নজরুলের গান অথবা তোমারে ঘিরিয়া গাহিবে আমার কবিতার বুলবুল || সোহরাব ইফরান

নজরুলের গান অথবা তোমারে ঘিরিয়া গাহিবে আমার কবিতার বুলবুল || সোহরাব ইফরান

শেয়ার করুন:

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ছাত্রদের প্রথম অ্যাস্ট্রোনট পয়েট, যিনি শব্দযোগের মাধ্যমে মহাবিশ্ব ভ্রমণের মতো কঠিন বিষয় নিয়ে পাঠদান করেছেন। যেই কবিতাটি বাংলাদেশের কর্ণে শিবনৃত্য মঞ্চস্থ করে দেখিয়েছে, সেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আমরা তাকে অ্যাস্ট্রোনোমিকাল অভিব্যক্তি প্রকাশ করার একটি সফল অভিযানকারী হিসেবে চিহ্নিত করি। কিন্তু তার বিদ্রোহী রচনা ব্যতিরেকে তিনি গানের কথায়ও এমন বহু শৈলী রেখে গিয়েছেন যার কিনা আইনস্টাইন নাসিকা আছে এমন লোকের রুচিবোধকে সমন্বিত করতে পারে। নজরুল বেড়ে উঠেছেন কীভাবে, আমরা কি তার কর্মের সে-দিকটি কখনো লক্ষ করেছি? তিনি রুটির দোকানে কাজ করেছেন, আর রুটি ঘিরে সময় কাটানো শুধু খাদ্যভুকের কাজ নয়, রুটির দোকানে কাজ করার সময় তার সুফি অন্তর তৈরি হচ্ছিলো। জুটমিলে শ্রমিকরা কাজীর জন্মদিন পালন করে। নজরুলের উপস্থিতি এমন অনেক হৃদয়ে আছে যেখানে বিলিয়ন খরচ করেও সাহিত্যের জন্য তবুও পৌঁছাতে পারেনি। মানুষের হৃদয়ে ঈশ্বর থাকে, দেবতার নিঝুম দেশ থাকে, দেবীর ফুলের সাঁঝি থাকে। ডিভাইন প্রফেসিয়াল উপাদান ছাড়া সেখানে অন্য কিছু বসবাস করতে পারে না।

গানের কথা নিয়ে লেখা যখন মনস্থির করেছি, তখন তার অর্থাৎ নজরুলের মহাবিশ্ব নিয়ে আগ্রহের জায়গাটি স্পষ্ট করেছে এমন একটি গান নিয়ে কিছু কথা সাজাচ্ছি। তার পূর্বে জানানোর দরকার, একজন শ্রোতা কখন এবং কেন মহাবিশ্ব ও স্রষ্টার শৈলী নিয়ে সাহিত্য শুনবে বা পড়বে কিংবা ভাববে। একজন সাধারণ মানুষ যখন তার কর্ম, সমাজ, পথচলা, সাধনা ইত্যাদি অবশ্যপালনীয় বিষয়ে কখনো বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন, তখন তার সমস্ত বিষয়ের উপর কেন তিনি রোষ বা জেদ এর পরাগায়ন ঘটাচ্ছে সেই বিষয়ে একটা যুক্তিতর্ক করতে চায় তার অন্তর। কিন্তু প্রাণের সেই মানুষ তো আর সম্মুখে কোনো ছবির মতো স্পষ্ট হয়ে নেই যে গপ্পো করবেন। এই ধরনের দু-ধারী দোলাচলের অভিজ্ঞতা যে উপমহাদেশের মানুষের আছে নজরুল সেটি অনুভব করতেন একদম সুস্পষ্টভাবে। তখন ব্রহ্মচারীর এমন রচনা পড়তে বা শুনতে অন্তরে গেঁথে এর ঘ্রাণ নিয়ে সমীরবিলাসী হতে চায় সহজ সাধারণ কিংবা কুটিল হৃদয়টাই। আমি এমন একটি অবস্থায় যখন রাজধানীর শান্তিবাগে থাকি তখন নজরুলের একটি গান প্রায়ই শুনতাম। সেটিকে প্রিয় গানের তালিকায় একটি সূচক হিসেবে নিচ্ছি, কারণ গানটিতে সুস্পষ্টভাবে মহাবিশ্বের গঠন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এমনকি চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীকে মহাকাশ ও এর তাবেদার নিয়ে ভাবিয়ে তুলতে সক্ষম। একটা ভালো গান একটা ভালো সসারের মতন। উন্নত মানের যানবাহনওয়ালা ইঞ্জিন থাকে সেই গানে।

মূল প্রদর্শনীতে আসি, এতক্ষণে তরুণতরুণী প্রবীণ ও চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা চলে এসেছে। এক কোনায় বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকেও তার বেহালা নিয়ে পায়চারী করতে লক্ষ করা গিয়েছে। শো এত দেরি করলে শেষে রজনিগন্ধা ছুঁড়ে মারবে ডাগর দৃষ্টির কোনো তরুণী আর আইনস্টাইন যে প্রেমের সমীকরণ নিয়ে ভাবছে সেটিতে বিচ্ছেদ ঘটবে সে-কারণে। গানের কথাটি লেখার আগে একজন ভালো ফ্যাশনসম্মত রক কবি ও ভোকাল এর ন্যায় একটি শব্দবন্ধ যোগ করতে চাই আমাদের গীতিকবি নজরুল সম্পর্কে, যেন তার আন্তর্জাতিক সংযোগটি স্পষ্ট করে সকলে অনুভব করতে পারে। জিম মরিসনের একটি লাইন কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে একদম খাপে খাপে মিলে যায়, ‘দি রয়্যাল বেবিস অ্যান্ড রুবিস’।  কাজী নজরুল ইসলামের গানের সাহিত্য পড়লে আপনি কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবেন না লোকটি তার সন্তানের দাফনকার্য সম্পন্ন করতে স্টুডিয়োতে গান লিখে সেই অর্থ দিয়ে একটি কাফন কিনে অশ্রু হজম করে ময়ূরের মতো এগিয়ে যাচ্ছিলেন গোরখোদকের কাছে।

নজরুলের সাহিত্যে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত মূল্যবান রত্নের নাম পাথরের নাম,  কারুকাজের অনুকরণ ইত্যাদি ছিল, যা একজন অত্যন্ত ব্যয়বহুল স্যাঁকরার কাজ ছাড়া অন্য কারো মনেই হবার কথা নয়। এইজন্য আন্তর্জাতিক কোনো জ্যুয়েলারিগবেষক যে নজরুলকে পড়তে চাইবেন সেটা স্বাভাবিক। কারণ লোকটি মুহূর্তেই গয়নার কারুকাজ ভাষায় রচনা করতে পারে। আর যখন খোদার আরশ বেহেশতের হুরপরি এবং প্রাচীন গডেসরা তাদের অলংকারের নকশা নজরুলকে দিয়েই দিলো আমরা তাকে আর্টিস্ট অফ হ্যাভেনস জ্যুয়েলারি ছাড়া আর কি বলতে পারি? তার একটি গানে তিনি তো প্রাকৃতিক লতাপাতা ইত্যাদিকেও অলংকার বানিয়ে রীতিমতো বাসর সাজিয়ে দিয়ে কিছু কিছু বিয়ের আসরের দরিদ্রতা চিরতরে দূর করে দিয়েছিলেন। জোছনার সাথে চন্দন দিয়া মাখানো যদিও অভিজাত একটা বাথটাব ছাড়া সম্ভব নয়।

আচ্ছা, ঈশাণ কোণে যেই ডাগরআঁখি তরুণীটি তার পার্সের সত্তর টাকা খরচ করে রজনিগন্ধা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন অডিটোরিয়ামে যিশুর মতন তিনি কি তা দুমড়াচ্ছেন?  ঠিক কি কারণে তিনি বক্তাদের অপছন্দ করেন সেটি জানলে সুবিধে হতো। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আসলে রাগের আড়ালে সামান্য ধৈর্য নিয়ে এলে মন্দ হয় না। তাছাড়া তাকে তো যিশু বলেছি। জানেন তো খ্রিস্টের কতখানি ধৈর্য ছিল? খ্রিস্ট যতখানি পুরুষ ছিল তার অধিক রমণী কিন্তু আপনি নন। আচ্ছা, তরুণী বলে যাকে ভুল করছিলাম তিনি আসলে একজন দীর্ঘ কেশের তরুণ, যিনি শান্তিনিকেতন থেকে এসেছেন আর অডিটোরিয়ামে তক্তপোষ না থাকায় একটু বিঘ্ন হয়েছেন। আইনস্টাইন চলে আসায় তিনিও এসেছেন সাথে। আচ্ছা, আমরা তাহলে ভৈরবী কাহারবা সমৃদ্ধ সেই গানের কথা বর্ণনা করি। ক্লাস ফোরের একটি শিশু সেটি আপনাদের গেয়ে শোনাবে। তার নাম বুলবুল বলে তাকে সে-সুযোগ দেয়া হয়েছে।

২.
ভক্তিমূলক এই গানের কথায় সুর সংযোজনা নজরুল নিজেই করেছে। গানটি কাহারবা এবং ভৈরবী রাগিণী। হীরক রাজা সেই রাগিণীর ভুলের জন্য একবার গোপীনাথ গাইনকে রাজ্য থেকে গাধারপিটুনি দিয়ে গাধার পিঠে চড়িয়ে গ্রামছাড়া করেছিলেন। এরপর তো আর এই রাগিণী হেঁয়ালি করে গাওয়ার দুঃসাহস আর কেউ করেনি। রক মিউজিশিয়ানদের কথা আলাদা। কিন্তু এসব গানের ফিউশনের প্রয়োজনে নজরুলের ধ্যান না ভাঙলে কি হয় না? তাছাড়া আপনারা বলতে পারেন নজরুল লেখক, সম্রাট, তরুণ তরুণী নটরাজ এমন অনেকের ধ্যান যে ভেঙেছে মেনকা না হয়েও। তর্ক বাড়িয়ে লাভ কি গানের বাজারে? হারমোনিয়াম নিয়ে এসো বুলবুল। মঞ্চে উপবিষ্ট যন্ত্রীদের সালাম দিচ্ছ তো? দিও দিও। সেটিই আসল।…বুলবুল কিছুক্ষণ তবলার বোল শুনে নিলেন, বেহালার ধুন রেকর্ডে কুড়ি সেকেন্ড যাবার পর সে গাইতে আরম্ভ করল। কিন্তু সম্পূর্ণ গানে তার ত্রি-নেত্রই আকাশের দিকে লক্ষ করে গানটি গেয়ে দিলেন।

“খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।
প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা নিরজনে প্রভু নিরজনে।।
শূন্যে মহা আকাশে
মগ্ন লীলা বিলাসে,
ভাঙিছ গড়িছ নিতি ক্ষণে ক্ষণে।।
তারকা রবি শশী খেলনা তব, হে উদাসী,
পড়িয়া আছে রাঙা পায়ের কাছে রাশি রাশি।
নিত্য তুমি, হে উদার
সুখে দুখে অবিকার,
হাসিছ খেলিছ তুমি আপন মনে।।”

আপনারা যারা কথ্য ভাষায় গানের স্বাদ দিতে চান তাদের জন্য ভার্চুয়াল এখন নিন্দার কাঁটা বিঁধে যাওয়া বন্ধ করেছে। ঘরে ভালো প্লেয়ার ডিস্ক না থাকলে ডিজিটাল বাইট থেকে আপাত মিউজিক ট্র‍্যাকটি ছেড়ে নিন, তাতে গদ্যটি শেষ করতে কিঞ্চিৎ পাঠ্যবস্তু সয়ংসম্পূর্ণ হবে। ঠিক আছে, ঐ যে ডিপ ডিপ করে একটু বেশি আওয়াজ দিচ্ছে ভালো যন্ত্রের অহমিকার জন্য সেই বেস ভলিউমটা একটু টিউন করে নিয়ে, হ্যাঁ হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে। ভালো রেশ এসেছে স্পিকারে। আজকাল ভালো স্পিকার বা হেডফোনে কিন্তু গানের কদরই দাদা একেবারে পাল্টে যায়। কি যে দিন এল। নজরুলের আদি শিল্পীরা যখন গাইত তখন কিন্তু একটা হেঁচ্ছো দিলেও বা চা গেলার শব্দ হলে কিংবা তেলাপোকার জন্য আঁৎকে ওঠার টু শব্দ হলেই রেকর্ড বাতিল হয়ে যেত। সেই অবস্থাটি কিন্তু আমরা সেই তরুণীর মধ্যে দুঃখিত সেই তরুণের মধ্যে লক্ষ করেছি। আজকাল রজনিগন্ধা নিয়ে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় কতজন আসে এভাবে! ফুলের ওজন সবাই বইতে পারে না, বুঝলেন। প্রেমিকার সাথে মিশ্ররাগে কথা বললে কিন্তু ফুচকার প্লেট ছু্ঁড়ে মারবে মুখে। আর তাতে চিনেমাটির তৈজস ভাঙবে রেস্টোরেন্টে বসে বিপ্লববাদী ফ্যাশনের বারোটা বাজবে। গানের তরুণী কিন্তু তাল কেটে কিংবা রাগ বদলে গাইলে ভীষণ ক্ষেপে যায়। বিশেষত নজরুল কিংবা অন্য ক্লাসিক গানের কন্যাদের সাথে মেলামেশা করার সময় গীতিকবিদের সেটি মনে রাখতে হবে। কাজেই রেকর্ডিং শৈলীর জন্য নজরুলের গানের রানীরা একটু আলাদা। তাদের দুয়ারে গান ছাড়া যাওয়াআসা করা ছিল মুশকিল। আর তাই নজরুল কবিতা গান দুটোই লিখেছেন। এবং পরে গান আর কবিতার ভেদাভেদ ভুলে গিয়েছেন। তার সৃষ্ট আলাদা রাগের যুক্ত করা ছিল সংগীতের অন্যতম সংযোজনা।


স্রষ্টা শিশুর মতো কোমলভাবে সৃষ্টিকে অনুভব করতে পারেন। আর তাই মহাবিশ্ব পরিচালনা করার কাজটি তার জন্য কঠিন কিছু নয়। আর তা করতে গিয়ে অনেক সময় কিছু দুঃখ দূর করতে অনেক সময় নেন স্রষ্টা আবার কিছু প্রার্থনা মঞ্জুর করতে অনেকখানি পথ পেরিয়ে নিয়ে আসেন। একটা নক্ষত্র লক্ষ করতে রাতের আকশে অনেকেই তাকিয়ে রয়। সেটি খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু সেই ভাসমান নক্ষত্রাদি কতটা উঁচুতে আছে তা কিন্তু বিজ্ঞানশিক্ষার ফলাফল দিয়েই মনকে সন্তুষ্ট করা যায় না। উপলব্ধি করতে পারলে পরে তা সাহিত্যের জন্য সহজ হয় আসলে। “তারকা রবি শশী খেলনা তব হে উদাসী / পড়িয়া আছে রাঙা পায়ের কাছে রাশি রাশি”। এই বাক্যের ব্যাসার্ধ কতখানি তা কি একজন গণিতজ্ঞ পন্ডিতের পক্ষে বলা সম্ভব আসলে? এক পলকেই কিন্তু মহাবিশ্ব আত্মার মধ্যে একটা প্রিজমা ফিল্টারাইজেশন করিয়ে দিচ্ছে। আর শিশুদের মস্তিস্ক ভালোভাবে গঠিত হবার জন্য নয়, সৃষ্টিশীলতা নিয়ে গঠিত হবার জন্য অনেক অনেক রকমের লাইন তাকে কবিতায় গানে পড়ে শুনে কনসার্টে গিয়ে শিক্ষিত হতে হয় সাহিত্যের জন্য। চিন্তায় স্রষ্টার প্রজ্ঞার ছায়াপাত রয়েছে, হৃদয়ে রয়েছে তার সজ্জা। আর তাকে না জেনেশুনে বিঘ্ন করা ভালো ছাত্রের কাজ নয়। কিন্তু সেই পাঠ্যক্রম অনেকখানি জুড়ে নজরুল খুবই বিজ্ঞানমনস্ক রচনা করেছেন। এই গানটি তেমনি উদাহারণ। প্রকৃতির রদবদলের যে ধাওয়া আছে বাতাসে কিংবা বসবাসে সেটি কিন্তু ‘হে উদাসী’ শব্দটি দিয়ে ব্যক্তিশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে স্রষ্টাকে সাধারণ মানুষের উপলন্ধি করার জায়গাটি তৈরি করেছেন। “হাসিছ খেলিছো তুমি আপন মনে” এই স্থলটি কিন্তু স্রষ্টার বা শিশুর যে একটি অনন্য মন আছে যা আপনার কিংবা আমাদের মনের মতন নয় সেটিরই সাক্ষ্য দিচ্ছে। তবুও গান শুনে উপলব্ধি করার বিষয়। গান শোনার অভ্যাস বা সম্মতির পরিমাপ কতখানি আপনার অন্তরে সে-অনুযায়ী গানের রমণী তার বাগানে প্রবেশ করায়। কাজেই উপলব্ধি ও প্রকৃত শিক্ষার জন্য কেবল তুখোড় একটি মন থাকলেই যথেষ্ট নয়। একটু নত হবার একটু শ্লথ হবার একটু জল হবার মতো নম্রতা বাঁচিয়ে চলতে হয় মেজাজে। না হলে গানের মেজাজ নিয়ে পাঠ করা খুবই মুশকিল।

শেষ করার আগে একটু বলি। নজরুল এই কঠিন গানটি রচনা করেছিলেন একেবারেই পরিণত বয়সে যা কিনা শিশুরা শুনতে পারে সেই অভিরুচিকে গুরুত্ব দিয়ে। আজ আমরা নজরুলের গান করছেন এমন অনেক শিল্পীকে চিনি জানি, কিন্তু নজরুল যেই বাগানে বিকশিত হয়েছিলেন তাদের স্ব মঞ্চের আশেপাশে ভিড় করতে দেখলে হটিয়ে দেয়া হয়। কিংবা চটকলে যে বস্তার উপর নজরুলের জন্মদিনে কুলি মজুররা কেক কাটেন সেটি তারা খেতেও যাবে না কোনোদিন। ঠিক এই জন্য দরিদ্র ছাত্রদের কিছুটা প্রাধান্য দিয়ে আমি রচনাটি তাদের গ্রন্থাগারে বসে লিপিবদ্ধ করেছি। নজরুলের গান অন্য কোনো গদ্যে আবারো একটি জাপানিজ গ্রন্থাগারে বসে বিত্তশালী ছাত্রছাত্রীদের জন্য লিখে দেবো সেই আশাবাদ রেখে লেখাটি এখানে শেষ করছি কি! লেখার শৈলী অনুযায়ী শেষ বলতে হবে। অন্যথায় আমরা লেখকরা যুগ যুগ পরিশ্রম করে লেখালেখির ব্যাকরণাদি তৈরি করলাম তার একটা লেখকসুলভ মূল্য থাকতে হবে। না হলে সাহিত্য ধ্যানাবস্থা অর্জন করবে কেমন করে, তাই না!

পুনশ্চ ১ : নজরুল সংগীতকোষ ও অন্যান্য গ্রন্থে উক্ত গানের কথাটি একেক ভাবে সাজানো থাকে। এসব এড়িয়ে গানের ভিতর যে গদ্য উপস্থাপিত হলো সেটিই প্রাধান্যভিত্তিক আমার কাছে। তাই স্বরলিপি নিয়ে কিছু লিখে আর এই গদ্যের বহর বাড়াইনি। অন্য আরো অনেক বিষয়ে বলা যেত। যেমন, কে কে গাইলেন। কোন কোন মঞ্চে সেটি তুমুল ছিল। গানটি কতটি ভাষায় পাওয়া যায়। কি কি ভাষার শব্দ আছে ইত্যাদি। কিন্তু গানের কথায় হৃদয়ে অনুপ্রবেশের ভাষাটি প্রাধান্য দেয়ার কারণে দেশি বিদেশি অর্ধ বাংলা শব্দের বিতর্ক এখানে প্রয়োগ করার প্রয়োজন অনুভব করছি না। প্রাধান্য দিচ্ছি নজরুলের এই গানের মাধ্যেমে একটি ক্লাস ফোরের শিশুর বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ওঠার ঘটনাটি। এবং নজরুল আধুনিক ল্যাব ছাড়া কিভাবে অ্যাস্ট্রোনোমিকাল আর্ট নিয়ে সিরিয়াস হলেন।

পুনশ্চ ২ : গানের সিডি আনতাম আজিজ মার্কেটের বাবুল রেডিও থেকে। উনার দোকান থেকে আমি প্রায়ই বিভিন্ন ক্লাসিক ও নৃত্যনাট্য ইত্যাদির অডিও সবান্ধব গিয়ে কিনে আনতাম। অনেক সংগীতকুশলীদের সাথে পরিচয় হয়েছিল আমার, যারা অধ্যয়নের প্রয়োজনে সিডি নিতে দোকানে আসত। কাজী নজরুল ইসলামের গান অরিজিনাল মাস্টার রেকর্ডিং থেকে শোনার জন্য অনেক সিডি পরিবর্ত বা অন্য গানের তালিকা নিয়ে একটা উসিলা হয়ে গিয়েছিল গানের দোকানে আসাযাওয়ার।

পুনশ্চ ৩ : কাজী নজরুল ইসলামের গানের প্রতি খুবই নিবিড় আগ্রহ আছে এমন দুয়েকজন বন্ধু ছিল আমার। সংগীত বিভাগের কিছু ছাত্র আমার সাথে লিরিকাল ইস্যু নিয়ে গানের আলোচনার জন্য যুক্ত ছিল। সর্বপোরি সবাই সম্মত ছিলাম, নজরুলগানের সম্মোহনী শক্তি ছিল অন্য মাত্রার, যা বাংলা গানের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। নম্র সুরের যুগে তিনি অত্যন্ত উচাটন পাহাড়, মরু, আলেয়াদগ্ধ ইরানি কণ্ঠ, আদিম মন্দিরের সাধকের ভাবনা সবকিছুর সাড়া সুরে ধরেছেন। নজরুল যেমন করে তরুণ অন্তর বুঝত তা বৈচিত্র‍্যময়। কোনো আদর্শগত ধারণায় নজরুল তার সুর বেঁধে রাখেননি। তিনি সুরের নিরীক্ষাধর্মী একজন ডাকসাইটে দস্যু ছিলেন। নৃত্যশিল্পীকে চাবুক মারলে নাকি তারা এমন নৃত্যশৈলী রাজদরবারে প্রদর্শন করতেন যা সম্রাটদের বিস্মিত করত। নজরুল জীবনে চাবুক খেতে খেতে সাহিত্য সুর কবিতা রচনা করে নিভৃত হয়েছেন।


গানপারে নজরুল

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you