ফিল্মের পড়াশোনা তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের সাহিত্যে কিন্তু সেটির পাঠ্য উপাদান এখনই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ক্লাসের পৃষ্ঠা বাড়ানো হচ্ছে বিদেশি চলচ্চিত্রকারদের কাজকর্ম দিয়ে। দেশীয় চলচ্চিত্রের গৌরব ও অর্জন ক্ষীণ হয়ে উচ্চারিত হচ্ছে। আমরা আড্ডায় দেশীয় চলচ্চিত্রের উন্নতি নিয়া বিতর্ক করি। কিন্তু পড়াশোনা করার সময় পড়ি বিদেশি ফিল্মমেকারদের প্রজ্ঞা।
ময়মনসিংহ গীতিকায় আমরা বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দরের গীতিপর্বে পেয়েছি, বেহুলা দীর্ঘসময় লক্ষ্মীন্দরের শব নিয়ে পানিতে ভেসে যান। তা একটা লোকগল্প বহুল প্রচলিত। কিন্তু গীতিকায় যেভাবে লিপিবদ্ধ আছে। গল্পটির আরো কয়েকটি ব্যতিক্রম আছে। তারপরেও সব থেকে জনপ্রিয় গল্পকথিকাটি স্থান দেয়া হয় ময়মনসিংহ গীতিকায়। সাপে কাটা শবকে সম্পূর্ণ মৃতদেহের সমতুল্য বলে মনে না হবার কারণে লোকবিশ্বাস রয়েছে। সনাতন ও কয়েকটি প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে এই ধারাটি প্রচলিত। বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যেও এটি প্রচলিত পদ্ধতি। আবার সাধক লালন সহ অন্য অনেক বসন্তের রোগীকে কলাগাছের ভেলায় করে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয় সেটিও প্রচলিত। প্রাচীন দেহসাধকরা কলাগাছের ভেলায় দীর্ঘ সমাধিতে চলে যাওয়া জীবিত দেহকে পানিতে ভেলায় করে ভাসিয়ে দিত। এমন অনেক প্রচলিত গল্প রয়েছে।

গীতিকায় বেহুলা প্রথম রাত্তিরে তার স্বামীকে সাপের অভিশাপ থেকে বাঁচানোর গল্পটি নিয়ে পরবর্তীতে বরেণ্য কথাসাহিত্যিক জহির রায়হান বেহুলা নামে একটি বাণিজ্যিক ছবি তৈরি করেছিলেন। যখন জহির রায়হান বাণিজ্যিক ছবির জন্য প্রয়োজন অনুভব করেন তিনি নির্বাচন করেন তার নিজস্ব লোকজধর্মী সাহিত্যে কি সম্পদ আছে, তথা ময়মনসিংহ গীতিকায়। সেটি একটি বা কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে লোকগল্পে স্থান পায়নি। পেয়েছিল একজন নারীর মর্মবেদনার কারণে। বেহুলার যৌবনের স্বীকৃতি ও মনসার অভিশাপ কাটিয়ে ওঠার পুথিয়ালের গল্প। সাহিত্যে তা-ই উঠে আসে যা জাতি ধর্ম বর্ণ ইত্যাদির কাল ছাপিয়ে মানুষের জীবনাচারে রঙ ও গল্প ও বেদনাবিধূর করে তোলার সিনেমা তৈরি করে। যেমন কারবালার ঘটনা মীর মোশাররফ হোসেন শুধু শিয়া গোষ্ঠীগত কারণে লেখেন নাই, তিনি সমগ্র মুসলিম জাতির যে সাহিত্য আছে সেটিও বিশাল কলেবরে যে হতে পারে সেই লোকজ চর্চা যে বাঙালীদের মনে রয়েছে তারই একটা সাক্ষ্য দিতে। কারবালার ঘটনা নিয়েও কিন্তু পুথিয়ালদের পুথি আছে, যা ঢালাওভাবে লোকজ সাহিত্যে বহুল চর্চিত। লোকগানেও মারাত্মক উপাদান। বহু বাউল সেসব নিয়ে গান পালাকার পালা তৈরি করেছে। লোকজ ফর্মের বাইরে বহু পরে মীর মোশাররফ হোসেন তা গ্রন্থিত সাহিত্যে আনেন।
সাপে কাটা শবের দিনলিপি ও দেহে প্রাণ ফিরে পাওয়ার যে কিংবদন্তি রয়েছে সেটিই বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের গল্প। কথাসাহিত্যিক জহির রায়হান সাহিত্যের লোক বলে সেটি নিয়ে বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা নির্মাণের চেষ্টা করেছেন, যা তৎকালে জনপ্রিয় ও ব্যবসাসফল সিনেমা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে সিনেমাহলগুলোতে। জহির রায়হান যদি সাহিত্যের লোক না হতেন তবে কি বাণিজ্যিক কারণে বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর অন্য কেউ নির্মাণ করতেন? হয়তো করলেও তা অত সহজে নির্বাচন করতেন না। জহির রায়হানের এমন প্রজ্ঞাই পরে আরো বাংলা সিনেমায় আরো লোকজ গল্প নির্বাচনের তাগদা তৈরি করে। জাপানের চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়ার যেমন খ্রিস্টীয় প্রতীক নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করার দৃষ্টান্ত দেন সেটা ধর্মীয় কারণ থেকে নয়, শৈল্পিক কারণে। তখন আমাদের এ সময়কার চলচ্চিত্রকাররা তা নিয়ে সিনেমার পাঠদান করার সময় উদাহারণ দেয়ার আধুনিকতা অনুভব করেন। কিন্তু লোকজ গল্পে বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের যে-গল্পটি নিয়ে সাহিত্যিক জহির রায়হান যে একই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ এড়িয়ে গল্পটি আরো বেশি লোকজ সাহিত্য হবার কারণে একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সিনেমা তৈরি করল তার উদাহারণ সিনেমার ক্লাসে একেবারেই টানা হয় না। বা ক্লাসের পড়ায় সেটির দৃষ্টিকোণ কি আলোচনা করা হয় না। জাপানিজ ছবি থেকে উপাদান নিয়ে ফিল্মের ক্লাসে বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীদের এই ইউনিট কমপ্লেক্স তথা ধর্মীয় কৃষ্টি সাহিত্য হবার ও পরে সিনেমা হবার বিষয়ে পাঠদান করা হয়। কিন্তু জহির রায়হান যে সেটির ব্যবসাসফল দৃষ্টান্ত রাখল তার কোনো গুরুত্ববহ উদাহারণ সিনেমার বইতে বা ক্লাসের কোনো শিক্ষার্থীর নিবন্ধ থেকে সাহিত্যে উঠে আসার প্রচেষ্টা নেই। কিন্তু আকিরা কুরোসাওয়ার পরিশ্রম আমাদের মস্তিস্কে গুরুত্ব পাওয়ার আগেই দেশীয় চলচ্চিত্রের উদাহারণ একই ফ্যাক্টে আলোচ্য হতে পারত।

আমাদের লোকশিল্পই তো আমাদের শিক্ষার সব থেকে বড় অধ্যায়। কিন্তু ফিল্ম সোসাইটিজ বুদ্ধিজীবীরা বিদেশি চলচ্চিত্রকারদের ছাড়া কিছুই ভাবতে চান না। একটা জাপানিজ বা ম্যাক্সিকান চলচ্চিত্রকার ছাড়া যেন আমাদের শিক্ষিত হবার কোনো চান্সই নেই। আপনারা ধর্মীয় কৃষ্টি সাহিত্য হবার পরে সিনেমা হবার উদাহারণ নিয়ে ভাবতে গেলে জহির রায়হানের এই উদাহারণ কেন দেন না? এর কারণ কি উদাহারণটি বেদে সম্প্রদায় কিংবা সনাতনীয় বলে নাকি সেটি অতি প্রাচীনকাল থেকে লোকজ সাহিত্য হবার কারণে? কবীর সুমন তার ‘জাতিস্মর’ গানে গাইলো ‘বেহুলা কখনো বিধবা হয় না এটা বাংলার রীতি’। এরপরেও সেটির ব্যাপকতা নিয়ে অধ্যায় সংশ্লিষ্ট হবার আরো কারণ ভাবা যেত, যখন কিনা আকিরা কুরোসাওয়ার প্রজ্ঞা নিয়ে ভাবছিলাম। অথচ ফিল্মের পথক্লাসে এই ‘বেহুলা লক্ষ্মীন্দর’ সিনেমাটি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক সিনেমার একটা ফটোগ্রাফ শুধু। আর আকিরা কুরোসাওয়ার ধর্মীয় কৃষ্টি থেকে সিনেমা হওয়ার জন্য যে প্রতীকী সাহায্য নিলো সেটির প্রজ্ঞা খুবই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। তাহলে কথাসাহিত্যিক জহির রায়হান কি অপরাধ করল? জহির রায়হান যখন এই সিনেমা তৈরি করেন, ধর্মীয় কৃষ্টি ব্যবহারের জন্য কোনো প্রশ্নই ওঠেনি। বরং তাতে হিন্দু মুসলিম সকল দর্শকই ছিল। ধর্মীয় কৃষ্টি নিয়ে রাম-সীতার গল্পের পর্যাপ্ত আলোচনা হয়তো করা হয়, ভারতীয় সিরিয়ালমেকারদের নিয়ে এত আলোচনা ও উদাহারণ দেয়া হয়। কিন্তু জহির রায়হানের সাফল্য নিয়ে সেক্ষেত্রে কোনো রাউ নাই। আছে আকিরা কুরোসাওয়া নিয়া। কিন্তু এত ঢালাওভাবে চিত্র, গান, লোকগাথা ও বহু সিনেমায় খণ্ডবিখণ্ড হয়ে আসার পরেও, জহির রায়হানের এই গল্প নির্বাচনের প্রজ্ঞা নিয়ে কোনো গুরুত্ববহ আলোচনার আধুনিকায়ন হলো না। সেটি শাদা কালোই রয়ে গেল।
- বেহুলা মুক্তি পায় ১৯৬৬ সালে। এর আগে পরে আরো কয়েকজন এটি নিয়ে সিনেমা করেন। কিন্তু জহির রায়হান আধুনিক সিনেমায় একটি অধ্যায়। সেক্ষেত্রে তার নির্বাচিত গল্পের পেছনের প্রজ্ঞা আবিস্কারের অধিক দাবি রাখে।
সোহরাব ইফরান রচনারাশি
গানপারে জহির রায়হান
- সিনেমার আড্ডায় দেশীয় সিনেমার গরিমা নিয়ে উভচর বিদ্যা || সোহরাব ইফরান - March 30, 2026
- মঙ্গলশঙ্খ বাজলো তৃণপুষ্পময় || শুভ্র সরকার - March 29, 2026
- একটা ডিলেট করা সিনের মধ্যে ঢুকে বসে আছি || নাফিস সবুর - March 27, 2026

COMMENTS