বাংলাদেশি মুসলমানদের মুসলমানিত্ব নিয়া || ইমরুল হাসান

বাংলাদেশি মুসলমানদের মুসলমানিত্ব নিয়া || ইমরুল হাসান

SHARE:

আগেও বলছিলাম মনেহয়, হিন্দুদের পূজাতে পার্টিসিপেইট কইরা বাংলাদেশের মুসলমানদের বুঝাইতে হয় যে, সে/শে আসলে ‘ভালো’ মুসলমান।

(এইটা বাজে কিছু না, বরং সোসাইটিতে মেজরিটির আইডেন্টিটি এইভাবে আপহোল্ডও করা যায় বা করতে হয় বইলা মনে হইতে পারে। কিন্তু ঘটনাটা সবসময় এই জায়গা থিকা ঘটে বইলা মনেহয় না। বেশিরভাগ সময় একটা কালচারালি ইনফিরিয়োরিটিতে সাবস্ক্রাইব করার জায়গা থিকাই ঘটার কথা যে, “মুসলমানরা তো অশিক্ষিত, গোঁয়ার এবং পরমতসহিষ্ণু  না”।

এই জায়গাটারে ‘আরো মুসলমান’ হইয়া মোকাবেলা করার একটা তরিকাও আছে ইদানীং। ঠিক মুসলমান না, বরং মুসলমানি ওয়ার্ড ইউজ করার ভিতর দিয়া ব্যাপারটারে ইগ্নোর করার একটা ব্যাপার যে, দেখেন, মুসলমান হইয়া মুসলমানি ওয়ার্ড ইউজ করা নিয়া আমি কোনো ইনফিরিয়োরিটিতে নাই। কিন্তু এই জিনিশটাও একই গ্রাউন্ডে অপারেট করে বইলা মনেহয়। মানে, কোনো ইশ্যুতে আপনি পক্ষ না বিপক্ষ তার চাইতে আপনে কোন গ্রাউন্ড থিকা ইশ্যুটারে কানেক্ট করতেছেন, সেইটা জরুরি মনেহয়।…)

কিন্তু কলকাতার হিন্দুদের মুসলমানদের ঈদে এইরকমের টেনশন খুব-একটা নিতে হয় বইলা মনেহয় না (যদিও ধীরে ধীরে এই জায়গাটাও ইমার্জ করার কথা।)

তো, এইরকমটা করা লাগে কেন? বাংলাদেশে হিন্দুধর্মের প্রতি সো-কল্ড ‘সহনশীল’ হইয়া কেন প্রমাণ করা লাগে যে, আমি ‘গুড মুসলিম’?

এইখানেই ধইরা নেয়ার সেই ব্যাপারটা আসে বইলা মনেহয় যে, মুসলমানরা তো এমনিতে ভালো না; ‘ভালো’ যে সেইটা প্রমাণ করা লাগে তখন, পার্টিসিপেইট কইরা।

এইখানে দুইটা জিনিশের কন্ট্রিবিউশন থাকার কথা। এক হইল, এই অঞ্চলের মুসলমানদের সো-কল্ড হিস্ট্রিক্যাল আইডেন্টিটি যে, ‘এরা তো মুসলমান না আসলে, লো-কাস্ট হিন্দুই’। পাকিস্তানের মুসলমান এবং ইন্ডিয়ার হিন্দুরা সেইম জায়গা থিকাই দেখেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও পাকিস্তানের ক্লেইম ছিল এইটা যে, বাঙালিরা তো মুসলমান না এনাফ! আর সেইটা ইন্ডিয়ার হিন্দুরাও বিশ্বাসই করত! আর এই জায়গাটাতে মাওলানা রুমিরও একটা উপমা আছে এইরকম যে, “যেমন দ্রাবিড়িয়্যান মুসলমানেরাও বিশেষ রকমে মুসলমান…”, — এইরকম …

।। মুসলমান বাঙালি ও হিন্দু বাঙালি ।।

ভয়ঙ্কর একটা বই পড়তাছি; বইটার নাম : ‘মুসলমান বাঙালির লোকাচার’ (ছাপা হইছে ইন্ডিয়া রাষ্ট্রের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা শহর থিকা, ঢাকাতে বিক্রি হয়), লেখক হিন্দু বাঙালি একরাম আলি। মানে, নাম মুসলমান হইলেও ধর্মে তিনি হিন্দু, যেমন তেঘরিয়ার মানুষেরা ধর্মে মুসলমান হইলেও লোকাচার, মানে মূল আইডেন্টিটি যেমন হিন্দুর। তিনটা বাক্য বলি বইটা থিকা, তাইলে হয়তো বোঝা যাইতে পারে :

  • “শব-ই-বরাতের সন্ধ্যায় কেউ তেঘরিয়া এলে ভাবতে পারেন, তাহলে কি আজ দেওয়ালি?” (পৃষ্ঠা ৩৩)
  • “বরং শব-ই-বরাতের এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে মিল রয়েছে রান্নাপুজোর।“ (পৃষ্ঠা ৩৫)
  • “চন্দনের ফোঁটা ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী নেওয়ার কোনও কারণ নেই। তাহলে কেন?” (পৃষ্ঠা ৩৬)

কারণটা হইল এরা তো আসলে ‘ধর্মান্তরিত মুসলমান’, মানে আগেরকার হিন্দু। ওরা মুসলমান হইলেও হিন্দুভাব ছাড়তে পারে নাই। সুতরাং অল্টারনেটিভ হিন্দু হিসাবে এই মুসলমান বাঙালিরে দেখার বা লোকাচারের ভিত্তিতে মুসলমান বাঙালি যে হিন্দু বাঙালিরই একটা এক্সটেনশন – এই প্রস্তাবই বইটার মূল ভাবনা।

এইটা মোটেই কোনো ভয়ঙ্কর ব্যাপার না। ‘ভয়ঙ্কর’ তখনই লাগছে যখন ফিল করছি যে, যিনি লিখছেন তিনি এইটা সর্ম্পকে মোটেই অ্যাওয়্যার না। মানে, এই বিষয়ে উনার কোনো পলিটিক্যাল অ্যাওয়্যারনেসের কোনো জায়গা দেখি নাই। উনি ধর্ম-এর বিবেচনা করতেছেন মোটামুটি একটা অ-ধার্মিক (সেক্যুলার)-এর জায়গা থিকা; যেইটা আসলে না-হিন্দু, না-মুসলমান, বরং ক্রিশ্চিয়ানিটির জায়গা; যা প্রত্যক্ষভাবে ক্রিশ্চিয়ানিটির একটা হিন্দু রূপ, যদি ধর্মের জায়গা থিকা দেখতে চাই। (মানে, আমি এইভাবে ভাবতে পারলাম আর-কি!)

২.
তো, ভূমিকাতে হিন্দু বাঙালি একরাম আলি বলছেন যে, বর্তমান লোকাচার দেইখা ‘মুসলমান বাঙালির অতীত’ বোঝার চেষ্টা তিনি করছেন; দেখছেন যে, এইটা ‘বড়ই জটিল এবং গভীর’; কিন্তু এইটা জটিল মনে হওয়াটা খুবই ‘জটিল’ উনার ইশারা-ইঙ্গিতের দিকে তাকাইয়া। (মানে, এক ধরনের বোঝাপড়া যে উনার নাই সেইটা তো না, একটু মোলায়েম ধরনের বইলা কি নাই সেইটা!)

বইটা লিখার জন্য উনারে শ্রদ্ধেয় প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য, শঙ্খ ঘোষ, সৌরীন ভট্টাচার্য আর দেবেশ রায় খুব রিকোয়েস্ট করছিলেন। উনারা সবাই হিন্দু বাঙালি। বইটা লেখার উদ্দেশ্য হিসাবে সৌরীন ভট্টাচার্য বলছেন যে, “পড়শিকে আমাদের জানা নেই। জানাই যদি না থাকে, তাহলে আর বোঝাবুঝি হবে কোথা থেকে।” মানে, ইন্ডিয়া রাষ্ট্রের বাঙালি-হিন্দুরা বাঙালি-মুসলমানদেরকে বুঝতে চান। (ইন্ডিয়াতে মুসলমান-বাঙালির সংখ্যা কত? ভোট কি খুব বেশি? বোঝাটা কেন দরকার, পলিটিক্যালি, সোশ্যালি, লিটারালি? এইগুলা অবশ্য বিস্তারিত বলা হয় নাই, যদ্দূর মনে হয়, উনারা দাঙ্গা ঠেকাইতে চান খালি … যেন কোনো ডিফ্রেন্স নাই, এইভাবে)

সুতরাং, পার্সপেক্টিভটা অবশ্যই হিন্দুর। হিন্দু (বাঙালি)-র দিক থিকা মুসলমান (বাঙালি)-রে বোঝার। এই কারণে, মুসলমান-এর ভিতর হিন্দুরে দেখাটাই প্রধান উদ্দেশ্য হওয়ার কথা। এইটা হইলে কোনো সমস্যাই থাকার কথা না। কিন্তু লেখক ধর্মরে দেখতে গিয়া ধর্ম-পরিচয়রেই আড়াল করতে চান। মানে, বাঙালিত্ব এবং হিন্দুত্বর মধ্যে অ্যাজ সাচ কোনো পার্থক্য নাই, কিন্তু যেহেতু হিন্দুত্ব এবং মুসলমানত্বের মধ্যে কিছুটা (হাল্কা, খুববেশি না) পার্থক্য আছে, এই কারণে মুসলমানিত্ব এবং বাঙালিত্বর মধ্যে একটা ফারাক দাঁড়াইয়া গেছে। যারে দেখা লাগতেছে, বলা লাগতেছে, আবিষ্কার করা লাগতেছে উইথ অ্যা সার্টেন ডেমোগ্র্যাফিক্যাল প্রুফ।

ও, আরেকটা ব্যাপার আছে, শালার ওয়েস্ট থিকা লোকজন (লিনা এম. ফ্রুজেট্টি) আইসা মুসলমান-বাঙালিরে ডিফাইন কইরা ফেলতেছে আমাদের চোখের সামনে আর আমরা (হিন্দু-বাঙালিরা) কি বইসা বইসা আঙুল চুষব নাকি! দ্যাটস দ্য ট্রু স্পিরিট!!

৩.
বইটাতে ৩টা নিবন্ধ আছে, ২টা ভূমিকা সহ। শেষেরটা (‘কিছু লোকাচার কিছু ধর্ম’) আসলে পরিচিতিমূলক, বিভিন্ন টীকা-টিপ্পনী, এইটা যে-কোনো ‘অভিধান’-এর শুরু হইতে পারে …

শেষের আগেরটা (‘লক্ষ্মী আর সাদওয়ান’) আরেকটু কম গুরুত্বপূর্ণ, বাঙালি মুসলমানের কৃষিজীবনে। কিন্তু যেইটা গুরুত্বপূর্ণ, ‘সাদওয়ান’ বইলা আরবে জিনিশ আছে, সেইটার একটা মৃদু ইম্পোজের চেষ্টা থাকলেও, লক্ষ্মীই আছেন মুসলমান বাঙালির অন্তরে।

প্রথম নিবন্ধই (‘মুসলমান বাঙালির লোকাচার’) আসলে বইটা। আরো ‘আসল’ তার শেষটা, দুইটা কোটেশন দিলাম, ব্র্যাকেটের ভিতরে আমার ব্যাকুল প্রশ্নমালা :

“শুধুমাত্র ধর্মীয় আইন মেনে উৎসব পালনে বাঙালি মুসলমানের মন স্ফূর্তিলাভ করে না (হিন্দু বাঙালির কি করে তাইলে?)। সে আরও কিছু আশা করে। তখনই প্রয়োজন হয় লোকাচারের (হিন্দু বাঙালির সেইটা প্রয়োজন হয় না তাইলে? মানে ‘ধর্মীয় আইন’ আর ‘লোকাচার’ যে ভিন্ন দুইটা জিনিশ, এইটা কি সব ধর্মের ভিতর নাই, খালি মুসলমান বাঙালিদের আছে!), যে লোকাচার বাঙালির (মানে যা বাঙালির সেইটা মুসলমান বাঙালির না?) বলে খ্যাত।” (পৃষ্ঠা ৪২)

“কিন্তু, যতক্ষণ সে বেঁচে আছে, তার নশ্বর দেহ ও মনকে এই পৃথিবীর যাবতীয় অমঙ্গলজনক বায়ু-বাতাস থেকে রক্ষা করার জন্য সে আশ্রয় নেয় লোকাচারের। আল্লা সর্বশক্তিমান। কিন্তু, পৃথিবীর অশুভ শক্তিকেও সে বেশ খানিকটা মূল্য দেয় (মানে, মুসলমান ধর্ম পুরাটাই পৃথিবীর বাইরের গল্প, অন্য কোন পৃথিবীর গান?)।” (পৃষ্ঠা ৪২)

৪.
এইটা ছাড়াও গ্রাম শহর, শহর গ্রাম — এই টাইপের একটা কাহিনিও আছে …

৫.
লেখক বলছেন, নৃ-বিজ্ঞান না এইটা। সাহিত্যও না (আমি কইলাম)। তাইলে কি প্রপাগান্ডা? ‘অন্য’-এর তরে ‘গলা ধার’ দেয়া?

‘গলা ধার’ দেয়ার কথা মনে হইল কারণ যদি কোনো হিন্দু-বাঙালি (জন্মসূত্রে) এই বই লিখতেন তাইলে এইটা কম বিশ্বাসযোগ্য হইত, কিন্তু ‘অন্য’ হিন্দু-বাঙালি (জ্ঞানসূত্রে) লেখায় এক ধরনের ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ তৈরি হইব বইলা ধারণা করা যায়্। এই রিজেপ্রেন্টেশনের রাজনীতিরে অ-শ্রদ্ধা করার তওফিক আল্লাহতালা সকল বাঙালিদেরকে দিন, শবেবরাতের রাতে এই মোনাজাত করতে চাই আমি।

৬.
ভাবতেছিলাম যে, এই জিনিশটা এইভাবে আমারে কেন ভাবাইল? আমি নিজে ধর্ম হিশাবে ‘মুসলমান’ এবং জাতি হিশাবে ‘বাঙালি’ পরিচয়ের অর্ন্তভু্ক্ত বইলা এবং দেখলাম যে, এই পরিচয়ের জায়গাটারে কি সীমিত করা হইতেছে, এই কারণে? … হইতেই পারে, কিন্তু শুধুমাত্র এই আবেগের কারণে আমার কথাগুলা কি মিথ্যা হয়া যাইতে পারে? মানে, এইরকম তো হইতেই পারে, কারো কারো কাছে।
২০১২

দুসরা যেই জিনিশটা মনেহয়, সোসাইটির স্ট্রাকচারের চাইতে সুপার-স্ট্রাকচারটাই ইম্পর্টেন্ট বেশি। পারফর্মেন্সটাই মেইন, দেখানোটা; এর বাইরে কিছু নাই। এমন না যে, ইকোনোমিক স্ট্রাকচারটারে গোপন করার লাইগা কালচারাল সুপার-স্ট্রাকচারটারে দেখানো হয়, বরং এখন একটা কালচারাল সুপার-স্ট্রাকচারই আছে যেইটা ইকোনোমিক ক্লাস স্ট্রাকচারটারে অপারেশন্যাল রাখতে হেল্প করে। একটা ‘সাহিত্যিক’ ইম্যাজিনেশন এইখানে আছে, সেই থিকা ডিরাইভ করা একটা মিডিয়া প্রজেকশনও, যেইখান থিকা এই রিয়্যালিটি পসিবল হয়া উঠতে পারে। খুবই শ্যালো মনে হইতে পারে ব্যাপারটা, কিন্তু একটু খেয়াল করলেই টের পাওয়ার কথা, ব্যাপারটা ‘কি’ বলতেছি — তা না; সবসময়ই ‘কেমনে’ বলতেছির জায়গাটাতে আইসা ভিজিবল হইতে থাকে। …

সো, এই পয়েন্ট দুইটারে কন্সিডার করার প্রস্তাব আমি রাখলাম।

তাইলে হিন্দুদের পূজাতে কি শামিল হওয়া যাবে না? এইরকম কোনো ফতোয়া দেয়ার মতো কিছু নাই। হিন্দুদের পূজাতে পার্টিসিপেইট করার ভিতর দিয়া সম্পত্তির দখল আরো ভালোভাবে করা যাইতে পারে বরং।  আর কোথাও মন্দির-প্রতিমা ভাঙা হোক বা না-হোক; ভাঙা হইতেছে আর আমরা প্রতিবাদ করতেছি — এইটুক জায়গা তো আমাদের নিজেদেরই দরকার (টু ফিট ইন টু দ্য আইডেন্টিটি দ্যাট উই ডিসাইডেড ফর আওয়ারসেলভস্)!

অক্টোবর ২০১৮

… …

ইমরুল হাসান

COMMENTS

error: