আমার কর্মস্থলের পাশেই একটা খাবারের দোকান। পাকিস্তানি মালিকানার এই প্রতিষ্ঠানে ভারতীয়, বাংলাদেশি, আফগানি কাজ করেন। বয়েসে সবাই তরুণ। মিশ্র জাতীয়তার এই কর্মপরিবেশের যোগসূত্র প্রথমত ভাষা, সবাই হিন্দি-উর্দু বা ইংরেজিতে সাবলীল এবং সবার ধর্ম এক। প্রায় প্রতিদিন যাওয়া আসার সুবাদে ওদের সবার সঙ্গেই সখ্য গড়ে উঠেছে। খাবারের ফাঁকে ফাঁকে অনেক বিষয় নিয়ে কথা ওঠে, কথা হয়।
হায়দ্রাবাদের মেয়ে নওশীন, এখানে কাজ করে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে যদি দেশ ছাড়তে হয়, তবে স্থায়ী বসবাসের জন্য সে বাংলাদেশকে বেছে নেবে কি না। মেয়েটি সাথে সাথে গুগল করে জেনে নিলো যা জানার। উত্তরে সে বলল, পৃথিবীর ৫ম অর্থনীতির দেশ থেকে ১৪৬তম অর্থনীতির দেশে সে কেন যাবে? আসলেই তাই! ভারত যদি অর্থনীতিতে পিছিয়ে থাকত বাংলাদেশের হিন্দুরা নিশ্চয়ই ওখানে যেত না।
যারা সারাদিন দিল্লি না ঢাকা চিল্লান তাদের ধারণাই নাই, কেন ভারত নেক্সট বিগ এলিফ্যান্ট। আজকে টেকদুনিয়ার সব জায়েন্টদের সিইও ভারতীয়। মেডিসিন থেকে মহাকাশ সব জায়গাতেই তাদের দাপট। ভারতের টাটা, বিড়লার মতো বড় কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন হয় ডলারে, রুপিতে নয়। হিসাবটা আবার বিলিয়নে। তাদের নারী বিজ্ঞানীরা মহাকাশে যান পাঠায়, আর আমাদের বোনেরা ব্যস্ত দাওয়াতি কার্যক্রম নিয়ে। একজন মুসলিম পন্ডিতের প্রণীত শিক্ষানীতিতে ভারত আজ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে, যে-শিক্ষানীতিতে ধর্মীয় শিক্ষার কোনো জায়গা হয়নি। এই ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের ভারতের শ্রমবাজার। বাংলাদেশে যদি ২৬ লক্ষ ভারতীয় কাজ করে তার কারণ ঐ স্কিল লেভেল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গত ৫০ বছরেও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো দার্শনিক উদ্দেশ্য নেই। সরকারি, বেসরকারি, বাংলা-ইংরেজি মাধ্যম, ক্যাডেট, অক্সফোর্ড, মাদ্রাসা সহ হরেক ব্যবস্থা বিদ্যমান গোষ্ঠীতুষ্টির এই ব্যবস্থায়। এরমধ্যে সবচে দুর্বল অবস্থায় আছে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। আলিয়া মাদ্রাসায় যদিও-বা গণিত বিজ্ঞান এই বিষয়গুলো পড়ানো হয়, কিন্তু কওমিরা কোরানহাদিসের বাইরে বেশি কিছুই শেখে না। এমনকি আরবি ভাষাজ্ঞানও নেই। তারা সাধারণ আরবি লেখা পড়তে ও লিখতে পারে না। কেউ কেউ বানান করে পড়তে পারে কিন্তু বাংলা অর্থ করতে পারে না। অনলাইনে মধু, তসবিহ বিক্রি অথবা ধর্মব্যবসা ছাড়া এদের কোনো ক্যারিয়ার অপশন নাই।
অ্যাআই(AI)নির্ভর আগামীর পৃথিবীতে শাউয়ামাউয়া ছিঁড়তে হলে আমাদের জ্ঞানভিত্তিক সমাজের দিকে হাঁটতে হবে। আমাদেরকে খুঁজে পেতে হবে একজন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বা এপিজে আবুল কালাম। আমাদের ব্যর্থতায় দেশ ভরে যাবে পঞ্চম শ্রেণির আইকিউসম্পন্ন কোটি যুবকে। চাকরির বাজারে প্রত্যাখাত এই সব হতাশ তরুণ, সমস্ত রাগ হতাশা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে ইসলামি বিপ্লবে। বিগত সকল সরকারই এই শূন্যস্থান পূরণে কোনো ভুমিকা রাখেনি। বরং শূন্যস্থানকে গহ্বরে রূপান্তর করেছে। যার ফল বাংলাদেশ ভোগ করবে আগামী কয়েক দশক।
রচনাকাল : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মনোজ দাস রচনারাশি
গানপার গদ্যসম্ভার
- বিস্মৃতির পরিভাষা ও অন্যান্য || শুভ্র সরকার - April 20, 2026
- ঊষর নগর, পরিচর্যাহীন মাতৃত্ব ও জীবনচক্রের সংকট : পাপড়ি রহমানের উপন্যাস : পরিবেশবাদী নারীবাদী পাঠ || উম্মে কুলসুম - April 19, 2026
- কেন লিখি? || হামীম কামরুল হক - April 17, 2026

COMMENTS