অন্তিমযাত্রায় এবি রিভিজিটেড || ফাহিম ইনান

অন্তিমযাত্রায় এবি রিভিজিটেড || ফাহিম ইনান

অফিসের কাজে ফিল্ডে ছিলাম। সকাল এগারোটার দিকে হঠাৎ মায়ের ফোন : “বাবা, আইয়ুব বাচ্চু মারা গেছেন।” মায়ের মনটা খারাপ লাগছে বুঝতে পারলাম ফোনে তার গলা শুনে। কেন মনখারাপ জিজ্ঞেস করলে বলবে — আমার ছেলেদের প্রিয় গায়ক তো, তাই।

বেলা বারোটার দিকে আমার সহকর্মী জাহেদ ভাইয়ের ফোন : “ফাহিম, শুনেছেন?” জাহেদ ভাইয়ের সাথে বহুবার বহু সন্ধ্যায়-বিকেলে বাংলা ব্যান্ডসংগীতে আইয়ুব বাচ্চুর শ্রেষ্ঠতা নিয়ে মধুর তর্ক করেছি। ব্যান্ডসংগীতের ভুবনে এবির অবস্থান, অবদান, যোগ্যতা, ভালোলাগা ইত্যাদি নিয়ে এলোমেলো ও গোছালো নানা আলোচনার পরেও আমার মতো পাঁড় এবিভক্তের সাথে একেবারে ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট শ্রেষ্ঠত্বের এন্ডোর্সমেন্টে উনি সহমত পোষণ করতেন না। আজ ফোনে তার গলাটা এত মলিন লাগল!

দুপুর দেড়টার দিকে লাঞ্চব্রেকে নিপাকে ফোন দিলাম। সহপাঠী সুহৃদ বন্ধু। ‘জলজোছনার মাঝে ভালোলাগা ছড়ালাম’ — কত লক্ষকোটিবার গেয়েছি একসাথে! আমি, নিপা, রোমেল, হীরা, তানভীর, আসাদ … আকাশজোড়া তারার মতো ছড়ানো কত কত মুহূর্ত ও মহাজীবনের বন্ধুত্ব! সবার কথা সারাদিন ধরে থেকে-থেকেই মনে পড়ছিল। সকলেই আমরা কমবেশ এবিসূত্রে গাঁথা। সবাইকে তো ফোন করা হয় না এখন আর। ব্যস্ততার বিকট দাঁতের তলায় পিষ্ট সকলেই। কিন্তু জানি আজকের দিনে, এবির অন্তিমযাত্রার বিউগল শুনে, এরা প্রত্যেকেই আমার মতো কোথাও-না-কোথাও মনখারাপ বসে আছে বা কাজের ভিতর নিজেকে ভুলিয়ে রাখছে। এবিগান আমাদের সেই টালমাটাল বন্ধুদিনের গান। এবিগান সসব্যস্ত বাস্তবতায় নিজেকে মনে-পড়ানোর গান। এবিগান শত কদর্যতায় জীবন উদযাপনের গান।

সমস্ত দিনের কর্তব্য সেরে ঘরে ফিরেছি সন্ধ্যার পরে। রাত সাড়ে-নয়টার দিকে টেলিভিশন অন করে দেখি বরগুনা থেকে লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে উন্নয়ন কন্সার্ট। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ও অর্থায়নে আয়োজিত কন্সার্ট। বসে আছি টিভিস্ক্রিনে শূন্য চোখ রেখে। জেমস্ মঞ্চে আসবেন বলে একটু পর পর ভেসে আসছিল উপস্থাপকের ঘোষণা। না, গান শুনব বলে নয়, আমি বসে আছি এবিকে নিয়ে জেমস্ কি বলে বা আদৌ বলে কি না তা শুনতে। বাংলাদেশের এক গ্রেইট মিউজিশিয়্যানের প্রস্থানদিনে আরেক গ্রেইটের ট্রিবিউট তর্পণের আদব দেখব বলে টেলিভিশনের সামনে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত বসে আছি। এবং জেমস্ বলল! — শুধু বলল নয়, আরও বেশি কিছু, এমন মুহূর্তের সাক্ষী রইলাম আমরা। শ্রদ্ধা শব্দটার ভিতরে যে বিষণ্ণ সৌরভ, যে ওজন, মনে হলো জেমস্ যেন সৌরভের পুরো কৌটো উপুড় করে ঢেলে দিলো তার প্রিয় বাচ্চু ভাইয়ের জন্য। যদিও শূন্য লাগছিল সারাদিন, আমার কাজের মাঝে মাঝে এবিসুরে কাটানো দুরন্ত সেই জীবনছবি মনে পড়ছিল যদিও, তবু চোখ ছিল অশ্রুহীন শুকনো স্বাভাবিক। শুধু টিভিস্ক্রিনে জেমসের চোখে পানি দেখে এই প্রথম আমারও চোখজোড়া ঝাপসা হলো। জেমস্ — এই পাথরও যে কাঁদতে জানে, এইটা জানা হলো। শুরু করল, মঞ্চে এসেই কপালে-ঠেকানো করজোড়ে সমবেত জনতাকে অনার জানাল, দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়েও অনুষ্ঠান চলবে বলল। অনুষ্ঠান কিন্তু থমকে গেল অল্প গিটারিঙের পরেই। মিনিট-চারেকের মধ্যেই হোঁচট খেল জেমসের তিন-দশক-ধরে স্টেজ-দাপানো প্রস্তরপ্রতিম শিল্পীসত্তা। পারলেন না আর আগাতে। জেমস্ পারলেন না বাচ্চু ভাই ছাড়া ব্যান্ডজগৎ মেনে নিয়ে স্বভাবসুলভ নির্বিকার গেয়ে বাজিয়ে যেতে। স্রেফ নিজেকে সামলানোর জন্য জনতার কাছ থেকে দশমিনিট সময় চেয়ে নিয়ে ব্যাকস্টেজে গেলেন জেমস্। পারবেন কীভাবে! এবির কাছাকাছি (হয়তো পাশাপাশি) তিনিই পোঁছাতে পেরেছিলেন, জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেছেন এবির সঙ্গে স্টেজে এবং স্টুডিয়ো-অ্যালবামে একমাত্র এই তিনিই। আজ আর প্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী নয়, জেমস্ যেন তার সহোদর অগ্রজকে, ব্যান্ডমিউজিক বাংলাদেশ পার্টের পুরোহিতকে, শেষ প্রণতি জানাচ্ছেন ডুকরে কেঁদে উঠে বারবার। জেমসের এই চেহারা আমাদেরে দেখতে হলো পয়লাবারের মতো। অভিজ্ঞতাটা, বিপন্ন বিস্ময়ের আর শ্রদ্ধাকাড়া এই অভিজ্ঞতাটা, আমি জীবদ্দশায় ভুলছি না।

কেউ-একজন বলছিল আমায় এবি সম্পর্কে একটাকিছু স্মৃতিচারণ করতে, কেমন করে এবিআচ্ছন্ন হলাম আমি, অ্যালবাম বা গান ধরে বলতে কবে এবং কেমন করে এবির সঙ্গে এই জীবনযাত্রা আরম্ভ হয়েছিল। মনে পড়ল না আইয়ুব বাচ্চু শোনার এক্স্যাক্ট প্রথম স্মৃতি। কিন্তু অনেক ভেবে দেখলাম যে মায়ের মুখের ছড়াগুলোর পরে গান নিয়ে আমার মাতামাতি যবে থেকে শুরু হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ভালোলাগা গানগুলো আইয়ুব বাচ্চুরই। এবির সুরে এবং এবির গলায়। “পথ হেঁটে হেঁটে হেঁটে হেঁটে যাই / মাঠ-পেরোনো বোকা কিশোর / মাঝদুপুর মায়ায় মায়ায় মায়ায় মায়ায় তোমায় খুঁজি / নাইবা যদি বন্ধু হলে চিনবেটা কী” … হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে কিশোর আমি তরুণ হলাম, একদিন জানি ভাটাও শুরু হবে। সংগীতবোদ্ধা হতে পারি নাই, চাইও নাই বোদ্ধা হতে। তবে শ্রোতা হতে পেরেছি। শচীনকর্তা, হেমন্ত, দুই-চারটা রবীন্দ্রসংগীত, রফি সাহাব, মুকেশ, লতাজি বা আশা ভোঁসলে থেকে নিয়ে আর্টসেল, শিরোনামহীন, সরলপুর সবই শুনি।

শ্রোতা হিশেবে আমি সর্বভূক। আর শ্রোতা হিশেবেই বলছি, এবং দায়িত্ব নিয়েই, আমার আনন্দ-বেদনা আমার উচ্ছ্বাস-নীরবতা, আমার পাওয়া আমার না-পাওয়া, আমার বন্ধুআড্ডা, আমার একাকিত্ব — বাস ট্রেন রিকশা বা বাইক — সবকিছুতেই সবখানেই কোনো-না-কোনোভাবে তোমার সুর মিশে আছে, এবি, প্রিয় প্রণম্য সংগীতজাদুকর হে! “বহুদূর যেতে হবে / এখনও পথের অনেক রয়েছে বাকি”, বিশ্বাস ছাড়ছি না ভালোবাসায়, বিশ্বাস রাখছি সুরে, এই সুন্দর বোধের উন্মেষও তোমাকেই শুনতে শুনতেই হয়েছে। হে রূপালি গিটারওয়ালা, আমার কাছে একদিনেরও পুরনো নও তুমি, প্রতিদিন নতুন তুমি, প্রতিদিন নবায়িত তুমি।  আমার প্রতিটি সকাল, অথবা ক্লান্ত বৃষ্টিভেজা দুপুর, বিষণ্ণ বিকেল, আদুরে সন্ধ্যা, রূপালি তারায় ভরা রাত, তোমাকে আমার কাছে নতুন করে এনে দেয়। এবি নিজের একটা গানে বলছেন, “আমি গানে গানে আসব ফিরে / কানে কানে দোলাব হৃদয় / তোমার সময়-অসময়ে / ক্ষণে-ক্ষণে প্রতিক্ষণে / বেলা-অবেলার আলিঙ্গনে / আমি থাকব তোমার ঠিক সবখানে”।

যা-ই হোক, আমার বিবেচনায় বাংলা ব্যান্ড কালচারটা একটা দীর্ঘ সময় যে-অল্পকিছু ব্যক্তি ধরে রেখেছিলেন এবি তাদের অন্যতম। সব শিল্পী বা ব্যান্ডের একটা আইডেন্টিক্যাল স্যং থাকে। এবির ব্যান্ড এলআরবিরও অমন গান আছে, যেমন অন্যদেরও আছে। এখন যদি বলা হয় যে ব্যান্ডসংগীত কালপর্বের একটা আইডেন্টিক্যাল স্যং উল্লেখ করতে, তাহলে এর রিপ্লাই কি হবে? একটু কঠিন হবে সেই রিপ্লাই, কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে ‘সেই তুমি’ বাংলা ব্যান্ডসিনের একটা আইডেন্টিক্যাল স্যং, অন্যতম এবং শীর্ষকাতারের। আর এই অবিশ্বাস্য সৃজনের পুরো হকদার একজনই, তিনি আইয়ুব বাচ্চু।

আমি শাদামাটা শ্রোতা হিশেবে বাংলা ব্যান্ড-অঙ্গনে এবির ইউনিক অনন্য অবস্থান নিয়ে একবিন্দুও সংশয়ের জায়গা দেখি না। আইয়ুব বাচ্চুর গান থাকবে, এবির গান লোকে শিখবে, শুনবে এবং গাইবে। আর, আজ থেকে, লোকে বলবে  — আমাদের একজন আইয়ুব বাচ্চু আছে। ছিলেন বলবে না, আছে বলবে।

হ্যাঁ। আমাদের একজন আইয়ুব বাচ্চু আছে।

… …

ফাহিম ইনান

COMMENTS