কালের মন্দিরা বাজে না কার হাতে? কে না বাজে, এবং বাজায়, একলা রাতের উইন্ডোয় কিংবা পাব্লিকপ্লেসের প্রখর দুপুরভিড়ে একটি ঋজু তরঙ্গের ন্যায়? কাল যেন অর্কেস্ট্রামাস্টার এক, ব্যাটন হাতে সে তার পরিপার্শ্বহাওয়ায় বাহিত কবি ও কলেজশিক্ষক থেকে প্যাস্টেলশিল্পী কি ট্যাপেস্ট্রিমিস্ত্রি কিংবা গাভিরাখাল গণৎকার স্টোরকিপার বিদূষী বিদগ্ধ সকলেরে দিয়েই নিজের কম্পোজিশনটা বাজিয়ে নেয়। কালের এই টিউন ও অন্যান্য কম্পোজিশন্যাল অ্যারেঞ্জমেন্টের আওতায় সাধারণের মতো কবি কথাকার চিত্রী সিনেমানির্মাতা যার যার কন্ট্রিবিউশন রেখে প্ল্যানেটের বাইরে বেরিয়ে পড়েন অগস্ত্যভ্রমণে একদিন। সকলেই আমরা বাদক অথবা বাদ্যসমুজদার, কালের। মুহূর্তমন্দিরায় আমাদের জাগরণ ও নিদ্রা, মাঝখানে একপল অতিজীবিতের ইউফোরিয়া, আবারও অফেরা হার্বারের পানে মুহূর্তময়ূরের পঙ্খীরাজে চেপে ট্র্যাভেল…

২
‘মুহূর্তমন্দিরা’ নাম ধরে যে-বই প্রকাশিত হয়েছে প্যান্ডেমিকের ঠিক আগের বছরটায়, সেই দ্বিসহস্রউনিশে, সে-বই দ্বিসহস্রছাব্বিশে এসে একটি রিভিজিটের চকিত মওকা পাওয়ায় এই নিবন্ধ সম্ভব হতে পেরেছে। এর আগেও বইটি রিড করেছি, বিভিন্ন সময়ে, একাধিক দফায়, এবং আত্মজৈবনিক নৈকট্য হেতু সৈয়দ আফসারের অভিষেক টু অদ্যাবধি বিব্লিয়োগ্র্যাফির সবগুলা টাইটেলই স্কিম থ্রু করে এসেছি বিগিনিং থেকেই। নিবন্ধের নানান জায়গায় সেই চিহ্ন, কবির সঙ্গে এই ক্রিটিকের কায়মনোসংলগ্নতার সাইন, মনে হয় ভিজিবল রইল।
সো, গোড়াতেই ক্লিয়ার বলে নেয়া ভালো, কবির জীবনী নয়, কবিতার জীবন ও যমযাতনা নিয়াই নিবন্ধটা আবর্তিত হবে। কেবল উপলক্ষ, উসিলা মাত্র, ‘মুহূর্তমন্দিরা’। তারপরও সৈয়দ আফসারের সামগ্রিক সাহিত্যশৈলী কিংবা তার কাব্যশাঁস সম্পর্কে বেখেয়ালি কিছু মন্তব্য/অনুসিদ্ধান্ত প্রসঙ্গচক্রে প্রকাশ হয়ে গেলে সেসব অতি প্রাথমিক ও অপরীক্ষিত পর্যবেক্ষণ হিশেবে যেন কন্সিডার করা হয়। কেননা, মাত্র এক বই নিয়া আলাপ করতে বসে এন্টায়ার কবিকৃতি নিরূপণ করা ন্যায়সংগত হয় না। আর, তা অহেতুক, অশোভনও। তবু, কবি ও কবিতা সম্পর্কে যেটুকু বুঝসমুজ হয় আমাদের, তা তো ক্ষণিকের পাঠজাত যতটা-না তারচেয়ে বেশি স্মৃতিজাত। পূর্বপাঠ কখনো উত্তরপাঠে অগোচর থাকে না।

৩
