রবি ঠাকুরের দলটির প্রথম চরিত্র-লক্ষণ তাহলে এই সংযত সাহস। ত্যাগের উপরেই এই সাহসের প্রতিষ্ঠা, কিন্তু মনের সংযমে কোথায় যেন ‘ভদ্রলোক’ শব্দটা মনে আসে। সেজন্য নিখিলেশের অন্য একটি বক্তব্য দেখা দরকার। আপনারা অবগত আছেন যে, বিমলার মধ্যে একটা রাজরানির মেজাজ ছিল। শুনেছি তাঁরা ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। এই সম্পর্কেই নিখিলেশের স্মরণীয় মন্তব্য রবি ঠাকুরের দলটির দ্বিতীয় চরিত্র-লক্ষণের ঠিকানা জোগাবে। নিখিলেশ বলেছিল :
আমার মধ্যে বোধহয় গুহক এবং একলব্যের রক্তের ধারাটাই প্রবল। আজ যারা আমার নিচে রয়েছে তাদের নিচ বলে একেবারে দূরে ঠেলে দিতে পারিনে। আমার ভারতবর্ষ কেবল ভদ্রলোকেরই ভারতবর্ষ নয়। আমি স্পষ্টই জানি, আমার নিচের লোক যত নাবছে ভারতবর্ষই নাবছে। তারা যত মরছে ভারতবর্ষই মরছে।
এই অল্প ক’টি কথায় নিখিলেশ দুটি অন্তত বেয়াড়া কথা বলছে। প্রণিধান করুন। উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্ণের মানুষকে নিখিলেশ ভদ্রলোক বলে ভুল করছে। কিন্তু উচ্চবিত্ত ছোটলোক আপনিও দেখেছেন, আমিও দেখেছি। তার চাইতে রবীন্দ্রনাথের কথাই মেনে নিই : ব্রাহ্মণ তাঁরাই যারা সত্যসম্ভব। তেমন ব্রাহ্মণ তো আজ পাবেন না। একটু-আধটু জল মিশিয়ে সেই সত্যসম্ভব ব্রাহ্মণ থেকে আজকের ভদ্রলোক। সেকেন্ড ক্লাস ট্রামে উঠলে এদের দেখা পাওয়া যায় বেশি। নিখিলেশ কিন্তু ওই রকম একটা ভুল কথা বলেই থেমে থাকছে না। নিখিলেশ সেকেন্ড ক্লাস ট্রামেই চলবে, পারলে পায়ে হেঁটে চলবে। জনতার মধ্যে ভদ্রলোকের সন্ধান নিখিলেশের মজ্জাগত। বিবেকানন্দ বলে গিয়েছেন পৃথিবীটা শূদ্রশক্তির, আমরা শুধু পথ আবিষ্কার করছি। এই সমাজ তো গুহক আর একলব্যের কথা তুলে নিখিলেশ বোধকরি সে-কথাই বলছে। এই যে সমাজের নিচের দিকে দল ভারী করার চেষ্টা এটাই বোধকরি রবি ঠাকুরের দলটির লক্ষণ। পারবেন কি না তা বলতে পারব না।
এই পারাপারির কথায় কয়েক বছর আগে লেখা গোরার কথায় আসি। গোরা কিছু-একটা ‘পারতে’ চাইছিল। কেন হলো না সে আপনারা জানেন। গোরা কী চেয়েছিল সেটা নিয়ে একটু ভাবি, রবি ঠাকুরের দলটিকে বোধহয় আরেকটু পরিষ্কার করে দেখতে পাবো। সহজ কথায় : গোরা ভারতবর্ষ নামক দেশটিকে শ্রদ্ধা করতে, ভালোবাসতে চাইছিল। দেশকে সংশোধন পরের কথা। অপমানের ভাগটুকু সকলের সঙ্গে নিতে না-পারলে, প্রথম সিঁড়িটাই থাকবে। দেশ জুড়ে আছে হিন্দুসমাজ। গোরা নিজেকে হিন্দু মনে করত। সেজন্য এই সমাজটিকে ভালোবাসার জন্য গোরা তৈরি হচ্ছিল। হিন্দুসমাজের ত্রুটিবিচ্যুতি – বিশেষ করে শহর থেকে গ্রামে চলে গেলে সমাজের যে গ্লানির চেহারা ফুটে ওঠে, গোরা সেই রূপটা ভালো করেই জানত। শুধু জানত না যে, ঘুষি পাকিয়ে ভালোবাসা যায় না। হারানবাবুর বিরুদ্ধে তর্ক করতে গেলে হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পরেশবাবু কি আনন্দময়ীর কাছে সে-হাতই আবার পায়ের ধুলো নেয়। গোরা উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ পরেশবাবুর মুখ দিয়ে কি আনন্দময়ীর কাজে নিজের কথা বলে গেছেন এ-সম্বন্ধে সন্দেহ রাখি না। কিন্তু গোরা একটু বেশি রকম জীবন্ত। এইভাবে একটি মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা এবং বাঁচিয়ে রাখা শিল্পীর কাজ। রবীন্দ্রনাথ একটা কাজ অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে করে গেছেন। নিজের মত ও অন্য মত যখন স্বতন্ত্র তখন অন্য মতের কোথায় জোর তিনি দেখতে পেতেন। বিশ্বসাহিত্যে শুধু এই জন্যই গোরার বেঁচে থাকা উচিত।
অবশ্য গোরা নামক মানুষটিকে রবীন্দ্রনাথ ঠেলে রাখেননি। গোরার মধ্যে কোথায় রবীন্দ্রনাথ শেষ এবং কোনখানে হিন্দু-গোরার প্রাধান্য বোঝা ভার। রবি ঠাকুরের দলটির চরিত্র-লক্ষণ নিয়ে যেহেতু আমরা ব্যস্ত সেহেতু গোরার দেশভক্তি জিনিশটা এই কথায় আমাদের বোঝা দরকার। মনে হয় এই দেশভক্তিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গোরার পাশেই ছিলেন।
চলবে
… …
- পোস্টমর্টেম ও অন্যান্য কবিতা || আবদুর রাজ্জাক - June 15, 2026
- সাহিত্যিকের পথরেখা : আয়ুর অরণ্যে এই স্মৃতির জোনাকি || জিহাদ মুনতাছির সাইম - June 14, 2026
- উইলি নেলসন মার্লি হ্যাগ্যার্ড : দুই লিজেন্ডের যুগলবন্দি - June 13, 2026

COMMENTS