“ডারনেওয়ালে কে লিয়ে ইহা কোই জাগা নেহি বোম্বাই মে! চল ওয়াপাস যা, চল!”
সকাল থেকে এই সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যাপারটা আমি প্রসেসই করতে পারছি না। আমার কাছে এখনো মনে হচ্ছে—উহু, এটা হয়তো কোনো বেহুদা নিউজের বদমাইশি। ভাইরাল হতে তো কত কী-ই করে আজকাল, কত শত ক্লিকবেইট নিউজ! বিশ্বনাথ পাটেকর ওরফে নানা পাটেকরের মৃত্যুসংবাদ তেমনই কিছু হবে হয়তো। কিন্তু এই সাঁঝবাতি দেওয়ার সময় পর্যন্ত সূর্যোদয়ের আগের খবরটা মিথ্যা হলো না। নানা সত্যি সত্যিই চলে গেছেন, হঠাৎ করেই।
এই লোকটা কোনো ফিল্মে তথাকথিত ‘নায়ক’ ছিলেন বলে কেউ খুব একটা স্মরণ করতে পারবেন না আসলে। ‘হিরো বাননে কে চক্কর মে অ্যাক্টর মাত খোনা’—শাহরুখ খানকে বলেছিলেন ‘রাজু বান গেয়া জেন্টেলম্যান’ সিনেমার সময়। নিজে আজীবন এই অভিনেতা হয়েই মন জয় করে গেছেন তাই। ‘ক্রান্তিবীর’ সিনেমার সেই জুয়াড়ি, কিংবা ‘প্রহার’-এর আর্মি অফিসার চৌহান, অথবা ‘গোলাম-এ-মোস্তফা’-র মোস্তফা—প্রটাগনিস্ট নানা পাটেকর আদতে নায়কের বলিউডি চেনা বৃত্তের বাইরের অনেক বড় কিছু। একজন খাঁটি অভিনেতা!

কী অদ্ভুত এক ক্ষমতা ছিল লোকটার! যখন ‘ক্রান্তিবীর’ সিনেমার দৃশ্যে বাচ্চা একটা ছেলে এসে সাহায্য চায় তার মাকে গুন্ডাদের হাত থেকে বাঁচাতে, হাসতে হাসতে নানা পাটেকর গড়াগড়ি দিতে থাকেন। কী যে তীব্র সে-হাসি! অদ্ভুত সততা সেখানে, আর তার সাথে তীক্ষ্ণ চপেটাঘাত দেওয়ার মতো ভীষণ ধারালো। লোকটার শরীরের প্রতিটা কোষ যেন তার নিয়ন্ত্রণে থাকত। তাই এমন প্রাণখোলা হাসির পর যখন এক মুহূর্তের নীরবতা নামে, আর তারপর আসে সংলাপ—সেটা সোজা গিয়ে বুকে ধাক্কা দেয়।
পর্দায় নানার এই উপস্থিতি শুধুই অভিনেতার কৌশল ছিল না, এক অদ্ভুত সম্মোহনও ছিল যেন। গলার আওয়াজে ড্রামাটিক ওঠা-নামা, মুহূর্তের মধ্যে চরম ক্ষোভ থেকে একদম উদাসীন নৈঃশব্দ্যে নেমে আসা, কিংবা চোখের এক পলকে ব্যাকুলতা ফুটিয়ে তোলা, বলিউডের আর কোনো অভিনেতার মধ্যে এমন আনপ্রেডিক্টেবল ক্ষুরধার তেজ আসলেই বিরল। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে আসা এই অভিনেতার সবচেয়ে বড় জাদু ছিল তাঁর অসাধারণ ‘নিয়ন্ত্রণ’। থিয়েট্রিক্যাল অ্যাক্টিংয়ের যে বিশাল আবেগ ও ম্যানারিজম, তাকে সিনেমাটিক ক্লোজ-আপে এনে কীভাবে নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়, তা নানার চেয়ে ভালো কে জানত! স্ক্রিপ্টের ছকবাঁধা লাইনের তোয়াক্কা না করে যখন তিনি কথা বলতেন, মনে হতো না কোনো সংলাপ মুখস্থ বলছেন; মনে হতো নিজের অজান্তেই সেই চরিত্রটার রক্ত-মাংসের হাহাকার হয়ে উঠছেন ক্যামেরার সামনে।

নানা পাটেকর যে কারণে আরও গেঁথে গেছেন আমার মনে, তার মাঝে অদ্ভুত একটা বড়ভাইসুলভ ব্যাপার আছে। কেন যেন তার প্রতিটি অভিনীত চরিত্রে সেটা কোনো না কোনোভাবে টের পাওয়া যায়। প্রথম ব্যাপারটা ধরতে পেরেছিলাম ‘রাজু বান গেয়া জেন্টেলম্যান’ থেকেই—শুরুর সংলাপটাও সেখান থেকে। শাহরুখ খান বোম্বে এসেছেন উঁচুতে উঠতে, আর তাকে কথাগুলো বলে নানার অভিনীত চরিত্র ‘জয়’। আজ নানার জন্য শাহরুখের বিদায়কথনে দেখলাম, নানা আসলেই ঠিক বড়ভাইয়ের মতো শাহরুখকে বলেছিলেন—”হিরো হতে না ছুটে, অভিনেতা হতে চেষ্টা করো।” মনে পড়ল, ঠিক এই সিনেমার ‘জয়’-এর মতো একজন বড়ভাই বোধহয় আমি আজীবনই খুঁজে গেছি।
নানা পাটেকর এই উপমহাদেশের সিনেমার সত্যিকারের বড়ভাই-ই ছিলেন।
বিদায়…
সজীব তানভীর রচনারাশি
- নানা || সজীব তানভীর - October 9, 2026
- লোককবি জালাল উদ্দিন খাঁ ও তাঁর গানের হকিকত || আল-আমিন সালমান - October 7, 2026
- গাছতলা থেকে গল্ফগ্রিন : কুট্টি মজুমদার ও অভিলাষা || মাহমুদ নেওয়াজ জয় - October 7, 2026

COMMENTS