ন্যাশন্যাল্ চলচ্চিত্র ফেস্টিভ্যাল্

ন্যাশন্যাল্ চলচ্চিত্র ফেস্টিভ্যাল্

উৎসব শব্দটা ভারি বিউটিফ্যুল্। যদিও অভিধান বা ব্যাকরণ অনুমোদন করবে কি না জানি না, আমরা আমভাবে এই শব্দটিকে ভেঙে এর দুইটা পার্ট পাই — ‘উৎ’ এবং ‘সব’। উৎ/উদ্, অভিধান বলছে যে, উপসর্গ হিশেবে শব্দের আদিতে থেকে বিবিধার্থ ভিন্ন ভিন্ন শব্দ তৈয়ের করে; যেমন ঊর্ধ্বসূচক, প্রাবল্যসূচক, উৎকর্ষসূচক, বিরুদ্ধসূচক, অতিক্রান্তসূচক প্রভৃতি বিভিন্ন অর্থধারী শব্দ উৎ/উদ্ উপসর্গযোগে গঠিত হয়ে থাকে। এইখানে ‘উৎসব’ শব্দটার ক্ষেত্রে অব্যয় পদ ‘উৎ’ বসেছে ঊর্ধ্ব অর্থে। ঊর্ধ্ব মানে হলো উপর, উপরের দিক, উল্লম্ব। ‘সব’ মানে তো জানে গাঁয়ের সর্বজন, ‘সব’ মানে সব/সবাই। সবাই মিলে একসঙ্গে উপরের দিকে ওঠা, আকাশারোহণ, পাখির মতো উড়োজাহাজের মতো অনন্ত-অনাদির মতো প্রবাহিত হওয়া। বাদপড়া বা এক্সক্লুশন্ ব্যাপারটা থাকলে সেইটা ফ্যাস্টিভ্যাল্/উৎসব হয় না। ভালো কথা, কার্নিভ্যাল্ না ফেস্টিভ্যাল্ — কোনটা অধিকতর লাগসই/অ্যাপ্রোপ্রিয়েট উৎসবের ইংরেজি হিশেবে? জানি না। খালি ইংরিজিপনা, বাছা, আর তো সহা যায় না।

আমাদের দেশে এই শব্দটা — উৎসব শব্দ ও শব্দান্তর্নিহিত অর্থ — ব্যবহারগুণে এখন বদলে গেছে বলেই মনে হয়। যেখানে কেউ যায় না, ঠেকায় না-পড়লে অ্যাভোয়েডই করে, সেইটাই উৎসব। অন্তত সাইনবোর্ডে/ব্যানারে সেই-রকমই লেখা থাকে। এক দুর্গাপূজা আর দুই ঈদ, আরেক পয়লা বৈশাখও, উৎসব বলা যায় একেবারে আদি অর্থে। এছাড়া আজকাল নিত্য উৎসবধামাকা থাকে ব্যবসাদারদের, কর্পোরেটের, নানাবিধ প্রোডাক্টের সেল্ বাড়ানোর মোচ্ছব তো লেগেই থাকে সেই-সমস্ত উৎসবাদিতে। এর বাইরে আছে এনজিওগুলোর, পত্রিকাগুলোর, টেলিকম্যুনিকেশন কোম্প্যানিগুলোর, টিভিচ্যানেলগুলোর জন্মোৎসব ও কর্মযজ্ঞ প্রদর্শনমূলক উৎসব। বর্ণিত সমস্ত উৎসব নামধারী ইভেন্ট আসলে স্বঘোষিত উৎসব, শখের ডাকাডাকি, নাম-কা-ওয়াস্তে ফেস্টিভ্যাল্, অর্থের দিকে তাকিয়ে ফের ব্যবহারের দিকে তাকালে বেদনাই মিলবে। একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে ফের বেদনার পানে … অ্যানিওয়ে। বেদনাও মধুর। বটে! হ্যাঁ, রিয়্যালি।

কিছুদিন আগে এক উৎসবের সাক্ষাতে এহেন কথাবার্তা ভাবছিলাম। মহা উৎসব একেবারে। দেশের সব-কয়টি জেলায় একযোগে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল চলচ্চিত্রোৎসব। সে-বছরের ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৫’ গোটা দেশের ৬৪ জেলায় আয়োজনের ব্যবস্থাপনায় ছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমি। ১০ ডিসেম্বর ‘সবার জন্য চলচ্চিত্র, সবার জন্য শিল্পসংস্কৃতি’ স্লোগ্যান্ নিয়ে ১৫ দিনব্যাপী সিলেট অংশের উৎসবের উদ্বোধন করেছিলেন এক অভিনেতা-কাম্-মন্ত্রী এবং প্রধান অতিথি হিশেবে উপস্থিত ছিলেন আরেক মন্ত্রী-কাম্-মহাবামপন্থী।

শিল্পকলা অ্যাকাডেমি মিলনায়তনে উৎসবের প্রদর্শনীগুলো হবে জেনে চলচ্চিত্রপিপাসু দর্শকেরা আগ্রহী হলেও বাস্তবে সন্ধ্যা-পরবর্তী শোগুলো হয়েছে অ্যাকাডেমির চত্বরে খোলা আকাশের তলায়। এমনিতে পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎসব চলাকালীন শুক্রবার, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিন বিকাল ৪টা এবং সন্ধ্যা ৬টায় একটি করে এবং অন্যান্য দিন সন্ধ্যা ৬টায় একটি করে চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে মর্মে দেশব্যাপী বিজ্ঞাপন প্রচারিয়া জানানো হয়েছিল। উৎসব উপলক্ষ্যে বেরোনো প্রচারপত্রে জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমি মিলনায়তনটিকে প্রেক্ষাকক্ষ হিশেবে প্রচার করা হলেও সন্ধ্যা-উত্তর প্রতিটি প্রদর্শনী হয়েছে উন্মুক্ত ও কনকনে হিমের হাওয়ায়। শিশিরে-কুয়াশায় ন্যাতানো মুমূর্ষু উপস্থিত দর্শকদের ত্রাহি মধুসূদনাবস্থায় ব্যবস্থাপনাকারী কারোর কোনো ভ্রুক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি।

বিয়াশাদিতে এবং বড় বড় উৎসবে এহেন অব্যবস্থাপনা খানিক হতেই পারে, হয়, সেক্ষেত্রে এইটা আদতেই বিশাল উৎসব ছিল বলতে হবে। অব্যবস্থাপনার বিবেচনায় শাদিমুবারকের চেয়েও মোচ্ছব ছিল অনুষ্ঠিত পক্ষকালব্যাপী ঘটনাটায়। মিসম্যানেজমেন্টের মোচ্ছব বলতে হয়। কেননা সান্ধ্য অধিবেশনগুলোতে এতে জনসমাগম হয়েছিল ছয়-সাতজনের ন্যায় বিপুলসংখ্যক। পরিসংখ্যানগত তথ্য সশরীর-সরেজমিন ভিন্ন ভিন্ন তিনদিনের উপস্থিতি থেকে স্বচক্ষে দেখিয়া জানাচ্ছি। অন্যান্য তেষট্টির খবর জানি না, একটা জেলার খবরেই সীমাবদ্ধ প্রতিবেদন এইটা। আমি মিসকিনের কোনো শাখা কার্যালয় কিংবা জেলা সংবাদদাতা নাই। অ্যানিওয়ে।

এমনিতেই সেবারকার পৌষ সিলেটে জেঁকে গেঁড়ে বসেছিল শুরু থেকেই। ফিল্মোৎসব চলাকালীন একপক্ষকাল ধরে হাড়কাঁপা শীতে শহরবাসীরা কাতরপ্রায়। এর মধ্যে শিল্পসংস্কৃতির সুধা পান করতে যেয়ে শীতার্ত দর্শকভোক্তাদের দশা প্রায় কাহিল। সন্ধ্যা-উত্তর শোগুলোতে এই শীতসুরক্ষা-ব্যবস্থাপনাহীনতার কারণে দর্শক সমাগম শুরুর দুই-তিনদিনের মধ্যে কমে গিয়ে একেবারে তেরো-চোদ্দজনে এসে ঠেকে। এইটা অ্যাভারেজ্ হিসাব। আলাদা আলাদা দিন ধরে লোকসমাগম আরও কম, ছয়-সাতের বেশি হবে না মনে হয়। সিলেট শিল্পকলা অ্যাকাডেমির একজন সাপোর্ট স্টাফ ছাড়া অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী কাউকেই শীতবিধ্বস্ত প্রদর্শনীপ্রান্তরে বৈকালোত্তর অধিবেশনে কেউ দেখতে পেয়েছে বলে সংবাদ মেলেনি। নিজেদের ভেন্যুতে ডেকে এনে খোদ আমন্ত্রকবর্গের এহেন অনুপস্থিতিজনিত অসৌজন্য বঙ্গদেশজ সংস্কৃতিসংস্থার পক্ষেই সম্ভব মনে হয়। আদর-আপ্যায়ন থাকুক গোল্লায়, এমনকি মিলনায়তন তথা প্রেক্ষাগার তালাবদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পকলার কর্তাব্যক্তিরা প্রস্রাবাগার তালাবদ্ধ করে গেছেন, বিলিভ মি অর নট, রিপ্লি সাহেবের প্রোগ্র্যামের আইটেম হতে পারে বিষয়টা, ন্যাক্কারজনক এহেন ঘটনা কালচারাল্ কেরানিদের ছাড়া সাধারণ কারও পক্ষে অকল্পনীয় ও অসম্ভব।

