কমলকুমার সন্দীপন

কমলকুমার সন্দীপন

শেয়ার করুন:

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আর কমলকুমার মজুমদার। উল্টো হয়ে গেছে এখানে, যদিও, অর্ডার। মোদ্দা বাত, দুইজনের মধ্যে বেশ কতেকটা জায়গায় মিল দেখতে পাই। মিল তো কত লোকের লগেই কত লোকের পাওয়া যায় বিছড়াইলে। মিল পাওয়া যায় মিল পাইতে চাইলে। কিন্তু কমলকুমারের বাংলার লগে সন্দীপনের বাংলার মিল একটু নয় অনেকটু কষ্টকল্পনাই। কিন্তু মিল আমি ঠিকই দেখতে পাই।

মিল আমার আগ্রহের জায়গায়। ইন্ডিয়ান বাংলা আখ্যানকার কবি নাট্যাচার্য অনেকের গদ্যভঙ্গি নিয়া আমার আগ্রহ চুপসে এলেও সন্দীপন কমলকুমার এই দুইয়ের গদ্য নিয়া আমার আগ্রহ অপার। আজও। অপরিমেয়। রহস্যাবৃত দুইয়ের গদ্যের প্যাটার্ন। লক্ষ্যার্থ ও বাচ্যার্থের ভিতরকার অপরিসীম লীলা। প্লেজার অফ প্রোজ। গল্পকাহিনি নয়, নিরেট গদ্যটার বিউটি। সিচুয়্যাশন ডেপিক্ট করার কৌশলগুচ্ছ।

দুইজনেরে নিয়াই বিস্তর মিথ ছড়িয়েছে। সেসব অনেক অনেক বই পত্রিকায় আছে। এখন পর্যন্ত কমলকুমার নিয়া আনন্দসঞ্জাত কোনো লেখা আমার নজরে পড়ে নাই। এমনকি সন্দীপন নিয়াও অভিজ্ঞতা একই, একটা ইন্টার্ভিয়্যুভিত্তিক বড়সড় লেখা পড়েছিলাম জয়ের, জয় গোস্বামীর, সন্দীপনকেন্দ্রী, হৃদি ভেসে গিয়েছিল। কমলকুমার নিয়া তো অকহতব্য অভিজ্ঞতা, কৃত্তিবাসী সবাই লিখেছেন গুরু গুরু রবে, সেসব একপ্রকার আনন্দবাজারী বই বিক্রির প্রোমো মনে হয়েছে, ইনক্লুডিং সুনীল গাঙ্গুলীর সমস্ত শ্রদ্ধাভক্তি, কাজের কাজ মনে হয় নাই কিছুই। রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইটা আছে। এবং কমলপুরাণ বাই রফিক কায়সার।

কমলকুমার প্রয়াণের বহু বছর বাদে এসে, ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে, ‘অনুষ্টুপ’ শারদীয় সংখ্যায় একটা ঠাসা ১০০ পৃষ্ঠার লেখা ছাপা হয়েছিল, এ-পর্যন্ত আমার দেখা কমলকুমার সম্পর্কিত পুরাণগুলোর মধ্যে এই লেখাটা রিয়েলি ওয়ার্থ-রিডিং। অনিরুদ্ধ লাহিড়ী লিখিত অনেকটাই জীবনীমূলক রচনাটার নাম ‘স্মৃতি উদযাপন : কমলকুমার ও কলকাতার কিসসা’। তা, সেই লেখাটা কমলরচনা পাঠবোধিনী নয় মোটেও, যদিও রচনা হিশেবে সেইটা ভালো ও উপভোগ্য, সবিস্তার জীবনঘটনাভিত্তিক, জীবন্ত, মিথ প্রভৃতির জোব্বাজাব্বা-আলখাল্লা খসিয়ে একটা শাঁস বের করবার চেষ্টা।

কিন্তু একটা ব্যাপার আমি এখনও খুঁজে বেড়াই, সেইটা হলো, কমলকুমারের সিন্ট্যাক্সপ্যাটার্ন সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, তিনি নাকি ফ্রেঞ্চ বাক্যসংগঠন বাংলায় এস্তেমাল করেন খুব ক্রিয়েইটিভলি…এই কথাটার উদাহরণ সহ ব্যাখ্যা না-পাইলে আমার মতো নবিশ পাঠক কেমন করে মাথায় তোলে বলেন তো! কমলের ক্রিটিক মানেই হলো, তিনি লেখকের লেখক, তিনি ফরাশি, তিনি বিভীষণ জ্ঞানী, তিনি স্পাইরাল, তিনি জট্টিল, তিনি অদ্বিতীয় অবতার বাঙ্গালা লেখাজোখার ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই দুই লিজেন্ড বঙ্গীয় প্রোজরাইটারের কপালটাই খারাপ যে, এত ভালো লেখাজোখা সত্ত্বেও ওদের যাপন-কিংবদন্তি নিজেদের রচনার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত এদের নিয়া পাঠ-উন্মোচক কোনো লেখা তো পাইলাম না…আপনারা যদি না-লিখেন তো কবে কেমনে কি হবে, বলেন! সময় তো দৌড়ায়া যায়, সোনার বান্ধাইলা নাও আর পিতলের ঘোড়াটার ন্যায়। একটু জ্ঞানগরিব এই পাঠকের কথাটা আমলে নেন, কমলকুমার নিয়ে লেখেন, তবে আমার ব্যক্তিগত প্রেম সন্দীপনের দিকেই ঝোঁকানো, অতএব সন্দীপন পয়লা, বাদ-মে দেখা যায়ে-গা গোলাপ সুন্দরী কি সুহাসিনীকে, তদাগ্রে চাই হিরোশিমা, মাই লাভ!

বলি, বিগিনারদের সন্দীপন…বিগিনারদের কমলকুমার…এই কিসিমের কিছু নোক্তা আলাপের নোট সিরিজ লঞ্চ করবার একটা ট্রাই করা যায়। আপনারা যারা যারা বাবু কমলকুমার ও বাবু সন্দীপনের গদ্যের নুন চেখেছেন তারা আগায়া আসেন। পাব্লিক্লি, শিগগির! টাইম ইজ মানি তো, কবে যে দুম করে মরে যাই, খালি ভাবি, কত শখ-আহ্লাদ পুরাইবার বাকি, একটা-দুইটা যদি নিজেদের মানুষজন না বিবেচনা করে তো কেমনে কি, বলেন!

দয়াময়ী মজুমদার লিখেছেন স্বামীকে নিয়ে, সম্পাদনা করেছেন, অনেক। মনে পড়ে এক বই ‘আমার স্বামী কমলকুমার’, কথায় লেখায় যেইখানে স্ত্রীর চোখে লেখক ও আর্টিস্ট কমলকুমার মজুমদার তাঁর মাধবের বিগ্রহ সমেত হাজির। কত রকমের যে বই আছে! একটা যেমন ‘চিঠিপত্রে দ্বিরালাপে কমলকুমার সন্দীপন সুব্রত’। বইটি ইন্ট্রোডিউস করেছেন সুব্রত চক্রবর্তী। লিটলম্যাগের ভলিউম আফটার ভলিউম তো বলা বাহুল্য।

কত বই কমলকুমার নিয়া! সুনীল ব্যাচের প্রায় সকলেই কিছু না কিছু কমলকুমারচরিত লিখেছেন। খালাসিটোলাপ্রাসঙ্গিক আলাপে একের পর এক কমলকুমারের মিথ পল্লবিত হয়েছে সেখানকার দশকের পর দশকের কবিদের জবানে এবং কলমে। সেদিক থেকে সেইম না হলেও তুলনায় কাছাকাছি মিথভাগ্য সন্দীপনেরও। কমলকুমারের আছে আনন্দবাজার, সম্ভবত সন্দীপনের তা নাই। মিল নাই আরও বহু জায়গায়ই।

ইন্ডিয়াবাংলার ‘অবভাস’ থেকে বেরোনো ছোট্ট একটা বই কিছুদিন আগে পড়েছি, কিংবা অনেকাংশই পড়েছি বলা ভালো। ওইখানে কমলকুমারের কবিতা দেখতে পাই। চিত্রকলার সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত যদিও। কমলকবিতা পড়ে বেশ লেগেছিল বলতে হবে, ‘স্মরণে গোলাপ’ নামে একটা কবিতার নাম মনে পড়ে, যেমনটা আরজ আলী মাতুব্বরের কবিতা পড়ে বেশ মজা পেয়েছিলাম, সন্দীপন চট্টো খুব ভালো করতেন কবিতালাইনে গেলে এইটা আমার সবসময় মনে হয়। কিছুতেই নাম ইয়াদ করতে পারছি না, বাট এই কিউট শেইপের বইটাতে একঝলক অন্তরঙ্গ কমলকুমার পাওয়া যায়। যেইটা বলতে চাই, এই বইতে একটা ইন্টার্ভিয়্যু রয়েছে কমল মজুমদারের, ছোট্ট হলেও কৌতূহলোদ্দীপক ও কাজের, সেইখানে ফরাশি সিন্ট্যাক্স আর বাংলাভাষায় সেই প্যাটার্ন এস্তেমালের ব্যাপারটা গাঁজাখুরি বোগাস ব্যাপার বলেই রিবিউক করেছিলেন মনে পড়ে, যদিও খুব ডিটেইল কিছু না, মাত্র দুই-তিন বাক্যে, বলা বাহুল্য।

তথাপি কমলপূজক ব্যক্তিদের মুখে এই কথাটা, মানে মজুমদারের বাকবিন্যাস ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, নিশ্চয় এই কিংবদন্তি বিস্তারের একটা সামাজিক-সাহিত্যিক পটপ্রেক্ষা আছে, এই জিনিশটা তালাশ করে দেখলে মজার কিছু কথাবার্তা বার হইতে পারে বলে মনে হয়। তেমনি খুব ভালো ফরাশি জানতেন এমন লোকজন, যেমন অরুণ মিত্র ও লোকনাথ ভট্টাচার্য প্রমুখ, তাদের বাংলা ন্যারেশনে ফ্রেঞ্চ কোনো কোঅপারেশন নিয়েছেন কি না তারা, ভালো করে খোঁজা হয়েছে বলে তো দেখি নাই। ঠিক দরকারও হয়তো নাই খোঁজার। অথবা জেনেবুঝে ধারকর্জ না-নিলেও, সাদৃশ্য-সাযুজ্য রয়েছে কি না বা যাতায়াত কখনো হয়েছে কি না একের ঘরে অন্যের, এইটা বা এইসব চোখের সামনে এলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে একবার চোখ বুলায়া যাইতাম আর-কি।

ইয়াদ হয় আরেক মজুমদার, অমিয়ভূষণ। প্রসঙ্গ হয় যদি বাংলা ল্যান্ডের লগে ফ্রেঞ্চের কালচারের কিস। কলোনি ছিল যেহেতু, ফরাশি উপনিবেশ, তো ধারণা করি, একটা চেনাজানা তো ঘটেছে একসময় দুয়ের মধ্যে, সেইটা সাহিত্যে এসেছে কি না বা বাংলা ভাষাব্যবস্থা ফরাশি প্রেমিকা এফোর্ড করতে পারে কি না…ফরাশি ভাষা সম্পর্কে একটুআধটু না-জেনে এই নিয়া লেখা সম্ভব কি না, তা একটা ভাবনা বটে, আমার বিশ্বাস সম্ভব, অ্যাজাম্পশননির্ভর হাইপোথেটিক্যাল লেখাও তো মন্দ হয় না…

যা-হোক, বইটা পার্চেজ করেছিলাম আপিশের জন্য, খুঁজে ফের পড়তে ইচ্ছে করছে, আপাতত নিরুপায়। হ্যাঁ, বিশ্বাসী কমলকুমারের বিশ্বাস সম্পর্কিত কৌতুকী পাওয়া যায় ওই ইন্টার্ভিয়্যুয়ের শেষে যেয়ে, গুরুভক্তি নিয়ে বলছেন তিনি, গোপন ফাঁস করার টোনে, ওইটা স্রেফ পাব্লিক রিলেশন! উদ্ধৃতি মনে নাই, কিন্তু ‘পাব্লিক রিলেশন’ কথাটা খুব মজার ভঙ্গিতে বলেছিলেন তাই মনে গেঁথে গেছে।

জাহেদ আহমদ ২০১৩

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you