সুরমা নদীর স্রোতধারার মতো কবিতা || সাজিদ উল হক আবির

সুরমা নদীর স্রোতধারার মতো কবিতা || সাজিদ উল হক আবির

শেয়ার করুন:

ভালো একেকটা বই, একেকভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে আমাদের সামনে। তার প্রচ্ছদ একভাবে কথা বলে, শিরোনাম — শিরোনামের টাইপোগ্রাফির কমিউনিকেট করার ভিন্ন একটা ভাষা থাকে, ভেতরের ফ্ল্যাপের লেখা, মূল বইয়ের টেক্সট, সবমিলিয়ে পুরো বইটা আলাদা একক এক সত্তা হয়ে দাঁড়িয়ে যায় মিনারের মতো, আমাদের মানসপটে।

কবি সরোজ মোস্তফার কাব্যগ্রন্থ ‘সুরমা নদীর দস্তখত’ (চৈতন্য, ২০২৪) মনের মাঝে দাগ কাটে, দূর পদ্মা নদীতে একাকী এক জেলে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে থাকা জেলে — এই দৃশ্যকল্পটি যেমন আমাদের মনে দাগ কাটে, সেভাবে; কিংবা বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে হঠাৎ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়ুয়া যেমতে আমাদের মনে দাগ কাটে, সেভাবে। হেমন্তের শিশিরভেজা ঘাসের ওপর খালিপায়ে হাঁটতে যেমন আরাম লাগে, তার এ কাব্যগ্রন্থ পাঠে মেলে সে-আরাম।

যেন মানুষ প্রথমবারের মতো কথা বলতে শিখেছে, আবিষ্কারের আনন্দ ভাগ করে নেয়ার উৎসাহ ও প্রফুল্লতায় পাথরের বুক চিরে বুনো ঝর্ণার মতো প্রবাহিত হচ্ছে বাণী। যেন প্রাচীন অ্যাংলোস্যাক্সন ভূখণ্ডে মেষ চরিয়ে বেড়ানো ইংরেজি ভাষার প্রথম কবি কেইদমনের ওপর ভর করেছে ঐশ্বরিক আবেশ, আর সে ঈশ্বরের আরাধনা শুরু করেছে প্রাচীন হরফে। কেইদমনের বিপ্রতীপে, কবি সরোজ মোস্তফার ঈশ্বরকে প্রতিস্থাপন করে প্রকৃতিমগ্নতা।


বইয়ের ভেতরে ঢুকলে দেখি, কবিতার নামকরণে কোনো জটিলতার আশ্রয় নিচ্ছেন না কবি। সোজাসাপ্টা ভাষায় রাখছেন একেক কবিতার শিরোনাম, যেমন — ‘আম্মা’, ‘সুরে’, ‘শীতে’, ‘নদীর কিনারে’, ‘মেঘে’, ‘ধান হয়ে’, ‘উত্তরের ভূমি’, ‘পুবদেশে’, ‘আব্বার কবরে’, ‘চাউল’ ইত্যাদি। কিছু রাজনৈতিক কবিতা আছে হাতেগোনা, তাদের নাম প্রাসঙ্গিক। কাব্য করার প্রয়াস, বা স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টা ছিল প্রথম ও শেষ দুটি কবিতার শিরোনামে : ‘সুরমা নদীর দস্তখত’ (বইয়েরও শিরোনাম যেটি), এবং ‘জলমজলিসে’।

 


বইটির অন্তর্গত কবিতাসমূহে উঠে এসেছে জন্ম ও মৃত্যু, প্রেম ও বিরহ, সাংসারিক জীবনের বিবিধ সম্পর্ক, সমাজ ও সভ্যতার সম্মুখে ব্যক্তিমানুষের কষ্টকর আত্মসমর্পণ। অবাক করা ব্যাপার, অথবা, হয়তো এটাই কবির মৌলিকতার জায়গা যে — এই যে গ্রন্থিত ভিন্ন ভিন্ন এত বিচিত্র রকমের অনুভূতির মাল্য, সবগুলিই তার কবিতার জমিনে বিধৃত হয়েছে প্রকৃতির পরিভাষায়। প্রকৃতিই তার কবিতায় একটা কমন থিম।