national film festival
১৫ দিনব্যাপী চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’, ‘বৈষম্য’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘কাচের দেয়াল’, ‘সুতপার ঠিকানা’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘সূর্যদীঘল বাড়ি ’, ‘মেঘের অনেক রং’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘গেরিলা’, ‘মৃত্তিকা মায়া’, ‘কমন জেন্ডার’, ‘রানওয়ে’, ‘বৃহন্নলা’, ‘কিত্তনখোলা’, ‘ঘাসফুল’, ‘আধিয়ার’, ‘লালন’, ‘ঘুড্ডি’, ‘সারেং বৌ’ এবং ‘সুতরাং’ প্রভৃতি বাংলাদেশের নতুন দিনের সুস্থধারার উন্নত চলচ্চিত্রগুলো। সব-কয়টাই কি অনুদানের সিনেমা? তালিকাস্থ সবার খবর বলতে না-পারলেও অধিকাংশ ছবিই অনুদানের, অন্তত কয়েকটা আগে থেকেই দেখা ছিল টেলিভিশন ইত্যাদি সুবাদে ছেলেবেলা থেকেই।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেখেছে কয়জন? নগদ দর্শনী ব্যতিরেকে এইধারা জাতীয়-পর্যায়িক আয়োজনে এহেন বেহাল দশা ভাবিয়ে ঘামিয়ে ফেলবার মতো। কত টাকা ব্যয় হয়েছে এইটা আয়োজনে, এই খবর কোথাও প্রকাশিত না-হলেও গুচ্ছের টাকাপয়সা লেগেছে এ-ব্যাপারে আন্দাজ তো করাই যায়। দেশের অন্য ৬৩ জেলায় শিল্পকলা অ্যাকাডেমি শীতকাবু জনতার সঙ্গে একই আচরণ করে থাকলে এই উৎসব আয়োজনের লক্ষ্য ও অর্জন নিয়া পুনর্ভাবনা এবং পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে নিশ্চয়। শীতকালে এদেশের বেশিরভাগ উৎসব আয়োজিত হয় স্বাভাবিক ও সংগত কারণে। কেবল যাদের জন্য আয়োজন, যারা টার্গেট অডিয়েন্স এই ন্যাশন্যাল্ ফেস্টের, তাদেরে চেনাজানা আগে থেকেই যদি না-থাকে কেরানিদের, তাইলে এহেন অপচয় হতেই থাকবে যুগে যুগে। যেখানে মানুষ উষ্ণ গেহকোণে দুনিয়ার সমস্ত ম্যুভি-জ্ঞানবিজ্ঞান-ধর্মকর্ম করে সারতে পারছে, ১/২টা বাংলা দানখয়রাতি সিনেমা দেখতে কুয়াশাপারাবারে এসে ঝাঁপায়ে নামবে, এতটা প্যাট্রিয়োটিজম্ সভ্যতা অ্যালাও করবে না।

মাগ্না খাইতে দিলে বেঙ্গলের লোকে আলকাতরা-তার্পিনতেল কিছুই সাবড়াইতে বাদ দেয় না, আয়োজকদের অন্তরে এ-ই যদি থাকিয়া থাকে তাইলে বলতে হবে বেচারাদের অন্তরে গলদ। লোকে আলকাতরা খাইতে বেগড়বাই করে না তারে ঠিকমতো বসতে দিলে, তমিজের সঙ্গে প্রেজেন্ট করতে হয় ডিশ তার সামনে, এছাড়া মাগ্না গাইয়ের দাঁত নাই কথাটা বাংলারই তির্যক বাগবিধির অভিজ্ঞানভুক্ত ভুলে গেলে চলবে না। কাজেই সিনেমাগুলো যদি ভিয়্যুয়ার না পায় তাইলে সেইটা আয়োজক তরফের দায়সারা মাথাস্ফীত গলতিরই কারণে।

এই ধরনের আয়োজনের আগে ন্যূনতম রিসার্চটা বাঞ্ছনীয়। সম্ভাব্য/টার্গেট অডিয়েন্স ঘিরে একটা তালাশ। কোন বয়ঃসীমার অডিয়েন্স, কোন বিত্তবলয়ের অডিয়েন্স, তারা কি দেখতে চায়, কখন দেখতে চায়, কীভাবে দেখতে চায় … এইসব প্রশ্নসূচক দিয়ে চেকলিস্ট ধরে সেই রিসার্চ হতে পারে। এহেন খোঁজপাত্তা চালাইলে কেবল নাম-কা-ওয়াস্তে ফেস্টিভ্যালের আয়োজনই সাফল্যমণ্ডিত হবে তা নয়, আখেরে গোটা বাংলা সিনেমাবানানি ইনিশিয়েটিভটা ফায়দা লাভ করবে। এবং খোঁজখবর রাতারাতি সমাধা করে ফেললে হবে না, চালু রইবে, রাউন্ড দ্য ইয়ার রিসার্চ কন্টিনিউ করবে। এবং ইন-সার্ভিস ট্রেইনিঙের কায়দায় রিসার্চ এবং সিনেমাদেখানি চলবে। তবেই মিলবে সেই সিনেমা-অনুরাগী জেনারেশনের দেখা, আজ হোক বা আগামীকাল, অদূর ভবিষ্যতে।

এছাড়া ছায়াছবিগুলো নানাভাবেই বিভিন্ন মাধ্যমে দেখা হয়ে ওঠে নাই এমন দর্শকের হদিস পাওয়া লাস্ট চারদশকের বাংলাদেশে ভার। আধাখেঁচড়াভাবে হলেও ম্যুভিগুলো লোকে দেখে ফেলেছে এইসব উৎসবাদির অনেক আগে। এই কথাটা বাংলাদেশের স্লামড্যুয়েলার থেকে শুরু করে স্কাইস্ক্র্যাপারবাসিন্দার ক্ষেত্রে খাটে। দেখা মাল আবার দেখতে যাবে কোন হাউশে? এখনকার এই বাংলাদেশে সেলফোনে নেটঅ্যাক্সেস্ নাই এমন একটাও ফকিরফক্রা পাওয়া যাবে তেপ্পান্ন গলিঘুঁপচি ঘুরে?

কেবল দুইটা পাঁচসিকি প্রাইসের ডিভিডি কিনে আর একটা ল্যাপ্টপ-প্রোজেক্টর বগলদাবা করে কুয়াশার ময়দানে হাগুমুতু বন্ধ রেখে কুঁজো হয়ে শামিয়ানাহীন কুয়াশার ময়দানে বসে পড়ার হাঁক দিলাম, আর সাতমুখ করে সেইটারে ন্যাশন্যাল্ চলচ্চিত্র উৎসব প্রচারিতে থাকলাম, অত সোজা আল্লার দুনিয়া? অ্যাকাডেমির আণ্ডাপাড়া স্টাফ-করণিকদিগের গোবরভরা চান্দি দিয়া হাগুমুতুবন্ধ উৎসব ছাড়া আর-কিছু প্রত্যাশিতও নয় বলিয়া বেত্তাদের অভিমত। অ্যাকাডেমি হোক বাংলার বা শিল্পকলার, এরা মাসতুতো ভাই, উভয়ের মধ্যে তফাৎ নাই তিনরত্তিও।

স্লোগ্যান নিয়া ঘ্যানঘ্যান করা খামাখা, তা-ও করি কিছুটা। সবার জন্য শিক্ষা টাইপের গলা-উঁচানো উন্নয়নমুখো স্লোগ্যান শুনিয়াই মনে হয় কেউ কেউ ক্ষমতাধর আছে এমন যারা নিশ্চয় সবাই শিক্ষাটিক্ষা পাক তা চায় না। বা চাইলেও ধান্দামান্দার সাক্ষরতা দিয়াই দেশবাসীরে ভুলায়া রাখতে চায়। তারা তাদিগের আত্মজদের জন্য বুলন্দ দারোয়াজার শিক্ষা সামলায়া রাখে। এই সিনেফেস্টিভ্যালের স্লোগ্যান শুনে সেই কথাই মনে হয়। ‘কেউ কেউ কবি’ হবার কথা কয়েছিলেন জীবনানন্দ, তা হয় কি না জানি না, তবে ‘কেউ কেউ’ ক্ষমতাধর হয় এইটা জানে দেশজনতা। ছায়াছবিজগতের বারোটা বাজায়ে জেলায় জেলায় ফেস্টের ফার্স, সিনেমাহ্যলগুলো হাপিশ করে দিয়ে জেলায় জেলায় বিগ্ ক্যাপিট্যালের সিনেপ্লেক্স বানানো, ভুজুংভাজুং ফেস্টিভ্যালের ফষ্টিনষ্টি, টিভিচ্যানেলের প্রিমিয়ারিং প্রহসন, যৌথ প্রযোজনার পুটুমারামারি ইত্যাদি দেখিয়া মনে তো হয় না বাংলাদেশের সবার জন্য চলচ্চিত্র সর্বান্তকরণে কেউ এরা চায় আদৌ। তবে এই সময়ে এসে আপনি-আমি না চাইলেও চলচ্চিত্র সবাই দেখছে, দেদারসে দেখছে, এবং ফ্রিডম অফ চয়েসেই নিরখিয়া যাইছে যার যার দেখার উপকরণ। রইল বাকি সুস্থধারার চলচ্চিত্র। উন্নত চলচ্চিত্র। বিশ্বমান হ্যানত্যান। আগড়মবাগড়ম। এইসব কথাবার্তার ইশটিশন আমি আজও খুঁজিয়া পাই নাই। কিন্তু ‘অসুস্থধারা’ বলিয়া আদৌ যদি কিছু জন্মিয়া থাকে এদেশে, সেইটাও লোকেরে দেখতে তো দেখলাম না এ-জনমে। এই দুঃখ লইয়াই চিতায়-ক্রিমেটোরিয়ামে-কব্বরে যাব যে তেরোশত সিনেমাহ্যলের এই দেশে এখন অধুনা হাতেগোনা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা ছাড়া বাকি সমস্তই কালের ধুলায় স্মৃতিভূত।

ময়দানে শীতজবুথবু উৎসব কে চায়? কেউ না। চাই ফিল্ম-অ্যাপ্রিসিয়েশনের সুবিধাসম্বলিত চলচ্চিত্র উৎসব। চাই রিজন্যাবল্ দর্শনীর বিনিময়ে উন্নত উপায়ে এবং নিয়মিত বিরতিতে নয়া বাংলাদেশজ ম্যুভির প্রোজেকশন। চাই কিশোর-বয়ঃসীমার দর্শক টার্গেট করা। তাদেরে কথা বলতে এবং টয়লেট ব্যবহার করতে দেয়া। চাই বিশেষভাবে সেকন্ডারি ইশকুলপড়ুয়াদের ইনক্লুড করা। বার্ধক্যে যেয়ে দেখার জিনিশ সিনেমা না। বার্ধক্যে যেয়ে মেইকিঙের জিনিশ সিনেমা না। পারলে স্রেফ রসিয়া বাইদানি বিনোদনের জিনিশ সিনেমা, — এই মাইন্ডসেট থেকে অবিলম্বে বাইরাও। শিক্ষামূলক মালসামান বইবার বাহন সিনেমা না, — পারলে ইমিডিয়েটলি স্বীকার করো জনসমক্ষে এইটা। আন্দোলনের নামে চলচ্চিত্রের চোদ্দগোষ্ঠী ঋণজর্জর করিয়া রাখবার মাইক্রোক্রেডিট রাহাজানিদিনের তামাদি ডিক্লেয়ার করো। নইলে এইসবে ফেস্টেফুস্টে এমন কোনো জলপাই-আমড়া হবে না। না-হয় তো পথ মাপো। ২০১৫-উৎসবের নিরানন্দ পুনরাবর্তন চাই না। চাই কিডনিবিকলের ঝুঁকিমুক্ত ম্যুভিস্ক্রিনিঙের ব্যবস্থা। ছায়াছবি দেখতে দাও বা না দাও, শৌচাগার তো দিবা? তা না-হলে নেক্সট প্রহসনোৎসব আয়োজনের আন্দু দরকার নাই। জাতীয় অর্থকড়ির মামলা, ফাইজলামি না। আকিজবিড়ি-খাওয়া ঘামঝরানো মেহনতি পাব্লিকের ট্যাক্সের পয়সায় জাতীয় অপচয় কে রুখবে? এভাবে সংস্কৃতিমন্ত্রজপ কয়দিন?

নিবন্ধপ্রণেতা : জাহেদ আহমদ

… …

COMMENTS

error: