২৯ এপ্রিল ১৯৯১, ফিডব্যাক, ম্যাক এবং একটা গান

২৯ এপ্রিল ১৯৯১, ফিডব্যাক, ম্যাক এবং একটা গান

“মাঝি তোর রেডিও নাই বইলা জানতেও পারলি না / আইতাসে ভাইঙ্গা এত বড় ঢেউ / সারা বাংলাদেশ জানল মাঝি তুই তো জানলি না রে” … এই গানটার জন্ম হতো না যদি আজ থেকে ঠিক তিরিশ বছর আগে এই দিনটির করুণ ও করাল গ্রাস বাংলাদেশটাকে ছেয়ে না ফেলত। ১৯৯১ সনের ২৯ এপ্রিল উপকূলীয় অঞ্চলে ধেয়ে এসেছিল ভয়াল ঘূর্ণিঝড়। প্রয়লয়ঙ্করী বিশেষণপদটার অর্থ বুঝতে শিখি ঠিক এই বছরেই ‘ইত্তেফাক’ আর ‘সংবাদ’ প্রভৃতি দৈনিকীর হেডলাইন্স পড়তে যেয়ে। সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে দেশের উপকূলভাগের চট্টগ্রাম, হাতিয়া, সন্দীপ, চরফ্যাশন, মহেশখালী ইত্যাদি দ্বীপাঞ্চলের প্রায় দেড়লক্ষাধিক মানুষের অসহায় মৃত্যু হয় এবং অতর্কিত ঝড়ের তাণ্ডবে এককোটিরও অধিক মানুষ চিরতরে তাদের ভিটামাটি ও সহায়-সম্পদ সর্বস্ব হারান। জলের স্ফীতি ছিল এতই যে এর সাধারণ উচ্চতা হয়েছিল অট্টালিকার মাপে ৩/৪-তলাস্পর্শী। গোটা দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস, যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে গিয়েছিল কয়েকদিনের জন্য। বহির্বিশ্বের সঙ্গেও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। তখন সবেমাত্র নবগঠিত গণতান্ত্রিক সরকার দীর্ঘ দশবছরের এরশাদশাহি স্বৈরশোষণ সরিয়ে এক/দেড়মাস হবে এসেছে, এরই মধ্যে এই ঘূর্ণিতাণ্ডব। সংবাদপত্রের শীর্ষস্থান তখন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধজঙ্গ নয়, কীর্ণ হয়েছিল নিজেদের ভূখণ্ডের মানুষের মৃত্যুলুণ্ঠিত ছিন্নবিচ্ছিন্ন শরীর আর ভাগ্যবলে-বেঁচে-যাওয়া মানুষের আহাজারিবিস্মৃত স্তম্ভিত চেহারায়। বিদেশের পত্রপত্রিকায় এই ঝড়সংবাদ কয়েকদিন ধরে গম্ভীর সমবেদনার সঙ্গে দেখেছে দুনিয়া।

আমরা তখন সেভেনে পড়ি। টিভিতে দেখি ইরাক-কুয়েত নিয়া আমেরিকার বিচারসালিশ, শুরুতে আমরা আমেরিকার মধ্যস্থতা স্বাগত জানায়েছিলাম সোল্লাসে এবং সাদ্দামের ইনভ্যাশন্ বরদাশ্ত করতে পারছিলাম না, যুদ্ধের খবরাখবর পড়ে পত্রিকার পাতার সঙ্গে রাত্তিরের বিটিভিনিউজে দেখানো ফ্যুটেজ্ মিলিয়ে বেশ উত্তেজনাপূর্ণ সময় পার করছিলাম। ম্যাকগাইভার  ছিল। ম্যুভি অফ দ্য উইক  ছিল। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধাভিযান ছিল। যথেষ্ট রগরগে দিন। সেইসঙ্গে ব্যান্ডমিউজিকের মূর্ছনায় বিলীন। এরই মধ্যে একসকালের পত্রিকাপাতায় ‘উপকূলীয় অঞ্চলে স্মরণকালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি’ শীর্ষক খবরে ইশকুলের শিক্ষকদের কামরায় নিস্তব্ধ ঘণ্টা কাটে বেশ কয়েকদিন। পড়াশোনা হয় না সেভাবে কেবল রোল্-কল্ ছাড়া। স্যারেরা সাদ্দাম আর বুশ নিয়া পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কিছুদিন ক্ষান্ত দেন। শোকের একটা ছায়া কাটে ত্রাণসংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলে পাড়ায় পাড়ায়। সেইবারই জীবনে পয়লা ত্রাণসামগ্রী শব্দটার সঙ্গে এবং ত্রাণসংগ্রহ প্রোসেসটার সঙ্গেও পরিচিত হই জীবনে প্রথমবারের মতো। অনেককিছুই ঘটে ব্যক্তিগত ইতিহাসে এই বছরে এবং বলা বাহুল্য সমস্তই কিন্তু প্রথমবারের মতো! অচিরে এই অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির বছরের একটা স্মারক হয়া আসবে ম্যাকের লেখায় এবং ফিডব্যাকের সুরে ও সংগীতায়োজনে একটা গান মাঝি  ’৯১

ক্রিস্টিয়ানা আমানপৌর্ সেইসময় সিএনএন চ্যানেলের হয়ে বাংলাদেশে নিউজ্ কাভার করতে আসেন। ক্রিস্টিয়ানাকে আমরা ভালোবাসতাম, যেমন বাসতাম স্টেফি গ্রাফকে, লম্বাচওড়া ব্যক্তিত্ব ও শরীরস্বাস্থ্য সমেত উপস্থাপনার জন্য। ক্রিস্টিয়ানা তার ভিশ্যুয়ালে দেখান বিস্তারিত ভয়াবহতা বাংলাদেশের উপকূলের। উল্লেখ করেন, সমুদ্রের জেলেজীবিকার লোকজন এবং মাঝিরা আর-দশটা সাধারণ দিনের ন্যায় এই দিনেও বেরিয়েছিলেন তাদের কর্মক্ষেত্রে তথা সাগরে। ফেরেন নাই কেউই। দিনটি ছিল সমুদ্রপ্রশান্ত, রৌদ্রকরোজ্জ্বল, সুন্দর ও স্বাভাবিকতামণ্ডিত। যদিও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার জাতীয় গণমাধ্যমে তথা বাংলাদেশের রেডিও-টেলিভিশনে আগে থেকেই বিপদসংকেত প্রচার করে আসছিল, মাঝি এবং জেলেরা ছিলেন এতই গরিব যে তাদের কারোরই ছিল না রেডিও শোনার সুযোগ, এই তথ্যটিও ক্রিস্টিয়ানা তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে ভোলেন না।

মাকসুদের কালজয়ী গানের রচনাটা আরম্ভ হয় এই তথ্যেরই হৃদয়নিংড়ানো উপস্থাপনার মধ্য দিয়া। “মাঝি তোর রেডিও নাই বইলা জানতেও পারলি না / আইতাসে ভাইঙ্গা এত বড় ঢেউ / সারা বাংলাদেশ জানল মাঝি তুই তো জানলি না রে” … এরপর গোটা গান জুড়ে এবড়োখেবড়ো গতি মিশিয়ে গলার হাই-পিচ লো-পিচ উপর্যুপরি সন্নিবেশ ঘটিয়ে এমন এক সুরসংশ্রয় ক্রিয়েট করতে দেখি ফিডব্যাককে যে ঢেউয়ের উত্তলাবতল দশা সাগরের অঘটনঘটনপটীয়সী নিশানা আমাদের চোখের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে। এবং সমুদ্রজীবী সেই সাহসী মানুষসম্প্রদায়ের সলিল সমাধিটি চিরস্মরণীয় হয়ে গেঁথে যেতে থাকে এই গানেরই ভিতর দিয়ে আমাদের হৃদয়ে। পঁচিশ বছর পরেও সমান সুরশৌর্য ও অভাবিত বক্তব্যদ্যোতনা নিয়া গানটা আমাদেরে বিহ্বল করে, আমাদেরে ভাবায়।

