প্রসঙ্গ অনুদানের চলচ্চিত্র : অনুদানে অনিয়ম ও নীতিমালা লঙ্ঘন

প্রসঙ্গ অনুদানের চলচ্চিত্র : অনুদানে অনিয়ম ও নীতিমালা লঙ্ঘন

২৪ এপ্রিল ২০১৯ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র শাখায় অনুদানের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। প্রজ্ঞাপনে মোট ৮টি চলচ্চিত্রকে সরকারি অনুদান দেয়া হয়। অনুদানে অনিয়ম হয়েছে স্বীকার করে অনুদান কমিটির চার সদস্য পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পর তথ্যমন্ত্রীর বাসভবনে একটি নৈশভোজের পর অনুদান কমিটির চার সদস্য তাদের পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। চার কমিটির পদত্যাগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ হিসেবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার বরাতে জানা যায়, যে-কারণে তারা পদত্যাগ করেছিলেন সে-বিষয়ে কমিটির বাকি সদস্যরা ঐক্যমত হয়েছে্ন। অনুদান কমিটির চার সদস্যের পদত্যাগের কারণটি গত ১৪ মে ২০১৯, অনুদান কমিটির শেষ সভার সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়। ‘স্বপ্ন মৃত্যু ভালবাসা’ নামের আরেকটি কাহিনিচিত্র চূড়ান্ত অনুদানতালিকায় সম্পৃক্ত হয়। চলচ্চিত্রটি অভিনেত্রী শমী কায়সারের নামে অনুদান পায়। শমী কায়সার চলচ্চিত্রটির প্রযোজক। প্রযোজক নিজেই বলেছেন অনুদানের জন্য তিনি আবেদন করেননি।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে চলচ্চিত্র সাঁতাও – saatao এর নির্মাতা Khandaker Sumon (খন্দকার সুমন) সে-সময়েই একটি পোস্ট করেছিলেন। সেই পোস্টটি আবারও সামনে আনলাম, এদেশে অনুদানের চলচ্চিত্র কীভাবে কি হয় তা বুঝতে চেষ্টা করার জন্য। খন্দকার সুমনকে ধন্যবাদ এই তথ্যবহুল লেখার জন্য; এবং তাকে নতমস্তকে কুর্নিশ জানাই তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় কোনো-অনুদান-ছাড়া বানানো সিনেমাটি সারাদেশে ফেরি করে হলেও দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। সালাম…

~~
২০১৮-১৯ অর্থবছরে চলচ্চিত্রে অনুদান প্রদানে “অনুদান প্রদান নীতিমালা-২০১২ (সংশোধিত)”-এর যে-ধারাগুলো অনুদান কমিটি লঙ্ঘন করেছে তা জানার আগে এক-নজরে অনুদান প্রদানের জন্য বিচার্য ধারাগুলো দেখে নেয়া যাক।

অনুদান প্রদানের জন্য বিচার্য বিষয়সমূহ :
১২। অনুদান বাছাই কমিটি প্রাপ্ত প্রস্তাবনাসমূহ বাছাইয়ের জন্য নিম্নবর্ণিত বিষয়সমূহ বিবেচনা করবে;

(ক) নির্মাতা/পরিচালকের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা : প্রস্তাবকারী পরিচালকের পূর্বনির্মিত একটি চলচ্চিত্র অথবা নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট এক বা একাধিক চলচ্চিত্রে তার ভূমিকা বিবেচনা করে অনুদান প্রদান কমিটি পরিচালকের যোগ্যতা নির্ধারণ করবে;
(খ) বিষয়বস্তু, সংলাপ ও চিত্রনাট্য;
(গ) প্রস্তাবিত চলচ্চিত্রের জন্য মনোনীত শিল্পী-কলাকুশলীর মান ও অভিজ্ঞতা;
(ঘ) সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাণ সংস্থার কারিগরি, আর্থিক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা;
(ঙ) সংশ্লিষ্ট প্রযোজকের আর্থিক সক্ষমতা;
(চ) নির্মাণাধীন, সমাপ্ত বা মুক্তিপ্রাপ্ত কোনো চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য অনুদানের জন্য বিবেচিত হবে না;
(ছ) চুড়ান্ত অনুদান প্রদানের পূর্বে চলচ্চিত্র প্রাথমিক বাছাইয়ের পর মূল কমিটি কর্তৃক বা মূল কমিটি কর্তৃক গঠিত সাব-কমিটি প্রযোজক/পরিচালকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে সামগ্রিক যোগ্যতা সহ অন্যান্য বিষয়াদি পরীক্ষাপূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন;

গত ২৪ এপ্রিল ২০১৯ পূর্ণদৈর্ঘ্য শাখায় অনুদানের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। প্রজ্ঞাপনে মোট ৮টি চলচ্চিত্রকে সরকারি অনুদান দেয়া হয়। অনুদানে অনিয়ম হয়েছে স্বীকার করে অনুদান কমিটির চার সদস্য পদত্যাগ করে। পদত্যাগের পর তথ্যমন্ত্রীর বাসভবনে একটি নৈশভোজের পর অনুদান কমিটির চার সদস্য তাদের পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। চার কমিটির পদত্যাগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ হিসেবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার বরাতে জানা যায় যে-কারণে তারা পদত্যাগ করেছিল সে-বিষয়ে কমিটির বাকি সদস্যরা ঐক্যমত হয়েছে। অনুদান কমিটির চার সদস্যের পদত্যাগের কারণ গত ১৪ মে ২০১৯, অনুদান কমিটির শেষ সভার সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়। ‘স্বপ্ন মৃত্যু ভালবাসা’ নামের আরেকটি কাহিনিচিত্র চূড়ান্ত অনুদানতালিকায় সম্পৃক্ত হয়। চলচ্চিত্রটি অভিনেত্রী শমী কায়সারের নামে অনুদান পায়। শমী কায়সার চলচ্চিত্রটির প্রযোজক। প্রযোজক নিজেই বলছেন অনুদানের জন্য তিনি আবেদন করেননি।

নতুন সংযোজিত চলচ্চিত্র সহ মোট ৯টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে মোট ৪ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা সরকারি অনুদান প্রদান করা হচ্ছে।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে চলচ্চিত্রে যে যে ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে তা নিম্নরূপ :
১। ‘নসু ডাকাত কুপোকাত’, ‘মেলাঘর’, ‘রাতজাগা ফুল’, ‘অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’, ‘১৯৭১ সেইসব দিন’ এবং ‘স্বপ্ন মৃত্যু ভালবাসা’-এর নির্মাতাদের পূর্বনির্মিত একটি চলচ্চিত্র অথবা নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট এক বা একাধিক চলচ্চিত্রে তাদের কোনো ভূমিকা আছে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এখানে ১২-এর (ক) ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে।

২। ‘রাতজাগা ফুল’ এবং ‘এই তুমি সেই তুমি’ নির্মাতাগণ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বলছেন তাদের চলচ্চিত্র প্রধান চরিত্র এখনো চূড়ান্ত নয়। তাহলে কিসের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত চলচ্চিত্রের জন্য মনোনীত শিল্পী-কলাকুশলীর মান ও অভিজ্ঞতা যাচাই করা হয়েছে। এখানে ১২-এর (গ) ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে।

৩। যে-সকল চলচ্চিত্র সরকারি অনুদানতালিকায় এসেছে সেগুলোর নির্মাণ সংস্থাগুলো থেকে একটি চলচ্চিত্রও পূর্বে নির্মিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাণ সংস্থার কারিগরি, আর্থিক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা আছে তা প্রমাণিত হয় না। এখানে ১২-এর (ঘ) ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে।

৪। আর্থিক সক্ষমতা না থাকার কারণেই চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদানের চূড়ান্ত তালিকায় থাকা প্রযোজকরা নিজস্ব বিনিয়োগে একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেনি। এখানে ১২-এর (ঙ) ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে।

৫। ‘বিলকিস এবং বিলকিস’ একটি নির্মাণাধীন প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বার্লিনাল ট্যালেন্ট প্রোগ্রামে ইরানি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা মিনা কেশহাভারাজকে চলচ্চিত্র কো-প্রডিউসার হিসেবে পাওয়া যায়। এরপরে সেখানে পিচ করে ফ্রান্সের একজন প্রযোজককে পেয়েছে বলে নির্মাতা গণমাধ্যমকে জানিয়েছে। বার্লিনাল ট্যালেন্ট প্রোগ্রামের ওয়েবসাইটে চলচ্চিত্রটি নির্মানাধীন দু’টি শটের স্টিল দেখা যায়। এখানে ১২-এর (চ) ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে।

৬। প্রাথমিক বাছাইয়ের পর বাছাই কমিটি যে সুপারিশতালিকা অনুদান কমিটিকে হস্তান্তর করেছে সেই তালিকায় থাকা প্রত্যেক প্রযোজক অথবা পরিচালকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে সামগ্রিক যোগ্যতা সহ অন্যান্য বিষয়াদি পরীক্ষাপূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করার ধারা থাকলেও চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুতের আগে কোনো চলচ্চিত্রের প্রযোজক অথবা পরিচালকদের কোনোপ্রকার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়নি। এখানে ১২-এর (ছ) ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে।

৭। ‘বিধবাদের কথা’ চলচ্চিত্রের নির্মাতা ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে একটি চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদান পেয়েছিল। অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাণের শর্তের ২২ ধারা (অনুদানের প্রথম চেক প্রাপ্তির ৯ মাসের মধ্য নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে) লঙ্ঘিত হলে তথ্য মন্ত্রণালয় মামলার সমন জারি করে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে একটি পেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। সেইসাথে অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাণের শর্তের ৩০ ধারা লঙ্ঘন করে চলচ্চিত্রটির মূল প্রযোজকস্বত্ব একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তর করে। “অনুদান প্রদান নীতিমালা-২০১২ (সংশোধিত)”- খেলাপকারী একজন নির্মাতা একজন প্রযোজক হিসেবে আর্থিকভাবে অক্ষম হওয়াই স্বাভাবিক। এখানে ১২-এর (ঙ) ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে।

৮। অনুদানের জন্য আবেদন না করেই ‘স্বপ্ন মৃত্যু ভালবাসা’ নামের চলচ্চিত্রটি অনুদান পেলে অনুদাননীতিমালার কোন কোন ধারা লঙ্ঘিত হয়নি এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে।


পোস্টস্ক্রিপ্ট  / এই রচনাটা সজীব তানভীরের ফেসবুকপেইজ থেকে কালেক্ট করা হয়েছে। যদিও তথ্যবহুল রচনাটা তানভীর শেয়ার করেছেন মাত্র, ছোট্ট একটা অ্যাড্রেসিং প্যারাগ্র্যাফ যুক্ত করে, উপস্থাপনকৃত মূল রচনাটি লিখেছেন ফিল্মমেইকার খন্দকার সুমন। গানপারে এর আগে একই থিমে একটা ভালো প্রতিবেদন আপ্লোড করা হয়েছে যেইটি লিখেছেন সজীব তানভীর, ‘যতদিন অনুদানের বাটপারির হাতে চলচ্চিত্র, একধাপও সামনে যাবে না দেশ’, যেখানে একদশকের অনুদান-বরাদ্দ ও অর্থ-তছরুপের খতিয়ান উঠে এসেছে। বর্তমান প্রতিবেদনটা ২০১৯ সালের অনুদানগ্রহণকারীদের বেলায় যেসব অনিয়ম ও নীতিলঙ্ঘন পরিলক্ষিত হয় তার একটা গ্র্যাফ সম্বলিত। খন্দকার সুমন এই প্রতিবেদনে যেভাবে পয়েন্ট বাই পয়েন্ট অনিয়মগুলা আনভেইল করেছেন তা গানপারে ডকুমেন্টেড রাখার তাগিদে শেয়ারকারীর মাধ্যমে মূল প্রতিবেদকের পরোক্ষ সম্মতি নিয়া আপ্লোড করা হলো। — গানপার

COMMENTS