মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে বসন্তপঞ্চমী মানে বিদ্যার্থীদের কাছে সরস্বতী পূজা। গ্রামের কারো কারো কাছে শ্রীপঞ্চমী। সংগীত, শিল্প ও সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত বিশ্বাসী ব্যক্তিদের জন্য একটি বিশেষ দিন। দিনটিতে বুদ্ধি এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রার্থনা হয়। দেবীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে সরস্বতী পূজা উৎসব আকারে পালিত হয়।
আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। সন্তান-সন্তুতিদের বিদ্যাশিক্ষার প্রত্যাশায় গ্রামের সচ্ছল কিষান হতে শহরের বিত্তবান ব্যক্তিরা স্বরস্বতী প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করে। গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা বিংশশতাব্দীতেও প্রচলিত ছিল বলে কোনো কোনো লেখাতে উল্লেখ মেলে।
প্রতিমাকল্পে বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতী। এক দিব্য নারীমূর্তিরূপ; শ্বেতবর্ণা, শ্বেতপদ্মে আসীনা, মুক্তার হারে ভূষিতা, পদ্মলোচনা ও বীণাপুস্তকধারিণী। বাহন রূপে থাকে রাজহংস। সরস্বতীপূজার প্রবর্তক ব্রহ্মা ও শ্রীকৃষ্ণ। বেদে সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। পণ্ডিতরা অনেকেই মনে করেন সরস্বতী প্রথমে নদী, পরে দেবী। তাঁকে বাসন্তী রঙের গাঁদাফুল, পলাশ, চিড়া, দই, পুস্তক, বাদ্যযন্ত্র, অভ্র-আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম, যবের শিষ,পদ্মপাতা, কলাপাতা, বেলপাতা, ধান, দুর্বা, তিল, হরতকি ইত্যাদি উপাচার বা সামগ্রীর নিবেদনে পুষ্পাঞ্জলির মাধ্যমে প্রণতি জানানো হয়।

২
ভৌগোলিকগত কারণে রূপ-চাক্ষুষে পুরোপুরি সাদৃশ্য না হলেও বসন্তপঞ্চমীর দিন থেকে ঋতু পরিবর্তন হয় এবং ঋতুরাজ বসন্তের আগমন ঘটে। শীতের জড়তা কেটে যেতে থাকে। গাছের পুরনো পাতা ঝরে নতুন অঙ্কুর গজায়। কোকিলের তান আর মহুয়া ও অন্যান্য ফুলের সুবাসে গোটা পরিবেশ মুখরিত হয়। এই দিন থেকে, শীতের জীর্ণতাকে ঠেলে, সূর্যের রশ্মি শক্তিশালী হতে শুরু করে। কনক ফসল অর্থাৎ গম সোনার মতো পাকে। গৃহ ধন-শস্যে ভরে। ক্ষেতে হলুদ সরিষা ফুলের সৌন্দর্য বসন্তপঞ্চমীর হলুদ রঙের প্রতীকের সঙ্গে মিতালি করে।
সংগীত, শিল্প ও সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত পূজারীরা এই দিনটিতে সরস্বতী দেবীর পূজা করে। পূজার রীতিনীতি, উৎসবের আয়োজন, ভৌগোলিক অবস্থান ও সংস্কৃতি অনুযায়ী ভিন্ন হয়ে থাকে। লক্ষ করলে দেখা যায় সরস্বতী শুধু বাংলায় বাঙালির কাছে নয়, বিশ্বের নানান দেশের নানান জাতিগোষ্ঠীর কাছে দেবী হিসেবে পূজিত হয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, উত্তর ভারত, মহারাষ্ট্র, আসাম এবং ওড়িশায় যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। তাছাড়া জাপান, চিন, মায়ানমার, তিব্বত, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এমনকি ইন্দোনেশিয়ায়ও ভিন্ন ভিন্ন নামে, ভিন্ন ভিন্ন পোশাকে, ভিন্ন ভিন্ন বাহনে দেবী পূজিত হয়।
চিন, জাপান কিংবা তিব্বতে দেবী সরস্বতী হংসহীনা। চিন ও জাপানে সরস্বতীর সঙ্গে দেখা যায় ড্রাগনকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ড্রাগন মূলত নাগ বা সর্প। কম্বোডিয়ায় এবং ইন্দোনেশিয়াতে সরস্বতীর বাহন রাজহংস; যেমনটা দেখতে আমরা অভ্যস্ত। একটা সময় কম্বোডিয়ায় হিন্দু ধর্মের উপাসনা হতো বলে হয়তো সরস্বতীর এমন সরাসরি রূপায়ন হয়েছে সে-দেশে। অঙ্করভাট মন্দির তো বটেই, তারও কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই কম্বোডিয়ায় একইসঙ্গে ব্রহ্মা এবং সরস্বতীর আরাধনার চল রয়েছে। অষ্টম শতকের নথিতে, বিশেষত খেমার সাহিত্যে তার প্রমাণ মেলে। কম্বোডিয়ার মতো ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডের ছবিও অনেকটাই এক। ইন্দোনেশিয়াতেও দেবীর বাহন রাজহংস। থাইল্যান্ডে সরস্বতীর বাহন ময়ূর। পাশপাশি আরও এক বিচিত্র জিনিসের দর্শন মেলে, তা হলো দেবীর গলায় মালার বদলে অ্যামুলেট। কথ্যভাষায় এটাকে ওই লাকি লকেট বললেও চলে।
সময় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকের কথা। বাঙালির কল্পনায় শ্বেত শাড়ি পরিহিতা বা পুরাণের ‘শ্বেতবসনা’ দেবী সরস্বতী জাগলেও জাপানে শাড়ির বদলে মোটা পশমের ওভারকোট গায়ে পরে পূজিত হতেন দেবী সরস্বতী। সে-দেশে তিনি ‘বেনজাইতেন’ নামে পরিচিত। তবে ‘বেনজাইতেন’ দেবী যে সরস্বতী দেবী, বা ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেবী সরস্বতী জাপানে কীভাবে পাড়ি জমালেন সেখানে প্রশ্ন থেকে যায়।
তাই খুঁজতে গিয়ে চোখে পড়ে ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রাচীনতম পূজিতা দেবীদের মধ্যে অন্যতম দেবী সরস্বতী, যার আরাধনা শুরু হয়েছে বৈদিক যুগে। সেখানে তিনি বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী, জ্ঞানের দেবী। তিনি ব্রহ্মার শক্তির উৎসও বটে। প্রাচীন যুগ থেকেই ভারতীয় পুরাণে এবং তন্ত্রশাস্ত্রে অধিকাংশ দেবতার শক্তির উৎস হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে কোনো দেবীকে। সরস্বতীর মতো শিবের শক্তিও এক নারী—দুর্গা। ভারতীয় পুরাণের এই মাতৃযোগ হুবহু নিজেদের তন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করেছেন বৌদ্ধ উপাসকরা। আরও বিশেষভাবে বলতে গেলে বজ্রযান ও মহাযান শাখা। সেখানেই বাগদেবতা মঞ্চুশ্রীর শক্তির আধার দেবী সরস্বতী।

৩
