‘আমরা যতটা দূর চ’লে যাই— চেয়ে দেখি আরো-কিছু আছে তারপরে’
শিরোনাম থেকে দেখা যাচ্ছে যে এই লেখার দু’টো অংশ; প্রথম অংশটুকু হচ্ছে- সংস্কৃতি বিকিকিনি, কোন জনস্বার্থে; এবং পরের অংশ হচ্ছে- চলচ্চিত্র উৎসব (নির্ভর), স্বাধীন/ধারার সিনেমা ও বাংলাদেশ। তো, যখন বাংলাদেশের সিঙ্গেল স্ক্রিন প্রেক্ষাগৃহগুলো একে একে সব বন্ধ হয়ে যেতে থাকলো, সিনেমার সাপ্লাই নেই বলে বা শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত-রুচিশীল-শৌখিন সমাজ প্রচলিত বাণিজ্যিক সিনেমার গায়ে ‘অতিনাটকীয়’, ‘ফর্মুলা’, ‘অশ্লীল’ ইত্যাকার তকমাজুড়ে দিয়ে, উচ্চ বা মধ্যবিত্ত ব্যতীত অন্নবিত্তদের সিনেমা দেখার অভ্যাসটাকে প্রব্লেমেটিক করে দিয়ে, নিজ গৃহের যে কোন রুমে বিশ্বচলচ্চিত্র কায়দা করে দেখার অভ্যাসে মজে উঠলেন- তক্ষণও আমরা বা ফিল্ম সোসাইটি করা লোকজন বলতে পারি নাই যে- যথাযথ প্রযোজক-পরিবেশক-প্রদর্শক-বান্ধব পরিবেশের অনুপস্থিতি ও জাতীয় নীতিমালার অভাবহেতু বাংলাদেশে সিনেমা ব্যবসার বেহাল দশা হয়েছে। নাগরিক, রুচিশীল সমাজ কেন এড়িয়ে যায় যে, সিনেমা দেখা, রস আস্বাদন ও সমঝদারির বিন্দুতে তাদের বৈরী আধিপত্যবাদী মনের হেজিমনিক চেহারা, গরিবের সিনেমা দেখা এবং বাণিজ্যিক সিনেমা ও সর্বরকমের সিনেমার বাণিজ্যিকতার বিস্তারে অন্যতম অন্তরায়। সুস্থ ছবির আড়ালে চলে অস্বাস্থ্যকর অবদমন।
আপনে কী জানেন না, ফর্মুলাবিহীন কোন সিনেমা নেই এই চরাচরে (বাণিজ্যিক বা শৈল্পিক) বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে; তাহলে গড়পড়তা, বাণিজ্যিক সিনেমার নির্মাতা ও তাদের ভোক্তাদের রুচির দিকে কেন বাঁকা নজর?! তারপর কিভাবে অস্বীকার করবেন যে, ক্যাপিটালিস্ট সিস্টেম নিজেই একটা প্রোডাক্ট বানায়, বাজারে ছাড়ে, মানুষকে অভ্যস্ত করে তোলে এবং দিনশেষে বলে থাকবে যে, ‘মানুষ এইটাই চায় বা খায়’ তাই আমি/আমরা এমনটাই বানাই! অর্থাৎ, বিষয়টা শুধু এমন নয় যে সিনেমা নাই তাই সিনেমা ব্যবসা বসে গেছে পথে, এরও অধিক সত্য হলো যে- যারা পয়সা ঢালবে, বাণিজ্য করবে তারা (জেনে বুঝে বিষপানের) ঝুঁকি কেনই নিবেন! পরন্তু, পুরো ‘সিনেমা ও ব্যবসা’ যে রাষ্ট্রীয় ভাবে জিম্মি ও ভিক্টিম সেই আলাপ আড়ালেই থেকে যায়। ‘জাতীয় চলচ্চিত্র’ বা ‘ন্যাশনাল সিনেমা’ দূর বাহ্য।
এহেন দশায়, বিশ্বজ্ঞান ধারণ করা মধ্য/উচ্চবিত্ত সমাজ বরাবরের মত বেছে নেয় বিদেশী সাহায্য। এক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পরিসর। বিকল্প প্রযোজনা, পরিবেশনা ভাবনা। চোখের অজান্তে মনের সামনে জন্মালো আরেকটি ধারণার: ফেস্টিভ্যাল ফিল্ম!
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনধারার সিনেমা মানে শুধুই সিনেমা নয় এর সাথে অলাভজনক বিনিয়োগ নামক একটা সুপ্ত ধারণার চর্চা করা হয়ে থাকে। পরন্তু, নির্মাতারা ও স্থানীয় মিডিয়ামালা সকলেই একযোগে প্রচার করে থাকেন যে, চলচ্চিত্রকার (মানুষের জন্য) একটা টপিক নিয়ে ইস্যুভিত্তিক কাজ করেছেন, মুনাফা অগ্রাধিকার নয়। বাংলাদেশে যারা বাণিজ্যিক ধারার সুযোগসুবিধা নিয়ে বা না নিয়ে স্বাধীনধারার সিনেমা করেন, তারা আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এর মধ্যে দিয়ে বিকল্প প্রযোজনা, পরিবেশনা ও বিপণনের একটি রাস্তায় নিয়মিত যাতায়াতের পথে আছেন। কারণ, বাংলাদেশের স্বাধীনধারার সিনেমাগুলো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের যে নেটওয়ার্ক, যেখানে একটা নড আছে, একটা ক্যাটাগরি আছে, একটা এক্সিবিট প্যানেল আছে- তার মধ্যে দিয়ে দর্শক, প্রদর্শক, বিভিন্ন দেশের টেলিভিশন চ্যানেলে জায়গা করে নিচ্ছে। যদিও, অর্জনের ফিরিস্তির আড়ালে এবং শিল্প-উৎসবের বাহ্যিক মোড়ক হেতু আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এর পুঁজিকেন্দ্রিক বিকল্প বাজার চরিত্রটা দর্শকদের নজরের আড়ালে থেকে যায়। অন্তিম অর্থে প্রকাশ থাকুক, এটা একটা লাভজনক বাজারেরই অংশ। বাজার চরিত্রের বিশেষ কৌশল বা পদ্ধতি পুরো বিষয়টা খোলাসা না করেই, মিডিয়া মারফত বাংলাদেশের প্রচলিত সিনেমা ধারণার বিপরীতে ‘আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ নামক ধারণাকে নাগরিক, সামাজিক যৌথচেতনার অংশ এবং সম্মানবর্গীয় করা হয়েছে ।
‘সকল ভূগোল নিতে হবে নতুন ক’রে গ’ড়ে’
আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালকেন্দ্রিক বাজার অর্থনীতি হাল আমলের ঘটনা নয়। এটি বিগত শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে আয়োজিত হয়ে আসছে। যেমন ধরা যাক, ফিল্ম কো-প্রোডাকশন। বৈশ্বিক চলচ্চিত্রের বাজারে কো-প্রোডাকশন বা সহ-প্রযোজনার ব্যবসা রমরমা। কারণ, স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তীকালে ১৯৯০’র দশক থেকেই ইউরোপের দেশগুলোতে ট্রান্স-কালচারাল ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগের বিধি-বিধান শিথিল হয়ে গেলে, এই ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠে এবং নির্মাতা-নেতৃত্বাধীন সিনেমা প্রকল্পের বাস্তবায়নের কো- প্রোডাকশন একটি গ্রহণযোগ্য মান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ফিল্ম-ফেস্টিভ্যালগুলো হয়ে উঠেছে এর কেন্দ্রবিন্দু।
গ্লোবাল ফিল্ম মার্কেটে কো-প্রোডাকশনের বাজার মূলত মিডিয়ার কর্পোরেটাইজেশনের ফলশ্রুতি (হেস্মনঢালঘ ২০০৬)। কো-প্রডাকশন হেতু, নির্মাতা এবং প্রযোজক প্রতিষ্ঠান উভয়ের লাভ। কো-প্রোডাকশনের এই ফন্দি শুধু নির্মাতাকেই নয়, সহ-প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকেও বড় প্রযোজকের সুনজরের দিকে এগিয়ে দেয়। ছোট মাছকে বড় মাছ গিলে ফেলার এই খেলায় শিল্পের দুনিয়ায় টাকার জোর, জবরদস্ত আকারে বেড়েই চলছে। শিল্প উদ্ধারের নামে এ এক আরেক কর্পোরেট পুঁজির খেলা।
চলমান সময়ে, প্রায়ই খবর আসে যে, বাংলাদেশের কোন না কোন নির্মাতা ফিল্ম বাজারের অংশ কো-প্রোডাকশন মার্কেটে সম্ভাবনাময় প্রকল্পের পুরস্কার জিতেছে। কিন্তু কেন এই পুরস্কার বা অর্থ প্রদান। শিল্পের খাতিরে শিল্পের উন্নয়ন হেতু নাকি অন্য কোন কারণে?
