ধ্রুপদী শিল্পী হিশেবে উত্থান ঘটেছিল শোভা মুড়গালের (Shubha Mudgal); যে-কারণে তিনি যখন প্যপ-ফিউশন এসবের দিকে এলেন, ক্ল্যাসিক্যালের জাত গেল জাত গেল বলে বেশ-একটা আওয়াজ উঠেছিল তখন জোরেশোরে। সেসব নিয়ে শোভার অবশ্য কোনো মাথাব্যথা নাই কিংবা ছিল না কখনোই। প্যপজগতে এসে তিনি যে-সাফল্য লাভ করেছেন সেটাকে নিজের যোগ্যতা মনে করেন। বিশেষ করে দারুণ প্রতিযোগিতার গ্ল্যামারপ্রবণ সংগীতের সার্কিটে তার মতো শাড়ি-টিপ-কাজলপরা শিল্পী বড্ড বেমানান। নব্বইয়ের দশকের এমটিভি-চ্যানেলভি জমানার সাথে শোভা যেন খাপ খায় না। কিন্তু অ্যাটিট্যুড এবং আউটল্যুক ছাপিয়ে গেছে তার গায়কী এবং পার্ফোর্ম্যান্স।
গত শতাব্দীর শেষদিকটায় ভারতীয় শোভা মুড়গাল এবং ব্রিটিশ পিয়ানোবাদক নিকি ইয়ো-র যুগলবন্দী ‘আলি ম্যেরে আঙ্গানা’-র টিন্যাইজারদের কাছে পর্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এর অসাধারণ বিটটি ছিল হিট আইটেম। মাঝখানে দীর্ঘ বিরতির পর শোভা আবার প্যপসার্কিটে ফিরে এসেছিলেন নব্বইয়ের দশকের অন্তিমে তার ‘আব্ ক্যে সাওন’ অ্যালবাম নিয়ে। এসেই এমটিভি ইন্ডিয়া হিট লিস্ট কাউন্ট ডাউনের দ্বিতীয় স্থানটি দখল করেছিলেন।
শোভা মুড়গালের গানের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে তার মেট্যালিক, শক্তিশালী এবং ভরাট কণ্ঠ। এটা একেবারেই মিষ্টি মিষ্টি টাইপ নয়। সেই-সময় মিউজিকমার্কেটে ছিল তার ব্যাপক চাহিদাও। শ্রোতা থেকে শুরু করে স্পন্সার, মিউজিকচ্যানেল, রেকর্ডকোম্প্যানি সকলেই তখন শোভাকে চায়। সেই-সময়ের এমটিভি-ইন্ডিয়ার অনুষ্ঠানপরিচালক কল্যাণ সুন্দরাম বলেন, তার মিউজিকব্র্যান্ডটা অর্থাৎ সুফি-প্যপ এবং ক্ল্যাসিক্যালের ফিউশন একটা উল্লেখযোগ্য প্রধান ঘটনা তখনকার মিউজিক-ইন্ডাস্ট্রির জন্য।

