‘আরে আমি তো ডাকাতের বংশধর!’ || ইলিয়াস কমল

‘আরে আমি তো ডাকাতের বংশধর!’ || ইলিয়াস কমল

উপমহাদেশের ধ্রুপদী সংগীতে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র নাম নিজস্ব স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। তার সংগীতজ্ঞান ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করার ক্ষমতা-যোগ্যতা কোনওটাই নেই আমার। তাই সেদিকে না যাওয়াই নিরাপদ। ঝড় আসবে জেনে যেমন আগাম নিরাপদ আশ্রয় নেই আমরা, তেমনি আলাউদ্দিন খাঁ-কে নিয়ে আলোচনা করার নিরাপদ জায়গা হলো তার ব্যক্তিজীবন ও যাপন। মূলত এই আলোচনার একটি বড় আশ্রয় তিনি নিজেই। একই সাথে তার ভাষ্যই আলোচনার প্রধান আশ্রয়ও।

আলাউদ্দিন খাঁ-র নিজেকে নিয়ে স্মৃতিচারণ বা বক্তৃতাকে অবলম্বন করে অনেক বছর আগে (ধারণা করি ১৯৯৭ সালে) একটা বই প্রকাশ হয়েছিল ‘আমার কথা’ নামে। তারও বেশ কয়েক বছর পর বইটির নতুন সংস্করণ করেন বর্তমানের আনন্দ পাবলিশার্স। তাতে ভূমিকা লিখেছেন তার সবচেয়ে বিখ্যাত ছাত্র পণ্ডিত রবিশঙ্কর, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রবিশঙ্করের নিজের আত্মজীবনীমূলক বই রাগ-অনুরাগে ব্যক্তি আলাউদ্দিন খাঁ নিয়ে মোটামুটি আলোচনা করেছেন, যেহেতু দীর্ঘ সময় তার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন রবি। রবিশঙ্করকে আলাউদ্দিন খাঁ নিজের ছেলেই মনে করতেন। আর রবিও আলাউদ্দিন খাঁ-কে ডাকতেন বাবা ও উনার স্ত্রী মদিনা বেগমকে মা ডাকতেন। এইসব রীতিমতো জনপ্রিয় ও সর্বদা সহজলভ্য তথ্য।

ব্যক্তিজীবনে আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন প্রচণ্ড রাগী মানুষ। কথায় কথায় বলতেন, বলা যায় স্বীকার করতেন, তিনি হলেন ডাকাতের বংশধর। তার নিজের মুখে বিনয় বলেন আর নিজের শেকড়ের কথা স্বীকার করার প্রসঙ্গেই হোক, তিনি বলতেন, আমি তো বেসুরা, আতাই  (ওস্তাদী ভাষায় আতাই বলতে বোঝায় যে শিল্পী সত্যিকার বড় ঘরানার নন, শুনে শুনে শিখেছেন। হাতুড়ে ডাক্তার গোছের কিছু)। জীবনে তো সুর লাগাইতে পারলাম না। আমি তো ম্লেচ্ছ, ডাকাতের বংশ। রাগলে চণ্ডাল হয়ে যাই।  এমন রাগ উনার যে তার জন্য সবাই তটস্থ থাকত। একবার সুরদাস নামের এক অন্ধ শিক্ষার্থীকে তবলার ‘টুকরা’ শেখাচ্ছিলেন। কোনওভাবেই তুলতে পারছিল না বলে রাগে তবলা মেলাবার যে হাতুড়ি তা দিয়েই এমন পেটানি পিটিয়েছে যে ছয়মাস তাকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। অবশ্য পেটানোর পর উনার খুব অপরাধবোধ কাজ করত। তাই নিয়মিত হাসপাতালে যেতেন তিনি। ফলমূল, দুধ নিয়ে হাসপাতালে সুরদাসকে দেখতে যেতেন ওস্তাদ। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র বাবা সবদার হোসেন খাঁ-ও সংগীতজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু তার পূর্বপুরুষ এক-সময় ডাকাত হিসেবেই বিখ্যাত ছিল।

আলাউদ্দিন খাঁ-র বড়দাদা দীননাথ সাধু এক-সময় ডাকাত ছিলেন। নাম পাল্টে বা ধর্মান্তরিত হয়ে হয়েছিলেন সিরাজু ডাকাত। এই সিরাজু ডাকাত এক-সময় সিলেটের এক জমিদারকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন ডাকাতি করতে যাবেন মর্মে। চিঠিতে কত টাকা দিতে হবে তাও লিখে দিয়েছিলেন। এতই দুর্ধর্ষ ছিলেন সিরাজু ডাকাত। সেই বংশের সন্তান ছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ। এক-সময় তিনি এক পীরের কাছে দুইজন জ্বিন উপহার পেয়েছিলেন। গল্পটা মজার। তিনি নিজেই বলেছেন এ-কথা। এমনকি আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন লোকে তা বিশ্বাস করবে কি না এই মর্মে।

রামপুর নামের এক গ্রামে তিনি থাকতেন, যা বর্তমানে ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি জেলা। সেই রামপুরের এক সংগীতসাধক ছিলেন উজীর খাঁ নামের। তার এখানে থাকার সময়ই সারাদিন বিভিন্ন ধরনের কাজ করতেন। যেমন গুরুর (উজীর খাঁ) জুতা পরিষ্কার, হুঁকো, পানদান গুছানো সহ নানা ধরনের কাজ করতেন। এ-সময় ভোর চারটায় উঠে রেওয়াজ করতেন। সকালে নামাজ পড়ে চা টা খেয়ে একদিন রাগ ভৈরবী বাজাচ্ছেন এমন সময় এক কাবুলিওয়ালা এসে তার কাছে জানায়, বেশ কয়েকদিন ধরেই তার বাজনা শুনেন। আলাউদ্দিন খাঁর কাছে চা খাওয়ার বায়না করে। চা বানিয়ে খাওয়ানোর পর আলাউদ্দিনকে একটা সোনার মোহর দিলেন। যদিও আলাউদ্দিন বলছিলেন এসবের প্রয়োজন নেই। তবুও কাবুলিওয়ালা মোহরটা দিলেন তাকে। সাত-আটদিন তিনি চা খেলেন আলাউদ্দিনের কাছে। আটদিনের দিন সাথে একটা রুটি। এমন করে একমাস ছিলেন।  যাবার আগে তমসা নদীতে গলা পানিতে নেমে রইলেন সাতদিন। তারপর একটা মাদুলি তৈরি করে দিলেন আলাউদ্দিনকে। দিয়ে বললেন, এটা তোমার। রেখে দেবে। খুব উপকার হবে। আমি (যে কাবুলিওয়ালা দিলেন) চলে গেলে শনিবার ধনো দিয়ে হাতে বাঁধবে। তা-ই করেছিলেন আলাউদ্দিন। তারপর ঘুম থেকে উঠে দেখলেন দুটো দৈত্যের মতো তার দুপাশে শুয়ে। ভয় পেয়ে গেলেন! ভাবলেন স্বপ্ন দেখছে কি না। তারপর মাদুলিটা খুলে ফেললেন। দেখেন ওই দৈত্যের মতো মানুষ দুটো আর নাই। দ্বিতীয় দিনও একই ঘটনা ঘটার পর ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। তৃতীয় দিন তমসা নদীতে ফেলে দিলেন। তারপর গুরুদেবকে বললেন ঘটনা। শুনে তিনি অবশ্য কিঞ্চিৎ তিরস্কার করলেন। বললেন, আরে আরে করলে কী! তোমাকে দুজন জামিন দিয়ে গেছিল — যা বলতে তা-ই করত ওরা। তুমি মহা-বেয়াকুব তো!

এই যে বাস্তবতা আর অধিবাস্তবতার জীবন আলাউদ্দিন খাঁ যাপন করে গেছেন তা কেবল মহানদের পক্ষেই সম্ভব। সংগীতের এত এত অনুষঙ্গ বাজানোয় তিনি ওস্তাদ ছিলেন যে তাকে মহান না বললে ভুলই হবে। অথচ জীবনভর বলে গেছেন, ‌‘আরে আমি তো ডাকাতের বংশধর!’

ইলিয়াস কমল রচনারাশি

গানপারে সমধর্মী আরও কয়েকটা লেখা

সকল গানের ওপারে
মুসলমান আলাউদ্দিন খাঁর বাঙালিজনিত সমস্যা
পণ্ডিতজি

COMMENTS