ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান—
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান—
আমার আপনহারা প্রাণ, আমার বাঁধনছেঁড়া প্রাণ।
তোমার অশোকে কিংশুকে
অলক্ষ রঙ লাগল আমার অকারণের সুখে
তোমার ঝাউয়ের দোলে
মর্মরিয়া ওঠে আমার দুঃখরাতের গান।।
পূর্ণিমাসন্ধ্যায় তোমার রজনীগন্ধায়
রূপসাগরের পারের পানে উদাসী মন ধায়।
তোমার প্রজাপতির পাখা
আমার আকাশ-চাওয়া মুগ্ধ চোখের রঙিন স্বপনমাখা
তোমার চাঁদের আলোয়
মিলায় আমার দুঃখসুখের সকল অবসান।।
উড়ছিল ওই বাণীগুলো, ওই গানপঙক্তিগুলো, অজ্ঞাত কোথাও। অথবা জ্ঞাত, নো ম্যাটার অ্যাট-অল কোথায় এবং কতক্ষণ, কুল-কাল সম্পর্কে কিউরিয়োসিটি যারা প্রকাশ করেন তারা গবেষক অথবা আর-কোনো গোত্র। রবিমিউজিক শোনে পাতক ও পূণ্যবান সবে সম/অসম কিংবা বিষম ভাবে। এবং শোনেও না কেউ, অথবা না-শোনে অনেকেই, শোনা ম্যান্ডেটোরি কিছু তো নয় নিশ্চয়। এমন গ্রুপ অফ পিওপলও তো প্রজাতন্ত্রে দুর্লভ নয় যারা কিনা রবিটোন ম্যান্ডেটোরি করিবারে বদ্ধপরিকর। উহারা কেমন করে হেজেমোনি ক্রিয়েটিয়া যায়, হে গুণী, আমি অবাক হয়ে হেরি। ডিসকোর্স শব্দটাও আসবে, এই চিলতে প্রোজে, হেজেমোনি ইতোমধ্যে এসে গেছে। অ্যানিওয়ে। এইগুলা টাইমেরই চিহ্ন। কথায় কথায় হেজিমোনি। ডিসকোর্স। ন্যারেটিভস। প্রভৃতি।
দিনভর লতিয়ে উঠছিল, ঝরঝর ঝরছিল, সুরপুঞ্জ ওই। বিশেষ ওইটুকু, ওই তো “মর্মরিয়া ওঠে আমার দুঃখরাতের গান”…ওই তো “তোমার অশোকে কিংশুকে / অলক্ষ রঙ লাগল আমার অকারণের সুখে”…উড়ছিল ঘুরে ঘুরে একেলা আকাশে। বেজে বেজে যাচ্ছিল বিপুলা বাতাসে। এই নিরাকার সুরের সাম্পান। ওই “ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান”…মনে মনে ভেবেছি দিনভর এই কথাটা যে, বেচারা ফাগুন কী-এমন নিয়েছে বা পেয়েছে, বাঙালির ব্যক্তিজীবনে ফাগুনেরই-বা কী-এমন রসগোল্লা অবদান তথা কন্ট্রিবিউশন, তা নিয়া জোর আলোচনা দরকার। তবে এখন তো চৈত্র—“এখন এটি চৈত্র মাস শিমুল গাছে ফুল / এখন গাছে ধরেছে খুব দাঁত-টকানো কুল”…সৈয়দ হকের লাইন এইটা, যা-হোক—বৈঠক একটা আয়োজন করা যাবে না-হয় আগামী ফাল্গুনে।

এখন, তবুও এখন, তুমি-যে কেন পড়ছ মনে হে ফাগুন, হে হাওয়া-হাওয়া! “হাওয়া! এই হাওয়া! হাওয়া এসে দুলে-দুলে যায়”…এইটা আবার আরেক গান, ‘সমগীত’ শিল্পীগোষ্ঠীর, অমল আকাশ ও সম্মিলিত কণ্ঠের। পরে এক-সময় এই নিয়াও তোলা যাবে আলাপ। “তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান”…ফাগুন, ওগো ও কমাচিহ্ন-সমেত ফাগুন, কত-না রহস্য ধরো তুমি অনঙ্গ তব অঙ্গে! রহস্য ধরে কতই-না তোমার ওই কমাচিহ্নখানি! একেবারে শুরুর লাইনে, একেবারে পয়লা তোমার নামের কোমরের কাছে, যেমন কোমরবিছে জেওর থাকতে দেখা যায় বেদেনারীদের শরীরে, শেহজাদিদের নৈসঙ্গবেলোয়ারি ঘিরে, এবং দ্যাখো, বোঝাই যায় না বিলকুল তোমাকে, এতই আলতো তুমি, যখন শান্তিদেব ঘোষ গলায় নেন তোমায়! এত রহস্য! ওগো কমাচিহ্ন কন্যে! এত্ত রহস্য! সমস্ত দিন জুড়ে ভেবে সারা আমি আজ ওই নিষ্পলক যতিচিহ্নটি নিয়া! ফাগুনান্তে জুড়ে-দেয়া ঠাকুরের ওই কমা সাইনখানি নিয়া!
দ্যাখো, অথচ, গাইবার সময় একদম বোঝা যায় না আশ্চর্য যতিচিহ্নখানি! বিপুলা এ-ধরণী, অয়ি, কী রহস্যে-যে ভরপুর!
জাহেদ আহমদ । রচনাকাল ৩০ মার্চ ২০১৪
- চৈত্রে শোনা ফাগুনগান ও এক যতিচিহ্নের বয়ান - March 31, 2026
- ছায়াছন্দ - February 16, 2026
- ফুলঝরি - February 4, 2026

COMMENTS