মনেহয় দেবী সরস্বতীর বিদেশে পাড়ি দেওয়ার অন্যতম কারণ এই বৌদ্ধ ধর্ম। হিন্দু ধর্ম ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে স্থিত থাকলেও, বৌদ্ধ ধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। শুধু ধর্ম নয়, পাশাপাশি চিনের সঙ্গে প্রাচীন যুগ থেকে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কও এই সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের অন্যতম কারণ। সেই প্রবাহে দেবী সরস্বতীও পৌঁছে যান চিন, মায়ানমার, তিব্বত, জাপান, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এমনকি ইন্দোনেশিয়ায়। ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে।
তিব্বতে তাঁর পরিচয় ‘ইয়েং চেন মা’। তিব্বত বহুযুগ আগ থেকেই বৌদ্ধধর্মের অন্যতম পীঠস্থান। বজ্রযান তন্ত্রানুসারে সরাসরিভাবেই সেখানের সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন সরস্বতী। সেখানেও তিনি শ্বেতবস্ত্রা, মঞ্জুশ্রীর সঙ্গিনী। এখানে আরও একটা কথা বলে নেওয়া দরকার। মহাযানতন্ত্রে দেবী সরস্বতীর তিনটি ভিন্ন ভিন্ন রূপ রয়েছে— কোথাও তিনি দ্বিভূজা, কোথাও আবার চতুর্ভূজা বা ষড়ভূজা।

৪
এবার আসা যাক ভারতের একটু উত্তর-পূর্বে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র চিনে। সেখানে সরস্বতী পূজিত হন ‘বিয়ানসাইতিয়ান’ রূপে। মহাযানতন্ত্রে আর্য-সরস্বতীর যে চতুর্ভূজা রূপটি বর্ণিত হয়েছে, ইনি তারই চৈনিক সংস্করণ। দুই হাতে তিনি বীণাবাদনরতা, অন্য দু’হাতে রয়েছে পদ্ম এবং পুস্তক। আবার কোথাও দক্ষিণ হস্তে পুস্তকের বদলে দেখা যায় হাতপাখা। বৌদ্ধতন্ত্রানুসারে তিনি ‘প্রজ্ঞাপারমিতা’।
চিন থেকে জাপান পেরিয়ে ‘বিয়ানসাইতিয়ান’ হয়ে ওঠেন ‘বেনজাইতেন’। সরস্বতীর মতো আজও জাপানের বিভিন্ন স্কুল এবং বৌদ্ধ মিশনারিতে দেবীর আরাধনা হয় নিয়ম করে। খুব স্বাভাবিকভাবেই সংস্কৃতি এবং ভৌগলিক অবস্থানের বদলের ছাপ স্পষ্ট হয়েছে তাঁর রূপকল্পনাতে। শাড়ির বদলে তাঁর গায়ে চেপেছে ভারী পশমের পোশাক। হাতে বীণার বদলে জায়গা নিয়েছে ম্যান্ডোলিনজাতীয় চার-তারবিশিষ্ট জাপানি বাদ্যযন্ত্র, বিওয়া।
তবে বেনজাইতেন শুধু সংগীত কিংবা বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী নন, তিনি একাধারে শান্তি এবং জলপ্রবাহের দেবীও বটে। গোটা জাপানজুড়ে বিভিন্ন জলাশয়ের ধারে পূজিতা হন তিনি। বিশ্বাস করা হয় বেনজাইতেন বসবাস করেন জলের গভীরে। সর্প এবং ড্রাগন যোগও রয়েছে তাঁর সঙ্গে। এ-কথা আরও বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, স্কন্দপুরাণে দেবী সরস্বতী পাতালনিবাসী। ব্রহ্মার অনুরোধেই তিনি পাতাললোক থেকে উঠে এসেছিলেন মর্ত্যে। তবে লোকচক্ষু থেকে তাঁকে আড়াল করতে ব্রহ্মা স্বয়ং একটি হ্রদ খনন করেন। সেই হ্রদের নিচেই আশ্রয় নেন দেবী সরস্বতী।

৫
মায়ানমারে পূজিত হন সরস্বতী। সেখানেও বৌদ্ধ ধর্মের সূত্র ধরেই পৌঁছেছেন দেবী। বার্মায় তাঁর নাম ‘থুরাথাডি’। বিদ্যার দেবী হিসাবেই আরাধনা হয় থুরাথাডির। হাতে বীণার বদলে থাকে বইয়ের সম্ভার। মায়ানমারের পুরাণে দেবী কল্পিত হয়েছেন গ্রন্থাগারিক। ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও সরস্বতী মায়ানমারে পাড়ি জমিয়েছেন চিন বা জাপানে বন্দনা শুরু হওয়ার অনেক পরে।

৬
পূজা একটি সামাজিক বন্ধনের উৎসব। কথায় আছে, উৎসব যার যার উপভোগ সভার। ধর্ম-বর্ণের উর্ধ্বে পূজার উদযাপন হতে বিসর্জন। প্রবীণ প্রজন্মের সরস্বতী পূজার দিকে খেয়াল করলে দেখা যায় সৃজনশীলতার চেয়ে গুরুগম্ভীর ভাব, রীতি-নীতিকে গভীরভাবে অনুসরণ, মন্ত্রোচ্চারণ, পুষ্পাঞ্জলি, আরতি সহ গান, নাটক বা কবিতা আবৃত্তি আর মাইক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, বিনোদনে আবিষ্ট। ঐতিহ্যের প্রতি থাকত মনোনিবেশ।
আর নবীনরা এসবের পাশাপাশি ভাবে নতুনত্ব; চিন্তার ছোঁয়ায় লাগায় আধুনিকত্ব। ওরা ভাবে এখন বিশ্বায়নের কাল। ওরা ঢাক-ঢোল-খোল-করতাল বা শুধু সন্ধ্যা আরতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সংযুক্ত করে নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্র; নিত্যনতুন নাচ। ঘটায় বিভিন্ন ভাষার, বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির মিতালি। তারা ভাবে, আমার করিমের গান যখন বিদেশি ভাষায় ক্যামব্রিজে বাজে কিংবা রাধারমণের গান নানান ভাষায় নানান ফিউশনে বাজে তাহলে সরস্বতী মায়ের পূজায় আনন্দে মাইকেল জ্যাকসন, ম্যাডোনা, পলক মোচালের মতো ভিন্নভাষী গানগুলোর সাথে ফিউশন করে একটু কোমর দোলালে এতে অপসংস্কৃতি বা অশ্রদ্ধারই বা কি আছে? কারণ সরস্বতী জ্ঞানদায়িনী। তাঁর জ্ঞান অসীম। উনি বাংলা, আরবি, ইংরেজি, হিন্দি সকল ভাষা সকল সংস্কৃতির যোগসূত্রকারী। শাস্ত্রেও আছে ‘নহি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে’ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/৩৯), অর্থাৎ, ‘জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছু নেই’।
আমাদের নবীনরা হিমালয়ের পাদদেশে থেকেও নায়াগ্রা জলপ্রপাত, ব্যাকিংহাম প্যালেসকে ধারণ করে, চিন্তার প্রখরতায় মূর্তির চারিদিকে থিম ডেকোরেশন করে। ওরা পূজায় আধুনিক উপকরণ যেমন ডিজাইনার প্রতিমা, ডিজে মিউজিক, পূজার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা, লাইভ স্ট্রিমিং, ই-আলপনা, ডিজে পার্টি, ফ্যাশন শো সহ মিশ্র সংস্কৃতির চর্চায় আবিষ্ট হচ্ছে।
কাজেই, বলতে দ্বিধা নেই, সরস্বতী পুজো যত না ধর্মীয়, তার থেকে অনেক বেশি সাংস্কৃতিক। এই পুজো যথার্থ অর্থেই একটি বর্ণিল সাংস্কৃতিক উৎসব।
*সুশান্ত দাস, সাংস্কৃতিক কর্মী, সেইন্ট ক্যালিক্সট, কানাডা
সুশান্ত দাস রচনারাশি
সরস্বতী দেবীর কথকতা
বাগেশ্বরী শিল্পপঙক্তিমালা
- In all departures there is an arrival & other poems || Roushan Hasan - September 11, 2026
- সাম্যের দিকে যেতে যেতে লেখাপত্র || রোদ্দুর রিফাত - September 10, 2026
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026

COMMENTS