‘নিয়তি ছিল বেদনাজাত। আহরণে ক্ষরণ আর সিদ্ধি। ধর্মে ও অধর্মে সমান পারাবার।… জলজ উত্থান থেকে আমাকে স্বধর্মে ফিরিয়ে দাও। কোথাও আমার শুরু ছিল না। আমার পরিসমাপ্তি নেই কোথাও।’
রফিক উল ইসলাম, কবি, তাঁর নিজের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন উপরের কথাগুলো।
কবির কি ছিল কোথাও পরিসমাপ্তিসীমান্ত? কবিতার কি পরিসমাপ্তি হয়, আদৌ? শুধু এক ভাবনা থেকে আরেক ভাবনায় থিতু হওয়া কিছুক্ষণের জন্য। কবিতা ব্যাপারটাই ক্রিয়া করে এইভাবে। এ-ই তো।
পশ্চিমবঙ্গের যে-কয়জন কবি আনন্দবাজারি গিমিকের বাইরে থেকে কবিতাযাপন করে যেতে পেরেছেন তিন দশকের বেশি সময় ধরে, রফিক উল ইসলাম তাদের মধ্যে একজন। ফলে, এই বৃহৎ বাংলায় আমরা যারা কাব্য পড়তে চাই বিরল অবসরে, এই কবি আমাদের পড়ার টেবিলে নিজের মহিমায় হাজির হয়েছেন বারবার। পশ্চিমবঙ্গের লিটলম্যাগগুলার পাতায় এই কবিকে যখনই পেয়েছি পড়েছি অভিনিবেশ সহকারে। এই কবিরই এক অনবদ্য একক কবিতাবই ‘জিয়ারত’।
“রফিক উল ইসলাম নিভৃতচারী এবং নিচু গলায় কথা বলে কবিতায়, কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের জোর অনুভব করা যায়।”—এই কথাগুলো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন রফিক উল ইসলাম সম্পর্কে।
এই বইয়ের কবিতাগুলিকে দুইটি বিভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম ভাগের কবিতায় একপ্রকার ধারাবাহিকতা থাকলেও কবি দ্বিতীয় পর্বে এসে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের দেখাতে শুরু করলেন অন্য এক ছবিমালা। আর ক্রমশ ফুটে উঠতে থাকল একটি কবিতাবইয়ের ব্যক্তিত্ব। নামকরণ হলো ‘জিয়ারত’।
‘জিয়ারত’ মুসলমানদের অবশ্যকর্তব্য এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান। পরলোকে-চলে-যাওয়া আত্মীয়পরিজন, হারায়া-যাওয়া তামাম বিশ্বআত্মার জন্য আল্লাহ্র কাছে শান্তিপ্রার্থনা করা হয় বিশেষ বিশেষ দিনে, তাকেই জিয়ারত বলে। এই শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো সাক্ষাৎ করা, দেখা করা, পরিদর্শন/পরিভ্রমণ করা বা তীর্থযাত্রা করা, বিশেষত কোনো পবিত্র স্থান, সমাধিক্ষেত্র, গোরস্থান, মাজার, দরগাহ বা কোনো নেককার/পির-আউলিয়ার কবর ইত্যাদিতে যাওয়া। এটি মূলত একটি আধ্যাত্মিক ভ্রমণ, যেখানে মানুষ মৃত বা জীবিত সম্মানিত ব্যক্তিদের স্মরণ করতে, তাদের জন্য দোয়া করতে এবং আধ্যাত্মিক শান্তি ও বরকত লাভ করতে যায়।
এহেন পরিভ্রমণের মোটিফটি নিয়া কবি কী করতে পারেন, কবি যদি হন রফিক উল ইসলাম, বইটা পাঠ করলেই শুধু এই অভিজ্ঞতাটি লভ্য। শুধু ধর্মীয় লোকাচারের বাইরে বেরিয়ে এই জিয়ারতের তখন পরতের পর পরত অর্থ উদ্ভাসিত হয় পাঠকের সামনে। এমনকি জিয়ারত এখানে সৌরজগতে গ্রহ ও গ্রহাণুপুঞ্জের সূর্য প্রদক্ষিণ করা ইত্যাদি অর্থেও।
অনন্ত শূন্যের মহিমায় কবিও বুঝি নিজের জন্য শান্তি খুঁজে নিতে চান। অশান্তির বেড়াজালে মানুষ পুড়ছে। এইসব কবিতা কি কখনো কখনো তাদের, সেই বিদগ্ধ সর্বসাধারণের, সঙ্গী হয়ে উঠবে? নিশ্চয়, নিশ্চয়!
এই বইয়ের কলেবর চাইর ফর্মা। দাম সত্তইর আরএস। বাংলা টাকায়, বাংলাদেশের টাকায়, বেশ রিজন্যাবল প্রাইসে এই বইটা খরিদ করা যায়। পাব্লিশার প্রতিভাস।
- আব্বাসউদ্দীন আল মাহমুদ - January 7, 2026
- ছবিলেখকের মিত্রকলা - January 6, 2026
- পরিভ্রমণের প্রেরণাবাহিত কবিতা - January 6, 2026

COMMENTS