অন্যদিকে শুদ্ধতাবাদীরা খাপ্পা ছিলেন তখন ধ্রুপদী নিয়ে শোভার একের-পর-এক পরীক্ষানিরীক্ষায়। তার প্যপ শুনতে খুবই আনমিউজিক্যাল, — এক সমালোচকের কণ্ঠে এহেন স্পষ্ট উক্তি ছিল তখনকার মিউজিকলিটারেইট অনেকেরই মনের কথা। তাকে প্রাথমিক অবস্থায় একজন স্টার বলা হলেও পরবর্তীকালে তাকে ক্ল্যাসিক্যাল শিল্পীই বলা হয়েছে। কখনো-কখনো বলা হয়েছে শুধুমাত্র লাইট-ক্ল্যাসিক্যাল শিল্পী। “শোভার একজন ভালো সলো শিল্পী হবার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু প্যপ এবং খেয়ালের মিক্সিং করাটা কঠিন বিষয়। একটাকে গ্রহণ করলে অপরটি বাদ দিতে হবে” — বলেছেন শোভা সম্পর্কে শ্রীরাম ভারতীয় কলাকেন্দ্রের পরিচালক দীপক সিং।
গত শতকের আশির দশকের শেষদিকে শোভা প্রথম মিউজিকসার্কিটে আসেন। তখন তাকে গণ্য করা হয়েছিল অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ল্যাসিক্যাল গায়িকা হিশেবে। এক-সময়, এবং অচিরেই, এই সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রিয়তা, টাকা এবং মার্কেটের প্রতি শোভার মোহ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।
এইসব সমালোচনায় অবশ্য শোভার কিছুই যায় আসে না। বরং ক্ল্যাসিক্যাল সার্কিটের প্রতিই তার কিছুটা ক্ষোভ রয়েছে। ধ্রুপদী মিউজিকক্ষেত্রের সকলের খানিকটা অবজ্ঞা রয়েছে প্যপ ঘরানার প্রতি। কিন্তু কোনো সংগীতকেই খারাপ বলা যাবে না যতদিন পর্যন্ত এটা মানুষের প্রশংসা পাবে। শোভার কোনোপ্রকার হীনম্মন্যতা নাই প্যপ শিল্পী হিশেবে নিজের পরিচয় দিতে। কেননা প্যপের মাধ্যমেই তিনি করতে পারছেন এক্সপেরিমেন্ট এবং ইম্প্রোভাইজেশন। কবীর, তুলসী, মীরা এবং সুফি কাব্য থেকে লিরিক নিয়ে রক্-ন্-রল্ বিটে গেয়েছেন ‘আব্ ক্যে সাওন’। মুড়গালের গায়কী এবং সুরের কারণে অ্যালবামটা সার্বিকভাবেই সফল হয়েছিল। শুধু গায়িকা হিশেবেই নয়, কম্পোজার শোভাও সফল হয়েছেন। জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছেন সংগীতপরিচালক হিশেবে নিজের দেশে, অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন ‘অমৃতবীজ’ ডকুমেন্টারির সংগীত পরিচালনার জন্য। মীরা নায়ারের ‘কামসূত্র’ ম্যুভির সাউন্ডট্র্যাকটাও শোভার করা। রাজেন কোশা-র ‘ড্যান্স অফ দ্য উইন্ড’-এর সাথেও শোভা আছেন।

শোভা মুড়গালের সাংগীতিক জীবনের এই প্রথাবিরোধী মনোভাবের প্রভাব পড়েছে তার ব্যক্তিজীবনে। শোভার গান শেখাটাও অন্যদের থেকে বেশ ভিন্ন। এলাহাবাদ য়্যুনিভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক তার পিতা। পারিবারিকভাবে গানটা পাননি। তবে এলাহাবাদ হচ্ছে গানের এলাকা। কলেজে ঢোকার পর তিনি ঠিক করলেন গান শিখতে হবে। এ-কারণেই অনেকে বলেন কি না তার গায়কী কোনো ঘরানা বা স্টাইলে পড়ে না।
শোভা তালিম নিয়েছেন অনেকের কাছ থেকে। অনেকেই তার সংগীতগুরু। প্রথমে শেখেন পণ্ডিত রাম আশরিয়া ঝাঁ-র কাছে। দিল্লিতে আসার পর শিখতে গেছেন পণ্ডিত বসন্ত্ থ্যাকারের কাছে। পরবর্তীকালে আরো অনেকের কাছেই শিখেছেন। মজার বিষয়, গানের বাইরে শোভার ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে কম্পিউটার নিয়ে। একটা সাইট আছে গানকেন্দ্রী যা শোভা সঞ্চালনা করেন। ডাব্লিউডাব্লিউডাব্লিউ-ডট-রাগসংগীত-ডট-কম শোভার সঞ্চালিত ওয়েবসাইটের নাম। এতে ভারতীয় সংগীত সম্পর্কে বেশ ভালো তথ্যই পাওয়া যায়।
লেখা : জিনাত জাহান
সূত্র : চতুর্থ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা আনন্দভুবন ১৯৯৯ ঢাকা
গানপার কর্তৃক ঈষৎ সংক্ষেপিত ও অনেকাংশ সম্পাদিত
… …
- In all departures there is an arrival & other poems || Roushan Hasan - September 11, 2026
- সাম্যের দিকে যেতে যেতে লেখাপত্র || রোদ্দুর রিফাত - September 10, 2026
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026

COMMENTS