জীবন, মরণ, আজম খান ও একটা গান

জীবন, মরণ, আজম খান ও একটা গান

যুদ্ধের পরে যে-সময়টায় আজম খান নয়া বাংলাদেশের মঞ্চে নয়া বাংলা গান নিয়া অ্যাপিয়ার করছেন, চারিদিকে তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও দশের পুনর্বাসন কর্মকাণ্ড, নতুন আশার সঞ্চার করা লাগছে সবদিকে।  এই আশা ফাঁপা আলাপ-আড্ডার আশা নয়, এই আশা নয় বেহুদা বুলি-বক্তিমার আশা, চারিপাশের জীবনের জঙ্গমে যুক্ত হয়ে লিপ্ত ও তৎপর থেকে এই আশার সঞ্চার করতে দেখব তৎকালিক সর্বপর্যায়ের দায়িত্ববাহক ও কর্মকদেরকে।  সেই সময়ের সাহিত্যে, চিত্রকলায়, গানে এবং শিল্পকলার সমস্ত খাতে এই আশার বিনিয়োগ আমরা লক্ষ করি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আজকে একদম স্লোগ্যানসর্বস্ব মনে হলেও অনেক ক্ষেত্রে এইটা নতুন নির্মিতির সহায়ক হয়েছে। লেখালেখিনির্ভর সাহিত্যে ব্যাপারটা আদৌ অভাবিত নতুন নির্মাণ উদ্বোধিত করেছে কি না, তা জানি না; গানে করেছে। বাংলাদেশের গানে পোস্ট-সেভেন্টিওয়ান নতুনতর নিশান উড়েছে দেখতে পাই। আবহমান বাংলা গানে একটা নতুন নগরের পত্তনি গোচরে এসেছে এই সময়েই; নতুন সামর্থ্য, নববলে বলীয়ান হইয়া যাত্রা শুরু বলে যেইটাকে, নতুন মন ও মানস নিয়া বাংলা গান উদিত হয়েছে এই দুঃখের দেশে। এই উদিত দুঃখের দেশে আবুল হাসান যেমন হৃদয় হরণ করেন শাহরিক তরুণযুবাদের বাংলা কবিতা দিয়ে, তেমনি গান দিয়া দ্বার উন্মোচনের চাবিগোছা হাতে নিয়া আবির্ভূত হন আজম খান।

তখনকার যে-প্রেক্ষাপট তাতে আজম খান একজন গণসংগীতশিল্পী হওয়াই ছিল সহজ ও স্বাভাবিক। খানের বন্ধুরা, আমরা লক্ষ করব, তা-ই হয়েছেন অনেকে এবং জাতীয়ভাবেই মিউজিকে এস্ট্যাব্লিশড হয়েছেন; পরবর্তীকালে এই গণসংগীতশিল্পীদের অধিকাংশই ক্ষমতাকাঠামোর দোসর-কোলাবোরেটর হয়ে ননিমাখানো ঢোলের গতরে চাঁটি দিয়ে দিয়ে দিনগুজরান করেছেন মহানন্দে। আজম খান ধরেছেন সম্পূর্ণ নয়া রাস্তা। প্রায় দুর্গম, অনধিগম্যপ্রায়, পথটি তিনি কেটেছেন নিজের কথা ভেবে যত-না তারচেয়ে বেশি নতুন দিনের অরুণ বরুণ বাংলা গানের কথা মাথায় রেখে। এইটা আমরা আন্দাজ করে নিচ্ছি যদিও, খান যদি নিজের স্বার্থসিদ্ধিই প্রণিধানযোগ্য মনে করতেন তো চটজলদি প্রতিষ্ঠিত ধারাতেই গাইতে মনস্থির করতেন, সম্ভবত এহেন অনুমানের পক্ষে সাফাই-যোগানো প্রমাণ দাখিল করতে বেগ পেতে হবে না আজ আর কারোরই। কিন্তু গণসংগীত গাওয়াই ছিল যেখানে স্বাভাবিক, কিংবা ছায়াছবি কি রেডিয়ো-টেলিভিশনের খাইখোরাক তিতপুরানা আধুনিক বাংলা চর্বিতচর্বণ, আজম খান সেইদিকে যান না। তার ঘরের মধ্যেই ছিল নতুন বাংলাদেশের ফিল্মিগানে প্লেব্যাকের কণ্ঠশিল্পী হবার মওকা, খানের জ্যেষ্ঠ সহোদর স্বনামখ্যাত সুরকার-অ্যারেঞ্জার এবং বাংলা ছায়াছবির ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যাপক কন্ট্রিবিউশন যার, স্বাভাবিকই ছিল আজম খান চলচ্চিত্রে ব্যবহার্য সংগীতের পরিচালক হবেন। সমস্ত সুদৃশ্য সহজ পথশোভা পাশ কাটায়ে তিনি নিয়েছেন কঠিনের অদৃশ্য অভাবিত বনপথে পরিভ্রমণের ঝুঁকি।

নিজের গান নিয়া খানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনোকালেই ছিল না, অ্যাট-লিস্ট আমরা তারে অ্যাম্বিশন প্রকাশিতে দেখি না, খান যেন সবার সঙ্গে ভাগেযোগে একটা গানের মজমায় জীবন কাটাতে চেয়েছেন। অকপটে তিনি স্বীকারও করেছেন নিজের গানগম্যি বা মিউজিকলিটারেসি ছিল শূন্য। গডগিফটেড একটা আশ্চর্য মিউজিকসেন্স ছিল তার, আর ছিল অদম্য সংগীতোদ্দীপনা আর উজ্জীবনশক্তি। ইউটিউবে এমনকিছু কথিকা পাওয়া যায় যেখানে আজম খান তার মিউজিককেন্দ্রী বিকাশদিনগুলোর আত্মবিবৃতি প্রকাশ করে রেখে গেছেন। তো, বলছিলাম যে, সমস্ত ফিৎনাফ্যাসাদ ফেলে আজম খান মিউজিকের মজমায় থাকতে চেয়েছেন সবসময়, যে-কারণে হয়তো গণসংগীত ইত্যাদি খোপের ভিতরে সেঁধিয়ে না যেয়ে একটা আলগ পথের দিকে ধাবিত হন, যেই পথটাকে আমরা পরবর্তীকালে ডেকে উঠছি বাংলা পপসংগীত নামে, এবং যেখান থেকে বাংলা ব্যান্ডসংগীত নামে একটা আশ্চর্য ফোয়ারার উৎসার আমরা লাভ করেছি। সকল লোকের মধ্যে থেকে সকল লোকের জন্যে সকল লোকের গানই তিনি গাইতে চেয়েছেন বলে পপুলার মিউজিক করেছেন, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠিত নামধেয় সংগীত তিনি করেন নাই। কিন্তু যা-ই তিনি করেছেন, নিজের বুঝমতো করেছেন, বাজারের বুঝমতো করেন নাই, সবাই তাকে সমব্যথায় সমভাবে গ্রহণ করবে কি না তা-ও ভাবেন নাই। এই কারণেই তার কাছ থেকে বাংলাদেশের গান পেয়েছে একটা আনকোরা রাস্তা, আনকা হাঁটার পন্থা, বাংলা গানের নতুন বুঝবুদ্ধি। খানের রোপিত ফলগাছটায় ঝাঁপিয়ে এসেছিল ফল গোটা আশি-নব্বই জুড়ে।

যে-আশার সঞ্চারের কথা বলা হচ্ছিল রচনার শুরুতে, সেইখানে ফেরা যাক। আজম খানের রচনায়, কিংবা তার পথানুসৃত পরবর্তীকালিক বাংলা ব্যান্ডসংগীতকারদের রচনায়, বাজারে বিপণনযোগ্যতা মাথায় রেখে আশাবাদের চাষ করতে আমরা অন্তত দেখি নাই। এই জিনিশটাই হয়েছে ইন্ডিয়ান বাংলা ‘জীবনমুখী’ গানে নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে পরের এক দশক দীর্ঘ। খানের এবং তদানুসারী ব্যান্ডমিউজিকের ধারায় আশাবাদ জিনিশটা আলাদা দেখনযোগ্য কিছু নয়, জিনিশটা পার্ট অফ টোট্যাল মিউজিক। শুধুই লিরিকে, শুধুই মিউজিকে, শুধুই টিউনে, শুধুই রেন্ডিশনে এই জিনিশ মিলবে না। আদ্যোপান্ত রচনাটা আবহ গড়ে তুলেছে এমনভাবে যেইটা আশার চিলতে রোদ্দুর দেখিয়েছে এবং তা দেখিয়েছে মূলত তরুণযুবাদেরে। এইটা আপাতত বলে রেখে যাওয়া যাক, পরে কখনো সবিস্তার বৈঠকীলিপ্ত হওয়া যাবে।

এখন ক্রমে এই নিবন্ধ গুটায়ে আনা যাক দ্রুত। আজম খানের গানজীবনে স্পষ্টত দুইটা ফেইজ্ লক্ষ করি আমরা। ফার্স্ট ফেইজে খান নতুন বাংলাদেশের গরিবগুর্বা মানুষগোষ্ঠীটিকে, এবং বিশেষভাবেই এতকাল যারা বাংলা গানে গরহাজির ছিল সেই আর্বান স্লাম বা নগরবস্তির জনগোষ্ঠীটিকে, হাজির করেছেন গানে। এরপর একটা লম্বা বিরতি নিতে দেখি আমরা খানকে। ফেরেন যখন, নব্বইয়ের গণম্যুভমেন্টসংলগ্ন সময়ে, অত্যন্ত ব্যক্তিক কিছু সংগীতানুভূতি, প্রেমের কিছু পঙক্তিমালার খানস্টাইলিশ প্রেজেন্টেশন, সেল্ফ-রিয়্যালাইজেশনের ম্যানিফেস্টেশন, নিজের কায়দায় একটা আত্মজৈবনিকতা আর সর্বোপরি মৃত্যুচিন্তা আসতে লেগেছে দেখতে পাই আজম খানের গানে। এই শেষের অনুষঙ্গ, বলছি মৃত্যুচিন্তা যে-ব্যাপারটারে, মর্বিডিটি বলতে যে-জিনিশটা আমরা বুঝি বা বোঝাই তা নয়। মৃত্যুমুমূর্ষু অন্ধকারচ্ছন্ন নয় আজম খানের মৃত্যুচিন্তাশ্রিত রচনাগুলো। বরঞ্চ রৌদ্রকরোজ্জ্বল, সচলায়ত জয়শ্রী জীবনের সকালবেলার মতো উদ্বোধনমাধুর্যে ঋদ্ধ, অকুতোভয় এক সহজিয়া হাসির রেখা থাকে লেপ্টে লেগে এই মৃত্যুচিন্তায়। নিচের একটা গান যদি একটাবার শুনে দেখি, নিশ্চয় স্বীকার করব আজম খানের মৃত্যুচিন্তা অ্যানিথিং বাট মর্বিডিটি, কী ইউনিক এই জিনিশ আধুনিক বাংলা গানের বর্তনে!

(ইতিহাস যুগে যুগে সাক্ষী দিয়েছে
শত ধ্বংস প্রেমের স্মৃতিসৌধ রয়েছে
ফেলে-আসা দিনগুলো ডাকে পিছনে
মন বলে যাব সেথা যাব সেখানে
সেখানে যাওয়া কী যায়
জীবনে মরণ কেন আসে)

গানে ভরা এ-মনটা চিরদিনের নয়
ভুবনে সব স্মৃতিগুলো রেখে যেতে হয়
আলোঘেরা জীবনে আঁধার কেন বয়।।

জগতের রীতিনীতি সবাই চলে যায়
কে কখন ছেড়ে যাবে বলা বড় দায়।
ঘণ্টা যখন বেজে যাবে দেখবি সময় নাই।।

সুখ দুখ সবই আছে সুরসাধনায়
বারে বারে প্রাণে তাই ভালোবাসা চাই।
ভালোবাসার মাঝে একটা দাগ রেখে যাই।।

লিরিসিস্ট কে এই গানের, তা জানি না; আজম খান হতে পারেন, না-ও হতে পারেন, স্যংরাইটার আজম খানও তো হেলাফেলার নন; অনেক গানেই সিঙ্গার-স্যংরাইটার আজম খানকে পেয়েছি আমরা। অ্যানিওয়ে। এই গানের শুরুতে ব্র্যাকেটভুক্ত অংশটুকুর রেন্ডিশন শুনে দেখুন আজম খানের গলায়, জীবন সফল হয়ে যায়। এইভাবে কেউ পারেন নাই আর, আগে কিংবা পরে, আজম খানের রেন্ডিশন অনুসরণ করতে কেউই পারেন নাই। আপনার ভালো লাগতে পারে, অথবা না, আজম খানের গায়নশৈলী কেউ ফলো করতে পারে নাই। পপুলার মিউজিশিয়্যান সকলেরই কাজ নকল করতে দেখা যায় হিটের অব্যবহিত পরেই, কিন্তু আজম খান আনপ্যারাল্যাল। আজম খানের গান শুনতে চাইলে আজম খানের গলাতেই শুনতে হয়। আজম খানের গাওয়া গান আরও মিষ্টি মিশিয়ে গাওয়া যায়, আরও হার্শ গাওয়া যায়, কিন্তু আজম খানের ম্যাজিক তাতে আনা যায় না। গানবাংলা চ্যানেলের ‘উয়িন্ড অফ চেইঞ্জ’ তৃতীয় তরঙ্গে প্রকাশিত মিজানের রেন্ডিশনে ‘পাপড়ি’ গানটা শুনে দেখুন, কত সুন্দর করে গাওয়া যায় খানের গান, মিজান খুব দরদ দিয়ে গেয়েছেন, অ্যারেঞ্জমেন্টও অত্যন্ত সমৃদ্ধ, তবু তা আজম খান ফিকে করে দেয় না।

ভালোবাসার মাঝে একটা দাগ রেখে যেতে চেয়েছেন আজম খান। এবং পেরেছেন, অকুণ্ঠ বলব, দ্ব্যর্থহীনভাবে পেরেছেন।

লেখা : সুবিনয় ইসলাম

… …

 

সুবিনয় ইসলাম
Latest posts by সুবিনয় ইসলাম (see all)

COMMENTS

error: