আগুনে-পোড়া বাংলার বাউল ও বিশ্বজোড়া লাইভস্ট্রিমিং বাউলসংহতি মিউজিক শো

আগুনে-পোড়া বাংলার বাউল ও বিশ্বজোড়া লাইভস্ট্রিমিং বাউলসংহতি মিউজিক শো

সুনামগঞ্জ জেলার অধীন দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে বাউল রণেশ ঠাকুরের বসতভূমি। কিছু ‘অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্ত’ কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে বাউলের সাধনগৃহ, তাঁর গানঘর, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গ্রামবাসী ঘুমাতে গেলে গভীর রাতে দুষ্কৃতিকারীরা আগুন দেয় বাউল রণেশের ভিটায়। বাউলসংগীতশিল্পী হিসেবে রণেশ ঠাকুরের পারিবারিক পরম্পরা ও খ্যাতি সিলেটে তো রয়েছেই, সিলেটের বাইরে দেশজোড়া তার পরিচিতি। তিনি একাধারে একজন গায়ক, গীতিকার এবং সুরকার। কিংবদন্তি বাউল মহাজন উস্তাদ শাহ আবদুল করিমের সাক্ষাৎ শিষ্য তিনি, জীবন যাপন করেছেন করিমের সঙ্গে একনিষ্ঠভাবে, করিমগৃহসংলগ্ন রণেশের পারিবারিক নিবাস। রণেশের নিজের বসতভিটায় স্থাপিত গানের একটা আসরঘরে তিনি বাউলগানের ভাবশিক্ষার্থী ও অনুরাগীদের নিয়ে কাজ করে আসছেন বিগত চারদশক ধরে। এই ঘরটি পুড়িয়ে দিয়েছে সুরবিদ্বেষী দুষ্কৃতিকারীরা। বাউলের সংগীতগৃহ সম্পূর্ণরূপে পুড়ে গেছে এবং গত চারদশক ধরে তিনি যা-কিছু বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন, সেইসঙ্গে তাঁর নিজের রচিত শত শত গানের অমূল্য পাণ্ডুলিপি তিনি এত বছর ধরে সংরক্ষণ করেছিলেন, পুড়েঝুরে আংরা হয়ে গেছে সমস্তকিছু। পুড়ে গেছে বাউলের অন্তর। বাউল রণেশ এখন যে মানসিক দুর্বিষহ অবস্থার ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন সেই অবস্থার নাম ট্রমা। নারকীয় ভয় এবং মনোযন্ত্রণা।

যা-ই হোক, দুর্বৃত্তরা তাদের কাজ করেছে এবং রাষ্ট্রও সেই চিরাচরিত গলায় এই দুর্বৃত্তদের বলছে ‘অজ্ঞাতপরিচয়’। এখন আমাদের পালা। আমরা যারা বাংলা গান ভালোবাসি, আমরা যারা বাউল দর্শন ও বাউল গান নিজের আত্মায় ধারণ করি, কী করব আমরা? আমাদের করণীয় একটাই। গৃহদগ্ধ রণেশ বাউলের পাশে এককাতারে দাঁড়ানো। সংহতি জানিয়েই নিষ্পন্ন হয়ে যাবে আমাদের দায়িত্ব? না। আমরা বাংলাদেশ ও বাংলাভাষী বিশ্বে যে যেখানেই থাকি না কেন, করোনা-বিপর্যস্ত মহাদুর্যোগের এই ক্রান্তিকালে বাংলার প্রান্তিক গানজীবী বাউল ও ফকির-বৈষ্ণব যারা বায়না পাচ্ছেন না গানের অনুষ্ঠানের, কবে স্বাভাবিক হবে দুনিয়া এবং গ্রামীণ বাউলেরা আবার মাঠপ্রান্তরে গানের আসরে একতারা-দোতারা হাতে গাইতে দাঁড়াতে পারবেন তা আমরা জানি না, আপদকালে এই নিরিবিলি মিউজিশিয়্যান মানবদর্শনপ্রচারকারীদের গ্রাসাচ্ছাদনের সাময়িক অসুবিধায় খানিকটা সহায় হওয়া আমাদের দায়িত্ব। নিজেদেরই অস্তিত্বের স্বার্থে এই কাজ আমাদের করে যেতে হবে। এই মুহূর্তে বাউলদের কীভাবে সহায়তা করা যায় আমাদেরকে ভাবতে হবে। দেরি না করে তাদের খোঁজ নিতে হবে এবং অব্যাহত সহায়তার হাত বাড়াতে হবে। এ কোনো দয়াদাক্ষিণ্য কিংবা দান নয়। এ হচ্ছে শিল্পীর আজীবন সাধনার প্রত্যুত্তরে একটুকু সম্মান করা। তারা আমাদেরে যা দিয়েছেন তার স্বীকৃতি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রকৃত বাউল কখনো আপনার-আমার কাছে হাত পাতবেন না। আদব বজায় রেখে আমরাই তাদেরকে ডেকে নেব আমাদের সঙ্গে, এই দুর্যোগে আমাদের জন্য গান বাঁধবেন তারা, বাঁধবেন দুর্যোগোত্তর দুনিয়ার দর্শন এবং দেখাবেন পথের দিশা।

বাংলার বাউল সংগীতধারা বাঁচাতে এগিয়ে আসুন সকলে। গোল হয়ে আসুন, ঘন হয়ে আসুন, হাতে রাখুন ভরসার হাত। গোটা বাংলার প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক সকল বাউল ও লোকায়ত ঘরানার শিল্পীদের কাছে এই ভরসাবার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে যে একা নন তারা। তাদের গ্রাসাচ্ছাদন ও গানসাধনার সংকট সবাই মিলেই নিরসন করব আমরা। আসুন আমরা যতটা পারি কণ্ঠস্বর উঁচিয়ে কথা বলি বাউল গানের পক্ষে, বাউল রণেশ ঠাকুরের পাশে দাঁড়াই, এবং তাকে ছাই থেকে পুনরুজ্জীবিত হতে অভয় যোগাই, হাত বাড়াই বাউলদের দিকে এবং বিলম্ব না করে ঘরপোড়া বাউল রণেশের সমর্থনে একত্র হই, বাড়িয়ে দেই নিরঙ্কুশ সহায়তা যাতে তিনি আবার গান গাইতে পারেন।

প্রশাসন তথা রাষ্ট্রের কাছে যে বা যারা ‘অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্ত’, আমরা এদেরকে সেই লালন সাঁইজির যুগ থেকেই চিনি।  চিরচেনা এই দুর্বৃত্তদের প্রতি, আসুন, একটি স্পষ্ট বিবৃতি দিই সবাই মিলে। এরা বুঝুক না-বুঝুক, যেন দেখতে পায় যে বাউলেরা একা নয়, বাউল মানেই বাংলাদেশ, বাউল মানেই বাংলাভাষা, বাংলায় জন্মেছে যে সে তো জন্মসূত্রেই বাউল। শুধু বাংলাদেশ বা বাংলাভাষী বিশ্ব নয়, মানবজাতির উৎকর্ষযাত্রার পক্ষে নিরলসভাবে গান বানানোর বাউলমিশন কখনো বন্ধ হবে না, বন্ধ হতে দেবো না আমরা। আমাদের উত্তরপ্রজন্মের কাছে এই বিপ্লবগর্ভা বাউলধারা আমরা অবিকল হস্তান্তর করে যেতে চাই। নিজেদের জীবনটা আরও নন্দিত ও মানবিক করতে চাই বলেই আমরা বাউল শিল্পীদেরকে বারবার প্রতিবার বাঁচাতে একাট্টা হই। বিরুদ্ধে যায় যারা গানের, সুরের সংহার যারা চায়, সেইসমস্ত অসুরদের পরাস্ত করব আমরা আমাদের সম্মিলিত অবস্থানের দৃঢ়তা দিয়ে। এর কোনো বিকল্প রাস্তা নাই। এর জন্য যত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়, আমরা তা হতে রাজি। বিকৃতমনা গানবিরোধী চিরপরিচিত দুর্বৃত্তগুলোকে এই বিবৃতিটা আমরা সাফ-সাফ দিতে চাই যে এই নিরঞ্জন সাঁইমানুষ আর ভাবুকবৃত্তির রাস্তাটা আমরা হাজার বছর ধরে হেঁটে হেঁটে তৈরি করেছি, বৃষ্টিতে-বানে দৈবদুর্বিপাকে এর কোনো ক্ষয় হলে আমরা তা বুকে খেটে মেরামত করে নেব আবার। আমরা কোনোদিনই হাল ছাড়ি নাই, ছাড়ব না, আমরা বাউলের হাত ছাড়ছি না।

আসুন, বন্ধুরা, বাউল রণেশ ঠাকুরকে যে-কোনো উপায়ে একটু সহায়তা করি তাঁর এই বিপন্নতার সময়টায়। বাংলার বাউলদের পাশে অভয়বাণী নিয়ে যাই এবং গানবাজনার বিরোধী বিষাক্ত অসুরগুলোকে প্রতিহত করি। আপনি এই কাফেলায় যোগ দিতে পারেন আপনার কথা নিয়ে, কাজ নিয়ে, আর্থিক বা অনার্থিক যে-কোনো সহায়তাপ্রস্তাব ও পরামর্শ নিয়ে। ফেসবুকে এই পৃষ্ঠায় আমরা আপনার সহযোগ পাবার অপেক্ষায় আছি। কিন্তু হুড়াতাড়ার কিছু নাই, আমরা পরিকল্পিতভাবে সবাইকে নিয়ে এগোতে চাই। এমনকিছু করতে চাই যা এই করোনা-আপদকালে বাউলদেরকে দেবে সুস্থায়ী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। আমরা সবাই মিলে হাত লাগালে এই কর্তব্য সম্পাদন সময়ের ব্যাপার মাত্র। স্বদেশে এবং বিদেশে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রতিবাদী হয়েছেন সকলে, ব্যক্তিক ও সামষ্টিক বিভিন্ন ধরনের সহায়তার উদ্যোগও গৃহীত হচ্ছে লক্ষ করব। প্রবাসে-থাকা বাংলাদেশিদের উদ্যোগে এমনই একটি উদ্যোগ :


রণেশ ঠাকুরের জন্য বাদ্যহারা বাউলা গান
বিশ্বজোড়া লাইভস্ট্রিমিং বাউলসংহতি অনুষ্ঠান!
করোনামারীবিপর্যস্ত লকডাউন দুনিয়ায় বাংলা গানের বিভিন্ন ধারার শিল্পীরা যার যার বাসস্থানে থেকে এই ইভেন্টের সঙ্গে একাত্ম হবেন বলে একবাক্যে সম্মতি দিয়েছেন। অনুষ্ঠানটি ৩০ মে ২০২০ শনিবার সারাদুনিয়ায় ফেসবুকে একযোগে দেখতে পারবেন এবং সক্রিয় হতে পারবেন সংহতি-জানাতে-ইচ্ছুক সবাই। শিল্পীরা গাইবেন খালিগলায়, বাদ্যসঙ্গত ছাড়া। বাউল রণেশ ঠাকুরের বাদ্যযন্ত্র পুড়ে গেছে বলে এমন খালিগলায় গাওয়ার ভাবনা। যারা বাউলপীড়নের সঙ্গে লিপ্ত, তাদের কাছে এ এক প্রতীকী বিবৃতি। তারা জানবে যে গান কখনো বন্ধ করা যায় না। গান কখনো থামানো যায় না। গান থামে না। গান স্রোতের মতো, অবিরত, জয়শ্রী জীবনের অনন্ত প্রবাহ। কথা বলবেন শিল্পীরা বাউলনিগ্রহের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করতে। এবং সঙ্গে রয়েছে একটি তহবিল সংগ্রহের উন্মুক্ত স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ। অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হবে বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা, কানাডা সময় সকাল ১০টা, যুক্তরাজ্য সময় বেলা ২টায় একযোগে। অংশ্রগ্রাহী শিল্পীরা প্রত্যেকেই তাদের স্ব স্ব ফেসবুক পার্সোন্যাল ও অফিসিয়্যাল পেইজ থেকে শেয়ার করবেন লিঙ্ক, যাতে তাদের ভক্তরা বাদ না যায় কেউ সংহতি জানানোর উদ্যোগটি থেকে।

আগুনে পোড়া বাউলা গান
আমার আত্মা আমার জান
শুধু রণেশ ঠাকুর নয়, বিশাল বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলায় বাউলদের নিপীড়ন করবার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে দেখতে পাচ্ছি আমরা। বাউলের বসতভিটায় আগুন দেয়া হচ্ছে, মামলামোকদ্দমায় ফাঁসানো হচ্ছে বাউলদেরকে। যেমন পুড়িয়ে দিয়েছে বাউলের সাধনগৃহ, তাঁর গানঘর, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তাঁর চারদশকের সঞ্চিত বাদ্যযন্ত্র ও স্বরচিত পদাবলির পাণ্ডুলিপিগুলো।  সরকার, রাষ্ট্র, প্রশাসনব্যবস্থা কী ভূমিকা পালন করছে তা-ও ক্রমশ স্পষ্ট। সংহতি জ্ঞাপনের এই অনুষ্ঠানেই কর্তব্য সম্পন্ন হয়ে যাবে এমন নয়। আমরা বাউলনিগ্রহকারী সমস্ত অশুভ প্রবণতা ও এহেন প্রবণতায় নীরবে মদতদানকারী সমস্ত ব্যবস্থার সমূল উৎসাদন দাবি করব। ভস্মীভূত বসতভিটায় দাঁড়িয়ে বাউলের বাদ্যযন্ত্রছাড়া খালিগলার সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমরা গাইব, অগ্নিনির্বাপিত ছাইগাদায় আমাদের প্রত্যয়ছাপ রাখব।

গলা ছেড়ে গান গাই
বাউলের পাশে দাঁড়াই
কিংবদন্তি বাউল শাহ আবদুল করিমের নিকট নাড়াবাঁধা শিষ্য রণেশ ঠাকুর। উজানধলের কালনী নদীকূলে গুরুর গৃহসংলগ্ন রণেশ ঠাকুরের সপরিবার বসবাস। এখানে থেকেই তাঁর আজীবনের সাধন-ভজন, সংগীতচর্চা ও মানবিকতার প্রচার। গভীর রাতে বাউলের বসতভিটায় যারা আগুন দিয়েছে, প্রশাসনের ভাষায় এরা ‘অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতিকারী’। কিন্তু আমরা লালনের আমল থেকে এই দুষ্কৃতিকারীদের পরিচয় জানি। কাজেই আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা গান গেয়েই গান বাঁচাব। পোড়া বাদ্য নিয়া গাইব। আমরা গাইব বাদ্যযন্ত্রছাড়া। বাউলের গান কখনো বাদ্যযন্ত্রে থাকে না, বাউলের গান খাতায় লেখা থাকে না, বাউলের গান থাকে তার জীবনযাপনে। সেই জীবন যত পোড়ে তত তার গলায় গান ওড়ে।

আসুন, সবাই মিলে খালিগলায় গানে গানে রণেশ ঠাকুরের সন্ত্রস্ত বুকে মাভৈ জাগাই! আসুন, আমরা সমবেত স্বরে বাউল গানের ট্রমা কাটাই! আসুন, ঘরপোড়া বাউলের নিষ্পলক চোখে আমরা অভয়কিরণ ছড়াই! বিশ্বজোড়া লাইভ স্ট্রিমিং বাউলসংহতি অনুষ্ঠানের সময় একযোগে হাজির থেকে, শেয়ার ও মন্তব্য প্রচার করে একটা আওয়াজই দিই চিরপরিচিত দুষ্কৃতিকারীদের কানে :
আগুনে আমার মৃত্যু নাই
আগুনে বাঁচি আগুনে গাই

রণেশ ঠাকুরের জন্য বাদ্যহারা বাউলা গান — বিশ্বজোড়া লাইভস্ট্রিমিং বাউলসংহতি অনুষ্ঠান! ৩০ মে ২০২০ শনিবার সারাদুনিয়ায় ফেসবুকে একযোগে বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা, কানাডা সময় সকাল ১০টা, যুক্তরাজ্য সময় বেলা ২টায়।


প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি উদ্যোগবার্তা, পক্ষে এর সমন্বয়ক উজ্জ্বল দাশ

… …

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you