স্মৃতিগদ্যে এক নতুন বয়ানরীতির বই || রেজাউল করিম

স্মৃতিগদ্যে এক নতুন বয়ানরীতির বই || রেজাউল করিম

শেয়ার করুন:

দেশের কোনো খ্যাতিমান সাহিত্যিক লেখালেখির অপরাহ্নেই ত্রিশ/বত্রিশ বছরের কর্মযজ্ঞ নিয়ে লিখেছেন, এমনটি চোখে পড়েনি। হাসান আজিজুল হক এবং ড. আনিসুজ্জামান লিখেছেন নিজেদের জীবনসন্ধ্যা পেরিয়ে। কিছুটা পরিচিত মানুষের অতীত জানতে (অবশ্যই সাহিত্যজীবন) কার না মন চায়, সে-কারণে একুশে বইমেলা থেকে তাঁর লেখা ‘আমার একলা পথের সাথি’ কিনে পড়া শুরু করলাম। আমার সাথে কানেক্টেড যারা, তারা একটু খেয়াল করলেই মনে করতে পারবেন, আমি প্রায়শই ভালোলাগা বইগুলো নিয়ে লিখি। যেগুলো ভালো লাগে না, সেগুলো নিয়ে লিখিও না।

পাপড়ি রহমান ছোটগল্পকার ও ঔপন্যাসিক, সম্পাদনার কাজও করেছেন। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে আলোর পাদপ্রদীপে জ্বলে ওঠেন। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই দেশে দৈনিক সংবাদপত্রের ব্যাপক বিস্তার ঘটতে থাকে। নব্বইয়ের দশকের শেষে এসে তা আরো ব্যাপকতর হয়। একটার পর একটা নতুন সংবাদপত্র বের হতে থাকে; সেগুলোরই একটি দৈনিকের পাঠকফোরামে নিয়মিত লিখতে শুরু করেন তিনি। পরে বাংলা অ্যাকাডেমির ‘তরুণ লেখক প্রকল্প’ তাঁর দেশের বৃহত্তর লেখক সমাজে প্রবেশের সিঁড়ি হিসেবে কাজ করে। এ-প্রসঙ্গে তিনি গ্রন্থের শুরুতেই লিখেছেন, “সাহিত্য করতে আসা মানে অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া। এমন-তেমন অন্ধকার নয়, ঘোরঘুট্টি অন্ধকার। একেবারে নিঃসাড় তমিস্রা। যে-অন্ধকারে ঝাঁপ দিয়ে পড়লে ফিরে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। পথ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কম। তবুও অনেকেই এই অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়। না জেনেবুঝেই দেয়।”

এর পরে ৩২ বছর কেটে গিয়েছে। তিনি লিখেছেন ১১টি গল্পগ্রন্থ, ৪টি উপন্যাস ও নানা সম্পাদিত গ্রন্থ সহ মোট ৩৫টি গ্রন্থ। ত্রিশ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় তিনি পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে তাঁর কর্মযজ্ঞ লিখেছেন সেভাবেই—কোনো মালায় পুঁতিগুলো সাজাতে হয়, নানা রঙ মিলিয়ে একটার পর একটা গেঁথে—যেভাবে। তাঁর ছোটগল্প পড়েছি, উপন্যাসও পড়েছি; কিন্তু স্মৃতিগদ্যে তিনি নতুন এক বয়ানরীতির স্বাক্ষর রেখেছেন। চলার পথে বিশেষত বড়দের সহায়তা পেয়েছেন—তাদের কথা লিখেছেন অকপটে—এরা সকলেই আমাদের পরিচিত মুখ। আবার যারা প্রতিবন্ধকতা রচনা করেছেন, সেসবও তুলে ধরেছেন অকপটে। এরাও আমাদের পরিচিত মুখ। সহযোগিতার পাতা মেলে ধরেছেন কৃতজ্ঞতায়, অসহযোগিতাগুলো কিছুটা স্যাটায়ার-সহযোগে, কখনো অভিমান কিংবা উষ্মাও প্রকাশ পেয়েছে। বাধার প্রাচীর ডিঙানোর বর্ণনায় তিনি যেন ক্রন্দনরত এক লেখক। হ্যাঁ, আমরা কে-না বাধার প্রাচীর ডিঙাই না লেখালিখির এই জগতে!

আখ্যান বয়ানে তিনি এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন যেগুলো আমরা সাধারণত ঘরোয়াভাবে বলে থাকি, যেমন : আচানক, ছাইপাঁশ, আঁটঘাট, মহামুসিবত, ফ্যাঁকড়া, প্যাঁচগোচ, ঘোরঘুট্টি ইত্যাদি। যথাস্থানে যথাশব্দ ব্যবহার লেখকের মুনশিয়ানার পরিচয় দেয়।

পারিবারিক বাধাবিপত্তির কথা বলতেও অকপট তিনি। যেমন লিখেছেন : “গৃহশান্তি বজায় রাখার জন্য বা নিজেকে সেফ জায়গায় রাখার জন্য আমি সর্বত্রই আমার পার্টনারকে সঙ্গে নিয়ে যেতাম। এজন্য আমাকে শত শত লিটার তেল খরচ করতে হতো। পার্টনারের কাছে মাছির মতো ভনভন করে বলতে হতো—ভাই, আজকে আমাকে অমুক জায়গায় যেতে হবে। ভাই, আমাকে কিন্তু যেতেই হবে বুঝলা? পার্টনার আমার কথা না শুনে গোঁফে তা দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকত।”

এই স্মৃতিগদ্যে পাপড়ি রহমান অতিক্রান্ত অতীত কিংবা অধরা ভবিষ্যৎ শুধু নয়, তিনি কথা বলেছেন স্পর্শযোগ্য সমসাময়িকদের নিয়ে । কতটা দুঃসাহসী না হলে কে পারে অতটা চক্ষুলজ্জা এড়াতে? এবং বলা যায় তিনি তার সিংহভাগই পেরেছেন বলে মনে করি। সে-কারণেই কখনো-বা তাঁর অনুভূতির বর্ণনা হয়েছে সরল এবং কখনো-বা কিছুটা তারল্যনির্ভর। কখনো-বা তিরের ফলার মতো সূক্ষ্ম ও ধারালো।


গ্রন্থনাম : আমার একলা পথের সাথি; গ্রন্থকার : পাপড়ি রহমান, পৃষ্ঠাসংখ্যা : ১৮৮; মুদ্রিত মূল্য : ৫০০ টাকা; প্রকাশক : বেঙ্গল পাবলিকেশনস, ঢাকা


গানপারে পাপড়ি রহমান
গানপার বইরিভিয়্যু

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you