ত্রাণসংগ্রহের কাজে সেইসময় শামিল হয়েছিল সর্বস্তরের সর্বপেশার মানুষগোষ্ঠী। দাঁড়িয়েছিল দুর্গতদের পাশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ব্যান্ডমিউজিশিয়্যান সকলেই কন্সার্ট করেছেন ত্রাণকার্যক্রমে তহবিল যোগানের নিমিত্তে একেবারেই বিনা পারিশ্রমিকে। বামবা  তখনও সক্রিয়, সবেমাত্র জন্ম হয়েছে বামবার, জন্মলগ্নের বামবা  অত্যন্ত কন্সার্টতৎপর, উদ্যোগী ছিল পুরোদমে একানব্বইয়ের ঘূর্ণিদুর্গত অঞ্চলের ত্রাণকার্যক্রমে। বেশকিছু উদ্ভট কর্মকাণ্ডও তখন সংঘটিত হয়েছিল রিলিফওয়ার্কের নাম ভাঙিয়ে। এর মধ্যে একটা ছিল, পত্রিকায় নিউজ্ প্রকাশের পর প্রচুর সমালোচিতও হয়েছিল ঘটনাটা, পয়সাওয়ালারা পাঁচতারায় ডিস্কো নেচে এবং নাচিয়ে ডোনেশন্ উত্তোলনের আয়োজন করেছিল দুর্গতদের সহায়তাকল্পে। ব্যাপারটার সার্কাস্ সনাক্ত না-করার বান্দা মাকসুদ না, যিনি লিখেছেন মাঝি ’৯১  এবং গেয়েছেনও অনুকরণদুঃসাধ্য গলা আর গায়কী দিয়া, বাংলা গানে গনগনে আগ্নেয় অনেক স্যাটায়ারপঙক্তির উদ্গাতা যিনি। ডিস্কো কেন, কোনোকিছু কিংবা কাউকেই ছেড়ে গা বাঁচিয়ে রেয়াতি টিউনে লেখবার বা গান গাইবার বান্দা মাকসুদ না। তারপরও গোটা গানের অন্তিম স্তবকে যেয়ে এটুকু অপারগের আর্তি ভোলেন না জানাতে : “এক সাধারণ শিল্পী হইয়া দুঃখ জানাই ক্যামন কইরা / গানের সুরে চক্ষের জলে শোধ হয় কি দুঃখের দেনা / মাঝি তোর রেডিও নাই বইলা জানতেও পারলি না” … হ্যাঁ, ইয়াদ রাখতে হবে সেইটা একানব্বই সন, বাজারে সুমন চট্টোপাধ্যায় এবং তার জীবনমুখা গান এবং তার আত্মসমালোচনামূলক গীতিধাঁচ শুরু হবে এরও বছরখানেক পরে থেকে। এসবের অনেক আগেই ধাঁচটা বাংলাদেশের গানে এসেছে এবং শিল্পসমন্বিত উপায়ে ব্যবহৃতও হয়েছে ব্যান্ডগুলোর গানে-বাদনে। এই একটা গানেই ফিডব্যাক এইটা করেছে, তা না; এরও আগের অ্যালবামগুলোতে ম্যাকের গলায় সেল্ফক্রিটিক্ পুনঃপুনঃ এসেছে এবং পরে তো বটেই আরও প্রভূতভাবে। সে-বছরেই মাঝি ’৯১  রিলিজ্ পায় এবং রিলিফতৎপরতায় এর থেকে প্রাপ্ত অর্থ উৎসর্গ করা হয়; এরপরে, অব্যবহিত পরেই, কলকাতা থেকে বেরোনো ফিডব্যাকের ‘জোয়ার’ সংকলনে গানটা যায় এবং তখন পর্যন্ত ‘তোমাকে চাই’ কিংবা আর-কোনো জীবনমুখের দেখা বাংলাদেশ অন্তত পায় নাই।

কিংবা মাঝি ’৯১  সৃজনের আগেও ফিডব্যাক  তথা মাকসুদ মাঝি  নিয়া আরেকটা গান করেন যে-গানটা ব্যঞ্জনায় এবং শ্রোতাগ্রাহ্যির বিবেচনায় আজও অমলিন; গানটা মাঝি ’৮৮  শিরোনামেই চিরপরিচিত। অষ্টআশির জলোচ্ছ্বাসবন্যায় ভেসে-যাওয়া মাঝি ও মানুষের স্মৃতি এবং প্রকৃতির আকস্মিক আক্রোশের সঙ্গে লড়াকু জনজীবনের গাথা গানটার হরফে এবং সুরে বিধৃত। “মাঝি তুমি বৈঠা ধরো রে / চলো যাই দূরে সুদূরে / মাঝি তুমি পাল উড়াইয়ো রে / চলো যাই দূরে সুদূরে” … এই হলো সূচনাস্ট্যাঞ্জা সেই গানের। গোটা গানস্থিত মুখ্য দুই স্তবক গুছিয়ে দেখা যাক নিচে :

“কী হে মাঝি! জলে নৌকা ভাসাই দিলি সুদূর দিগন্তে / নাও বুঝি তোর ফিরল না রে ফিরল না তীরে / ও মাঝি রে! পরনে তোর ছেঁড়া কাপড় সাগর কী জানে / ঘরে তোর আহার নাই রে মানুষ কী বোঝে # কী হে মাঝি! ভোরবেলা তোর ঘুম ভাঙিল গাঙচিলের ডাকে / ওই ডাকে তোর মরণ আইব মানুষ কী জানে / ও মাঝি রে! জলে দেহ ভাসাই নিলো কঠিন সমুদ্রে / নাও বুঝি তোর ভাঙল তীরে সঙ্গে আইলো কে …”

যে-ব্যাপারটা প্রোক্ত দুইটা গানেই লক্ষ করবার তা এদের লোকবাচনিক ভাষা। তারপরও এরা আধুনিক টানটান। দশকখানেক পরে এই নির্বাধ ভাষার ব্যবহার আমরা ফলিয়ে তুলতে দেখব বাংলাদেশের লিখিত সাহিত্যে একদল নতুন লিখিয়েকে। এবং অব্যবহিত অনুবর্তন দেখি বিশেষ লোকোচ্চারের সেই বাচিকতা বাংলা নাটকে, টেলিফিকশনে, নেহায়েত অনুল্লেখ্যও নয় এমন কয়েকটি সিনেমায়। এই-যে প্রমিত বাগবিধিটির প্যারাল্যাল একটা বাগবিধি নির্মাণ করবার তাগাদা, ব্যান্ডগানে এইটা আগাগোড়াই ছিল। গুরুচণ্ডালির উপর দিয়াও যদি কোনো চণ্ডালিকীর্তন থাকে, ব্যান্ডমিউজিক সেইটা স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় সেরেছে এবং সফলভাবেই উৎরেছে পরীক্ষায়। ফিডব্যাক, পরবর্তীকালে একলা-একা মাকসুদ, অবলীলায় এইসব বস্তিলিঙ্গুয়া মার্জিত সমাজের সদস্যদের কানে ঢুকিয়েছে এবং এমন কায়দায় যে সেই সমাজের প্রাগ্রসর তরুণ তুর্কিরা তা কানে এবং মনে টেনে নিয়েছে। একেবারেই রিসেন্টলি টিভিফিকশনে যে-একটা বাগভঙ্গির উদ্বোধন ও উত্থান দেখা যাইছে, এর বীজতলা বাংলাদেশের ব্যান্ডগানে। এই ইশ্যু নিয়া, বাংলাদেশের ছোট-মধ্যম-বড় সমস্ত ব্যান্ডের গানের কথাভাগে ব্যবহৃত ভাষার স্পর্ধাস্পন্দ নিয়া, আরেকটু গুছায়ে বসে আলাপ তোলা যাবে একদিন অচিরে।

লেখা / জাহেদ আহমদ


গানপারে লেখকের অন্যান্য রচনা

আগের পোষ্ট

COMMENTS

error: