শিশুত্রয়ীর হাতে নেচে নেচে হেসে ওঠে একথোকা সানন্দা আলোফুল্কি। নিখিলের আকর্ণবিস্তৃত উচ্ছ্বাস যেন ঝরে ঝরে পড়ে চারিধারে। যেন শতেক ফুলের পাপড়ি আর পরাগরেণু মহল্লা ভাসায়ে দেয় আলোর সুবাসে। যেন বসন্তথৈথৈ স্নিগ্ধ গুঞ্জরিয়া যায় আলোপ্রকাশিতা আনন্দধৈবৎ। হুল্লোড় নয়, স্নিগ্ধ খুশিনিঃশ্বাস আর বিস্ময়ঝিলিক শিশুত্রয়ীর মুখে-চোখে এবং গোটা আলতো অবয়বে। এই দীপাবলিঝিলিমিলি নিশীথসন্ধ্যায় শিশুত্রয়ী নিসর্গের মতো খলবলিয়া যায়। শিশুত্রয়ীর জন্য, দুনিয়ার থোকা থোকা আলোপাখি শিশুদের জন্য, প্রতিটি সন্ধ্যাই যেন শবেবরাতের সন্ধ্যা হয়, যেন প্রত্যেকটা রাইত হয় বাত্তির রাইত, প্রত্যেকটি বিকাল হয় চেরাগির বিকাল, এই দোয়া আর্দ্র হাওয়ার শাখায়-পাতায় আমলকি আর অড়বরইয়ের কচমা ডালে দোল খায় মিহি মিহি। শিশুখুশিতে একটি বিপন্ন বদ্বীপ সম্পন্ন হয়ে ওঠার ভরসা জাগে ফের জাগিয়া-থাকা শিশুর পিতার অন্তরে অন্তরে। ভেতর-বাহির একাত্ম হয় এই স্নিগ্ধস্পন্দ শবেবরাতের ঘরোয়া তেলাওয়াতের সুরে।
এতদঞ্চলে এর নাম ফুলঝরি, ফুলের মতন ঝরি ঝরি মৃত্তিকায় তৃণশয্যায় সিমেন্টইয়ার্ডে পড়ে বলেই অমন নাম তার, বিদেশে/ভিনজেলায় এরে তারাবাতি নামেও ডাকতে শোনা যায়। সেইটাও মন্দ সম্বোধন নয় নিশ্চয়। তারার মতনই থরথরিয়ে ঝরে, যেন তারাখসা, যেন নক্ষত্রনৌটঙ্কি। কিংবা হাউই বলা যায় তারে, মিনিয়েচার ফর্মের হাউই, বেশি খুশিয়া আর আলোকোচ্ছ্বলতা তার মিনিয়েচার সুরতের কারণেই। শিশুহাতে ফুলঝরি যেন ‘পলকে পলকে ঝলসি উঠিছে ঝলকে ঝলকে’, হে ঠাকুর, এ কী সৃষ্টিনাশা কাণ্ড, শবেবরাতের দিনেও মুমিনের মনে তোমার লাইনঘাটের হেন দৌরাত্ম্য অতিশয় রাহাজানিরই শামিল, ক্ষেমা দেও মোরে, এরপরও শবেবরাতের সন্ধ্যায় ‘শান্ত হাসির করুণ আলোকে’ এক অতিকায় আয়ুপক্ষী নিঃশেষে ব্যয়িত হবার বেদনায় ‘ভাতিছে নয়নপাতে’, এই ফুরায়া যাওয়া, পার্থিব ফুর্তির পাশেই বয়ে চলে অপার্থিব বিষাদের চিরকেলে এক নদী… নিস্তার নাই এর হাত থেকে, এমনকি শিশুস্ফূর্ত শবেবরাতের মহিমান্বিত রজনিতেও! স্যুয়িটেস্ট গানগুলা আমাদেরে চিরকাল স্যাডেস্ট থট উপহার দেয় ‘বীণাবাদিনীর শতদলদলে’ বেষ্টিত রয়েও!
গোস্তাকি নিও না আমার, ধর্মাবতার, আমি চিরদিন শবেবরাতে শিশুত্রয়ীর হাতে ফুলঝরি দিয়া যাব তুলে। সেই ম্যাজাইদের গল্পে জ্ঞানী দরবেশগণ নক্ষত্রালোকিত খড়ের গাদায় শিশুটিকে যেসব উপঢৌকন দিয়েছিলেন, যদি ম্যাজাইদের ন্যায় দিব্যজ্ঞানী আর ঐশী বিত্তশালী হতাম তবে শিশুদেরে সেই-সমস্ত ও অন্যান্য অজস্র উপঢৌকনই দিতাম আজি এই বরাত বিলিবরাদ্দবণ্টনের রাতে। জেল্লা নাই বিত্তের, পরিধানে নাই গিলে-করা আলখাল্লা বা আচকান-কিস্তিটুপি, দীন মের্জাই-পরা মাসমাইনেতে বাঁধা চাকুরিজীব এক, ফলে আমার ফুলঝরিতেই শিশুবরণ, ফেরেশ্তা স্বাগতকরণ। কবুল করো, পরমপ্রিয়, ফুলঝরিতে এই শিশুস্ফুরণ মঞ্জুর করো মৌলা আমার!
আর যদি নিতান্ত রুষ্ঠ হও ফুলঝরি বিতরণের বিনিময়ে ফেরেশ্তাহাসি জিনিবার হেন কূটকৌশলে, হে ত্রিকালসিন্ধু দয়াল, ক্ষম এ পামরে! এরপরও ফুলঝরি বিতরণের সাধ আমার মরবেনাকো জেনো! ফুলঝরিবিহসিত ত্রয়ী শিশুমুখ দেখার ভিতরে যদি ধর্মনাশের আশঙ্কা থাকে, হে নাথ, হেঁতালের লাঠি দিয়া আমারে পেটায়ো। তবু, প্রভু, ত্রয়ী শিশুর নসিবে এনায়েৎ কোরো ফুলঝরিবিকাশের ভবিষ্যৎ! শঙ্খদোয়া আজি ভেজিনু আমিও তব দুয়ারে, “এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম / আজ বসন্তের শূন্য হাত — / ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও / আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক। / … জাগাও শহরের প্রান্তে প্রান্তরে / ধূসর শূন্যের আজান গান; / পাথর করে দাও আমাকে নিশ্চল / আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক। / … না কি এ শরীরের পাপের বীজাণুতে / কোনোই ত্রাণ নেই ভবিষ্যের? / আমারই বর্বর জয়ের উল্লাসে / মৃত্যু ডেকে আনি নিজের ঘরে?” … হে মাবুদ, বর্বর এই জয়োল্লাস আমার থামাও, স্বপ্নে থাকতে দাও সন্ততিদিগেরে আমার, ফুলঝরিতে আলোসুরভিত থাকে যেন আমার সন্তান, দুনিয়ার বাচ্চারা আনন্দে থাক, স্নিগ্ধ ফুলঝরিকিরণে কাটুক তাদের শৈশব ও সমস্ত জিন্দেগি, ইয়া মৌলা, মাবুদ, তুমি নিশ্চয় আলোর উদ্গাতা, আলো অপছন্দ করার কথা না তোমার অন্তত ওইসমস্ত ওয়াহাবাইট আর সালাফাইটদের ন্যায়!
- ছায়াছন্দ - February 16, 2026
- ফুলঝরি - February 4, 2026
- উইথ অ্যাপোলোজিস টু ইদম শাহ - February 3, 2026

COMMENTS