এক লেখাচোর ও কয়েক চতুর

এক লেখাচোর ও কয়েক চতুর

শেয়ার করুন:

০৯ ডিসেম্বর ২০১৭, ফেইসবুকের পোস্ট, মেমোরিস থেকে পাওয়া। তারই ভিত্তিতে এই নিবন্ধ। অনেকটা কেইসস্টাডি। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে এই ঘটনা আজ থেকে এক দশক আগের। আজকের নয়। কিন্তু ঘটনাটা বারবার অনিবার ঘটেছিল ঘটছে এবং ঘটবে। এবং আমাদেরই নির্বিকার আমুদে আশকারায়।

এমনই বিচ্ছিরি এক কাণ্ড! চুরি করে ধরা খায় হাতেনাতে একজন, তার ছাড়ান নিতে অ্যাডভোক্যাসি করে একটা আস্ত সংগঠন! ওয়েবে লেখা ছাপাছাপির যুগে এই গল্প অগোচর সগোচর পুনরাবৃত্ত পুনরাভিনীত হচ্ছে। এই কীর্তিকলাপের কোনো মনিটরিং নাই। ঘিরিয়া ঘিরিয়া নাচুনিরে নিয়া বড়াই। চোরে চতুরে বইনালা ভাইয়ালা পাতাই।

কিন্তু গল্পটা আস্ত পরাবাস্তব আজ। এই গল্পের প্রধান উপাদান লিঙ্কগুলা আজ আর অর্ধেকটা কাজ করে না। বাদি হাজির বিবাদি হাওয়া। তারপরও স্মরণের সরণি ঘিরে তার আসাযাওয়া। কাজেই, গল্পের ক্যারেক্টারগুলা বাস্তবিক বিরাজ করে কি না, তা গল্পের বাইরেকার বিবেচনা। আমরা গল্পে থাকব।

গল্পের ক্যারেক্টারের নাম বিতস্তা ঘোষাল।

কে এই বিতস্তা ঘোষাল? যদিও পরিচয়লিপিতে লেখা আছে উনার সাকিনঠিকানা, ভারতীয় সুনাগারিক হিশেবে, ছাপানো ষোলোখানা কিতাবের জননী তিনি! কিন্তু কুম্ভীলকবৃত্তির ষোলোকলায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেই তিনি বোধহয় লেখালেখিতে নেমেছেন।

‘পরস্পর’ নামে একটা সাইটে দেখা যাচ্ছে গত (২০১৭) নভেম্বরের ১০ তারিখে এই মহিয়সীর ‘বব ডিলানের কবিতা’ (লিঙ্ক অকেজো) শীর্ষক কয়েকটা গানের ‘অনুবাদ’ (কুম্ভীলক ঘোষালজির ভাষায়) ১ম কিস্তি ছাপা হয়েছে, যেখানে পয়লা মালটা আস্ত সৈয়দ শামসুল হকের অনুসৃজিত রচনা যা ‘গানপার’ সাইটে সুবিনয় ইসলামের সংগ্রহসূত্র ও ভূমিকাভাষ্যসমেত ছাপা হয়েছে সৈয়দ হকের প্রয়াণবার্ষিকীতে। এইটা পরস্পরে আশ্রয়-পাওয়া বিতস্তাকাণ্ডের অন্তত একমাস আগের ঘটনা। গানপারের ফেসবুকপেইজে শেয়ার দেয়া হয়েছে ২০১৭ সনের ১৪ অক্টোবর তারিখে। এবং দি থিফ অব ক্যালকাটা বিতস্তাজির ‘অনুবাদ’ নাজেল হয়েছে এর একমাস (প্রায়) পরে ২০১৭ সনের ১০ নভেম্বর তারিখে। আর হকের লেখাটা গানপারে নেয়া হয়েছে ২০০৩ সনে ঢাকা থেকে বেরোনো বই ‘বিম্বিত কবিতাগুলো’ থেকে। গানপারের ভূমিকায় সেসব বিস্তারিত বলা আছে।

একটাতেই বিতস্তা থামতেন যদি! কিন্তু ঘটনাধারা দেখে সন্দেহ হচ্ছে বেচারি ক্রিপ্টোম্যানিয়ায় আক্রান্ত কি না। কারণ, পরে যে-দুইটা মাল পরপর ‘পরস্পর’ পরম স্নেহে ছাপিয়েছে সেই দুইটা জাহেদ আহমদ কৃত ‘বব ডিলান কুড়িটা গান’ শীর্ষক অক্টোবর ২০১৬ সনে আপলোড-করা ‘রাশপ্রিন্ট’ সাইটের একটা পোস্ট থেকে মেরে দেয়া, যা কি-না ডিলান নোবেল পাবার বছরখানেক আগে থেকে জাহেদের ফেসবুকনোটে ছাপা।

পাঠক, লক্ষ করুন, ‘মেরে দেয়া’ বা ‘হুবহু’ বা ‘অবিকল’ ইত্যাদি এক্সপ্রেশন দিয়া ন্যাক্কারজনক এহেন ঘটনা হাল্কা হয়ে যায়। এইটা আসলে একটা মারাত্মক সঙ্কট, চৌর্যবৃত্তি চিরকালেরই ক্রাইসিস অবশ্য, সমাজে ব্যাপক প্রশ্রয় পায় এই ভোকেশন, অনলাইনযুগে এইটা আরও মহামারি হয়েছে। এগুলো রোখার বেশকিছু নির্ভরযোগ্য রাস্তা থাকলেও আমাদের মতো ধর-তক্তা-মার-পেরেক টাইপের সাইটচালকদের নে-লেখা-দে-আপ পলিসির কারণে কুম্ভীলকবৃত্তি উৎসাহিত হচ্ছে কি না ভাবতে হবে সবাইকে সুস্থির বসে।

এইখানে কেবল পাঠকের দেখার জন্যে (একমাস হয়ে গেল আমাদেরই চোখে পড়তে পড়তে!) ‘পরস্পর’ কর্তৃক প্রচারিত ঘোষালের কুকাণ্ডগুলোর নজির রাখছি। লিঙ্ক দিচ্ছি বিতস্তা ঘোষালের চুরির (উনি ভদ্রসমাজের যেহেতু, ভদ্রসমাজ পড়ুন ‘কুম্ভীলকবৃত্তি’, কিংবা ‘তঞ্চকবৃত্তি’ ইত্যাদি) এবং সেইসঙ্গে পূর্বপ্রকাশিত হকের লেখাটার গানপারলিঙ্ক এবং জাহেদ আহমদের লেখা-স্থান-পাওয়া রাশপ্রিন্টলিঙ্ক।

গানপারে সৈয়দ হকের লেখাটা মিলিয়ে দেখুন বিতস্তা ঘোষাল ম্যাডামের পয়লাটার লগে…

রাশপ্রিন্টের জাহেদ আহমদ কর্তৃক অনুবাদগুচ্ছের ২য় পর্বে ‘ব্লু মুন’ এবং “আই’ল্ বি য়্যুর বেইবি টুনাইট” অনুবাদদ্বয়ের লগে এই কুম্ভীলকের ‘নীল চাঁদ’ আর ‘আজ রাতে আমি তোমার’ মিলিয়ে একবার যদি দেখেন তবে গ্যারান্টি দিচ্ছি এই মজা আপনি জিন্দেগিতেও ভুলবেন না।

তা, বাংলাদেশ তো চুরিচামারির ব্যাপারে উদার গণতান্ত্রিক। জননেত্রীর আমলে তো চোরদেরই পোয়াবারো। অতএব যারা বলবেন, ‘হতেই পারে এমন, মিলে যেতেই পারে’, তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, ইংরেজি লিরিক্স পড়লেই বুঝবেন যে এগুলো অনুবাদ নয়, ছিল অতীব-স্বাধীনতা-নেয়া অনুসৃজন। ঘোষাল যদি ইংরেজি লিরিক্স দেখে দেখে ‘অনুবাদ’ করিয়া থাকেন তাইলে সেই জিনিশগুলা আংরেজিতে থাকবে তো! কই, আছে? হ্যাঁ, পাবেন শুধু হকের আর জাহেদের বাংলায়। যা আংরেজিতে নাই তা ঘোষালজি পাইলেন ক্যামনে!

এ কী, বিতস্তাজি, এ কী কাণ্ড! চোরে-চোরে বিয়াইআলা করতে গিয়া আপন নামে নিয়া নিলেন গোটা আস্ত ব্রহ্মাণ্ড! ব্র্যাভো, ঘোষালজি, ব্র্যাভো!

দ্রষ্টব্য। যারা নোবেলপ্রাপ্তির পরে এক হিড়িকে ডিলান অনুবাদ করেছেন নানা জায়গায় নানাভাবে, তারা ‘পরস্পর’ সাইটের এই পোস্টদ্বয়ে যেয়ে চেক করে নেন নিজের লেখাটা এই সিন্ডিকেইটের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে কি না। হাতেনাতে ধৃত হওয়া মাত্র প্রতিবাদ করুন, ফাঁস করুন ব্রহ্মাণ্ডচুরির কাণ্ড, চোরদের রুখিয়া দাঁড়ান! চতুরদের চতুরালি ডিনাই করুন!

ঘোষালের পোস্টদ্বয়ের কোনোটাই আজ আর কাজ করে না। কাজেই, জিনিশটা ক্ল্যাসিক গল্প হবার ক্ষেত্রে কার্যত কোনো অন্তরায় নাই আর।

আলোচ্য চৌর্যবৃত্তি সম্পর্কে আরও সবিস্তার জানতে এই দুই লিঙ্ক ক্লিক করতে পারেন : লিঙ্ক ১লিঙ্ক ২

আলফ্রেড আমিন


আলফ্রেড আমিন রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you