সোনার বাংলা সার্কাস ডেব্যু অ্যালবাম লাইভ রিলিজ ইনোগারেশন

সোনার বাংলা সার্কাস ডেব্যু অ্যালবাম লাইভ রিলিজ ইনোগারেশন

হায়েনা এক্সপ্রেসসোনার বাংলা সার্কাস ব্যান্ডের ডেব্যু অ্যালবাম এবং টাইটেল-স্যং। অ্যালবামটা রিলিজ হয়েছিল ২০২০ ফেব্রুয়ারিতে। সেই সময়টায় চিনের উহানে এবং দুনিয়ার আরও কোথাও কোথাও কোভিড/করোনা আউটব্রেকের কারণে মানুষ মরতেসিল কাতারে কাতার, আর আমরা তখনও বগল বাজাচ্ছিলাম আমাদের কিছু হবে না বলে বলে। এরপর মার্চের মাঝামাঝি আমাদেরও স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিগুলা তালা মারা হলো, মাসের শেষে বে/আধা/পূর্ণ-সরকারি সহ সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলো, লকডাউনে গেল দেশ। শুরুর দিকে দেশের একমাত্র মালিক পিএম হাইনেসও মশকরা করতেসিলেন করোনা জিনিশটা নিয়া, আমরাও সবাই মিলে তা-ই করতেসিলাম, ঘাটের মড়া কী-একটা মন্ত্রী চাবায়া-চাবায়া বলতেসিল যে আওয়ামী লীগ করোনার চেয়েও শক্তিশালী ইত্যাদি। নিশ্চয়। মিনিশ্টারটা আজও বোধহয় টের পায় নাই কী সাংঘাতিক সত্য প্রকাশ করে ফেলেছে সে ভ্যাব্লার ভঙ্গিতে। অ্যানিওয়ে। এরপরে তো শুরু হলো মরিয়া বাঁচনচেষ্টা। প্রাণান্ত তামাশা।

হায়েনা এক্সপ্রেস’ অ্যালবামের আবির্ভাব ওই সময়টাতেই। মানে, ফেব্রুয়ারিতে, ডেথট্রল শুরু হবে অ্যালবাম প্রকাশেরও পক্ষকাল পরে। হ্যাঁ, আবির্ভাব শব্দটা ব্যবহার করা যায় আত্মপ্রকাশের বদলা। অ্যাট-লিস্ট এই অ্যালবাম অ্যাপ্রিশিয়েট করার ক্ষেত্রে একটু ওজনদার শব্দপ্রয়োগ দোষের নয়। এইটা সোনাবন্ধুর পিরিতিমার্কা অ্যালবাম নয়। এর গীতাখ্যগুলো পোলিটিক্যাল মেনিফেস্টেশনের রিমার্কেবল নজির। এর আগে ফিডব্যাক, ওয়ারফেজ, মাকসুদ ও ঢাকা ব্যান্ডত্রয়ের লিরিকে এবং টোট্যাল প্রেজেন্টেশনে যে-স্ট্রেন্থ লক্ষ করা যায়, যা বহুদিন ধরেই মিসিং ছিল, সার্কাসের অভিষেক অ্যালবামে সেই স্মৃতিটাই ফিরল অনেক বিস্তার ও বেদ সমেত।

কন্সেপ্চুয়্যাল অ্যালবাম বলা হচ্ছে একে; অ্যালবামের নয়টা গানের লিরিক দিয়া আদ্যোপান্ত সভ্যতার ভ্রমণ একটা, জার্নি মানবজাতির গোড়া থেকে এই বিকল চূড়া পর্যন্ত, কাহিনি দেশনির্বিশেষে এই কালের। এই অ্যালবামের রিভিয়্যু করার জন্যে যেটুকু প্রস্তুতি, সময় ও সংগতি দরকার তা এ-মুহূর্তে এই নিবন্ধকারের নাই। বিগত কুড়িকুড়ি খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরের দিকে এর দুইটা গানের লাইভ ভার্শন রিলিজ হয়েছে, সেই দুইটার প্রথমটা ‘হায়েনা এক্সপ্রেস’ আর দ্বিতীয়টা ‘আমার নাম অসুখ’। প্রথমটা শোনার অব্যবহিত পরের তাৎক্ষণিক সংবেদ এই নিবন্ধ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যান্ডের বরাত দিয়া আমরা যা জানতে পারতেসি তা এ-ই যে, গ্লোব্যাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে রিলিজ-করা লাইভ কন্সার্টের আদলে একটেকে সব ভিডিয়ো ও অডিয়ো রেকর্ডিং সম্পূর্ণ আনকাট এবং কোনো ওভারডাব ছাড়াই প্রেজেন্টেড। মুক্তকন্সার্টের লগে এর তফাৎ এ-ই যে এখানে দর্শক অনুপস্থিত। ব্যান্ডের বরাতে আরও জানা যায় যে ক্রমশ অন্য গানগুলাও প্রকাশ করা হবে একই প্রক্রিয়ায়। হায়েনা এক্সপ্রেস  দিয়া ইনোগারেইট করা হয়েছে শুধু। নয়া নর্ম্যালে এছাড়া গত্যন্তর সহসা নাইও বোধহয়। তথাস্তু।

স্টুডিয়োরেকর্ডেড ভার্শন বলি কিংবা এইখানকার ‘লাইভ’, কন্টেমপ্লেটিভ মিউজিকের এক উদাহরণীয় খণ্ড। মনে রাখার মতো মিউজিক এক্সপেরিয়েন্স। গিটার … গিটার … গিটার এভৃঅয়্যার। নট অ্যা সিঙ্গল ড্রপ টু বি অ্যাভোয়েডেড। অরণ্যাচ্ছন্ন আবহ তৈয়ার করে রেখেছে গোটা চোদ্দ মিনিট ঊনপঞ্চাশ সেকেন্ড। দুই মিনিট সাঁইত্রিশ সেকেন্ডের চড়ুই মিউজিকের মজমায় এ যেন অতিকায় তিরবিদ্ধা হাতির ত্রাহি চিৎকার। অথচ আক্ষরিক চিৎকার নাই কিন্তু! অথচ নাই চিপাচাপায় চমকবাজির চাকচিক্য। পুতুপুতু লালিত্যের রকাঢ্য লবডঙ্কা বা রাগী কাজিয়াফ্যাসাদের মেটালপনাও নয়, এর ব্যক্তিত্ব আলাদা। ব্যক্তিত্বই মিউজিকের মোদ্দা মাল। পল্লিগীতি থেকে ফাঙ্ক-রক-ফোক-পপ ও অন্যান্য গপশপ সবকিছুরেই ব্যক্তিত্বটা হাসিল করতে হয়, নাহলে মিউজিকের নামে পিজিয়ন হয়। তা-ও অবশ্য মন্দ কিছু নয়। পিজিয়ন-টুনটুনি মন্দ কিছু না। বাজারকাটা বালিশ হইতেই তো সংগীতের সাধনা বাংলায়। কিন্তু ‘সোনার বাংলা সার্কাস’ (Shonar Bangla Circus) বোধহয় এখনও ওই রাস্তা মাড়াইকারী নয়। তেমন ইন্টেনশন ব্যান্ডটার ভাবগতিকে এখনও গোচর হয় নাই।

কিছুদিন আগে, একদম লকডাউনের প্রাক-কালে, এই গানেরই নামাবলম্বী অ্যালবামে যেমন প্রস্তার নিয়া গানটা গাওয়া, এইখানে এর লগে যুক্ত হয়েছে নিরীক্ষণযোগ্য নয়া সাংগীতিক কিছু অভিব্যক্তি। ইম্প্রোভাইজেশন। এবং সে যে কী দুর্ধর্ষ পরিমাণে এবং মানে, এর অ্যালবামভার্শনে ছয় মিনিট আঠারো সেকেন্ড ব্যাপ্তিটাকে চোদ্দ মিনিট ঊনপঞ্চাশ সেকেন্ডের এক মহাজাগতিকতায় নিয়া যাওয়া হয়েছে, তার মানে এখানে কী পরিমাণে মিউজিক হয়েছে সব মিলিয়ে, মহোদয়গণ, বোঝা যায়? গানটার গায়ক, গীতলেখক ও সংগীতকার প্রবর রিপন (Probar Ripon) তাঁর গলায় যেই দাঁতচাপা ধ্যানস্থ তুজুর্বা দেখান এইখানে এবং অন্যত্র, শরীর শিউরানো। বহুদিন বাদে, জেমসের বহুদিন বাদে, এইখানে এই গলায় সেই স্ক্রিব্লিং, সেই ডুডলিং, অর্থবহ ডুডলিং, তাৎপর্যপূর্ণ ডুডলিং, গানের শেষদিকে এই জিনিশটা আরও উড়তাই হয়েছে। এই জিনিশ মনে রাখতে হবে আরও বহুদিন মিউজিকশ্রোতাদেরকে।

এই অ্যালবামের গোটা-আটেক/নয়েক গানের সঙ্গে এর অন্তত তিনমাস পরে বেরোনো বব ডিলানের ‘রাফ অ্যান্ড রাউডি ওয়েইস্’ অ্যালবামের আটটা গানের মিউজিকের শ্রবণাভিজ্ঞতা নিয়া কেউ যদি লিখত বাংলায়! লিসেনিঙের বেইসিসে, মেইকিঙের বেইসিসে নয়। মানে, উভয়ের মিউজিকনির্মাণস্টাইল বা লিরিকমেইকিং কোয়ালিটি নয়, লিসেনিঙের পরে একটা ভাবাবেশের তুল্যমূল্য প্রতিবেদন হতে পারে। আই উইশ আই ক্যুড!

