ময়মনসিংহের বিভাগীয় বইমেলা থেকে আমার অত্যন্ত প্রিয় স্বজন মোতাসিম বিল্লাহ পাঠিয়েছেন ‘ময়মনসিংহের ইতিকথা’ শিরোনামে ৬৪ পৃষ্ঠার ছোট্ট গ্রন্থ। আমার বিবেচনায় গ্রন্থটি ছোট্ট হলেও এটি একটি মহামূল্যবান গ্রন্থ। গ্রন্থের লেখক আহমদ তৌফিক চৌধুরী। টীকা ও ভূমিকা লিখেছেন খান মাহবুব। ময়মনসিংহ শহরের দুশো বছরের সরল সংক্ষিপ্ত ইতিহাস যারা পাঠ করতে চান তাদের জন্য এই বই মহামূল্যবান।
‘হাওর জঙ্গল মহিষের শিং / এ তিনে ময়মনসিং’—প্রবাদের মতো উচ্চারিত এই কথাটি দিয়ে মূলত ময়মনসিংহের ভৌগোলিক সীমানা ও জনপদের বৈচিত্র্য নির্ধারণ করা হয়। হাজার বছরের ভৌগোলিক বিচিত্রতায় শহর ময়মনসিংহ মূলত ব্রহ্মপুত্র নদের দুহিতা। তিব্বতের লুসাই পর্বত থেকে নেমে আসা নদীটার মতো শহরটাও প্রাচীন।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ব্রিটিশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষক, তাঁতি ও অন্যান্য পেশাজীবীদের বিদ্রোহ ঘটে। এই বিদ্রোহ ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নামে পরিচিত। অবশ্য গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস এই বিদ্রোহকে কৃষক বিদ্রোহ বলে প্রথমে অভিহিত করেন। ১৭৮৭ সালে ফকির বিদ্রোহের অন্যতম নেতা মজনু শাহ এক হাজার সঙ্গী নিয়ে ময়মনসিংহে প্রবেশ করলে ব্রিটিশ সরকার তটস্থ হয়ে এ জেলার বিভিন্ন স্থানে সৈন্যদল প্রেরণ করে। বিদ্রোহীদের দ্বারা আক্রান্ত হয় থানা ও জমিদারদের কাচারি। ঢাকা থেকে বিদ্রোহ দমন সময়সাধ্য বিষয় ছিল। এজন্য ১৭৮৭ সালের ১ মে ময়মনসিংহ জেলা সৃষ্টি করা হয়। মধুপুরের সন্ন্যাসীদের দমনে ইংরেজ সরকারকে বেগ পেতে হয়েছিল। তাদের অনেক লোকক্ষয় হয়েছিল। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন সন্ন্যাসীদের দলপতি জয়সিং গিরির দল যদি সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময় তখনকার প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র নদ অতিক্রম করতে পারত তাহলে ময়মনসিংহের ইতিহাস অন্যভাবে রচিত হতো। এই শহরের প্রশাসনিক কাঠামোও অনেক প্রাচীন। ১৭৭১ সালে এই শহরে দেওয়ানি আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়।

দালিলিক প্রমাণ না-থাকলেও ময়মনসিংহ নাম নিয়ে বিচিত্রতর জনশ্রুতি আছে। এইসব জনশ্রুতি সত্যের চেয়েও সত্য, লোকইতিহাস। জনশ্রুতি মতে মোঘল আমলে মোমেনশাহী নামে এক সাধু এ অঞ্চলে এসেছিলেন, যার নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম হয় মোমেনশাহী। পরে এই মোমেনশাহীই বিবর্তিত হয়ে ময়মনসিংহ হয়েছে। অনেকের মতে মোঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ এ অঞ্চলে এসে ঘাঁটি স্থাপন করেছিলেন। ময়মনসিংহ অঞ্চলের স্বাধীন শাসক মসনবি ঈশা খাঁর সঙ্গে মানসিংহের যুদ্ধের নানা লোককাহিনি এখনো ময়মনসিংহের মানুষের মুখে। মানসিংহের নাম থেকে ময়মনসিংহ নাম হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। অনেকেই মনে করেন ‘মাই মেন সিং’ অর্থাৎ আমার লোকেরা গান করে সেই অর্থেও এই অঞ্চলের নাম ময়মনসিংহ।
মাত্র চার ফর্মায় যে ইতিহাস লেখা যায় এই গ্রন্থটি তারই স্বাক্ষর। সংক্ষিপ্ত, সরল এবং প্রয়োজনীয়। অনেকেই গদ্য লিখতে পারেন না কিন্তু গ্রন্থ লেখেন। কিন্তু এই গ্রন্থের গদ্যও দুর্দান্ত। আহমদ চৌধুরী সাহেবের ভাষা যে অপূর্ব এই ছোট্ট বই না পড়লে অজানা থাকত। তাই ইতিহাস পড়তে এতটুকু ক্লান্তি লাগে না বরং একনিশ্বাসে প্রাচীন ময়মনসিংহের ঐশ্বর্য থেকে ঘুরে আসা যায়। অনেকদিন পর টীকায় ও গ্রন্থনায় গবেষক খান মাহবুব পুস্তিকাটি জনসমক্ষে এনেছেন। এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং দরকারি একটি কাজ।
শহর ময়মনসিংহের ইতিকথা (দুইশ বছরের সরল ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস)। মূল : আহমদ তৌফিক চৌধুরী, ভূমিকা ও টীকা : খান মাহবুব
সরোজ মোস্তফা ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
সরোজ মোস্তফা রচনারাশি
গানপার বইরিভিয়্যু
- ব্রহ্মপুত্রদুহিতার বহমান জীবন ও জনপদ - March 11, 2026
- দোয়েল, দুপুর ও ধানমেয়ের গান || সরোজ মোস্তফা - March 9, 2026
- কবির শৈশব কবির কৈশোর - March 7, 2026

COMMENTS