নাম্বার ওয়ান, প্রথম কথা হলো, ‘মুহূর্তমন্দিরা’ আফসারের আগের পাঁচটা কাব্যগ্রন্থের কণ্ঠস্বরের সম্মিলিত অনুরণনপুঞ্জ ধরতে পেরেছে বলে মনে হয়েছে। সেই ‘নিঃসঙ্গী নিহিতার্থে’ থেকে ‘সেলাই গাছের কারখানা’ পর্যন্ত, মধ্যিখানের ‘যথা, কথকতা’ ও ‘জলের করাত’ ও ‘উড়াল হাওয়া’ সমেত, সৈয়দ আফসার মূলত অতি ব্যক্তিক প্রণয়বিরহ ও তৎসঞ্জাত মনোদৈহিক ক্ষরণের ধারাপাত ঘটান কবিতায়। শেষ তথা আলোচ্য বইটিও উক্ত ঘটনার ব্যতিক্রম নয়। প্রেম ও অচরিতার্থতার পঙক্তিগুচ্ছ, প্রধানত, ‘মুহূর্তমন্দিরা’ ধারণ করে আছে এর পাঁচ ফর্মা আশি গ্রাম বসুন্ধরা ব্রাউনিশ মনোরমা পাতাপত্রালিকায়।
এইখানেও, যথাপূর্ব, কবিতাগুলি ইমোশন রিকালেক্ট করার চেয়ে কেমন জানি ইমোশন কন্সট্রাক্ট করার দিকেই ঝোঁকানো মনে হয়। চিত্রকল্প সম্পন্ন হতে যেয়েও হয় না, ব্যাহত হয়, ডিরেইল্ড হয়া যায়, এমনকি মিসকমিউনিক্যাশনও কখনো কখনো, কোথাও পৌঁছাতে যেয়েও মনে হয় যেন পৌঁছায় না। আরেকটা আপত্তি, গীতলতা। আপত্তি মৃদু। কবিতা মাত্রই, ইন জেনারেল বাংলা কবিতার কথা বলছি, গীতের দিকে যেতে চায়। সেই গীতপ্রবণতা বাংলা আধুনিক উত্তরোত্তর কবিতায় শাসন করবার ইতিহাসটাই ইন অ্যা নাটশেল আবহমান বাংলা সাহিত্যেরই ইতিহাস। সুর চড়া হয়ে গেলে যেমন সংগীত হয় ব্যাহত, করুণ আবহের আধিক্যে যেমন হয় স্ক্রিনপ্লে মেলোড্রামাটিক, সৈয়দ আফসারের কবিতা পড়তে পড়তে এমন দুর্ঘটগুলা পার হতে হয়।
কাব্যগুলি গীতিবিচ্ছুরণকারী, লিরিক্যাল ও অনাবশ্যকভাবেই মিউজিক্যাল, এগুলির রিদম ও রাইমিং প্যাটার্ন অতিশয় এলানো ও অত সচেতন নয় মনে হয়। এর পঙক্তিবিন্যাস ও স্তবকবণ্টন দৃশ্যত চৌকস হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে যেনবা খাপছাড়া। আর অতি মাত্রায় গীতল হবার কারণে কানে ক্যাকোফোনির মতো শোনায়। গীতলতা, আশ্চর্য যে, এই বইয়ের অধিকাংশ রানিং গদ্যফর্ম্যাটের কবিতাগুলিরও বৈশিষ্ট্য। কবিতাগুলি, রিপিট করি, গীতল। অতিগীতল কখনো কখনো। তখন রসভঙ্গ ঘটায়। বা, তা না হলেও, সাময়িক পাঠবিঘ্নের কারণ হয়া দাঁড়ায়। যেমনটা স্বাদ বদলায়া যায় বেশি মিঠায় বা স্বাদেন্দ্রিয়-অসাড়-করা খাট্টায়।

৪
তা যা হোক, বলা হয়, কবিতা পাঠ করবার সময় আমরা পাঠ করি নিজেকেই, কিংবা চাই নিজেকেই রিইনভেন্ট রিডিফাইন করে নিতে। সেক্ষেত্রে এই বইয়ের কবিতাগুলি হৃদজটিলতায় জেরবার নিঃস্ব-বোধ-করা পাঠকের অপেক্ষায় প্রায় সত্তইরটা আলাদা আলাদা টাইটেলে হাজির। অক্ষরবৃত্ত। পয়ারঝোঁকা। লাইনগুলা সাংকেতিক, সিগ্ন্যালিক, যদিও সংকেত পর্যবসিত হয় প্রায়শ ধোঁয়াশায়। অ্যাব্রাপ্ট স্টার্টিং কবিতাগুলারে যতটা অ্যাট্র্যাক্টিভ করে তোলে, এর অব্যবহিত পরবর্তী সিগ্ন্যালগুলায় গিয়া আর যেন কমিউনিক্যাশনচেইন ওয়ার্ক করে না। পাঠ দরকার হয় বারবার। তারপরও খটকা থাকিয়াই যায়। ভাব/অর্থ দোহনের খটকা।
আইডিয়াতাড়িত নয় যেহেতু কবিতাগুলি, ইমোশন বা আবেগিক অনুভূতিসৃষ্ট, নির্দিষ্ট কোনো অর্থোদ্ঘাটন বা ভাবোন্মোচনের দিকে যেতে হয় না। আখেরে একটা নান্দনিক হাহাকার শুধু। অকারণ নয়, হাহাকারগুলি, সিরিয়াসলি হৃদয়ঘটিত। তবু হাহাকার, যতই হৃদয়ঘটিত ও নন্দনঋদ্ধ হোক, হাহাকারই। নিষ্ফল, অন্তিম বিবেচনায়। কিন্তু রোদনের সাউন্ড মডিউল্যাশনের মাধ্যমে একটা হাহাকারই নিতে পারে সংগীতের শরীর। মুহূর্তমন্দিরায় তেমন সুসমঞ্জস সংগীতের দেখা আমরা পাতায় পাতায় না হলেও উল্লেখযোগ্য অনেক জায়গায় পাবো।
সৈয়দ আফসারের কবিতায় ব্যক্তিগত অপ্রাপ্তি, নিসঙ্গচৈতন্য ও অনিকেতবোধ, বিশেষত জৈব প্রণয়বঞ্চনা, ছিটিয়ে ছড়িয়ে রাখা আছে। এ-সমস্ত পঙক্তিনিচয়ের সঙ্গে ব্যক্তিপাঠকের বোঝাপড়া সাধিত হবে ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার তারতম্য অনুসারে। এই কবির ভোয়েস ডেভেলপমেন্ট ও ডেলিভারি প্রসেসে একটা ‘অ্যা প্রায়োরি’ বিরাজ করে দেখতে পাবো, অভিজ্ঞতা-নিরপেক্ষ জ্ঞান, যা আগে থেকে জানা বা যুক্তি ও অনুমানের ভিত্তিতে অর্জিত হয়, কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণ ছাড়া; আফসারের বাকপ্রতিমাগুলো স্বতলব্ধ, অবরোহী প্রণালীভিত্তিক।
‘মুহূর্তমন্দিরা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতার আরেক বৈশিষ্ট্য, পঙক্তিগত ও মর্মবস্তুগত উপস্থাপনায় এরা আশ্চর্য সমসত্ব, হোমোজেনাস, ফলে এক বিশেষ লয়ে গলা খেলাবার আরাম এখানে পাওয়া যায়। অসমসত্বতার, হেটেরোজেনাসিটির, উতরোল কার্নিভ্যাল এখানে নাই, কিন্তু হোমোজেনাসিটির আটপৌরে একরূপতার নির্ভরতা আছে। কেবল একটা বাক্য বলার আছে এর মর্মবস্তুগত প্রধান কন্সার্নটি নিয়া। আত্মক্ষরণ। কবিমাত্রেই এক প্রকার ক্ষরণের ধারাবিবরণীই লিখতে থাকেন, রোম্যান্টিক ও তার আগের পরের বেবাক এরার কবিরা আত্মক্ষরণের ভিতর দিয়াই বিমোক্ষণ বা ক্যাথার্সিস ঘটান। সতর্ক থাকতে হয়, আত্মক্ষরণের আধিক্যে যেন কবিতাটারে স্রেফ আত্মরতি কিংবা আত্মকণ্ডূয়ন মনে না হয়।

৫
সৈয়দ আফসার কবিতায় শৃঙ্গার রসের কারবার করেন। ঐতিহ্যগত সুকুমার শিল্পকলার বেশিরভাগ বিষয়বস্তু মুখ্যত নর ও নারীর মধ্যকার সম্পর্কের চারপাশটায় আবর্তিত রয়। এইভাবে উৎপন্ন প্রাথমিক আবেগের বাঙময়তাই শৃঙ্গার। প্রেমিক ও প্রেয়সীর মধ্যে রোম্যান্টিক সম্পর্ক অন্যদিক থেকে ব্যক্তি ও ঈশ্বরের সম্পর্কের রূপক। শাস্ত্রীয় থিয়েটার বা নৃত্যশিল্পীরা শৃঙ্গারকে সকল রসের জনয়িত্রীও বলে থাকেন। নয় রসের একটি শৃঙ্গার একলাই ঈর্ষা, রাগ, ভয়, বেদনা ও সমবেদনা এবং অবশ্যই শারীরিক মানসিক জৈবিক ঘনিষ্ঠতার প্রকাশ সহ অন্যান্য আবেগের রূপায়নে অগণিত সুযোগ দেয়। বাকি আট রসের আর-কারো এতটা ব্যাপ্তি নাই। মোটামুটি সব দশকের কবিতার সার্ফেইস লেয়ারে এই রসের জোয়ার দেখতে পাওয়া যায়।
প্রেমের কবিতাই লিখেছেন কবি, লিখে চলেছেন, ‘নিঃসঙ্গী নিহিতার্থে’ থেকে এই ‘মুহূর্তমন্দিরা’ পর্যন্ত। পঙক্তিতে পঙক্তিতে প্রেম ও তজ্জনিত পর্যুদস্ততার চিহ্ন শুধু। অস্তিত্বের অপরাপর অনটন কবিতাগুলায় ভাসিত হয় না। নাই নয়, আছে, কেবল অনুকূল আবহের অভাবে যথাযথ পরিস্ফুটিত হয় না। আমি-তুমি সর্বনামের সর্ববিস্তারী যুগল মূর্তায়ন সত্ত্বেও কবিতাগুলো নর-নারী দ্বিকোটিক দ্বৈরথের বাইনারি মিনিঙের বাইরে বেরোতে পারে না। যার ফলে একঘেয়েমি অ্যাভোয়েড করা প্রায় ডিফিকাল্ট হয়।
কী চমৎকার সমস্ত কবিতার কোয়েক্সিস্ট্যান্স মুহূর্তমন্দিরায়! টাইপিঙে আলসেমির কারণে বেশকিছু কবিতার চূর্ণপঙক্তি কিছু পঙক্তিমালা হাজির করি। টিজার ফর দি রিডার্স। বোঝা যাবে এই কবির পঙক্তিনির্মিতির গুপ্তকলাও অনেকটা। ‘ছায়ার নিচে সে যদি রোদ কুড়ায় / তবে সেলাইকলের টানাটানা শব্দও বাদ যাবে কেন / কলঘরের একটানা শব্দও কুড়াক’, এই তিন পঙক্তির স্মার্ট স্তবক দিয়ে শুরু হয় ‘শব্দ’, বইয়ের প্রথম কবিতা। তারপরে একটি তিন ও একটি চাইর লাইনের স্তবক, পরে একটা লাইনে শেষ, ‘দগ্ধ পাঁজর জুড়ে পাবে হাসি, চুম্বনের’, ব্যাস। লক্ষণীয়, অন্তিমে যতি নাই। গোটা কাব্যের কোথাও তা নাই, ব্যত্যয় ঘটেছে কেবল ইন্টেরোগ্যাটিভ ও এক্সক্ল্যাম্যাটোরি ইমোশনের বেলায়। আদারোয়াইজ, ফ্যুল পিরিয়ড নাই। প্রিভিয়াস ডিকেইডে এইটা প্র্যাক্টিসড প্রচুরভাবে। এখন অন্য গিমিক আছে অবশ্য।
বইয়ের কবিতাগুলির গড় অবয়ব বুঝতে চাইলে একটা রানিং প্রোজ ফর্ম্যাটের কবিতা আর একটা লাইনবিন্যাস্ত কবিতা আস্ত অবলোকন করা ভালো। দৈবচয়িত পঙক্তিচূর্ণের পরিবর্তে একটা আস্ত কবিতার অবয়ব উৎকলন বেহতর এই কারণে যে এতে কবির ক্র্যাফট ও কবিতার কন্সট্রাকশন দুনো বোঝা সহজ হয়। ফার্স্ট পূর্ণোদ্ধৃতি, শিরোনাম ‘আবছায়া’, নিচে দেখব।
জলে ভাসে জল, চোখ হয় লীন
রহস্যে ঘিরে রাখো সব
স্থির থাকে মায়া
রাত্রি গভীর হলে ঘুরে আসে যে-মুখ
সে কি তুমি?
দক্ষিণে সমুদ্রমহাল, উত্তরে আবছায়া…
যা বলছিলাম, স্থাপত্যিক পঙক্তিবিন্যাস্ত কবিতার পাশাপাশি টানাগদ্যের কবিতাকাজ এই বইয়ের প্রকরণগত বৈচিত্র্যের দুই প্রধান দিক। অধিক নয়, একটি নিদর্শন শুধু টুকে নেব অনুচ্ছেদান্তরে। এই কবিতার নাম, ‘তৃপ্তিজাত’ :
যেতে চাই, কিন্তু যাব কই? যাব বলে কোথাও যাওয়া হয় না। ভাস্কর, তারচে তুমিই বলো, তৃপ্তি যেন কিসে? কার দখলে ঠায় দাঁড়াও, মেশাও পিপাসু উত্তরাধিকার! অলস এই আমি, স্বপ্নঘাত গোপন রেখে বসে আছি। আর দেখছি কীভাবে তুমি চাপা পড়ো বর্ণে ও ছায়ায়। শর্টকাট দৃষ্টি ফেলে যন্ত্রণা নিয়ে যাব স্বগৃহে। রহস্যময় দুপুরও দাঁড়ায় চৌরাস্তায়। এবার বলো, হাওয়ার জোরে আর কত বসে থাকা; কথা না-বলে কত অপেক্ষা স্তব্ধতার ভেতর খুন হবার মন্ত্রে শেখো, বুক খুলে দেখো, তৃপ্তিজাত ফলের মিষ্টতা
চমকে ওঠার মতো অ-জটিল সহজ স্পন্দের কিছু কবিতা পাওয়া যায়, একটা যেমন ‘পরস্পর’ :
প্রাণকে ধারণ করে যে-গাছ
গাছকে ধারণ করে যে-মাটি
সে-মাটিতে রাখছি আমাদের
পা
জলে মাছের বসবাস
নীলাকাশ পাখপাখালির
এইখানে মাছপাখির স্বতন্ত্র চাষ
গাছ ও মানুষ নির্ভর পরস্পর
উপরোক্ত টোনের কবিতাগুলা আফসারের ‘সেলাই গাছের কারখানা’ পার্টে বেশ প্রণিধানযোগ্যতায় হাজির ছিল। প্রকৃতি ও মানুষের সিম্বায়োটিক পজিশন। জল, হাওয়া, মাটি, নদী, তীরবর্তী জনপদের কথকতা আফসারের কবিতায় আগাগোড়া আচ্ছাদিত হয়া থাকে। একেবারে জড়ানোমোড়ানো। পঙক্তিতে এক্সেন্ট্রিসিটি আছে, সেসব পার্ট অফ দি পার্সেল, সেসব কবিতারই কিমিয়া। যা-কিছু কবিতায় ব্যবহৃত, ত্রুটিবিচ্যুতি বিপর্যয় বিপর্যাস, ধরে নিতে হবে সেসবই কবির অভিপ্রেত।

৬
গ্রসলি রিজেকশনের জায়গাগুলিই লিপিবদ্ধ হচ্ছে এই নিবন্ধে, খেয়াল করবেন। সো, ফোকাসড থাকি। রিসেপশনের বা অ্যাক্সেপ্ট্যান্স/অ্যাপ্রুভ্যালের জায়গাগুলি নিয়া না বলি। কিন্তু গ্রহণ তো করেছি অনেক। টেক্সটগুলি গীতিমুখর, গতিশীল, গমকে ভরপুর। সুভাষিত। সুন্দর। তবে, সেসব কথা থাক, কেবলই রিসেপশনগুলি কিংবা অ্যাচিভমেন্টগুলি নিয়া আলাদা আয়োজনে রেজিস্ট্রেশন করা যাবে কখনো।
গোড়া থেকে এ-পর্যন্ত সৈয়দ আফসারের সাউন্ডকার্ডটা নাইন্টিসের রেজোন্যান্স বহন করে এসেছে। বাংলাদেশের কবিতাজাগতিক নব্বইয়ের ধ্বনিবলয়ে এই কবিতাগুলি বিকশিত। ফলে, একটা পাস্ট অ্যান্ড লস্ট ডিকেইডের হ্যাঙোভার ও নস্ট্যালজিয়ায় আমরা আক্রান্ত ও আদৃত হই, পীড়িত ও প্রীত হই, গ্রস্ত হই, মেদুর হয়া উঠি। বিশেষত কবিতাগুলির ভোক্যাবুলারি, ডিকশন, ইমোশন্যাল অ্যালাইনমেন্ট নব্বইয়ের অ্যারোমা ক্যারি করায় পাঠককে অ্যাশিউর করে অ্যাকোয়েইন্ট্যান্সের ইশারায়।
ডিপার্চার দরকার। ডিপার্চারের চিহ্নগুলা আফসারের বিভিন্ন কবিতায় ছিটিয়ে ছড়িয়ে আছে। কেবল নাইন্টিসের সাউন্ড প্রোগ্রেশনের সাইন ও সিগ্নিফায়ারগুলি দিয়া আফসার যে আর নিজের ক্ষরণ ও অনুভূতিশৃঙ্গারগুলা আঁটাতে পারছেন না, আঁটানো সম্ভব নয় বলে, তা এই বইয়ের বেশকিছু জায়গায় নোটিস করা যায়। ডিসাইড করে রেখেছি ‘প্রিয় অন্ধকার’ কবিতাটা আহরণ করব, বইয়ের শেষ ও কবির ডিপার্চারের চিহ্নবাহী নিদর্শনযোগ্য কবিতা :
এই অমারাত্রিই আমাকে পুরোটা গিলে খাবে
এইখানে থেঁৎলে গেছি মৃত্যুর কিংখাবে
এখানেই নিজেকে খুঁজে ফিরি বারবার
স্মৃতিকথারাও খায় চেটেপুটে স্বপ্ন সুভদ্রার
অন্ধকার মিশে আছে রক্তে-মাংশে আমার
সে কি জানে কেমন বাদ্য এই নীরবতার?
ঘোরের ভেতর ঘনঘোর আমি বসে রই অনিবার
নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু নাচে এই সংসার
উদ্ভুত হয়ে বিলীন হবার খুঁজছি বিপুলা দ্বার
পথে পেয়ে গেছি শ্রীমতী আঁধার সুনন্দ সমাচার
অতঃপর আছি জীবনে ব্যাকুল জ্যোৎস্নাসারাৎসার
গ্রীবাতৃষ্ণায় পেরোচ্ছি এই পৃথিবীর পারাবার
আরেকটি জিনিশ, সৈয়দ আফসারের কবিতায় শারীরিক সমকালটা নাই। ফিজিক্যাল সমকাল ইজ মিসিং হিয়ার। বলতে চাইছি, ঠিক যে-সময়ে টেক্সটটা হাজির হয়েছে, সেই সময়ের সনাক্তযোগ্য কোনো অনুষঙ্গ বা আঁচড় রচনায় থাকে না। আকারে ইঙ্গিতেও না। তা বাংলা ভাষায় অ্যাভারেইজ সাহিত্যেই মিলানো কঠিন হয়। বাংলাদেশের শিল্পকলায় এ এক সাধারণ সমস্যা যে এখানকার উপন্যাসে গল্পে কবিতায় গানে সিনেমায় চিত্রকলায় ফিজিক্যাল সমকালটা প্রায় ইগ্নোর্ড হয়। টাইমের ট্রেইলগুলি ডিফিউজ এমনকি ইরেইজ করেও কবিতা আখ্যান করা যায়, তা বাহুল্য বলা। বাংলাদেশের নানাবিধ নন্দনতাত্ত্বিক পদচারণাপারঙ্গম কবিতারা তার প্রামাণ্য উদাহরণ। সৈয়দ আফসারের কবিতারা স্থানিক একটা কালার অ্যান্ড টোন অফার করতে চায় যেহেতু, মনে হয়েছে আমার, অতএব স্থানিকতার খুঁটিনাটি চিহ্নাচিহ্ন ডকুমেন্টেশনের ভার বহন করতে পারলে এরা আরও উড্ডয়নক্ষম হতো।

৭
কবিতা বা কবি চিনতে মুখবন্ধ সহায়ক হয়েছে বলে তেমন নজির নাই, কোথাও, কিংবা এমনও বলা যাবে না যে একজন কবির জন্য ঘটকালি দরকার হয় ক্রিটিকের। কবিকে কেউ পাঠক পাইয়ে দেয় না, আদৌ সম্ভব নয় পাঠক পাইয়ে দেয়া, তার কবিতাই পারে সেই রিডারের সেই পাঠকের কাছাকাছি নিয়ে যেতে কবিকে। এর মধ্যিখানে একটিআধটি মিডিয়ার দৌত্যে, একটাআধটা প্রাধান্যবর্গীয় সঙ্ঘের পৌরোহিত্যে, বেশখানিক তেল্লাই পাওয়া যায় হয়তো-বা। আখেরে, এতে নিতান্ত হতাশ্বাসীকেও ভরসা রাখতে হয়, কবিকে তার পারানির কড়ি দিতে পারে কেবল কবিতাপাঠক। কখনো সেই কড়ি দিয়া কবি ভীষণ ঝড়ের তোড় সত্ত্বেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, কখনো অল্পদূর দরিয়ার মাঝখানে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন হাল। সৈয়দ আফসার আস্থা রাখেন, সবসময়, পাঠকের ওপর। সাদর গ্রহণ কিংবা অনাদর প্রত্যাখ্যান কোনোটাই অনভিপ্রেত নয়, কবির কাছে, যদি সেই গ্রহণ/বর্জন পাঠপূর্বক হয়। এই নিরুপম কবিতাকারখানায় এমন সশ্রম আয়ু বিনিয়োগ করে চলেছেন কবি কোনোপ্রকার ফলাকাঙ্ক্ষা ছাড়াই। ফল ফলাবার আশা আফসার করেন না, মা ফলেষু কদাচন, এমনকি ফুল ফুটাবারও। অপুষ্পক উদ্ভিদের জীবনী কি শিল্পবনানীতে একেবারেই অস্পৃশ্য? মনে হয় এমন সপ্রশ্ন সন্ধান থেকে একজন কবি নির্মাণ করে নেন তার দর্শনায়তন। সৈয়দ আফসার, সন্দেহ নেই, কবিতার পঙক্তি দিয়ে সেলাই করে নিতে চেয়েছেন নিজের জখম। শুধু নিজেরই নয়, পরেরও, জখমগুলো সময়ের। আফসার তার কারখানায় রিফু করেন স্মৃতি, রিফু করেন নিজের ও অপরের সত্তা, আমাদের ভবিষ্যৎ। কতটুকু টেকসই তার রিফুকর্ম, কতটা কারুসুশ্রী, কিংবা তার ভূমিকা তান্ত্রিকের না শল্যচিকিৎসকের প্রভৃতি বিবিধকৌণিক বিচার যারা করতে চান তাদেরকে এই কবির এ-পর্যন্ত প্রকাশিত সপ্তসিন্ধু তথা সাতটি বইয়ের নাম রেফার করা যায়, যার ভিতর একখণ্ড গদ্য ও ছয়খণ্ড কবিতার।

৮
আড়াই দশকেরও অধিক হবে এই কবি লিটারারি অ্যারেনায়, বাংলা ভাষায়, লিখে চলেছেন অনলস ও বলা যায় প্রায় নিয়মিতই। বিশেষত উল্লেখ্য, ব্লগযুগে যে-একটি ইউফোরিয়া বাংলায় এসেছিল, দুইহাজারসাত থেকে তেরোচোদ্দ অব্দি বলা যাক, সৈয়দ আফসার ওই সময় হাত খুলে লিখেছেন ব্লগপ্ল্যাটফর্মগুলায়। লিটলম্যাগে লেখালেখি ততদিনে প্রাগৈতিহাসিক প্রস্তরযুগের প্রত্নঘটনা হয়ে গেলেও স্বসম্পাদিত ‘অর্কিড’ ও সমমনা কাগজগুলায় লেখাপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা আফসার এখনও পরিত্যাগ করেন নাই তা আন্দাজ করা যায় প্রিন্টপত্রিকাপাব্লিক্যাশনগুলায় তার ফ্রিকোয়েন্সি অফ অ্যাপিয়ার্যান্স দেখে। প্যান্ডেমিকের আগ পর্যন্ত গত-হওয়া প্রায় আড়াই দশকের কবিতাচারণায় আফসার বাংলাদেশের বনেদি লিটলম্যাগগুলায় লিখেছেন, সমান তালে সক্রিয় থেকেছেন আন্তর্জালিক বাংলা সাহিত্যের পরিসরগুলায়। মেইনলি কবিতায় তার অভিনিবেশ ও অধিবাস। প্রথম দশকে লেখালেখির অ্যারেনায় আবির্ভূত অত্যন্ত প্রোলিফিক কবিদের কাতারে একজন সৈয়দ আফসার, জন্ম ও বেড়ে-ওঠা বাংলাদেশের সীমান্তজনপদ সিলেট জেলার জগন্নাথপুর উপজেলায় হলেও বর্তমানে এবং বহুদিন হলো যুক্তরাজ্যবাসী। এ-পর্যন্ত প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ দশকসংকলনগুলায় সৈয়দ আফসারের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে তিনি এই সময়েরই বিবিক্ত ব্যক্তিমানুষের শ্বাসবায়ু ও জলহাওয়া ধারণ করেন তার কবিতায়। গদ্য লেখেন, অনানুষ্ঠানিক, ‘ব্লগাবলি’ টাইটেলে একটা বই রয়েছে গদ্যের। প্রকাশপ্রাপ্ত কবিতাবই এ-যাবৎ ছয়; ‘নিঃসঙ্গী নিহিতার্থে’ ডেব্যুবই, রিলিজড দুইহাজারসাত; পরে, গেল দুই দশকে, একে একে বেরোয় ‘যথা, কথকতা’, ‘জলের করাত’, ‘উড়াল হাওয়া’, ‘সেলাই গাছের কারখানা’ এবং এ-পর্যন্ত উনিশে বেরোনো ‘মুহূর্তমন্দিরা’ আফসারের সর্বশেষ ও অদ্যাবধি শীর্ষ কবিতাবই।

৯
শীর্ষ কেন, ‘মুহূর্তমন্দিরা’, বর্তমান নিবন্ধে সেই ইশারাগুলা আঁটতে পারলেই নিবন্ধটা সার্থক হতে পারে। এতক্ষণ ধরে সেই চেষ্টা চালিয়ে এখন অন্তিমে উপনীত। বইটা বার হয়েছে অর্কিড প্রকাশনী থেকে। প্রকাশকাল দুইহাজারউনিশ ফেব্রুয়ারি। প্রিন্ট হয়েছে গ্রাফিক্স জোন অফসেট প্রেস সিলেট থেকে। এর চমৎকার ব্যাকগ্রাউন্ডের কাভারটা আর্ট করেছেন অসীম দাস। বইয়ের দৈর্ঘ্যপ্রস্থগত অবয়বটি বিশেষ, পরিকল্পিত, ও সফল। জ্যাকেট কাভারের বেলেল্লা বাহুল্যমুক্ত। প্রকাশের ছয়-সাত বছর বাদে এই বই, কিংবা আফসারের আগের বইগুলি, ইন্ডিয়ান বই বিক্রির কমিশন অ্যাজেন্ট বাংলাদেশের বইবিপণীগুলায় পাওয়া যাওয়ার কথা নয়। এই নিবন্ধ, অতএব, অর্ধপঠিত গণ্য হবে যে-পর্যন্ত সৈয়দ আফসার সিলেকশন অথবা কমপ্লিট ওয়ার্ক্স অ্যাভ্যাইল্যাবল না হবে। একটা ভালো সংকলন দরকার, যেখানে একটানা আড়াই/তিন দশক ধরে লিখে আসা কবির পথরেখা পাওয়া যাবে। একটি ছিপছিপি নির্বাচিতা হলে ভালো হয়। ঢাউশ নয়। সাপোজ, সৈয়দ আফসার ফর দি বিগিনার্স। দুইফর্মায় আঁটাতে পারলে বেস্ট, ম্যাক্স সোয়াদুই কিংবা তার উর্ধ্ব। অনুরূপ অন্য বহুদশক-অতিক্রান্ত কবিদেরও। কবিরা বাংলাদেশে এত সমগ্রবিলাসী কী হেতু যে, কে-বা কারে কবে জিগায়েছে।

১০
এখনও স্বপ্ন দেখে, এখনও গল্প লেখে, এখনও গান গায় প্রাণভরে যারা, মৌসুমী ভৌমিকের করুণ সেই কীর্তনঝরা অ্যালবামগুলার ন্যায়, তাদের আওয়াজে বেজে উঠুক বাংলাদেশের বেতার অন্তরাত্মা। আর, বাংলাদেশের বইবিপণীডিসপ্লেগুলায় জায়গা পাক আট বছর আগে বেরোনো কোনো দূর দুরান্তের বাংলাদেশের তরুণ কবির বই। কিন্তু, পরিতাপ এ-ই যে, বাংলাদেশের বইদোকানিরা বাংলাদেশের বই তিনমাসও সংরক্ষণ করে না তাকিয়ায়, ভারতীয় বই তিন দশক ধরে গোডাউন ভাড়া করে হেফাজতে রাখে, একদিন খদ্দের জুটবে এই আশায়। এই নিধুয়া পাথারের পলিফলা বাংলায়।
জাহেদ আহমদ
সৈয়দ আফসার রচনারাশি
কবিতায় সৈয়দ আফসার
- আত্মক্ষরণের অঙ্গার ও অনুভূতির শৃঙ্গার - January 22, 2026
- আমরা যাহারা মাকাল পঁয়তিরিশা - January 12, 2026
- কমলকুমার সন্দীপন - January 4, 2026

COMMENTS