প্রকৃতির বিবিধ অনুষঙ্গ ঘুরে ফিরে আসতে থাকে, আসতেই থকে বারংবার। এবং, সে যে খুব চেনা প্রকৃতি, তাও নয়। বৈচিত্র্য আছে।

তার কবিতার প্রসঙ্গ হিসেবে বারবার এসে খাড়া হয় সুরমা নদী, আউশ ও বোরো ধান, ধানের ক্ষেত। জানতে পারি — ‘হিজল মূলত জলবৃক্ষ! হাওর মুকুট।’ ফিরে আসে মনসামঙ্গলের পালা, ধামাইল গান। গজার, বোয়াল, দাড়কিনে মাছ। জারুলের ঘ্রাণ। আছে মাটি জোছনা, বাতাবি লেবুর ঘ্রাণ।

মায়ের পরিচয় কবির কাছে এমন —

আম্মা, ধানের পাতার মতো
খালপাড়ের বাড়িতে
শিশিরেও হাসে
রোদেও সুন্দর।

তার চেহারায় মুর্শিদ জ্ঞানের রূপ
তার চেহারায় বিরুই ধানের ভাত।

‘সর্বত্র’ কবিতায়, ‘হাওড় কবির’ স্বভাব নিয়ে তিনি উচ্চকিত হয়ে ওঠেন পাখির মতন। বলেন —

যে হাতে কর্ষণ, সে হাতে সেলাই
নদী সাথে নিয়ে প্রেমের স্বভাবে ঘুড়ি
রাজাক্রোশে চুপ থাকি ভূমিতে লুকাই
সবজি ফলাই। বনের কুঞ্জি সাজাই।

কবি মৃত্যু চান প্রকৃতির মাঝেই, বলেন —

মরতে চেয়েছি স্নিগ্ধ রঙে ভোরে
একার অক্ষরে রাষ্ট্র থেকে দূরে
করলা ক্ষেতের চরে।
(দিতে হবে)

কবির পুরো সত্তাকেই আমরা আবিষ্কার করি লোকায়ত জীবনে সমর্পিত অবস্থায় —

বাদাম ক্ষেতের বিস্তীর্ণ বিকালে
শীত সুরমাকে করজোড়ে চাইতে হয়।

জলের তলায় বোকা বাউশের মতো
পীর-মুর্শিদের কাছে করজোড়ে
সমর্পণ করি নিজ নাম।
(করজোড়ে)

‘বন্ধুত্ব’ কবিতায় দেখি সাম্প্রদায়িকতার ভেদাভেদ ভুলে দুই বন্ধু পাখির কিচিরমিচির —

এক পাখি গায় মনসামঙ্গল
অন্যপাখি পাশে বসে, শোনে
জীবননিশানে সেও কণ্ঠ দেয় কারবালার গানে।

এত এত প্রাকৃতিক অনুষঙ্গের মধ্যেও আছে বীভৎসতা (কবিতা — ‘তুহিনের রক্ত’) —

বোরো ধানের মাটিতে
হাওরে বাউল সাধুর বাড়িতে
এমন করুণ কার্তিক আর আসে নি।
জোছনায় কেটে নিয়ে কোলের শিশুর গলা
পিতা সাজিয়েছে প্রতিহিংসার মামলা।

আছে আধুনিক জীবনের তিরতির ছায়া —

চেতনা বধির করে সামাজিক পাখি
ভাঙা ছবিকেও ডাকাডাকি করে।
ফেইক আইডি দিয়েও অভিভূত করে।
(সব গান)

তার কবিতার ছত্রে উন্মুল হয়ে ওঠে ভাটির দেশের মানুষের পরিচয় —

“নদী ও মাটিকে চিনে যে পুরুষ / পুবদেশে সে-ই গুণী। … নৌকার তলার মতো গাত্রটা পিচ্ছিল / বানে-রোদে, কৃষি-কামে হয় না কাহিল” … ইত্যাদি।

ভাত রান্নার ফাঁকে হাওড় অঞ্চলের অভাবী মানুষের দুঃখের আখ্যান বাঙময় হয়ে ওঠে, যখন তিনি বলেন —

ভাতের বলক আসতেই ক্ষুধা তীব্র হয়! দরজা-জানালা বন্ধ করে
আম্মা রেশন চালের ঘ্রাণ আটকাতে থাকেন। ঘরের ছিদ্রগুলোকে
সংশোধনের চেষ্টা করতে করতে আব্বা বলে,
ঔষধ মাখানো মোটা চাল ঘ্রাণ ছড়াবেই।
বলকে বলকে সরে যায় ভাতের ঢাকনা।
চুলার আগুনে ঘামতে ঘামতে মা বলেন,
‘পড়শিরা না জানুক আমরা কি খাই!’

জানতে পারি, ভাটি অঞ্চলের কৃষকের দুঃখগাথা —

ধানকাটা শেষে মজমা বসাব
বাকির খাতাটা কীভাবে মুছব!
ধানের বাজারে খুব ধান্দাবাজি
কৃষকের মাংসে হচ্ছে দোপিয়াজি!
(ধান হয়ে)

‘শীতে’ কবিতায় আমরা জানতে পারি, শীত ঋতুটি কীভাবে মানুষের জন্মমৃত্যুর প্রাকৃতিক আখ্যান রচনা করে —

না-ঝরলে গাছের পাতাও জন্মায় না।
আরেকটা ঘড়ির দূরত্ব
কখনো দেখা যায় না।
না-জন্মালে কে কাকে আদর করে
তাও তো দেখা যায় না।
এ জীবন না জানার, না বোঝার।.

কবির কলমে বাঙময় হয়ে ওঠে সংসারজীবনের গাথা —

দেহ ভাগাভাগি করা সংসার-নন্দন
স্ত্রী পুত্রের কাছে ফাঁস হয় না ক্রন্দন।
(শীতের সিথানে)

প্রকৃতি ও প্রেম সমার্থক অর্থে উচ্চারিত হয় বারংবার —

ধানের উঁচানো শীষে
সূর্য যত মাধুর্য ঢেলেছে, তার পাশে
ভীষণ সোহাগে তোমাকে চেয়েছি নয়ন মল্লিকা।
(তার পাশে)

অথবা

তুমি খোঁপা খুললেই বৃষ্টির বাহার!
এককিলো দূরে দূরে মেঘের পাহাড়।
বুকের পাশে বইছে বেলগাছের হাওয়া
লঞ্চঘাট থেকে তিথি তোমার চলে যাওয়া।
(আফসোস)


কবির ‘জলমজলিসে’ কবিতাটি কাব্যগ্রন্থের শেষ এবং সর্ববৃহৎ কবিতা, যা আলাদা পাঠ ও মনোযোগ দাবি করে। হাওড় বা ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনগাথা নিয়ে এই কবিতার মতো অনিন্দ্যসুন্দর কবিতা আমি পড়িনি আগে। সময় যদি একটু সহানুভূতিশীল হয় তো এই কবিতার জন্যই কবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রইতে পারেন আমাদের বাংলা কবিতার জগতে।

কবিতাটার ছত্র ছত্র কোট করবার মতো। পছন্দের কিছু অংশ তুলে ধরছি। যেমন, এই লাইনগুলি কবির আত্মপরিচিতি —

বাদুরের ঝুলন্ত প্রহরে মেঘস্নিঘ গ্রমগুলো মাদের জন্মস্থান।
উত্তরকাশে মেঘের সুবাসে নেমে আসা নদী
খালের প্রবাহে লতা-গুল্মে ভেসে পরিচয় তুলে ধর যদি
ভাইবোন করে নদীর মতোন ভাত ন্যে দাকি
দোয়েল পাখিকে দেখে রাখি আজো জমির সমান।
হাওরে সাগরে সব কৈবর্তসন্তান।
মেঘ বিকশিত নদীটায় ভাসি আজো পূর্ণতর জলের মাস্তান

ভাটির সন্তানের আধুনিক জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই পঙক্তিগুলিতে —

জাম্বুরা ফুলের পাশে তোমাদের মন ততটা বুঝি নি
যতটা বুঝেছি ঘাট-পারাপার, মৎস্য শিহরণ।

 


এ যাত্রা কিছু সমালোচনা করা যাক।

কবির কবিতায় বিস্ময়বোধক চিহ্ন (!) ব্যবহারের আতিশায্য আছে। এটার প্রয়োগ কমিয়ে এক কবি-দার্শনিকসুলভ নির্মোহ জায়গায় পৌঁছানোর প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। মুদ্রণপ্রমাদও আছে, ছোট কবিতাবইয়ের পাণ্ডুলিপি হিসেবে চাইলে যেটাকে এড়ানো যেত। আরবি-ফারসি শব্দ, যেগুলো কিছুকিছু কবিতায় এসেছে, সেগুলো আমার ক্ষেত্রবিশেষে আরোপিত মনে হয়েছে। পুরো কবিতাবইয়ের ধারাবাহিকতায়, মনে হয়েছে তেলে জলে মিশ খায়নি। রাজনৈতিক কবিতাগুলি, চাইলে এ অন্তর্ভুক্তি থেকে বাদ দেয়া যেত, বিষয়বস্তুর সাযুজ্য ধরে রাখার জন্য। ‘বুকে রাখি’ আর ‘বুকে তুলে রাখি’ প্রায় একই কবিতা, চাইলে তাদের একটা বাদ দেয়াই যেত।

সর্বোপরি সমস্ত কবিতায় প্রকৃতি যাপন করতে করতে, একপর্যায়ে ক্লান্তিই চলে আসে। হঠাৎ করেই কবি উচ্চারণ করেন —

এই পৃথিবী আসলে পিতা-মাতা, মাসি-পিসি, জেঠুর কবর।
যে যার মতো রাখেন ঠোঁটের অক্ষর।

ধরিত্রীর এ সংজ্ঞায়নে আমরা চমকে উঠি। পাঠের পুনরাবৃত্তির ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।

কবি সরোজ মোস্তফাকে শুভেচ্ছা ও আলিঙ্গন, সুরমা নদীর স্রোতধারার মতো নিটোল একটি কাব্যগ্রন্থ আমাদের উপহার দেয়ার জন্য!

নো ট : কবি সরোজ মোস্তফা, আমাদের সরোজভাইকে আমার প্রথম আবিষ্কার গেলবারের ঢাকা লিট ফেস্টে। বাংলার বাউল দর্শন নিয়ে একটি সেশনে এত সুন্দর কাব্যিক সঞ্চালনা করেছিলেন তিনি, মনে দাগ কেটে গিয়েছিল। দ্বিতীয় পরিচয়, তার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের মাধ্যমে, যাতে আমি সংযুক্ত ছিলাম না আগে, তবে তার হাওড় অঞ্চলের স্বভাবকবি, কিংবা কবিয়ালদের জীবন ও দর্শন নিয়ে তৈরি ভিডিওক্লিপগুলো কীভাবে কীভাবে যেন চলে আসতো আমার প্রোফাইলে। দেখতাম। ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিচিতি গত শুক্রবারের বইমেলায়। ওনার কাছ থেকেই জানতে পারা, নান্দনিক প্রকাশনা সংস্থা চৈতন্য  তার এবারের কবিতাবইটি বের করেছে। বইটি সংগ্রহের ১ দিনের মাঝেই সবগুলো কবিতা পড়ে শেষ করি। তা নিয়েই দু-ছত্র লেখার প্রয়াস। দ্রুত লিখবার কারণে লেখাটা একটু খাপছাড়া হয়ে গেল হয়তো।

*সাজিদ উল হক আবির, কথাশিল্পী


গানপার বইরিভিয়্যু

শেয়ার করুন:
আগের পোষ্ট

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you