এই কারণেই শিরোনামে বলতে চেয়েছি যে, স্বাধীন/ধারার। অর্থাৎ, স্বাধীনধারার ছবিগুলো আসলে স্থানীয় বাজারে কতখানি স্বাধীন আর কতখানি ডিপেন্ডেন্ট তা ‘ফেস্টিভ্যাল ফিল্ম’ ধারণার আলোকে ভেবে দেখাটা জরুরী। বক্ষ্যমাণ আলাপে এই জরুরী ভাবনার একটি সামগ্রিক আলোচনা করার চেষ্টা করা হবে।
‘নগরীর রাজপথে মোড়ে-মোড়ে চিহ্ন প’ড়ে আছে’
প্রকাশ থাকুক, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল প্রথমত একটি ইউরোপিয়ান প্রতিষ্ঠান এবং ইউরোপ থেকেই এর বিস্তার। এর আছে নিজস্ব গতিবিদ্যা। শুধু তাই নয়, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এর সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং অর্থনীতিকে ঘিরে আকাদেমিক পরিসরে নিয়মিত আলাপ আছে, চলছে এবং সমীক্ষণ জারি আছে। যেখানে বিশেষ করে জার্মান চলচ্চিত্রবেত্তা ও অধ্যাপক মরহুম থমাস এলসেসার (১৯৪৩-২০১৯) সাহেবের কথা বলতেই হয়। তাঁর European Cinema: Face to Face with Hollywood (২০০৫) গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ‘Film Festival Networks: The New Topographies of Cinema in Europe’ রচনায় ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এর ফ্রেমওয়ার্ক বিষয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। জেনে রাখি, আজকের আলোচনার পাটাতন ও যোগসূত্র হিসেবে উল্লেখিত রচনাটি দিশারীর ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ থেকে যে ধরনের ছবি দেশের বাইরে যাচ্ছে বা ফেস্টিভ্যালগুলোতে বিভিন্ন ধরনের প্রযোজনা বা অফার পাচ্ছে, অনুদান পাচ্ছে তা যেন এলসেসার বর্ণিত ওই ফ্রেমওয়ার্কেরই একধরনের অবিকল প্রতিরূপ। যদিও, এলসেসার উল্লেখিত অধ্যায়টি লিখেছেন ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বাস্তবতাটা এখনের হলেও, ঘটনার সিলসিলা ঐতিহাসিক আর কী!
ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বা ‘যেই সব ছায়া এসে পড়ে’
ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বা চলচ্চিত্র উৎসব এর কথা যখন মুখে বা নজরে আসে তখন আসলে তা কী প্রতীতি নিয়ে হাজির। মানে এইটা কী শুধু উৎসব মাত্র যেখানে আমরা আনন্দ করব, ফূর্তি করব, মুভি দেখব৷ দুইটা নতুন মানুষের সাথে দেখা হবে, কথা হবে। তারপর মনভরা রোমাঞ্চ আর মাথাভরা চিন্তার খোরাক নিয়ে ঘরের মানুষ বাসায় ফেরত চলে আসবো। তাই কি? চলচ্চিত্র ‘উৎসব’ নামে জনপরিসরে হাজির থাকলে আদতে এটি শুধুমাত্র উৎসব নয়। এটি একটি মিলনমেলা- প্রযোজক, পরিবেশক, বিপণনকারী, প্রদর্শক, নির্মাতা, কলাকুশলী- সকলের জন্য। পাশাপাশি, ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলো এক অর্থে লগ্নিকারকের ভূমিকাও পালন করে থাকে, করে আসছে। নির্বাচিত ও মনোনীত সিনেমাগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হচ্ছে। মনে রাখবেন, প্রতিতুলনা ও প্রতিযোগিতা নিও-লিবারলে ইকোনমি বা নব্য-উদারনৈতিক অর্থনীতির অন্যতম কাঁচামাল। বিশুদ্ধ অর্থে উৎসব হলে সেখানে এ ধরণের কার্যকরী বাণিজ্যিক ব্যবস্থার পসার থাকতো না। আর তাই, উৎসব শব্দের আড়ালে মার্কেট বা বাজার নির্মাণের এই বিশেষ কৌশল বা পদ্ধতির নকশা জনমানসের আবডালে রয়ে যায়। উলটো, এই উৎসব/প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হওয়া, শেষ দৌড়ে পদক অর্জন করা- এই ঘটনাগুলো আর তথ্যের আকারে সীমিত না থেকে বরং ফ্যাক্ট বা প্রকৃত ঘটনা বা সত্য এর নির্ণায়ক হিসেবে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। এখন প্রশ্ন করতেই পারেন যে, পুঁজির মলয় বাতাসে ভেসে বাজারে উপনীত না হয়ে কি উপায়ে কুসুমের মধু পান করবেন? বাজার এক শুদ্ধ কারবার। তাতে কোন আপত্তি নাই। তবে, বেচা বা বিক্রি শব্দটা বললে রোমান্টিক, বিদ্রোহের আগুনে জ্বলতে থাকা শিল্প-সম্ভাবা নির্মাতাদের মনে অন্য আঁচ বা একটু অস্বস্তি তৈরি হলেও ধনতান্ত্রিক বারামখানায় বেচা-বিক্রির বাইরে তো কিছু নাই।
ফিল্ম ও ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল পুরোটাই একটা ইউরোপিয়ান ইন্সটিটিউট। এই যে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ধারণাটা, এটা কিন্তু একধরণের বাজারও বটে। এখন সেটারই বিভিন্ন কপি দীর্ঘদিন যাবৎ এশিয়ার বিভিন্ন জোনে হচ্ছে, আমেরিকার অন্যান্য জায়গায় হচ্ছে, শুদ্ধ করে বলতে গেলে কোথায় হচ্ছে না ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল! এইটা এমন এক দারুণ বাজার যেটা খুব আর্টিস্টিক জায়গা থেকে হলিউডকে (মানে বাণিজ্যিক সিনেমাকে) যেমন বাইপাস করে; তেমনি নিজস্ব বাজার চরিত্রটাকেও আড়াল করতে পারছে দর্শক, সমালোচক এবং সাধারণ মানুষদের কাছে। যেহেতু, বিভিন্ন দেশের মানুষের বিভিন্ন ধরনের ছবিমালা এখানে হাজির করা হচ্ছে সেই অর্থে এটা একটা কালচারাল ফেস্টিভাল বা সাংস্কৃতিক-‘শিল্প’-উৎসব এর মর্যাদা পাচ্ছে। যেভাবে ধরেন মিউজিক্যাল ফেস্টিভ্যাল হয়, থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল হয়। আবার এখানে বিভিন্ন ধরনের কম্পিটিশন থাকছে এবং আবার সেই কম্পিটিশনে আর্থিক প্রণোদনা বা প্রাইজমানিও থাকছে পুরষ্কার হিসেবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, এটা একধরণের অলিম্পিক গেমসের আদলও নিচ্ছে। যেহেতু বিভিন্ন দেশের মানুষ এখানে এক জায়গায় আসছে, ফলতঃ বহুজাতিক চরিত্র গড়ে উঠছে। যেমন ধরেন, প্যানডেমিক পূর্ববর্তী জামানার ব্যাপক আলোচিত সিনেমা ‘প্যারাসাইট’। ২০১৯ সালে বং জন-হো নির্মিত দক্ষিণ কোরিয়ার এ ছবিটি সেরা সিনেমাসহ চারটি শাখায় অস্কার পুরষ্কার লাভ করে (হলিউড)। আটলান্টিকের অন্য পাড়েও মানে ফ্রান্সের কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে (আর্টিস্টিক) ২০১৯ এ সেরা সিনেমা হিসেবে পাম দো’র ভূষিত হয়। অর্থাৎ, সিনেমা ব্যবসার বাণিজ্যিক ও শৈল্পিক উভয় বরকন্দাজ সিনেমাটার প্রশংসা করছে এই বলে যে, ‘প্যারাসাইট’ এর গল্পের ‘ইউনিভার্সাল ক্যারেক্টার’ আছে, ‘মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি’ আছে; যেখানে নির্মাতা সিউল শহরে বিলাসবহুল বাড়িতে বসবাসরত ধনী এবং বাঞ্জিহা বা মাটির তলের ফ্ল্যাটে অভাবী ও দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের বিপ্রতীপ বাস্তবতার ও জীবনযাত্রার গল্প মেলে ধরেছেন।
আবার, আপনি যদি একটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের এডহক বডিটার কথা চিন্তা করেন সেখানে দেখবেন যে বিভিন্ন দেশের জুরিদের রাখা হয় বা ফিল্মমেকারদের রাখা হয়। এলসেসার সাহেব এই আদলটাকে জাতিসংঘ এর কাঠামোর সাথে তুলনা করেছেন। জাতিসংঘে যেমন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি নিয়ে একটা সাধারণ পরিষদ গঠন করা হয়, যাতে একধরনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের যে অর্গানাইজিং কমিটি সেটার একটা পার্লামেন্টারি সিস্টেম আছে। ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর আছে যাকে সবসময় প্রেসের সাথে কমিউনিকেট করতে হয়। তো এই যে মডেলটা, এটার মধ্যে যেমন একটা কালচারাল আস্পেক্ট আছে, পলিটিক্যাল নড আছে তেমনি ফাইন্যান্সিয়াল একটা গেটওয়ে আছে।
আপাত অর্থে যা হচ্ছে তা হলো যে, প্রতিটি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কাজ করে একটি প্রতিষ্ঠান এর আদলে। ফলে, তাদের নিজস্ব আলোচ্যসূচি,কর্মপন্থা ও কূটনৈতিক দৃটিভঙ্গি আছে, যা বাজারে ওপেন সিক্রেট হিসেবে বিরাজ করে। নির্দিষ্ট ফেস্টিভ্যাল নির্দিষ্ট ভিস্যুয়াল স্টাইল ও নন্দনতাত্ত্বিক ছবি প্রদর্শনের জন্য নির্বাচন করে থাকে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মরিয়া হয়ে নিজস্ব চরিত্রটাকে মার্কেটে হাজির রাখতে চায়। প্রতিষ্ঠানগুলোর এক্সিস্টেনশিয়াল কূটনীতি আছে।
যেমন, বলা যায় কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এর লোগোটা কীভাবে ব্যবহার করবেন, কোন ফরম্যাটে, কোথায় কি ধরনের পজিশনিং হবে- সব শর্ত লেখা থাকে, আছে। ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ব্যবসায় রাজনীতিটা হচ্ছে কে কোন ধরণের ‘ফিল্ম’কে নিজেদের পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখাবে। এখন যারা ফিল্মের ফর্ম ভাঙছেন বা প্রচলিত নিয়মের সীমানা অতিক্রম করে নতুন ভাষাভঙ্গির ম্যাজিক দেখানোর কসরত করে থাকেন- কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল তাদেরকে জায়গা করে দিচ্ছে বরাবরের মতো। অন্যদিকে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে শৈলীগতভাবে পোয়েটিক, মেলোড্রামাটিক মুভি প্রদর্শন করে থাকে। “বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের খবরে ইদানীং যেমন দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের নাম প্রতিনিয়ত শোনা যায়। এর কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ১৯৯৬ সন থেকে চালু হওয়া বুসান চলচ্চিত্র উৎসব এখন এশিয়া অঞ্চলের ফিল্ম বিজনেসের অন্যতম মহাজন। বুসান তার পূর্বসুরী অর্থাৎ হংকং, টোকিও ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের কাছে থেকে উৎসবভিত্তিক সিনেমা বিপণন, পরিবেশনের মার্কেটটাই শুধু হস্তগত করেনি, বরং অন্তঃ-এশীয় চলচ্চিত্র উৎপাদন ব্যবস্থার একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে” (ফিরদাউস ২০১৯)। ব্যাপারটা হচ্ছে একটা মার্কেট হয়ে গেছে, মার্কেট অনুযায়ী সিনেমা সাপ্লাই হচ্ছে।
ফেস্টিভ্যাল ফিল্ম বা দর্শক ‘ডাকিবার ভাষা’
ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে যেহেতু ইউরোপীয় চিন্তাধারার পোষকতা করে, সেহেতু স্বভাবতই, ইউরোপিয়ান ক্রেতা, নর্ম, ভ্যালুজ, এথিকস, মরালিটিকে নিয়া এই প্রতিষ্ঠানটা গড়ে উঠছে। এখন এই প্রতিষ্ঠানে ছবি নিয়ে যেতে হলে এই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আঙ্গিকের ভেতর দিয়েই ছবিটাকে করে নিয়ে যেতে হবে বা হয়ে থাকে। তবে অন্যতম শর্ত হলো যে, সিনেমার ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতে বিশ্বজনীনতা ও মানুষিক প্রকরণ থাকতে হবে।
ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে নানান জাতের, জঁরার, দেশের সিনেমা রাখা হয়। দেশের বলতে উন্নত/উন্নয়নশীল/স্বল্প-উন্নত সবাইকে রাখা হয় অনুষ্ঠানসূচীতে। ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলো ইন্টারন্যাশনাল আর্ট সিনেমার মোড়কে উন্নয়নশীল/স্বল্প-উন্নত দেশে নির্মিত এমন সিনেমাগুলোকেই বাছাই করে থাকে যা শৈল্পিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে ‘আর্টহাউস’ সিনেমার খানদানি শৈলী, দেখনদারি ধারণ করে এবং সিনে-প্রকল্পের সামগ্রিকতার ভেতর দিয়ে বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসের সাথে যোগ স্থাপন করার ইশারা বহন করে। এই ধারার বা ধরণের সিনেমাগুলোকে এলসেসার সাহেব ডেকেছেন ‘ফেস্টিভ্যাল ফিল্ম’ নামে। পরিবেশন-প্রদর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে ফেস্টিভ্যাল ফিল্ম মানে যে ফিল্মটা ধরেন একজন পটেনশিয়াল নির্মাতা বানাইছেন, যেটার মধ্যে হচ্ছে গিয়ে জরুরি ইস্যু আছে। কিন্তু এটার এখনো সম্ভাব্য কোন ধরনের প্রচলিত এক্সজিবিশন উইন্ডো খুঁজে পাওয়া যায়নি; মার্কেটিং-প্রমোশন করার বাজেটও নাই তাই এইটাও বলা যাচ্ছে না অন্যান্য দেশে কি এটা এক্সপোর্ট হবে কিনা; সেল হবে কিনা? আবার যে দেশের সিনেমা সে দেশের স্থানীয় পরিসরে রিলিজ করে টাকা উঠানোর অবস্থাও নাই। তাহলে কী ফেস্টিভ্যাল ফেস্টিভ্যালে ঘুরে ফিল্মটার আয়ু শেষ করবে কিনা। এসব প্রশ্ন পকেটে নিয়ে ‘ফেস্টিভ্যাল ফিল্ম’ ঘুরে বেড়ায়। এই ঘুরে বেড়ানো যেন সম্ভবপর হয়, তার ব্যবস্থা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষরা নিশ্চিত করে থাকবে। কেননা, এই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলো একটা নেটওয়ার্ক এর মধ্যে বিরাজ করে, যাকে কোনভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ক্যালেন্ডারের বারো মাসে এই ফেস্টিভ্যালগুলো কিন্তু নির্দিষ্ট সময়, তারিখ ধরে আয়োজিত হয় এবং আপনি কখনই দেখবেন না যে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সাথে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের টাইমিংয়ে ওভারল্যাপিং হচ্ছে। বা এমন আরো যতো বড় বড় রিজিয়নাল ফেস্টিভ্যাল আছে যেমন ধরেন এশিয়ার মধ্যে হচ্ছে বুসান বা সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল তাদের কর্মসূচীর তারিখের কিন্তু কখনই ওভারল্যাপ হয় না। কারণ, টাইমফ্রেম যদি ওভারল্যাপ হয়, এই ফেস্টিভ্যালগুলো মূলত যাদেরকে উদ্দেশ্য করে আয়োজন করা, এই যে ফিল্মমেকার, কো-প্রডিউসার, ইন্টারন্যাশনাল প্রডিউসার, ডিস্ট্রিবিউটর এবং প্রেস জার্নালিস্ট, পাশাপাশি (স্থানীয়) দর্শকবৃন্দের জন্য বটে- তাদের লাইফ জেরবার হয়ে যাবে বিমানবন্দর থেকে বিমানবন্দরে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে। এবং (ফেস্টিভ্যাল) ফিল্মের ক্ষেত্রে একটা ফেস্টিভ্যালে গেলে আবার দশটা ফেস্টিভ্যালে যাওয়ার রাস্তা তৈরি হয়ে যায়। তো, এই ফেস্টিভ্যাল ফিল্মগুলো আসলে ওই উইন্ডোটার উপর ভর করে ফেস্টিভ্যালে এক্সেসটা তৈরি করতে চায়। এইক্ষেত্রে, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সার্কিট একটা বিকল্প পরিবেশক-প্রদর্শক এর ভূমিকা পালন করে আসছে। ঘটনাটা এমন যে, একবার নির্মাতা যদি এখান থেকে এই ফোর্সটা নিয়ে বের হতে পারে, দেখা যাবে যে আল্টিমেটলি বছর শেষে নির্মাতা হয়তো তার সেকেন্ড ছবির আরেকটা প্রডিউসার নিয়ে বের হবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রেস জার্নালিস্টদের ভূমিকাটা কেমন এখানে? কোন সিনেমা দর্শক হিসেবে আমাদের দেখাতে হবে বা হবে না বা কোন সিনেমা বাজার পাবে বা পাবে না এইসব নির্ধারণের প্রশ্নে প্রেস জার্নালিস্টরাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। আমরা দেখে থাকবো, বাংলাদেশের ছবি যখনই দেশের বাইরে যায়, সেটা বাইরে গিয়ে আসলে ভালো করলো না খারাপ করলো সেই খবর যাদের বরাতে ছাপানো হয় বাংলাদেশের পত্রিকায়; সেখানে কতিপয় পত্রিকার নাম সবসময় দেখবেন। একটা হচ্ছে ইন্ডিওয়্যার অথবা হলিউড রিপোর্টার বা স্ক্রিন ডেইলি বাভ্যারাইটি। এরা কারা? এদের বরাতেই কেন ছবির খবরটা ছাপতে হয়? আদতে, এরাই হচ্ছে মূলধারার যে চলচ্চিত্র ব্যবসা, সেই ব্যবসার খবরাখবর রাখে, বাজার মনিটর করে থাকে। বক্স অফিস ফলো করে৷ বক্স অফিস বিষয়ক ইস্যুগুলো সারাবছর এনালাইসিস করে। তো, এই পত্রিকায় নিউজ/ফিচার জায়গা করে নিতে পারা টা একটা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই ফেস্টিভ্যালগুলোতে ছবি পাঠানো এবং ফলাও করে সংবাদ ছাপানোর অন্যতম রাজনীতি হলো, আর্ট বা শিল্প হিসেবে ছবিটিকে নির্ণায়িত করার প্রচেষ্টা মাত্র। এ কারণেই ফিল্মবেত্তা ডিনা ইওরদানভা (২০১৩) মনে করেন, বিশ্ব চলচ্চিত্র ব্যবসায় শুধু প্রযোজনা ও পরিবেশনায় নয় এই ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট কর্তা, নির্মাতা, প্রযোজক এবং সমালোচক এর সংযোগবিন্দু রূপে ফেস্টিভ্যাল গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আবার আসি ফেস্টিভ্যাল ফিল্মের ঘরে। এশিয়ান বা সাউথ এশিয়ান সিনেমাকে সবচেয়ে বড় ব্যাকআপ কিন্তু ইউরোপিয়ান ফেস্টিভ্যালগুলোই দেয়, যারা আবার ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলের সাথে প্রাক্তন (কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত নয় এমন) কলোনাইজার-কলোনি সম্পর্কে সম্পর্কিত। যেমন, রটারডেম, লোকার্নো এই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলো ভেনিস, বার্লিন, কান এর সাথে তুলনা করলে তাদের চেয়ে একটু কম প্রভাবশালী কিন্তু আলোচিত ফেস্টিভ্যাল। প্রশ্ন হলো, শুধুই কি তাদের প্রচার আছে তাই তাদের মানুষ চিনে নাকি কোন বিশেষ কারণে তাদের খোঁজ রাখে? খোঁজ রাখে কারণ, এই ফেস্টিভ্যালগুলোর প্রোগ্রামিংয়ে এশিয়ার উপর একটা ফোকাস থাকে। অন্যান্য বড় ফেস্টিভ্যাল এর এইরকম জোন স্পেসিফিক নজর রাখার সুযোগ কম থাকে, আরও আরও বাণিজ্যিক ও নানাবিধ কারণে। সেখানে এই রিজিওনাল ফেস্টিভ্যালগুলোর অফারিং টা হচ্ছে এরা লংটার্ম ধরে উদীয়মান বা সম্ভাবনাময় নির্মাতাদের আর্থিক অনুদান দেয়, কারিগরি সহায়তা দিয়ে নির্মাতাকে একটা প্রক্রিয়ার মধ্য রেখে তাকে দু’টো বা তিনটা ছবি করার সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি, মেন্টরিং সেশন, ট্যালেন্ট ক্যাম্পাস, মাস্টার ক্লাস এসবের মাধ্যমে নির্মাতাকেও যেমন বিকশিত করা হচ্ছে তেমনি ভবিষ্যতের সাপ্লাইয়ের জন্য কাঁচামাল এর যোগানের পথ সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে। এভাবেই বার্লিন ট্যালেন্ট ক্যাম্পাস; বা, ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের বিয়েন্যাল কলেজ সিনেমা- এর মতো একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে।
আবারও স্মরণ করি এলসেসার সাহেবকে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, এই বিকাশ ও উন্নয়ন বর্ধনের খেলায় কিভাবে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের কোল থেকে ‘অঁতর’, ‘নিউ ওয়েভ’ এবং নিদেনপক্ষে একজন নির্মাতার রেট্রস্পেকটিভ ফিল্ম শো-কেসের উদ্ভব ঘটে থাকবে।
যেমন, কোন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যে কোন একটা দেশ থেকে কোন একজন ফিল্মমেকার ফেস্টিভ্যালের অলিখিত এবং বহুল চর্চিত আদর্শ অনুস্মরণ করে, নিজস্ব শৈলী বজায় রেখে নির্মিত সিনেমা দিয়ে তাক লাগানোর ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারলে, কর্তৃপক্ষ এলান করে থাকে ওই দেশ থেকে একজন সম্ভাব্য ‘অঁতর’ নির্মাতার খোঁজ পাওয়া গেছে। যদি একই বছরে কোন একটা দেশ থেকে দুই-তিনজন তাক লাগানো নির্মাণ শৈলীর ফিল্মমেকার পাওয়া যায়, তাহলে ঐ ফেস্টিভ্যাল থেকে বলা হয়, ওই দেশে ‘নিউ ওয়েভ’ শুরু হয়ে গেছে।
তারপরের মজা টা হচ্ছে, প্রথম ছবিটা তো নজর কাড়ছে, এখন দ্বিতীয় টা যদি যথেষ্ঠ নাম কুঁড়াতে ব্যর্থ হয়, তখন দানে দানে তিন দানের ভরসা তৃতীয় ছবিটা! থার্ড সিনেমাটা যদি গুণে ভালো/দামে কম এর ক্যাটেগরিতে টিকে যায়- ব্যস হয়ে গেলো! তিনটে সিনেমা দিয়ে অনায়াসে একটা রেট্রোস্পেক্টিভ হয়ে যাবে। এবং শিল্প সমাজে ‘অঁতর’ ফিল্মমেকার হিসেবে ঐ নির্মাতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।
এইটা খেয়াল রাখা জরুরি যে, ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে শুধুমাত্র প্রযোজকরা যায়, তা কিন্তু না। এইখানে বিভিন্ন দেশের টেলিভিশন/ব্রডকাস্টিং ব্যবসা থেকে ক্রেতারা সিনেমা খরিদ করতে আসে তাদের দর্শকের জন্য, যেগুলো তারা নির্দিষ্ট টাইমচাংকে প্রদর্শন করে থাকে। কেননা, সব দেশের দর্শকরা এবং টিভি প্রতিষ্ঠানগুলো, বাংলাদেশের টিভি দর্শকদের মত বিজ্ঞাপন গিলতে বা গেলাতে অভ্যস্ত নয়। তাদের খাদ্য দিতে হয়। তো, তারাও খুঁজে কোন নতুন অঁতর পাওয়া গেলো কিনা যদি না পাওয়া যায় ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের বাজার থেকে যেগুলো ভালো লাগল, সেগুলো ওয়ার্ল্ড সিনেমা হিসেবে দেখালো। সো, এই যে খেলাটা যে চলে, এই খেলাটার সাথে দেশীয় দর্শকেরও হক আছে বোঝাপড়া উৎপাদনের।
‘আমাদের সোনা রুপো নেই, তবু আমরা কে কার ক্রীতদাস?’
একটা ধোঁয়াশা বাংলাদেশের বিদেশে চালানযোগ্য সিনেমার ক্ষেত্রে জন-আলাপে উঠে আসে, যেমন বিদেশে বসা মানুষরা কি দেশের গরিবি বাস্তবতা অর্থাৎ এই যে বিবিধ সমস্যার ছড়াছড়ি, তার উপস্থাপন দেখতে চায়? বিষয়টা এমন নয় যে, ভূগোলের পশ্চিমে অবস্থিত মুরব্বী দেশগুলো পূর্বে অধিষ্ঠিত দেশগুলো থেকে আপাত নেতিবাচক, সমস্যাক্লিশট, দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র এর সফল দৃশ্যরূপক চিত্রায়ন দেখতে চায়। উল্টোটাও ঘটে থাকে যে, স্থানীয় নির্মাতা চলমান বাস্তবতাকে প্রাচ্যায়নের ফেটিসিস্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাজির করে থাকতে পারেন ঐ পারের দর্শকদের জন্য। মানে, এই প্রবণতাকে কি পোস্ট কলোনিয়াল হ্যাংওভার নাকি বিষয়বস্তুর অতি বা ক্লিশে ব্যবহার হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় কিনা- সেটি ভিন্ন পরিসরে বিস্তারিত আলাপের দাবি রাখে। এককথায় এভাবে চিন্তা করা যায় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনধারার সিনেমাগুলো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোতে যাচ্ছে বা দেশের ভিতরে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোতে অংশ নিচ্ছে; কিন্তু, সিনেমাগুলো আসলে কী দেখাচ্ছে? বা, এই সিনেমাগুলো মূলতঃ কোন বাস্তবতাটা ধারণ করে। এবং সেখানে এই বাস্তবতাটার খরিদদার বা কনজিউমার কারা? এন্ডোর্স করবে কারা? আর ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল যে ব্যাপারটা- সেখানে একটা দেশের ছবি যখন একজন পরিচালক নিয়ে যান তখন আলো-ছায়া-ছবির মোড়কে তিনি কী নিয়ে যাচ্ছেন বা রফতানি করছেন?
“মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজকে টার্গেট অডিয়েন্স হিসেবে মাথায় রেখে স্বাধীনধারার অল্পপ্রাণ ছবিগুলো অধিকংশক্ষেত্রে আদর্শবাদের ধ্বজা ধরে, জানা সমস্যাবলীর ক্লিশে চিহ্নায়ন ও সমাধানের পথ ব্যবহার করে থাকে। এই সমাধানের পথে পথে ছড়িয়ে থাকে এলিট সমাজের দর্শন। এতে না থাকে সমাজের গরিষ্ঠ মানুষের ভাবনার কোন প্রতিফলন, না থাকে সামাজিক বাস্তবতার কোন প্রতিফলন” (ফিরদাউস ২০১৯)। চিত্রায়ন ও উপস্থাপনের নিরিখে এই ধারায় দারিদ্রতার একরকম বাজার সবসময়ই থাকে। এই দারিদ্র্যের সীমা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এর সীমা সর্বব্যাপী- রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ব্যক্তিক, মানসিক এবং আরো যা যা হতে পারে। প্রশ্ন হলো যে, এই দারিদ্র্য কোন দারিদ্র্য- এইটা কি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কে এন ইসলামের দারিদ্র্য যা মহান ও যিশু খ্রীষ্টের আত্মত্যাগের সম্মান দান করে এবং ‘দুরন্ত সাহসে অসঙ্কোচ প্রকাশের’ শক্তি যোগায় নাকি এগিয়ে যাওয়া গ্লোবাল দুনিয়ায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সোজা সামনের দিকে যাওয়ার বাসনায় প্রতিকূল অবস্থায় সঙ্গে কুস্তি লড়াই ব্যাখ্যান ধারণ করে। বাংলাদেশে সিনেমা বিশেষে উভয় ডিসকোর্সের বৈষয়িক বা নৈর্ব্যক্তিক প্রদর্শনের মিশ্রণ দেখা যায়। তবে, ফেস্টিভ্যাল ফিল্মের আলাপে বিষয়টা আসলে দরিদ্রতার দীনতা প্রকাশই মুখ্য নয়, ‘দারিদ্র্য’ ধারণাটাকে কোন কোন নির্মাতা বার্তা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে যেমন ব্যবহার করে থাকেন হয়ে থাকেন তেমনি কেউ কেউ ব্যক্তি মানুষের লড়াই এর প্রকাশের উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করে থাকেন।
যখন বাংলাদেশের স্বাধীনধারার ছবি ফেস্টিভ্যালে আসে যায়, তখন কার্যতঃ দর্শক-শ্রোতা-পাঠিকাবৃন্দের সম্মুখে ফেস্টিভ্যালকে শিল্পমাধ্যমের বাহন এবং সিনেমাটিকে একধরনের শৈল্পিক ছবি হিসেবে হাজির করা হয়। এবং সবসুদ্ধ দেখা যাচ্ছে যে, নেটওয়ার্ক এর মধ্য দিয়ে একটা ছবি সম্ভাব্য প্রোডিউসারদের এবং ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। যেহেতু, ফেস্টিভ্যালগুলোর একটা আর্টিস্টিক বা শৈল্পিক মর্যাদা আছে এবং স্বাধীনধারার ছবি যারা করে থাকেন ধরেই নেয়া হয় (বা নির্মাতা নিজেও মনে করে থাকেন(?)) যে, তা(দে)র সিনেমাটা মানবিক, বিশ্বজনীন এবং শৈল্পিক মানে উত্তীর্ণ। অর্থাৎ, দেশ-কাল ভেদে সবাই সিনেমাটার অ-জ্ঞান বাস্তবতাটাকে সজ্ঞানে বুঝতে পারবে এবং তারিফ করবে। বাংলাদেশের স্বাধীনধারার ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ফেরত বা প্রত্যাশী সিনেমাগুলো ‘সর্বজনীনতা’ বা ‘বিশ্বজনীনতার’ ছাঁচ-বিন্যাস এর ছকটাই অনুসরণ করে থাকে। যেখানে স্থানীয় চরাচরের গরীব-দুখী-প্রান্তিক-নাগরিক-পরিবেশ-বাঁচা-মরার মোড়াল লড়াই এর গল্প আলগা বুনোটে, আখ্যানে ঠেঁসে ভরা হয়। তথাপি, নির্মাতার নিজের বয়ানে, নিজে যে সময়-সমাজ-শ্রেণী’র অধিবাসী হয়ে জীবন যাপন করে থাকবেন তা সিনেমার গল্প হিসেবে গরহাজির রয়ে যায়। যাইহোক, কেন এমন হয় অথবা হচ্ছে বা নর্ম হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারছে- সেটি ভিন্ন আলাপ। নির্মাতা নিজের সময়ের কথা বলতে গিয়ে অ-যাপিত আরেক শ্রেণীর মানুষ-জীবন-চরিত্রের ঘাঁড়ে বন্দুক রেখে ফিকশনের কামান দাগবেন, তাতে আপত্তি করার কিছু নাই, তবে তিনি বেদরদীর মত ঐ অ-জানা যাপন ও জীবনকে ভিজ্যুয়ালি নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে হাজির করছেন হরদম, এবং দরদের সাথে ওই জীবন-মানুষ-বাস্তবতার প্রতিকৃতি যে আঁকতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তা অন্তত এইখানে টুকে রাখা থাক।
‘আমাদের জানালায় অনেক মানুষ, চেয়ে আছে দিনমান হেঁয়ালির দিকে’
এবার আসা যাক, সংস্কৃতি বিকিকিনি- এর প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের স্বাধীনধারার সিনেমাগুলোতে যেমন থাকে বিত্তহীন, (নিম্ন-)মধ্যবিত্ত, গ্রামীণ মানুষের বাগান তেমনি থাকে প্রান্তিক, গ্রামীণ মানুষের ‘গরিবী অমরতা’র ‘কালচারাল’ ক্যাচালের গল্প। ব্যাপারটা ক্যাপিটাল হিসেবে দারুণ, নয় কি! সে কারণে, বাংলাদেশে সিনেমার টপিক আকারে যে বিষয়গুলো বেছে নেওয়া হয় সেগুলো বরাবর মোটাদাগে অভিবাসী (অভ্যন্তরীণ/আন্তর্জাতিক), পরিবার, লিঙ্গ বৈষম্য, দারিদ্র, শিক্ষা, ব্যক্তি-মানুষের মানসিক তকলিফ, সামাজিক বঞ্চনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ এইসবের মধ্যে ঘুরপাঁক খায়। এই বিষয়গুলো আবার কিন্তু এনজিও বা উন্নয়ন সংস্থার এজেন্ডা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। কিন্তু, তর্ক-বিতর্কের শোরগোলটা বাঁধে যখন দেখা যায় যে, সিনেমার আখ্যানে বাস্তবতার অনুলিপি সাঁটতে গিয়ে নির্মাতা উন্নয়ন সংস্কৃতি বা এনজিও সংস্কৃতি প্রসূত সংজ্ঞার আবরণে বৈষম্য, অধিকার, পশ্চাদপদতার জায়মান বাস্তবতাকে পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের পাটাতনে জীবন্ত বলি দিয়ে থাকছেন। ফলে, শিল্পের নামে যখন নাটকীয়-বাস্তবতাবাদের (ড্রামাটিক রিয়ালিটি) দোহাই দিয়ে ফিল্মে এইসব প্রেস্ক্রাইবড সংজ্ঞা সাবস্ক্রাইব করা হয় তখন অবধারিতভাবে বাস্তব মানুষ ও ব্যক্তি-বাস্তবতার মধ্যে বিরাজমান যে দ্বান্দ্বিক দশা তার থেকে একটা দূরত্ব তৈরি হয়।
কিন্তু, কালচার বেচা-বিক্রি করার ব্যবসায় কেন এইসব পদের দরকার পড়তেছে? কারণ, আর কিছুই নয় সিনেমার বাজারে দ্বান্দ্বিক বাস্তবতার নিবেদন বা বিবরণের কাটতি ভাল। হোক সেটা আমেরিকান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বা ইউরোপিয়ায়ন সিনেমা কালচার। জঁরা যাই হোক না কেন মূল জট লাগে কোন না কোন দ্বান্দ্বিক প্রশ্নে। যেমন, আপনি যদি ইউরোপিয়ান বনাম অ্যামেরিকান সিনেমার ভেদরেখা খুঁজতে যান, তাহলে দেখবেন যে, অ্যামেরিকান ছবির আখ্যানের জট সাধারণত পরিবার সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে নিহিত: ড্যাডি ইস্যু নয়তো মামি ইস্যু অর্থাৎ অয়ডিপাল কমপ্লেক্স, আপনি আলফ্রেড হিচককের সাইকো (১৯৬০) থেকে শুরু করে যে কোনো সিনেমায় এই দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ট্রেস করতে পারবেন। ইউরোপিয়ান সিনেমার ঘরানার মধ্যে দেখবেন পরিবারকে কেন্দ্রে বা সন্নিহিত অবস্থানে রেখে এক্সিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিসের গল্প রচনার নিয়মিত প্রবণতা। হোক সেটা কামিং অফ এজের গল্প বা প্রেমের গল্প, ফোকাস থাকবে দুইটা মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব, দ্বিধা বা বোঝাপড়ার ব্যর্থতার যে জায়গা সেইখানে।
ইউরোপ থেকে নেয়া এই সিনেম্যাটিক দ্বান্দ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন বাংলাদেশের স্বাধীনধারার সিনেমায় বিভিন্ন মাত্রায় হরহামেশা হচ্ছে। যেখানে আখ্যানের কেন্দ্রে থাকবে হেটারোনোমাস জেন্ডার, ক্যারেক্টার, সম্পর্ক, এবং জীবন যুদ্ধে তাদের ব্যর্থতা, বা জীবনের কাছে পরাজয়, আবার পরাজয়কে আবেগজড়িত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এবং ব্যর্থতাকে শক্তিতে পরিণত করার আপ্রাণ কোশেশ। অর্থাৎ, ট্রমা ও অস্তিত্ব-সম্বন্ধীয় সংকট-ই সিনেমাকে জোগান দিচ্ছে শৈল্পিক লাইনে বক্তব্য প্রকাশের কাঁচামাল।
তাহলে আবার যদি শিরোনামে ফিরে যাই যে, সংস্কৃতি বিকিকিনি — কোন জনস্বার্থে? মানে ফিল্মমেকার কার জন্য ছবি করতেছে এবং কার জন্য বেচতেছে। মানুষকে নিয়ে ছবি করলেই তো মানুষের জন্য ছবি তৈরি করা হয় না। আবার মানুষের পক্ষেও ছবি করা যায় না। আসলে, আমাদের এখানে আক্ষরিক বা রূপক অর্থে দরিদ্রতা নিয়ে যত বড় বড় সিনেমা আছে, সেসব যদি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে দেখবেন, পোভার্টি প্রসঙ্গ হিসেবে ন্যারেটিভের উপরিতল বা সারফেসে থাকে কিন্তু গভীরতল বা ডিপ স্ট্রাকচারে দুই বা ততোধিক মানুষের দ্বন্দ্বের কথাই থাকে। পোভার্টির কারণে হয়, ফ্যামিলি ফেইল করতেছে, ফ্যামিলি হয়ত ডিসপ্লেস হয়ে যাচ্ছে। সারফেসে কারণ হিসেবে যেই ঘটনা দেখানো হোক না কেন ভেতরের গল্পটা কিন্তু দুইটা মানুষ বা শক্তির বা অস্তিত্বের যে দ্বান্দ্বিক বাস্তবতা তার-ই গল্প মেলে ধরে থাকে। মোটাদাগে, বাংলাদেশের ফেস্টিভ্যাল-আর্ত বা বিলেতফেরত সিনেমাগুলো দ্বান্দ্বিক বাস্তবতা প্রকাশের এই প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করে থাকে। এক্ষেত্রে বলা যায়, নির্মাতা বা পরিচালক সংশ্লিষ্ট দেশের যে বাস্তবতা সেটাও যেমন দেখান, তেমনই ঐ বাস্তবতাটা দেখানোর ভেতর দিয়ে দেশের সংস্কৃতি, ভাষা, জীবনযাপন তথাপি একধরণের নৃ-তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিও হাজির করেন। ভিনদেশে বসে ভিনদেশি বা প্রবাসী দর্শক যখন সিনেমাঘরে বসে সিনেমাটা দেখছেন, তাঁর কাছে ওটাই তখন অন্যতম চাক্ষুষ নমুনা হয়ে উঠে। নির্মাতার লেন্স দিয়ে, ভিউ দিয়ে দেখাটাই অন্যতর সংস্কৃতি বিচার বা অন্বেষণের উপায় হয়ে দাঁড়ায়। তো, সিনেমাটা কি কোন দর্শকের জন্য তৈয়ার করা হয় নাই? অবশ্যই এটা কোনো না কোন মানুষের জন্যে বানানো হচ্ছে, দেখানো হচ্ছে। তারা কারা? তাই স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে- উৎসবমুখী সিনেমাগুলো আমাদের দেশের মানুষের জন্যে কতখানি ফোকাস করে তৈরী করা হচ্ছে। একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে, ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবি দিতে গিয়ে আমি কি জুতার মাপে পা কাটবো নাকি পায়ের মাপে জুতা?
কারণ, স্বাধীন উদ্যোগে সিনেমা করে ফেস্টিভ্যালে পাঠানো বা ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে সিনেমা বানানো এবং ফেস্টিভালে নিয়ে যাওয়া, সেখানে প্রজেক্টটা ওয়ার্কআউট করার পর আবার দেশে ফিরিয়ে এনে থিয়েটারে রিলিজ করা- এটা যেমন সিনেমা করার একটা প্রক্রিয়া তেমনি আরেকটি প্রসেস হলো এই বিষয়গুলি নিজের অডিয়েন্সকে ফোকাস করে করা হবে কিনা বা না হলে কেন নয় এই বিষয়গুলোতে আলাপ এর পরিসর উন্মুক্ত রাখা। যেহেতু, বিভিন্ন সময় বারবার আহাজারি ঘটে দর্শকশূন্যতা নিয়ে; সেহেতু, দর্শক পাওয়া না গেলে সেইটা কেন পাওয়া যাচ্ছে না বা সেইটা শুধু দর্শকের, নাকি ফিল্মমেকারের দায়? মনে রাখি, স্বাধীনধারার ফিল্ম যে নির্মাণ করেন, তার একটা সুযোগ বা জায়গা থাকে নিজস্ব অভিব্যক্তি বা সেল্ফ এক্সপ্রেশন প্রকাশের। কিন্তু এই সেল্ফ এক্সপ্রেশনকে জন্য জায়গা দিতে গিয়ে সেল্ফ স্টাইলেশন কে বড় করে দেখা হচ্ছে কি না… বা সেটা করতে গিয়ে নির্মাতা যখন সেল্ফ নিয়ে ডিল করছেন তখন কি আসলে তিনি ‘সেলফ-সেন্সরশিপের’ কনফর্মিস্ট বেড়াজালে আটকে যাচ্ছেন কিনা বা কেন গেলেন— এই প্রশ্নগুলো তোলার সংস্কৃতি অনুপস্থিত। নচেৎ, বাংলাদেশের সিনেমাকরিয়েদের ক্লিশে সংকট ‘গল্প নাই’ এর আশু সমাধান নেই। প্রত্যেক বছর বছর বাংলাদেশে এমন দশটা ঘটনা ঘটে যেগুলো নিয়ে সিনেমায় কাজ হওয়ার কথা; কিন্তু, ‘সেলফ-সেন্সরশিপের’ ছাঁকনি গলে বাংলাদেশের না বাণিজ্যিক, না স্বাদহীন ধারা — কোন শৈলীপ্রবাহ সেইসব গল্পগুলো ছুঁয়ে দেখে না। আমার মতে, বাংলাদেশের উৎসবমুখী চলচ্চিত্রের কাফেলার দিকে নজর রেখে এই প্রসঙ্গগুলোও এখন আলাপ করা জরুরি।
স্বাধীনতার ‘আহ্লাদের অবসাদে ভ’রে আসে আমার শরীর’
বাংলাদেশে চলচ্চিত্রশিল্প পুরাপুরি ব্যক্তিগত বা বেসরকারি খাতের অংশ নয়। বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম যেখানে রাষ্ট্র যেখানে চলচ্চিত্রশিল্প রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার অংশভুক্ত কিন্তু তথ্য মন্ত্রণালয়ের অন্তর্গত। দেশে নানা জাতের, তরিকার ফিল্মমমেকার আছেন কিন্তু জাতীয় চলচ্চিত্র এবং নীতিমালা কোনটাই নাই। সরকারি অনুদান আছে, কিন্তু অনুদানের ছবির দর্শক নাই সিনেমাহলে। এমন একটা অবস্থায়, শিক্ষিত সমাজ ও জাতীয়তাবাদী চেতনার নিয়মিত আহ্লাদের সরবরাহ করে যাচ্ছে ফেস্টিভ্যাল ফিল্ম এবং ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং বিদেশ ফেরত চলচ্চিত্রগুলোর ‘সাংস্কৃতিক বৈধকরণের জমিন হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে’ (বোরদিঁও ১৯৯৩)।
চলচ্চিত্রগুলো ‘ভালো কাজ’ বলে স্বীকৃতি পাচ্ছে, মাঠ-ময়দান থেকে মানুষের গল্প তুলে আনছে বল্যে সুনাম পাচ্ছে। এই বৈদেশিক অর্জন হবু-নির্মাতা, সক্রিয় নির্মাতাদের সামনে সফলতা লাভের একটি অনুসরণীয় মডেল বা নকশা হিসেবে আলোচিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনধারার ফেস্টিভ্যাল ফেরত তথা ফেস্টিভ্যালবাহী বিকল্প বিপণন চর্চার সঙ্কট তৈরী হচ্ছে শংসার এইবিন্দু থেকেই। কেননা, বাংলাদেশের চালু সংস্কৃতিতে কোন একটা কিছু কে ভাল বলার পরে বিতর্কের অবকাশ থাকে না। ভালো মানেই যে সত্য এবং সৎ একথা তো হলফ করে বলা যায় না, যায় কি? ভালো হয়ে গেলে সেটার আর গঠনমূলক সমালোচনা করা যায় না। গঠনমূলক সমালোচনা প্রয়োজন এই কারণে যে, যেন বর্তমান সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করে আরও ‘ভালো’র সীমানাকে প্রশস্ত করা যায়। সমালোচনা মানেই বাতিল বা ক্যান্সেল কালচারের হাতিয়ার নয়। বরং, যে ফিল্ম-ইকোসিস্টেমের মধ্যে নির্মাতা-দর্শক-প্রযোজক-পরিবেশক-সমালোচক-প্রদর্শক বিরাজ করেন, সম্বন্ধ রাখেন সেই সিস্টেমটা যাতে আরও ফলপ্রসূভাবে সামনের দিকে আগাতে পারে, শক্ত জমিনের উপর দাঁড়াতে পারে, এবং ইজ্জতের সাথে সব রকমের সিনেমার সাপ্লাই দিতে পারে- তারই প্রচেষ্টা মাত্র।
উল্লেখ
আইআইইউএসএফএফ. ২০২০, আইআইইউএসএফএফ টক উইথ ইমরান ফিরদাউস, ইউটিউব, <https://www.youtube.com/watch?v=g_z2ERZo0G4>।
ইওরদানভা, ডি (সম্পা.), ২০১৩, ইনট্রোডাকশন টু দ্য ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রিডার, সেন্ট অ্যান্ড্রুস ফিল্ম স্টাডিজ: সেন্ট অ্যান্ড্রুস।
এলসেসার, টি. ২০০৫, ‘ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল নেটওর্য়ার্স: দ্য নিউ টপোগ্রাফিস অভ সিনেমা ইন ইউরোপ’, ইউরোপিয়ান সিনেমা: ফেস টু ফেস উইথ হলিউড, আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটি প্রেস: আমস্টারডাম।
ফিরদাউস, ই. ২০১৯, ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র, বিদেশী উৎসব, বিশ্বায়ন ও রাজনৈতিক শুদ্ধতা: এসো নবধারা জলে করো স্নান’, অ্যাকাডেমিয়া, <tinyurl.com/2rsse45z>।
বোরদিঁও, পি. ১৯৯৩, দ্য ফিল্ড অভ কালাচারাল প্রোডাকশন: এসেজ অন্য আর্ট অ্যান্ড লিটেরাচার, র্যান্ডাল জে. (সম্পা.), পলিটি প্রেস: ক্যামব্রিজ।
দাশ, জী. ১৯৫৪, ‘আবহমান’, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, নাভানা: কলকাতা, পৃ. ৫৬-৬০।
দাশ, জী. ১৯৫৪, ‘অনন্দা’, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, নাভানা: কলকাতা, পৃ. ১২৯-১৩১।
দাশ, জী. ১৯৫৪, ‘বিভিন্ন কোরাস’, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, নাভানা: কলকাতা, পৃ. ১০৮-১১২।
দাশ, জী. ১৯৫৪, ‘স্বপ্নের হাতে’, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, নাভানা: কলকাতা, পৃ. ৪৪-৪৬।
দাশ, জী. ১৯৫৪, ‘সহজ’, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, নাভানা: কলকাতা, পৃ. ৩৯-৪১।
দাশ, জী. ১৯৫৪, ‘অবসরের গান’, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, নাভানা: কলকাতা, পৃ. ২৫-৩০।
দাশ, জী. ১৯৫৪, ‘বিভিন্ন কোরাস’, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, নাভানা: কলকাতা, পৃ. ১০৮-১১২।
দাশ, জী. ১৯৫৪, ‘লঘু মুহূর্ত’, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, নাভানা: কলকাতা, পৃ. ৯২-৯৪।
হেস্মনঢালঘ, ডি. ২০০৬, ‘বোরদিঁও, দ্য মিডিয়া অ্যান্ড কালচারাল প্রোডাকশন’, মিডিয়া, কালচার অ্যান্ড সোসাইটি, ভলিউম. ২৮, নং. ৩, পিপি. ২১১-২৩১।
লেখক : চলচ্চিত্রনির্মাতা, সংস্কৃতিবীক্ষক ও কলাসমালোচক। ইউনিভার্সিটি অভ টেকনোলজি সিডনি-তে স্ক্রিন স্টাডিজে পিএইচডি করছেন।
- In all departures there is an arrival & other poems || Roushan Hasan - September 11, 2026
- সাম্যের দিকে যেতে যেতে লেখাপত্র || রোদ্দুর রিফাত - September 10, 2026
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026

COMMENTS