ফ্র্যাগমেন্টেড ভিয়্যু ফ্রম অ্যা মিউজিক্যাল কন্সার্ট

ফ্র্যাগমেন্টেড ভিয়্যু ফ্রম অ্যা মিউজিক্যাল কন্সার্ট

একলগে দুই ক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়া যায় না তা নয়, বিশেষত দৈনন্দিন কর্মসমাধাকালে মেন্টাল রিলিফের জন্য হলেও লোকে কম্পালস্যরি কাজটার পাশে একটা-না-একটা সাবসিডিয়ারি কাজ হামেশা করিয়া থাকে। যেমন আপিশে কেরানিগিরির দৈনন্দিন র‍্যুটিনকাজের বিরল ফুরসতে কেউ গান শোনে, কেউ সোশ্যাল সংযোগস্পেসে স্ট্যাটাস আপডেট করে বা লাইকায় ধুমিয়ে, কেউ ইউটিউবে ফান আইটেম দেখে। এইভাবে মানুষ পরিত্রাণ খোঁজে শেকলবান্ধা কামকাজের প্যাঁচপয়জার থেকে, পরিত্রাণ পায়, ব্যাহত না-হয়ে মূল কাজ আরও গতি লাভ করে। তেমনি মিউজিক্যাল কন্সার্টে যেয়ে আমরা শুধু গুরুগম্ভীর মুখ বানাইয়া গানই শুনি তা তো নয়। আমরা সামাজিক কুশলাদি জিজ্ঞাসা করি পার্শ্ববর্তী মিউজিকফ্যানটিকে, কেউ কেউ হয়তো নতুন বন্ধুও জুটিয়ে ফ্যালে কন্সার্টময়দানে বা গানশ্রবণের প্রেক্ষাকামরায়, কেউ-দেখতে-পাচ্ছে-না-ভান-ধরে কেউ তার প্রেমাস্পদেরে আলতো আদর করে কর্ণলতিকায়, কেউ ওয়ান-মোর চিৎকারে ছেঁড়ে গলার রগ, কেউ অদ্ভুত দিওয়ানা নাচে বা হেঁড়ে গলায় দিগ্বিদিকশূন্য গান গায়। এইসব তো অবাক হয়ে দর্শনীয়। কোথাও কোনো কর্নারে একেকটা জুটি ফিসফিসিয়ে কথা বলে চলে, শালিকের দুরুদুরু পাখাঝাপ্টানির মতো চোখের পাতা কাঁপে সেই ইন্টার্মিডিয়েইট প্রেমিকজুটির, এইসব তো কন্সার্টে গান শুনতে যেয়ে উপ্রি পাওনা।

গানবাজনার অনুষ্ঠান রিভিয়্যু করতে যেয়ে কেবল মঞ্চের পানে চেয়ে থেকে আলোচনা সারতে গেলে ব্যাপক আনন্দ অধরা থাকিয়া যায়। কেবল সরলসোজা আনন্দ বলছি কেন, অনেককিছুই ক্রিটিক্যালি ফিরে দেখা থেকে বঞ্চিত হই আমরা গানমঞ্চ ছাড়ায়ে অডিয়েন্সের দিকটায় না-তাকালে। এবং গানের অনুষ্ঠানে যেয়ে স্রেফ কানে শোনা নয়, চোখে দেখাটাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। কেননা সাংস্কৃতিক বিকাশের গতিধারা ভালো প্রকাশিত হয় লাইভ/জ্যান্ত অনুষ্ঠানগুলোতে। এমনকি শিস বাজানো থেকে শুরু করে দর্শকের ইউফোরিয়া, আনন্দোল্লাস, আরেকটা গান বা নাচের আব্দার, শিল্পীর পার্ফোর্ম্যান্সকালে শ্রোতাদর্শকের দুয়োধ্বনি ইত্যাদি নিরিখ করিয়া গেলে একটা আন্দাজ করা যায় যাপিত সময় সম্পর্কে; একটা আন্দাজ পাওয়া যায় জাতির/জনপদের মনোজগৎ সম্পর্কে, একটা আইডিয়া পাওয়া যায় সাংস্কৃতিক জনরুচি সম্পর্কে। এবং কে না জানে যে সংস্কৃতি নিছক শৌখিনতা নয়, গানবাজানাই কালচার নয়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ-হতাশা মিলেজুলেই জিনিশটা চালু থাকে।

এই নিবন্ধপ্রতিবেদনে একটা বড়-কলেবর কন্সার্টের পরিপার্শ্বদৃশ্য-মন্তব্য-মন্তাজগুলো দলিলায়িত করার প্রয়াস মিলেছে। একদম আনুপূর্বিক তো সম্ভব হয় না কিছুই, নিবন্ধটা ফ্র্যাগমেন্টেড কিছু মুহূর্তচূর্ণ উপস্থাপন করতে চলেছে যেখানে স্টেজে এবং স্টেজের বাইরেকার ঘটনাবলি রিপোর্টাজের ধাঁচে গেঁথে তোলা হয়েছে। এই কন্সার্টটা আয়োজিত হয়েছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ব্যানারে এবং সরকারি তহবিল থেকেই নির্বাহ করা হয়েছে এর ব্যয়ভার। সিলেটের রিকাবিবাজারে যে-স্টেডিয়াম রয়েছে, সেইটাই ছিল কন্সার্টের ভেন্যু। ২০১৮ সনের মার্চ পয়লা হপ্তায় এইটা আয়োজিত হয়েছিল। কন্সার্টসমুজদার লোকে ভেন্যু ছিল লোকারণ্য। মমতাজ বেগম, ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস্ আর শুভাশিস মজুমদার বাপ্পা ছিলেন বাদ-সন্ধ্যা আমন্ত্রিত শিল্পী। দিনের বেলায় স্থানীয় অনেক শিল্পী নিজেদের মতো করে এই এলাকার লোকগান পরিবেশন করেছিলেন। দিবাভাগের উল্লেখযোগ্য শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন সুষমা দাশ, যিনি বাংলাদেশের হাওরবেষ্টিত জনপদের লোকগানের এক ভাণ্ডারী। কিন্তু সংগীতের কলাকারি নিয়া এই নিবন্ধ নয়, এইখানে পাওয়া যাবে সংগীতপ্রতিবেশী কিছু কথাবার্তা; পাওয়া যাবে দর্শকশ্রোতাসারির কিছু তামাশা, খানিকটা ব্যক্তিকেন্দ্রী আলাপের চুম্বক।

স্টুডিয়োরেকর্ড বনাম লাইভ পার্ফোর্ম্যান্স

গাইছিলেন বাপ্পা মজুমদার। মাগ্রেবের আজানের অব্যবহিত পরে স্টেজে আরোহণ করেন শুভাশিস মজুমদার বাপ্পা। আট-দশটা গাইলেন বোধহয়, এক-দুইটা বাড়তি-কমতি হতে পারে, ঠিক গুনিয়া রাখি নাই। কিন্তু একটা জিনিশ খেয়াল করছিলাম যে, ব্যাপক পপ্যুলার কয়েকটা গান গাইলেও শ্রোতাদর্শকসারির ভিতরে সেই-অর্থে আবেশ জাগাইতে পারছিলেন না তিনি। কিন্তু দলছুটের যে-কয়টা গান সঞ্জীবের বদলা বাপ্পা গাইলেন, সেগুলোতে অ্যাট-লিস্ট বুঁদ হয়ে থাকবার কথা ছিল সংগীতসমুজদারদের। তা হয় নাই। নিজের সোলোগুলোতেও তথৈবচ। ‘পরী’ গানটা গাইবার সময় অডিয়েন্সরেস্পোন্স লক্ষ করলাম, উন্মাদনা নাই, পুঁতাইন্না-ন্যাতানো। ‘দিন বাড়ি যায়’ গাইলেন, একই শ্রোতাদর্শকপ্রতিক্রিয়া। ‘বায়ান্ন তাস’ গাইলেন, দলছুটের হিউজ হিট, অথবা ‘বায়োস্কোপ’, সাড়াশব্দ ওই-ই। একটা গানেই শুধু উন্মাতাল হয়েছিল শ্রোতা, শাহ আবদুল করিমের ‘গাড়ি চলে না’ সেই গান, তা যত-না বাপ্পার কারণে তারচেয়ে বেশি বরং গানটার আবেদন এতদঞ্চলের ব্লাডে রয়েছে বলেই হয়তো। মোদ্দা কথা, বাপ্পা আসর-জমানো শিল্পী নন আন্দাজ হলো অবস্থা দেখেশুনে। এর একটা কারণ তো এ-ই যে, স্টেজে এসে একটা গান ইম্প্রোভাইজ করার ম্যাজিকটা বাপ্পায় নাই। নিখুঁত স্টুডিয়োরেকর্ডেড গলায় রেন্ডিশন অন্তত মঞ্চে সেই উন্মাদনাটা আনতে পারে না, যা কিনা কাম্য। ওপেন-এয়ার কন্সার্টে এই জিনিশটা, অ্যালবামে যেমন রেন্ডিশন হুবহু মঞ্চেও তেমন হলে, আদতে বোরিং। মোনোটোনাস। লোকে তো হরমুহূর্তে এখন মুঠোফোনে রেকর্ডেড গানটা শুনছে। স্টেডিয়ামে ঠ্যালাধাক্কা সামলে এসে যদি সেই লাউকদুটাই শোনে, সেক্ষেত্রে বিরক্ত তো হবেই। নিস্তেজ অডিয়েন্স নিয়া আর-যা-হোক মুক্তমঞ্চ কন্সার্ট চলে না। তাছাড়া বাপ্পার হাতে ম্যাসপিপ্যলের সঙ্গে সংযোগ ঘটাবার কিমিয়াটাও নাই বলিয়াই মনে হয়েছে আগাগোড়া। খালি শুদ্ধ গাইলে, সহি গাইলে, রেকর্ডের মতো কন্সার্টেও অবিকল বাজিয়ে গেলে ম্যে-বি ভালো গাওয়া হয়, কিন্তু ভালোর উপর দিয়া গাইতে গেলে একটা আলাদা কারিকুরি রিক্যোয়্যার্ড। ওই রিক্যোয়্যার্ড ব্যাপারটাকেই বোধহয় উস্তাদি বলে  লোকে। মেকানিক্যাল ধাতব গলায় হেলদোলহীন ভালোই গেয়েছেন বাপ্পা। তারপরও বলি, ইম্প্রোভাইজেশন ছাড়া খাঁটি নিখাদ গলায় গাইলেও ভরাডুবি থেকে রেহাই পাওয়া যায় না, বাপ্পার মঞ্চপরিবেশনা দেখে এ-মতোই মেহসুস হয়।

হিপহপ তবু ফ্লপ

উল্টা-ক্যাপ মাথায় দিয়া বার্মুডা শর্টস্ পরিধান করিয়া গা-কোমর বেঁকায়া-মুচড়ায়া গাইতে পারলেই হিট। অবশ্য ভিশ্যুয়্যালে ব্যাপারটা খায় বেশি, নাকি ভিশ্যুয়্যাল উপস্থাপনা ছাড়াও শুধু শ্রবণাভিঘাতে একই রেজাল্ট আসত বলা যাচ্ছে না। আজকাল হিপহপের মার্কেট বেশ রবরবা। কাউকে কাউকে র‍্যাপও বলতে শুনি হিপহপটাকে। ব্যাপারটা কি ঠিক বলা হয়? অ্যানিওয়ে। বেঁকাইন্না মাজা-কোমর হইলেই কি র‍্যাপ হয়ে গেল? উল্টা-ক্যাপ আর ঢোলঢোলা স্যান্ডো বানিয়ানের তলায় বা উপ্রে একখানি স্কিনি টিশার্ট হইলেই হিপ থপথপিয়া র‍্যাপ হয়ে যাইতেই তো দেখি। হিট। পোলাপানে খায়। কুদ্দুস বয়াতী তো বহু আগেই ডিস্কো হয়েছেন, সম্প্রতি হিপহপ। উনি যে এককালে আলকাপ গাইতেন, কিসসা গান গাইতেন, ওইটা আইডেন্টিটি নয় উনার অধিকন্তু।Momtaz Begum ওইটা স্ট্রাগলের কাল ছিল বয়াতীর। বর্তমানে উনি হিপহপে হ্যাপি। ঠিক কুদ্দুসপদাঙ্ক অনুসরণ করেই হয়তো মমতাজ বেগমও সম্প্রতি হিপহপহ্যাপি শিল্পী হিশেবে নয়া আইডি নিয়া হাজির হয়েছেন শ্রোতার দরবারে। এইবারকার সিলেট-কন্সার্টে ব্যাপারটা আরও অভিনিবেশে খেয়াল করা গেল। পয়লা গান গাইবার আগে একটু আদাব-সালাম দিবার সময়েই চিল্লাচ্ছিল পোলাপানে “পাঙ্খা পাঙ্খা পাঙ্খা পাঙ্খা পাঙ্খা … লোক্যাল-বাস লোক্যাল-বাস লোক্যাল-বাস …” ইত্যাদি হেঁকে। এমপি মমতাজকে দেখে মনে হলো উনি বিষয়টা সানন্দ উপভোগ করছেন। উনার শত শত গান ম্লান করে দিলো দুই হিপহপ, উনি বিষয়টা ভালোভাবেই নিয়েছেন শুধু না, অত্যন্ত অম্লান বদনে ব্যাপারটার জন্য মহান আল্লাতালার কাছে শোকরগোজারও করছেন শোনা গেল। লোক্যাল বাস আর পাঙ্খা অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়ায় বেগম মমতাজ অত্যন্ত গদগদ। তবু ওইদিনের কন্সার্টে উনার পরিবেশনা বাজনাবাদ্যি দিয়া ধামধুম ছাড়া বেশি কিছু হয়েছিল বলা যাচ্ছে না। রাধারমণ দত্ত ও শাহ আবদুল করিমের দেশে এসে বেগম মমতাজ ওইদিন হোস্টদের কথা ভেবেই কি না কে জানে নিজের গুরুর কথা বোধহয় পাশরিয়া গেছিলেন। ফলে একের পর এক সিলটিয়া গানমহাজনদের পদ গাইলেন তিনি, কিন্তু কোনো প্রাণ তাতে পেলো না প্রতিষ্ঠা। রাধারমণগানের ভনিতাপদে বারবার উনি ‘রাধার মন’, ‘ভাইবেরাদার মন বলে’ এই-রকম বলছিলেন ভ্রম হচ্ছিল, স্বকর্ণে শ্রবণ করিয়াও বিশ্বাস হচ্ছিল না। আবদুল করিমের গানকয়টারে একদম পাক্কা আওয়ামীগীত বানিয়ে ফেললেন সফলভাবে। এমপিশিল্পী হিশেবে বেগম মমতাজ অনেস্ট সন্দেহ নাই। কিন্তু করিমচর্চাকারী কেউই-যে স্টেডিয়ামে হাজিরানে-মজলিশ ছিলেন না তা আলবৎ বোঝা যাইল; নইলে এদ্দিনে করিমগান বিকৃতির অভিযোগে কাউয়াক্যাচক্যাচ হতো। পরিতাপের এ-ই যে, স্বীয় জনপ্রিয়তার নেপথ্যে যে-কারিগরের সবচেয়ে বেশি লিরিক ক্রিয়াশীল বলিয়া আমাদের বিবেচনা বলছে, সেই শাহ আলম সরকারের গান মমতাজ যদি সেদিন আগাগোড়া গাইতেন, বলা যায় না শো-স্টপার শিল্পীকে ছাড়াইয়া না-যাইলেও কাছাকাছি-যে যাইতেনই নিশ্চিত। তো, ‘লোক্যাল বাস’ আর ‘পাঙ্খা’ গাইলেন অবশ্য মমতাজজি ভীষণ রেলিশ করে। লেখা বাহুল্য।

শেরপা

ফারক মাহফুজ আনাম জেমস্। বছর-দশ আগে একটা বহুল প্রচারিত দৈনিকের মিনি-ইন্টার্ভিয়্যুতে জেমস্ বলেছিলেন যে তিনি তার চূড়া ছুঁয়ে ফেলেছেন, নতুন করে বেশিকিছু দিবার তার নাই আর। কথাটা আদৌ অসত্য নয়। কিন্তু চূড়া ব্যাপারটারে কে কীভাবে এবং কোত্থেকে দেখছে, এর ওপর নির্ভর করে চূড়ারোহণের সত্যাসত্য। জনপ্রিয়তার নিরিখে যে-চূড়া তা বটে কেউ সতেরো বছর বয়সেই হাসিল করে ফেলে, লেননদের বিটলস যেমন করেছিল, এবং যা-কিছু জনপ্রিয় হয় তা তো রদ্দি মাল নয় নেসেসারিলি, কিন্তু শিল্পীর যে-সার্চ, শুধু শিল্পীর কথাই কেন বলি, ইন-কোয়েস্ট থাকাটারেই তো জিন্দেগি বলে, একজন সাধারণ মানুষের যে-তালাশ দৈনন্দিন, সেই জীবনখোঁজা পাহাড়ের পিকের সেই চূড়ার নাগাল কি পাওয়া যায়? যায় যখন, তখনই জিন্দেগি থমকায়। স্থিতাবস্থারে তো জিন্দেগি বলে না। কাজেই, সৃষ্টিশীলের সার্চ এবং থার্স্ট, সাধারণের লাস্ট ফর লাইফ, কক্ষনো কোনো চূড়ার নাগালে যেতে দেয় না। ব্যাপারটা জীবনবান্ধবই আগাগোড়া। কাজেই পিপাসাটা জাগায়ে রেখে যেতে হয় হামেশা। ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস্ অবশ্য চূড়ার কথাটা আন্দাজ করি বলেছিলেন একটা বীতশ্রদ্ধতা থেকে; যে, এত প্রত্যাশা তার কাছে লোকের, এত প্রত্যাশার লেলিহান আগুন নিভানোর দমকলশ্রম হুদা আর দিতে চাইছেন না তিনি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে শিল্পী তার আর্লি দিনগুলোতে যেমন তরিকায় স্ট্রাগল্ করেছেন, এখনও ওইভাবেই করে যাবেন তা তো হয় না। ব্যাপারটা কাজেই ঠিক আছে; জেমস্ যে-কথাটা কয়েছিলেন সেইটা আমরা এইভাবে পোজিটিভলি দেখতে পারি। স্বীকার করব যে, জেমসের ক্যারিয়ারে একাধিক পর্যায় গিয়েছে। এই ফেইজগুলোর মধ্যেই তিনি নিজেরে বদলিয়েছেন, নবায়ন করে নিয়েছেন নিজেরে, এখন চলছে জেমসের মঞ্চপর্যায়। স্টেজযুগে জেমসের যে-চেহারা তা দেখতে হলে যেতে হবে একটা-কোনো কন্সার্টে। যে-তুজুর্বা, বাপ-রে-ব্বাপ! কন্সার্টের টেলিভিশন লাইভেও সম্যক ধরা যায় না ব্যাপারটা। গানের ওপর, গলার ওপর, গায়নশৈলীর ওপর যে-দখল লক্ষ করা যায়, এইটা লা-জওয়াব। সেদিনের সিলেট স্টেডিয়ামের কন্সার্টে যে-জেমস্, একইসঙ্গে সমাহিত ও সংগীতোদ্দীপ্ত, অনেকদিন পর্যন্ত মনে থাকবে সেদিনের ময়দানে উপস্থিত শ্রোতাদর্শকের। পঞ্চাশোর্ধ্ব রকারদের মধ্যে এমন হিম্মৎ এমন তাকৎ দুনিয়ায় বিরল। musial-concertহাজিরানে-ময়দান কেউ চোখ তুলে তাকানোরও জোর পায় নাই, এমন স্তব্ধ মেস্মেরাইজ্ করে রেখেছিলেন সবাইকে। কেউ শব্দটাও করছিল না যেন, ওয়ান-মোর বলা তো দূর-কি-বাত, স্বয়ং সংগীতের অধিষ্ঠান হয়েছিল যেন সেদিন জেমসের উপরে। এমন অভিজ্ঞতা ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস্ ছাড়া আর-কে দিতে পারত এই দেশে, এই দুনিয়ায়, আমাদের জীবদ্দশায়? স্টেজে যতক্ষণ ছিলেন জেমস্, অডিয়েন্স-সংযোগ ঘটাবার জন্য দুই-তিনটার বেশি বাক্যালাপও করেছেন কি করেন নাই এত সমাহিত সৌম্য সংগীতগম্ভীর, মনে পড়ছিল শেরপাদের মুখ। শুধু শেরপারাই নিঃসঙ্গ হয়েও সুন্দর, সবল, স্ব-অবলম্বী। কিংবা আবহমান অলমাইটি। শিখরে শেরপাদেরেই মানায়, শীর্ষে শেরপাদেরেই শুধু অশ্লীল লাগে না। মানুষের সঙ্গকামনা স্বাভাবিক। মানুষের নিঃসঙ্গতা ন্যাচারাল নয়। নিঃসঙ্গ মানুষ অদ্ভুতভাবে ভঙ্গুর, নাজুক, অসহায়। নিঃসঙ্গতা শেরপাদেরেই মানায়। সেদিনের কন্সার্টে এবং এর আগেও ২০১৭ ফেব্রুয়ারির একটা কন্সার্টে জেমসের লীলা দেখে শেরপা ছাড়া আর-কোনো মনুষ্যাবয়বের সঙ্গে এই হিম্মতি শীর্ষসমাহিতির তুলনা পাই নাই। কিংবা তারই গাওয়া গানে, জেমসেরই ভীষণদিনের দুর্ধর্ষ একটা গানে, এমন কিছু লাইন পাই : “ঈশ্বরের মতো / ভবঘুরে স্বপ্নগুলো / রাতের অরণ্যে / ভোজসভায় / উৎসবে মাতে / একা আমি একলা রাতে / শত শতাব্দী ধরে” … সেই সিলেটকন্সার্টে এমনই নিশ্চুপ চরাচরে জেমসের ঈশ্বরভবঘুরে রেন্ডিশন দেখেছে হাজার-তিরিশেক সমবেত জনতা। পাহাড়ের পিকদেশে শেরপার সুর আচ্ছাদিত করে রেখেছিল অচিনপুর। ওনলি দি শেরপাস্ ক্যান্ স্ট্যান্ড অ্যালোন অন্ টপ অফ দি সলিট্যারি মাউন্টেন।

আকাশজোড়া আতশবাজি : নিমপেঁচাটির চোখে

জেমসের মঞ্চারোহণের আগে ঘোষণা এল, নওশিন নামে এক টিভিমুখ কন্সার্টের অ্যাঙ্করিং করছিলেন খাপছাড়া হাসিখুশি, চৌথা আসমানে এবে ফায়ারওয়ার্ক হবে। হ্যাঁ, হলো, ব্যাপক বাজি পোড়ানো হলো পরের ঝাড়া আধাঘণ্টা। মানুষের সবিস্ময় এক্সপ্রেশন ময়দানে একটা আবহ তৈয়ার করেছিল বটে। দেশে কোনো দুঃখকষ্ট নাই মনে হচ্ছিল। হতাশা দারিদ্র্য গুমখুন গুণ্ডামি কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যাওয়া গিয়েছিল। দুনিয়ায় সেলিব্রেশনের হাওয়া ভাসছিল শুধু। উন্নয়নের উদযাপন চৌদিকে। জয়যাত্রা। আর সশব্দ সুমধুর বাজি ফাটছিল চোখ ধাঁধিয়ে স্টেডিয়ামগ্যালারির ঈশানকোণের মধ্যাকাশে। কেউ কোনোদিন যেন আকাশ দেখে নাই, নিঝুম আকাশের তারা দেখে নাই, পৃথ্বীতে এই পয়লা মানুষ ঊর্ধ্বগগনে এত মমতায় তাকাল। কোথাও ধর্ষণ নাই, ধড়িবাজি নাই, নির্মমতা নাই। নিমপেঁচাটির শুধু মনে পড়ছিল গত-হয়ে-যাওয়া আজন্মস্বজনদের মুখ, যারা আলোকের এই বিলাস দেখে যেতে পারেন নাই। নিমপেঁচাটির মনে কেবল একটা সওয়াল খচখচ করছিল, কত পয়সা ঢালা হলো নভোমণ্ডলে এই আলোকমাস্তানির পিছনে? কে কারে শুধায়, কেই-বা অ্যান্সার দ্যায়!

শাসক-ত্রাসক অমর রহে

musial-concert

জেমস্ ছিলেন শো-স্টপার, বাপ্পা স্টার্ট করেছিলেন, মমতাজ পার্ফোর্ম করেছেন মাঝখানে। এমপিশিল্পী ময়দান মুখর করে রেখেছিলেন শাসকদলের স্লোগ্যানে। এইটা বাদ-মাগ্রেব খবর শুধু। বিফোর দ্য ডাস্ক স্থানীয় শিল্পীরা পার্ফোর্ম করেছেন, সেই বিবরণ অনিবার্য কারণে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সান্ধ্য অধিবেশন চলাকালে বেশ-কয়েকজন কন্সার্টস্পেক্টেটরের সঙ্গে ভিড় সামলে এই প্রতিবেদকের আলাপ হয় খাজুইরা। তাদের উল্লেখযোগ্য অংশকেই মনে হচ্ছিল সম্মোহিত। কন্সার্ট উপভোগ করে মেস্মেরাইজড, না শাসকদলের সাংস্কৃতিক স্পন্সর্শিপের বাহাদুরি দেখে, সন্দেহ রয়। একজন বলছিলেন, এই সরকার ছাড়া আর-কেউ সংস্কৃতির এত্ত বৃহৎ বন্ধু হতেই পারবে না। শাসকদলের সংস্কৃতিসোহাগ দেখে, শাসকদের সাংস্কৃতিক সহবত দেখে, একদম আমুণ্ডু গদগদ একজনের লগে দুই-লোকমা আলাপ হলো। পঁয়তিরিশের যুবক, বলছিলেন, এই সরকার ছাড়া আর-কেউ সংস্কৃতিপৃষ্ঠপোষক হবার হিম্মৎ রাখে না। ইত্যাদি। কিন্তু উনারে লে. জে. হু. মু. এরশাদের সাংস্কৃতিক মতলববাজি ইয়াদ করিয়ে দিতে যেয়েও দেই নাই। যখনই মানুষ ম্যুভ করার মতো পরিস্থিতিতে গেছে, টেলিভিশনে দিনভর অধিবেশন চালানো হয়েছে সিনেমা আর সার্কাসের। ঘর থেকে বেরোবা না, মিছিলে যাওয়া যুবকের দলও ঘরে বসে টেলিভিশনে নয়ন মুদে পঙ্গু। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আয়োজন পণ্ড। কথাটি কয়ো না, লাফালাফি কোরো না, খালি সংস্কৃতি করে বেড়াও। কবিতা পরিষদ আর পথকলি ট্রাস্টের সাংস্কৃতিক মতলববাজি ইয়াদ রাখি নাই আমরা। রাষ্ট্রপতির সভাকবি-সভাশিল্পীদের দৌরাত্ম্য ভুলে গেছি আমরা। মানুষ এক-দশক কাটিয়েছে সাংস্কৃতিক ফুর্তির চাপানো দমচাপা আবহে। কাজেই সংস্কৃতি শাসন-শোষণ-ত্রাসনের হাতিয়ারও হয়। দেখেছি অনেক। সংস্কৃতিসিপাহসালাররা এই জিনিশ বোঝেন না, মানতে গররাজি আমরা। হালুয়ারুটির দুনিয়া। কার মুখ থেকে কে কাড়ছে, সেইটা ব্যাপার না। কাড়াকাড়ি চলবে। এইসব সাংস্কৃতিক ধামাকা বাড়বে বৈ কমবে না।

লাবণ্য ও অন্যান্য

স্টেডিয়ামের দক্ষিণ গ্যালারি ঘেঁষে একসারি রিফ্রেশমেন্টের টেন্ট বসেছিল। ফ্যুডকার্ট। কফি ইত্যাদি বেচতেছিল। আইসক্রিমও। ফুচকা-স্যান্ডুয়িচ আছে। অ্যাফোর্ড করা যায় এমনই রিজনেবল প্রাইস। সচরাচর যেমন হয় মেলা ইত্যাদিতে, টেন্ট বসায়ে টেনে নেয় জেবের রেস্ত সবটুকু, এইখানে ব্যাপারটা সাধ্যিসীমার মধ্যি ছিল সকলের। ফলে বেজায় লাইন পড়ছিল কফিখেকো খদ্দেরের। পুরা ফ্যামিলির জন্য প্যপকর্ন দুই হাতে জাপটে এনে বেটে দিতে দেখা গেল প্যুশিং-ফোর্টি স্ফীতবপু ভদ্রলোকটিরে। টেন প্যাকেটস্ অফ প্যপকর্ন, গুনে দেখলাম বণ্টনকালে আড়চোখে। বেশ সপরিবার নাইট-আউট হলো নগরবাসীর। কন্সার্টসুবাদে।

সেইখানেই আলাপ হলো। কফিতাঁবুর কাছে। একটু ঝুঁকে, কানের কাছে মুখ নামায়ে নিচু হয়ে, জানতে চাইলাম নাম। লাবণ্য। ফোরে পড়ে। পেখমের মতো ময়ূরবেণী। জিগাইলাম, কার গান শুনতে এসেছেন আম্মাজি? মিচকি হেসে মিকিমাউস জানায়, জেমসের!

মমতাজ তখন মঞ্চে। বেদম বিয়াবাড়ির লারেলাপ্পা খ্যামটা সাউন্ডে লোকাল বাস চলছিল। তখন সোয়া-নয়, সেলফোনঘড়ি রিডিং দিচ্ছিল। সন্ধ্যা থেকে সম্রাজ্ঞী স্টেজে অ্যাসেন্ড করার আগ অব্দি বাপ্পা মজুমদার স্টুডিয়োরেকর্ড গলায় থ্রিল-সাস্পেন্সহীন বাজনায় ইনিংস শেষ করেন। তবে এইসব যা-কিছুই হোক, লাবণ্য শুনতে এসেছে জেমসকে।

স্টেজে জেমস উঠতে উঠতে দশটা পার। তাকাই ইতিউতি, ক্রিমক্র্যাকার্সের প্যাকেট-লটকানো দোকানটায় উঁকি দিয়া দেখতে চেষ্টা করি, কিন্তু কোথাও লাবণ্যকে খুঁজিয়া পাই না। মাঠ ছেড়ে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে এরই মধ্যে লাবণ্য আর তার পরিবার। ম্যালা রাইত। নিশ্চয় গাল ফুলিয়ে প্যারেন্টসের সঙ্গে হাঙ্গামা করতে করতে ময়দান থেকে নিতান্ত অনিচ্ছায় বেরিয়েছে মেয়েটা। আহা! আমাদের হাতে যদি থাকত এর প্রতিকার কোনো! লাবণ্য কি দেখতে পাবে না জেমসের মুক্তমঞ্চ কন্সার্ট?

আবার কখন কবে … এমন সন্ধ্যা হবে …

বেঁচে থাকো লাবণ্য, “বড় হও / দীর্ঘ হও / শুধু বেড়ে ওঠো / শুধু বেড়ে …

প্রতিবেদক : সুবিনয় ইসলাম

[metaslider id=”4234″]

… …

সুবিনয় ইসলাম
Latest posts by সুবিনয় ইসলাম (see all)

COMMENTS

error: