বজ্রগর্জনের গীতিনৃত্যঘূর্ণিচিত্র

বজ্রগর্জনের গীতিনৃত্যঘূর্ণিচিত্র

শেয়ার করুন:

“নিজেকে খুঁজে পাওয়া, বা আর কাউকে, অন্যকিছু খুঁজে পাওয়ার নাম জীবন নয়। নিজেকে সৃষ্টি করার নামই জীবন।” বব ডিলান

বব ডিলান আর মার্টিন স্কর্সেসি মিলিত হয়েছেন একটা কাজের সুবাদে, সেই কাজ কেমন হবে তা তো কল্পনা করতে হয় না, দুনিয়ার সিনেপ্রেমী মিউজিকলাভারদের কাছে সেই কাজ চিরআদরণীয়। দুই টাইমের দুই গ্রেইট। দুই শিল্পমাধ্যমেরও। চলচ্চিত্র ও সংগীত। শোবিজনেসেরও বিবর্তন সেই কাজে যে থাকবে, এবং আছে, সেইটা আর বলতে হয় না।

কাজটা আর কিছু নয়, একটা সিনেমা। নাম তার ‘রোলিং থান্ডার রেভ্যু’। অ্যা বব ডিলান স্টোরি বাই মার্টিন স্কর্সেসি। রিলিজড দুইহাজারউনিশ।

মনে আছে, এর আগে দুইহাজারসাতে রিলিজড ‘আই অ্যাম নট দেয়ার’ দেখার অভিজ্ঞতা। বায়োগ্রাফিক্যাল এক্সপেরিমেন্টাল ম্যুভি। ডিলানের মিউজিক্যাল জার্নিঋদ্ধ বোধিবর্ণাঢ্য জীবনের একটি ইম্প্রেশনিস্টিক পোর্ট্রে। এই সিনেমায় ডিলানের লাইফের জটিল জায়গাগুলো খুঁড়তে সচেষ্ট পরিচালক টড হ্যানিস। বব ডিলানের দুর্ধর্ষ দোলাচলে-ভোগা খ্যাপাটে ক্যারেক্টারে মাইন্ডব্লোয়িং অভিনয় করেছেন কেইট ব্ল্যানশেট।

স্ব স্ব ক্ষেত্রে, শিল্পকলায়, অবিসংবাদিত এই দুই মাস্টার ডিলান ও স্কর্সেসি আলোচ্য সিনেমায় একে অপরের ক্ষেত্রটিকে এই সিনেমায় ইনকর্পোরেইট করেছেন বারবার। লক্ষ করে এসেছি, ডিলান তার গানে প্রায়ই সিনেম্যাটিক ধাঁচে গল্প বলেন। অন্যদিকে মিউজিক ছাড়া মার্টিন স্কর্সেসির সিনেমা ভাবাই যায় না। আর তা যে কেবল আবহ সংগীতের গরজে ব্যবহার করেন স্কর্সেসি, তা না, বরং সম্পাদনার রিদমে এবং সিনেমার সামগ্রিক অ্যাটমোস্ফিয়ারে। এর আগে ‘মিন স্ট্রিটস’, ‘গুডফেলাস’ প্রভৃতি সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ও গানের ব্যবহার ইয়াদ করব। আবার রকব্যান্ড ‘দ্য ব্যান্ড’-এর ‘দ্য লাস্ট ওয়াল্টজ’, জর্জ হ্যারিসনকে ঘিরে ‘লিভিং ইন অ্যা ম্যাটেরিয়াল ওয়ার্ল্ড’-এর মতো অনবদ্য ডকুমেন্টারিগুলো দেখলেই বোঝা যায় সিনেমা আর মিউজিকের যুগলবন্দি হাজিরায় মার্টিন স্কর্সেসি ঠিক কতটা গ্রাহ্য।

ম্যুভিমেইকারের মিউজিকসেন্স তো থাকতেই হয়, আরও দশপাঁচটা সেন্সের মতো প্রখর। স্কর্সেসি রিমার্ক্যাবল। মিউজিকসেন্সের বিবেচনায়। লাইক সত্যজিৎ রায়। তার সিনেমার পর সিনেমায় এই নিদর্শন পাওয়া যায়। এবং তার সংগীতনির্ভর, মিউজিক ও মিউজিশিয়্যান কেন্দ্র করে বানানো, ডকুমেন্টারিগুলো যে তার ফিকশন্যাল কাজের মতোই শক্তিশালী হতে পারে, তার আরেকটি উদাহারণ বব ডিলানকে নিয়ে প্যান্ডেমিকের ঠিক আগে আগে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রোলিং থান্ডার রেভ্যু’। বব ডিলান নিয়ে এই পয়লাই তিনি কাজ করলেন এমন নয়। এর আগেও ‘নো ডায়রেকশন হোম’ ডকুমেন্টারিটিতে এই দুই যুগন্ধরের প্রতিভার প্রকাশ আমরা দেখে এসে থাকব। গোড়ার দিককার সময়ে গ্রিনিচ ভিলেজে এক লোকসংগীতগায়ক ডিলানের ইতিউতি বিশৃঙ্খল ঘুরে বেড়ানো এবং অবশেষে খ্যাতির চূড়ায় পদার্পণ করার আনুপূর্বিক চিত্র বর্ণিত হয়েছিল ওই ডকুটায়।

আলোচ্য ‘রোলিং থান্ডার রেভ্যু’ ম্যুভি দিয়া মার্টিন স্কর্সেসি স্ক্রিনের দর্শককে নিয়ে গেছেন সেই নাইন্টিনসেভেন্টিফাইভে। সেই সময়টি ছিল ঝড়ো। যুক্তরাষ্ট্রের সে বড় সুখের সময় ছিল না। আবার, অন্য বিবেচনায়, সে বড় সুখের বড় সৃষ্টির সময় এসেছিল তখনটায়। খালি যে অ্যামেরিকায়, তা নয়, আস্ত দুনিয়ায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ক্ষতজাত মনুষ্যত্ব ও মর্মের উদয়, অ্যান্টিওয়ার ম্যুভমেন্ট, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পরে  গোটা অ্যামেরিকায় বেহাল সেই দশায় একটা লার্জার দ্যান লাইফ ফেনোমেনার দরকার ছিল। বব ডিলান, মিস্টার ট্যাম্বুরিন ম্যান, সেই দ্রষ্টা মানুষটি।

ডিলান ততদিনে নিজের লোকগায়কির ভোলাভালা ধারা পাল্টায়া ইলেক্ট্রনিক মিউজিক দিয়া জায়ান্ট স্টেডিয়ামগুলায় সাফল্য পাওয়ায় ছোট ছোট সম্মিলনস্থলগুলায় তার কণ্ঠ আরো বেশি হার্জে ছড়িয়ে দেয়ার জোরালো তাগিদ অনুভব করেন। অডিয়েন্সের সঙ্গে একাত্ম হবার আকাঙ্ক্ষায় ময়ূরপালকখচিত হ্যাট মাথায় চাপিয়ে মুখে মাস্ক পরে কিংবা কখনো কখনো চকখড়িরঙ মুখে মেখে স্টেজে জমায়েতে একের পর এক গান গেয়ে চলেছেন। এমন টাইমেই সহগায়ক জোয়ান বায়েজ, ভায়োলিনিস্ট স্কার্লেট রিভেরা, গিটারিস্ট মিক রন্সনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ডিলান তার ‘রোলিং থান্ডার রেভ্যু’ ট্যুরে।

এরপর তো সমস্তই ইতিহাস। ১৯৭৫-১৯৭৬। এই টাইমফ্রেইমের মধ্যেই ডিলান তার প্রোক্ত লাইনাপের ব্যান্ডটি নিয়ে মোট সাতান্নটি কন্সার্ট করেছেন গোটা অ্যামেরিকার ছোট ছোট ভেন্যুগুলায়। একটা জায়গায়, এই সিনেমায়, ডিলানকে যখন প্রশ্ন করা হয়, পার্ফর্ম করবার সময় একটা প্ল্যাস্টিকের মাস্কের আড়ালে আপনি কী জানি লুকাইতেসেন মনে হয়? ডিলান সোজাসাপ্টা তার স্বভাবসুলভ রিপ্লাই দেন, সত্য কইতে গেলে তোমার মুখোশটা আগে লাগবে, যখন তুমি একটা মুখোশ পরা থাকবা, তখনই তুমি সত্যটা বা তার কাছাকাছি কিছু বলতে পারবা।

‘দ্য বব ডিলান স্টোরি’ বলেন নাই ডিরেক্টার, লক্ষ করব, বলতেসেন দ্ব্যর্থকণ্ঠ ‘অ্যা বব ডিলান স্টোরি’। রিমার্ক না করে উপায় নাই। ফিল্মটিকে ডকু বলব, না ফিচার? ননফিকশনের ধাঁচটাই যেন বদলায়া দিতেসেন স্কর্সেসি, এইখানে, ফিকশন্যাল ন্যারেটিভ জুড়ে জুড়ে। ডকুমেন্টারির প্রচলিত সংজ্ঞায় এইটা খাপ খায় না। মার্টিন স্কর্সেসি ফিকশন আর ননফিকশনের মাঝখানকার গ্রে অ্যারিয়াটায় এই সিনেমা স্থাপন করেছেন বলব।

মূলত ম্যুভিটা দেখতে দেখতে এর সম্পাদনার তারিফ না করে পারবেন না আপনি। ডিরেক্টার এখানে এডিটার। ১৯৭৫ সালের সেই ট্যুরে কন্সার্ট চলাকালে শ্যুট করা আর্কাইভফুটেজগুলা প্রায় পুনরুদ্ধার করেছেন স্কর্সেসি। এই ফুটেজগুলি দিয়ে সেই সময়েই একটা কন্সার্টম্যুভি হয়েছিল ‘রেনাল্ডো অ্যান্ড ক্লেরা’ নামে। সেই সিনেমার ফুটেজগুলা ব্যবহার করেছেন স্কর্সেসি নবতাৎপর্যে নতুন ভাষায়। একইসঙ্গে জ্যাক এলিয়ট, রজার ম্যাকগুইন, জনি মিশেল প্রমুখ মিউজিশিয়্যানদের নতুন ইন্টার্ভিয়্যু যোগ করে ফ্যাক্ট এবং ফিকশনের মাঝখানে একটা আশ্চর্য উচ্ছ্বলতার ভাব নিয়া আসতে পেরেছেন স্কর্সেসি। ডিলান ওই সময়টায় তার নতুন একটা অ্যালবাম ‘ডিজায়ার’ নিয়া কাজ করতেসিলেন। বছর চৌত্রিশের যুবক ডিলান। অন্যদিকে সেই সময়টায় ফিল্মমেইকার স্কর্সেসি বিজি ছিলেন তার পাঁচ নাম্বার সিনেমা ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ নিয়া।

গায়ক ও ফিল্মমেইকার দুইজনেই তখন তাদের যার যার জায়গায় খাড়ায়া চারপাশটা দেখতেসেন, অ্যাক্ট করতেসেন, এই ব্যাপারটি সিনেমায় ফিল করা যায়। সেই সময়কার তাদের প্রতিবাদ ও বিষাদ দুইটাই লেগে রয়েছে তাদের কাজে। এদিকে, ব্যাকস্টেজে জোয়ান বায়েজের সাথে ডিলানের ক্ষণিকের দৃষ্টিবিনিময়, মৃদু হাসির সংক্ষিপ্ত মুহূর্তগুলো প্রতিবাদের গনগনা তাপে খানিকটা ভালোবাসার আবেশ রেখে যায়। এই সংক্ষিপ্ত মুহূর্তগুলো, গ্রহণ করা হয়েছে সেই ‘রেনাল্ডো অ্যান্ড ক্লেরা’ সিনেমা থেকে, রোমান্টিক সিনেমার ভাইব দিয়া যায় আদ্যোপান্ত।

গোটা আখ্যানভাগে ন্যারেটর কে? কে নয়! টাইম। টাইমের লগে অ্যাক্ট-করা মানুষগুলা। মাঝে মাঝে প্রবীণ ডিলান বর্ণনাকারীর ভূমিকায় থাকলেও মূল ন্যারেটিভ গড়ে দিয়েছে কন্সার্টে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন শ্রোতা আর দর্শনার্থীদের সাক্ষাৎকার। স্কর্সেসির এই টেক্নিকটা দারুণ! ছোট ছোট এই সাক্ষাৎকারগুলা ফ্রেইজের মতো করে সাজায়া মার্টিন স্কর্সেসি এই ন্যারেটিভের চমৎকারিত্ব ফুটাইসেন। এই কৃৎকৌশল কন্সার্টের উন্মত্ততা আরো রঙিন করে তোলে। সেইসাথে ফিকশনের ব্যাপারটা আরো ধাতস্থ হয়ে ওঠে এর মাধ্যমে। ফিকশন্যাল ন্যারেটিভের আরো নিদর্শন পাওয়া যায় বিভিন্ন জনের টুকরা টুকরা সাক্ষাৎকারে। এই ট্যুরের সাথে অনেকের সংযোগসূত্র খুব একটা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি সিনেমায়, তাতে সিনেমার হানি ঘটে নাই। বিশ্বজোড়া কত লোকেই তো বব ডিলানরে লাইফে মিট করে নাই, কিন্তু জিগ্যেশ করলে আপনজনের চেয়েও গভীর অন্তরঙ্গতায় ডিলানরে নিয়া আলাপ জুড়তে পারে। এইটাই মনে হয়েছে অনেক পরিচিত লোকের ফাঁকফোকরে অনেক অপরিচিত লোক দেখতে দেখতে। অ্যাগেইন, অনেক এমন পরিচিত লোকের লগেও দেখা হয়, যাদের সঙ্গে ট্যাম্বুরিন ম্যানের যোগসূত্র আগে জানা ছিল না। শ্যারন স্টোনের আছে এমন উপস্থিতি। ডিলানের সঙ্গে শ্যারনের দেখা হওয়ার বিবরণ এবং শ্যারনের জন্যে ডিলান একটি গানও রচনা করেছেন এমন দাবি সিনেমায় জানতে পারি, যা আগে জানা ছিল না একদমই।

সিনেমায় ফিকশন্যাল ন্যারেটিভের ব্যাপারটা আরো মাথাচাড়া দেয় যখন প্রবীণ ডিলানের কিছু কথায়ও দ্বান্দ্বিকতা ভেসে ওঠে। একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় এগুলি ট্রিক্স, হয়তো, সিনেম্যাটিক। কিছু ব্যক্তি নিজেদেরে যেভাবে ইন্ট্রোডিউস করেছেন ম্যুভির শুরুতে, সেখানটায় অ্যাম্বিগ্যুয়িটি রাখা হয়েছে। ন্যারেটিভে স্কর্সেসির এই স্কিলড ক্র্যাফট প্রশংসনীয় বলতেই হবে। সেইসঙ্গে একইসময়ে ফিকশন আর ননফিকশনের এত নিখুঁত ভারসাম্য অবাক করে দেয় আমাদেরে। এইটাকে ডকুমেন্টারি বলি বা ফিকশন যা-ই হোক এর শেষে যেয়ে দর্শক ভাবতে বাধ্য হয়, আসলে কোন অংশটি সত্য, আর কোন অংশ তত সত্য নয়! বানানো কতটুকু আর কতটা তা নয়। ট্যাগলাইনটা আরেকবার মনে করে দেখুন তো! দ্য নয়, অ্যা বব ডিলান স্টোরি। বাই মার্টিন স্কর্সেসি।

নিখুঁত সম্পাদনার পাশাপাশি ফিল্মজিনিয়াস স্কর্সেসির ভিশুয়্যাল মাস্টারির দিকটিও সবিশেষ লক্ষণীয় এই সিনেমায়। বিশ্ববিখ্যাত অনেক সিনেমার ফুটেজ ব্যবহার করে সেই সময়টাকে সেই বিশেষ বিশেষ মুহূর্তের বোধগুলাকে এত চমৎকার ভিশুয়্যালাইজ করা হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে সেই সময়ের স্রষ্টাদের প্রতি ট্রিবিউটও পে করা গেছে। এক ফিল্মমেইকার আরেক ফিল্মমেইকারকে কেমন করে মনে রাখে তাও বুঝতে পারি ট্রিবিউট ফুটেজগুলায়। আলাদাভাবে উল্লেখ করব কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের সাক্ষাৎকারের বলিষ্ঠ ফুটেজগুলো। ট্যুর চলাকালীন এবং ট্যুর শেষে উভয় অংশেই গিন্সবার্গের সাক্ষাৎকারগুলায় তার অতুলনীয় বাগ্মিতা এবং বুদ্ধিদীপ্ততা আলাদা মাত্রা যোগ করেছে এই ফিল্মে। শেষের অংশে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকায়া দেয়া গিন্সবার্গের সেই বিদায়ভাষণটি স্পিচলেস এবং মুখর তৎপর করে তোলে একইসঙ্গে।

এই সিনেমার প্রাণ তার গান। বব ডিলানের গান। গানের জন্ম। গানের বিকাশ। সমাজের। রাষ্ট্রের। ব্যক্তির।

ও, আরেকটা কথা। অ্যাজ অফ দুইহাজারপঁচিশ মার্টিন স্কর্সেসি মোট ছাব্বিশটা ফ্যুললেন্থ ফিচার ফিল্ম ও ষোলোটা ফ্যুললেন্থ ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানাইসেন। আর, বব ডিলান? নারদ, নারদ!

সুবিনয় ইসলাম


গানপারে বব ডিলান

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you