এমন তো অন্য সবকিছু, অনেককিছু নিয়াই হতে পারে। এমন তুল্যমূল্যাঙ্কন হতে পারে। এমন যদি হতো, তবে কেমন হতো? উড়ে উড়ে বেড়াইতুম সারাক্ষণ, আমি পাখির মতো? পোলাভুলানি ডিসগাস্টিং কথাবার্তা সব। যা হবার তা হয়ে গেছে। হায়েনা এক্সপ্রেস হয়ে গেছে। আর কিছু তো হবার দরকার নাই। মিউজিক হ্যাপেন্স। যদিও উৎপাদন/প্রোডাকশন হিশেবেই দেখা হয় মিউজিকটাকে আজকাল, হরেদরে সেই জিনিশ উৎপাদিত হতে দেখি হরহামেশা, ফলে উৎপাতের সীমা নাই দিনদুনিয়ায়। মিউজিকভিডিয়োর নামে ফ্যাশনকোরিয়োগ্র্যাফি সেই-যে শুরু হলো, চলতেসে দেদারসে; এই জিনিশের নিস্তারহীন উৎপাতের হাজার বছর পরে অ্যানিম্যাশনের নামে যেই বিতলামি স্টার্ট হয়েছে, এইটা আরও কয় হাজার বছর চলবে আল্লায় জানে। এমনিতে অ্যানিম্যাশন বা কোরিয়োগ্র্যাফি ডিস্টিংক্ট আর্টফর্ম হিশেবে তো তারিফযোগ্য, কিন্তু গানের লগে এর প্রাদুর্ভাব     হ্যাপেনিং হিশেবে, বিকামিং হিশেবে, ব্যাপারটা কালেভদ্রে দেখা মেলে বাংলায়। যেমন সোনার বাংলায় দেখা গেল বহুদিন বাদে।

এই  ‘লাইভ’-এর ক্যামেরাপ্রবাহ আর এর আলোয় যে থকথকা শান্ত পরিত্যক্ততা, তা সংক্রামক। মনে থাকবে। এইটা এতই নিপুণ ও লক্ষ্যভেদী নির্মাণ হয়েছে যে একে এডিটিং টেবিলে নেয়া হয় নাই ভাবতে পারছি না। কোকমিউজিকের স্টুডিয়োসেটের, বা তারই ইমিটেশন আমাদের দেশের তাপসবাংলার, ঝাকানাকা ধামাকার সেটের রিপ্লাই হিশেবে এই শক্তপোক্ত বুদ্ধিদীপ্ত মিনিম্যালিস্ট সেটকল্পনা তারিফ করতেই হবে। একে লাইভ কেন বলব, কর্তৃপক্ষ বলছেন যদিও, সম্পাদনা আর এর পরিচালনা এতই সুচারু। দুই মিনিট সাঁইত্রিশ সেকেন্ড মেয়াদের কাউয়াডুবের বঙ্গোপসংগীতসাগরে এহেন চোদ্দ মিনিট ঊনপঞ্চাশ সেকেন্ড চুবায়া রাখবার সিদ্ধান্তটাই তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্তব্য। ওই সিদ্ধান্তের ভিতরেই মূল ঘটনাটা ঘটে যায়। বাজারের ব্যাজস্তুতি থেকে এর তফাতে থাকবার বাসনার মধ্যেই মিউজিক লুকানো, ভবিষ্যতের বাংলাদেশের গানবাজনা লুকানো; গোটা বাংলাদেশটা ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণকালেই একবার করে এগোবার মওকা পায়।

হায়েনা এক্সপ্রেসের সিডাক্টিভ ব্ল্যুজ শোনা হলো। জরুরি এইবার এর ল্যুপ থেকে, এই আসক্তি থেকে, এর আচ্ছন্নতা থেকে বেরোনো। যথেষ্ট আয়াসসাধ্য হবার কথা কাজটা। লেট’স্ ট্রাই।


সোনার বাংলা সার্কাস ব্যান্ডের ইউটিউবপেইজ
‘হায়েনা এক্সপ্রেস’ গানের লাইভ ভার্শন
‘আমার নাম অসুখ’ গানের লাইভ ভার্শন

… …

COMMENTS

error: