ঘূর্ণিঝড় নিয়ে কারো তেমন মাথাব্যথা দেখছি না। মাথাব্যথা থাকবেই-বা কেন! ঢাকার মানুষের ধারণাই নাই ঘূর্ণিঝড় কাকে বলে, এর প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতি কত দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। চারদেয়ালের নিরাপদ আশ্রয়ের ভিতরে বসে প্রলয় টের পাওয়া যায় না। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের কথা এখনও মনে আছে আমার। এত দীর্ঘ কালো রাত জীবনে আর আসেনি।
সেদিন স্কুলে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থী বড়আপাদের বিদায়সংবর্ধনা ছিল। আমি আর আমার ছোটবোন একই ক্লাসে পড়তাম — দুজনই তখন ক্লাস এইটের ছাত্রী। সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা ছিল। দুপুর থেকে বইতে-থাকা দমকা বাতাস প্রবল এক ঝড়ের আভাস দিচ্ছিল। স্কুলে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান তাড়াতাড়ি শেষ করার চাপ দিচ্ছিলেন শিক্ষকরা। এত সুন্দর অনুষ্ঠান — স্টেজে নাটক, গান, কবিতাআবৃত্তি চলছিল। নাটকের সিকোয়েন্সের সাথে সাথে পাল্টে যাচ্ছিল স্ক্রিন। বিদায়ী বড়আপাদের কান্নাকাটি করার কথা ছিল, অথচ তারা দেখলাম দিব্যি একে অন্যের গায়ে হাসতে হাসতে ঢলে পড়ছিল। আমাদের অঙ্কের স্যার বললেন, ‘ওরা তো হাসবেই, কারণ ওরা জানে — সবাই স্ট্যান্ড করবে।’ ওটাই ছিল স্কুলের সবচেয়ে ভালো ব্যাচ।
এক-রকম শিক্ষকদের চাপাচাপিতে অনুষ্ঠান শেষ হলো। বলা হলো ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেওয়া হয়েছে; তাড়াতাড়ি বাসায় গিয়ে আমরা যেন আমাদের বইখাতা বস্তায় ভরে নিরাপদ জায়গায় রেখে দিই। বিশেষ করে যারা এসএসসি পরীক্ষা দেবে। আমরা অবশ্য এই বিপদসংকেত মানে কী, ঠিকমতো বুঝতে পারিনি। অনেকে হয়তো এই শব্দটাই জীবনে প্রথম শুনলাম। তখন তো আর এখনকার মতো ঘরে ঘরে টিভি আর হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিল না।
১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত! কথাটার মানে বা গুরুত্ব না বুঝলেও সেদিন সন্ধ্যায় বাবাকে পেয়ে আমরা তিনবোন মহাখুশি। মা-র শাসন থেকে একটু বাঁচা যেত আব্বা কাছে থাকলে। দেখলাম আব্বা একগাদা বাজার নিয়ে এসেছে — একবস্তা ছোট-বড় আলু, শুকনা খাবারদাবার। মাছ-মাংসও ছিল বোধহয়, ঠিক মনে নাই। বাবা মাকে বলল, যা যা পারা যায় রান্না করে রাখতে। বাসায় ফ্রিজ না থাকায় খাবার প্রিজার্ভ করার ব্যবস্থা ছিল না। মা কাজে লেগে পড়ল, আর আব্বাকে দেখলাম আমাদের বইখাতা গুছিয়ে বস্তায় ভরছে, সাথে ঘরের অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও।
একসময় কারেন্টও চলে গেল। আমরা রাতের খাবার আগে-আগেই খেয়েছিলাম। সম্ভবত রাত তখন ৮টা, ততক্ষণে বাতাসের কটমট আর শোঁ শোঁ শব্দ আরম্ভ হয়ে গেছে। আমরা থাকতাম একটা কলোনিতে — পর পর লাগোয়া টিনের ঘর, চারপাশে ইটের দেয়াল। শব্দ করে কথা বললে পাশের বাসা থেকেও শোনা যায়। আশপাশের কয়েকটা বাসায় রেডিও-টিভি ছিল। বেতারে ঘোষণা শোনা গেল বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলা হয়েছে।
শুনে আমার মা-র মুখ শুকিয়ে গেল। আমাদের গ্রামের বাড়ির লোকজন আর আমার খালা-মামাদের নিয়ে চিন্তা করতে লাগল। আব্বা অভয় দিলো আর আমাদের বলল একটু ঘুমিয়ে নিতে। সারাদিনের উত্তেজনার কারণে আমরা এমনিতেই অনেক ক্লান্ত ছিলাম, বোধহয় ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। ঘুমিয়ে পড়ার আগে আব্বাকে জায়নামাজে বসতে দেখেছিলাম। আব্বা সারাদিনের কাজ শেষ করে মাঝরাত পর্যন্ত ইবাদত করত।
একটু পরেই অনুভব করেছিলাম আব্বা আমাদের ঝাঁকুনি দিয়ে ঘুম থেকে ডেকে তুলছে। বাবাকে আতঙ্কিত দেখাচ্ছিল — পরিবারের সবার জীবন বাঁচাতে হবে! তখনও মাত্র রাতের প্রথম ভাগ, ১১টা বাজে বোধ হয়। একদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, অন্যদিকে প্রচণ্ড ঝড়-তুফান। বাইরে বাতাসের গর্জন আর প্রচণ্ড বেগ।
বাবাকে বারবার আজান দিতে দেখলাম। আর মা আমাদের তিনজনকে জড়িয়ে ধরে বসে ছিল। বাতাসের তাণ্ডবে দরজা আটকে রাখা যাচ্ছিল না, চালার টিনও খুলতে শুরু করেছে। আব্বা আমাদের খাটের নিচে ঢুকিয়ে দিলেন। ঝড়ের সাথে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা ঘরে ভিতরে পড়ছে। চারিদিকে কী ভয়াবহ ঝড়তুফান আর বৃষ্টি! আমরা কিছুক্ষণ খাটের নিচে আর কিছুক্ষণ পড়ার টেবিলের নিচে আশ্রয় নিয়েছি। বাবা-মা ভেবেছিল যদি উপর থেকে কিছু ভেঙে পড়ে তাহলে অন্তত মাথায় আঘাত লাগবে না। আমাদের তিনবোনের মনে হচ্ছিল আজই হয়তো পৃথিবীর শেষ দিন।
সারারাত তাণ্ডব চালিয়ে ভোরের দিকে ঝড় একটু থামল। আমরা আমাদের ঘর থেকে বের হয়ে কিছু চিনতে পারছিলাম না। পা ফেলার মতো জায়গা নেই। ছিন্নভিন্ন, লণ্ডভণ্ড, তছনছ অবস্থা — গাছ, টিনের চাল, আসবাবপত্র সব দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে। কলোনিতে যে বেড়ার ঘরগুলো ছিল সেগুলোর চিহ্নমাত্র নাই। সেসব ঘরে থাকত আমাদেরই বন্ধুরা, ওরা রাতেই অন্য প্রতিবেশীদের ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল।
চারিদিকে কান্না আর কান্না। আব্বা আর প্রতিবেশী খালুরা লেগে পড়ল ঘরে টিন লাগানোর কাজে। তার মধ্যে টিনে লেগে পা কেটে গেল বাবার। এই কাটা পায়ে আমাদের ঘর ঠিক করে বেরিয়ে পড়ল আমাদের আত্মীয়স্বজনদের খবর নিতে। রেডিওতে শোনা গেছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার অবস্থা খুব খারাপ। আমার একমাত্র খালার বাড়ি ওখানেই।
খালা খুব অবস্থাসম্পন্ন। গল্পের মতো পুকুরভরা মাছ, গোয়ালভরা ধান, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জামরুল, গাব সহ নানারকম ফলের বিশাল বিশাল বাগান। লালমাটির দেওয়ালের বড় বড় ঘর। বাড়ির সামনে-পিছনে প্রশস্ত উঠান। খালু জনতা ব্যাংকে চাকরির সূত্রে শহরে থাকত, আমাদের বাসার পাশেই একটা ছোট বাসা ভাড়া করে থাকত। প্রতিদিন অফিস শেষে আমাদের বাসায় আসত। খালু প্রতিসপ্তাহে বাড়ি যেত আর প্রতিবারই খালা কিছু-না-কিছু পাঠিয়ে দিত মা-র জন্য। আমকাঁঠালের দিনে খালা ব্যাগ ভরে ফল পাঠাত। ইয়া বড় বড় কাঁঠাল খালু বয়ে নিয়ে আসত বাঁশখালী থেকে। শহর থেকে বাঁশখালীর দূরত্ব কম না। যোগাযোগব্যবস্থাও এখনকার মতো ভালো ছিল না। তিন-চারবার গাড়ি বদলাতে হতো। যা-ই হোক, আব্বা ঘরের টিনের চাল কোনোরকম ঠিক করে বাঁশখালীর দিকে রওনা দিলো। পরের ঘটনা বাবার মুখ থেকেই শোনা।
আব্বা প্রথমে গেল আমাদের গ্রামে (খালার বাড়ি যাওয়ার আগেই পড়ে) — আমার বড়আব্বা, বড়আম্মা (জ্যাঠা আর জেঠিমা) সহ পরিবারের অন্যান্য আত্মীয়দের দেখতে। আমাদের গ্রাম পাহাড়ে ঘেরা, তাই ঝড়বৃষ্টি সেভাবে এর ক্ষতি করতে পারেনি। এলাকাটা পুরোপুরি অক্ষত ছিল। এরপর বাবা গেল আমার নানার বাড়িতে। সেখানে জলোচ্ছ্বাসের পানি ঢুকেছিল, ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছিল অনেক। নানাভাই সহ সবাই নিরাপদেই ছিল, কিন্তু প্রত্যেকেই কোনো-না-কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এরপর বাবা রওনা দিলো খালার বাড়ির উদ্দেশে। যাতায়াতের রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মানুষের লাশ, বিভিন্ন গবাদি পশুপাখি ও অন্যান্য জীবজন্তুর লাশ, ছোট জাহাজ, ট্রলার, নৌকা, বিদ্যুতের খুঁটি, গাছপালা, মানুষের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র ভেঙেচুরে পড়ে আছে রাস্তায়। ঘূর্ণিঝড়ের সাক্ষী। গাছে ঝুলছে মানুষের লাশ। একপ্রকার মৃতদেহ ঠেলতে ঠেলতে সামনে আগানো!
আব্বা অনেক কষ্টে পায়ে হেঁটে, কখনো ভ্যানে ও নৌকায় চড়ে, প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে শেষমেশ খালার বাড়িতে পৌঁছাল। কিন্তু চেনা বাড়িটাকে কিছুতেই চিনতে পারল না। কারণ তখন সেখানে কোনো বাড়ি ছিল না। পানিতে থইথই করছিল পুকুর, লাল মাটির বড় বড় কামরার ঘর, বিশাল বিশাল ফলের বাগান। আমকাঁঠালের গাছগুলো শিকড় উপড়ে স্রোতের টানে ভেসে গেছে। তখনও পুরো জায়গাটা জলোচ্ছ্বাসের তিনফুট পানির নিচে।
বাবাকে দেখেও খালার মুখে কোনো কথা সরল না। খালার ঘরে ছিল নতুন তোলা ধান — সব ধান পানি আর মাটিতে মিশে একাকার। ঘরে একমুঠো চালও নেই যে খাবে। আমার খালাতো বোনরাও সবাই বিধ্বস্ত। চারদিকে থইথই পানি, সেই পানি ডিঙিয়ে কোনোরকমে বাড়ির পাশের স্কুলঘরে আশ্রয় নিয়েছিল ওরা। আশ্রয় নিতে যাওয়ার সময় এক বোন পানিতে প্রায় ভেসেই যাচ্ছিল। আমার খালা ওর চুল ধরে টেনে বাঁচিয়েছিল। সকালে বাড়ির পুকুরে মানুষের লাশ ভাসতে দেখে আমার ভাইবোনরা তাদের ছেলেবেলাটাই হারিয়ে ফেলেছিল।
বাবা তারপরের দিন আমার তিন খালাতো ভাইবোনকে নিয়ে বাসায় ফিরে এল বিধ্বস্ত অবস্থায়। ওরা কয়েক মাস পর্যন্ত হাসতে পারেনি, এমনই ট্রমা ভর করেছিল ওদের ওপর। আমার আপনজনেরা বেঁচে ছিল, কিন্তু যারা কাছের মানুষদের হারিয়েছে না-জানি তাদের কত কষ্ট। আমাদের কলোনির একটা পরিবারের গ্রামের বাড়ি ছিল কুতুবদিয়ায়। সেই পরিবারের ৪৫জন সদস্যের মধ্যে বেঁচে ছিল মাত্র ৯ জন।
সেই দুর্যোগে স্বজন হারিয়েছিল, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল হাজারো পরিবার। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ, বাঁশখালী, আনোয়ারা আর কক্সবাজারের মহেশখালী, কুতুবদিয়া উপকূলে প্রাণ হারায় অন্তত ১ লাখ ৩৯ হাজার মানুষ। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয় আরো ১ কোটি মানুষ। জমিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার জন্য বছরখানেক উপকূল অঞ্চলের মানুষ চাষাবাদ করতে পারেনি।
আমার ছেলেবেলার এই ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত আর ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতার কথা আমি আজও ভুলতে পারি না।
২০ মে ২০২০
… …
- In all departures there is an arrival & other poems || Roushan Hasan - September 11, 2026
- সাম্যের দিকে যেতে যেতে লেখাপত্র || রোদ্দুর রিফাত - September 10, 2026
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026

COMMENTS