নকটার্ন, রেজারেকশান, কবিতা কিংবা সাইকাডেলিয়া || সাব্বির পারভেজ সোহান

নকটার্ন, রেজারেকশান, কবিতা কিংবা সাইকাডেলিয়া || সাব্বির পারভেজ সোহান

টিলাগড় পয়েন্ট, আহত চড়ুই এবং অন্যান্য আলাপ :  তৃতীয় কিস্তি

৬. 

‘আমি যামিনী তুমি শশী হে ভাতিছ গগন মাঝে’

নাইন্টিন সিক্সটি সেভেনে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার উত্তম কুমার থুড়ি মান্না দে কে দিয়ে যখন এই নিশাক্রান্ত ফিরিঙ্গি মনের তৎসম মৃদু ঘানঘোর ঘাটার পালক ছুঁইয়ে বাঙালি চিত্তকে নিতি নৃত্যের তা তা থৈ থৈ এর সন্ধান দিচ্ছেন, তখনই সুদূর পরবাসে অপর এক নিশাক্রান্ত-নেশাক্রান্ত কবি, ইউ মে সে পোয়েট্‌ ইফ ইউ ওয়ান্না সাউন্ডস আ বিট মোর কালচার্ড, জিম মরিসন উচ্চারণ করতেছে, চিৎকার দিতেছে, বলছে, বলতেছে এবং আমাকে দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছে —

When the music’s over
Turn out the lights
Turn out the lights
Turn out the lights

তো প্রায়ই যেই বিতর্ক অথবা ইন্টারপ্রিটেশনটা পাঠক (একজন শ্রোতা এবং দর্শককেও আমরা এবং আমি পাঠক ভাবতে চাই এখানে) অথবা আর্টিস্টদের কাছে অথবা তাদের মাধ্যমে তৈরি করার সম্ভাবনা আসে, বা যেই মেরুকরণের দূষণ দেখা যায় — সেটা হইল — আর্টের পোলিটিক্যাল স্ট্যান্ড অথবা আর্টের নেসেসিটি কি? আই মিন, আর্ট কি কেবল আর্টস ফর আর্ট’স সেইক হবে, নাকি আর্টকে কেবল আর্টের বদলে অন্যকিছু হয়ে উঠতে হবে, নাকি অন্যকিছু হয়ে উঠলেই সেটাকে আমরা আর্ট বলব? শিল্পী কি কেবল jim morrisonনন্দনঘোরবিহ্বলতার শিল্প করবেন, নাকি সে অত্যন্ত সচেতনভাবে বামডানবামডান মেরুকরণের ছকে নিজেরে ‘সমাজসচেতন’ ‘জীবনমুখী’ ‘মানবিক’ শিল্পী হিসেবে রিপ্রেজেন্ট করবেন? মোট কথা, শিল্প সংক্রান্ত চিন্তা ও দর্শনে আমাদের পার্সপেক্টিভ কি? যে-কোনো ক্রিয়েটিভ ফর্ম অব এক্সপ্রেশনের ব্যাপারে আমাদের কঞ্জুমারিং অথবা ওরশিপিং প্যাটার্নের সূত্রই-বা কোথায়? বাই বর্ন আমাদের, হিউম্যান রেইসের, যে পোলিটিক্যাল ডগমা-ডিলেমা, সহজাত রাজনৈতিক বোধ ও খাসলত আছে, শিল্পী কি সেইটার জিকির করবেন, নাকি তিনি সোশিয়োপোলিটিক্যাল কন্টেক্সট কিংবা পার্টিবেইজ্‌ড যে মেইন্সট্রিম ভোটিং পোলিটিক্স আছে, সেইটার সাথে নিজেরে মার্জ করবেন? এই-রকম কতগুলা প্রশ্ন এবং তর্কের জায়গা আপনি চাইলে রাখতে পারেন। কিংবা, কেবল ঋত্বিক ঘটককে আপনি শিল্পী ভাবতে পারেন, সত্যজিৎকে অরাজনৈতিক বলে গালি দিতে পারেন কিবোর্ড চেপে, মানে — যেহেতু আপনার-আমার ডিসাইসিভ হওয়ার সুযোগ আছে, এবং যে-কোনো বিষয়ে নিজ ইজমের পোলিটিক্যাল স্ট্যান্ডে পৌঁছাইতে পারলে বেশ আরাম পাওয়া যায়, সেহেতু শিল্প ও শিল্পীর রাজনীতি নিয়া দিনের পর দিন তর্ক মায় ঝগড়া মায় সমালোচনা মায় ডিস্কোর্স মায় ডিকন্সট্রাকশন চলতেই পারে। এবং, চলছেও। তো, সেই ফাঁকেই আমরা যেটা করতে পারি, কিংবা পারি না, সেটা হলো — গান শুনতে পারি, গান বুনতে পারি হৃদয় ও মগজের জমিনে। অ্যানাটোমিক্যালি, যেটাকে ভিসেরা অব হার্ট বলা হয় সেই হৃদয়ের জায়গায় আমরা আমাদের চর্যাপদী রবীন্দ্রমুখর অথবা রুটলেস আভা গার্দ সেমিইউরোপীয় সেমিবঙ্গীয় হৃদয়রে কল্পনা করে নিবো। এবং বলব —

“একরাশ ক্লান্তি নিয়ে সূর্যটা চলে গেল
প্রিয়তমা চাঁদ সুস্বাগতম

 

৭।

তো, যেহেতু মরিসন একজন আপাদমস্তক কবি (এবং কবি মানে কবিই) ছিলেন,  সেহেতু মরিসনকে সমাজবিচ্ছিন্ন ভাবালু এস্থেটিক বোকাচোদা হিসেবে দেখার ইচ্ছা আপনার হইতেই পারে। আপনি মরিসনকে সমাজবিচ্ছিন্ন ঘোরগ্রস্ত কবি হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে অস্বীকার করতেই পারেন সেই মরিসনকে, যে The Unknown Soldier-এ ওয়্যার নিয়া মিউজিক্যাল প্লট তৈরি করতেছে, কিংবা When The Music’s Over-এ জিজ্ঞেস করতেছে —

What have they done to the earth?
What have they done to our fair sister?
Ravaged and plundered and ripped her and bit her
Stuck her with knives in the side of the dawn
And tied her with fences and dragged her down

I hear a very gentle sound
With your ear down to the ground

 

আফটার অল, মরিসন যেহেতু শিল্পের জন্য ভুখা পেটে মরে নাই, যেহেতু, শিল্পীর ভুখানাঙ্গা সংগ্রামী জীবনের কষাঘাতে ক্লিষ্ট ইমেজ দেখার মাঝে যে প্রগতিশীল রোম্যান্টিকতা আছে, সেইটা মরিসন কিংবা সিক্সটিজ-সেভেন্টিজের মেইনফ্রন্টের রকব্যান্ডগুলার মাঝে আমরা পাচ্ছি না, সেহেতু — ওদের মাল্টিফ্যাসেটেড কালচারালি এক্সট্রাভ্যাগ্যান্ট হ্যালুসিনেটিভ ইভেন টু সাম এক্সটেন্ট পারভার্টেড লাইফের এলএসডি ফ্যান্টাসিটা যেইটা আমাদের এই এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার পাশ্‌শো সত্তর বর্গকিলোমিটারের মাছভাতের রিয়্যালিটির সাথে মিট করে না, সেইটারে নিয়ে ভাবাবেগ ও যাপনে আক্রান্ত হওয়াটা আমাদের মাঝে একটা ক্রাইসিস তৈরি করতেই পারে। যেই ক্রাইসিসটা বিগত ৫-৬ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি স্বাভাবিক বলেই মনে করি, সেই ক্রাইসিস, যেটার বাংলা করতে পারি আমরা সংকট, সেই সংকট হলো — অস্তিত্ব, যাপন এবং চিন্তার বিনিময়ের জায়গায় পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নিজ দেশীয় কন্টেম্পোরারি আর্ট-কালচার সিনের সাথে আত্মার সবটুকু দিয়ে এক হতে না পারার সংকট। প্রবল উন্মাদনা ও ভালোবাসা নিয়ে বর্তমানের সাথে মিলতে না পারার সংকট। সংকট — নিজ শৈশবকৈশোর ও অগ্রজ প্রজন্মের শৈশব-উন্মাতাল যৌবনে আটকে পড়ার। সংকট — উড-বি-ফিল্মমেকারের ফিউচার-ডাক্তার হয়ে যাবার। উই অল হ্যাভ আওয়ার ওন হিরোজ, অ্যান্ড উইথ অ্যা ফিউ এক্সেপশান মাই হিরোজ আর নট বর্ন ইন মাই টাইম। আমার প্রতিটা নায়কই অনেক আগে চিনে নিয়েছে রিগর মর্টিসের রূপ নতুবা তারা আমাকে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শৈশব-কৈশোর-বয়ঃসন্ধি এর লুপহোলে; যেইখানে প্রেসেন্ট ইন্ডিফিনিটের থেকে পাস্ট পারফেক্ট মোর প্রাসঙ্গিক, অভিজ্ঞতা অনবরত নস্টালজিয়া জেনারেটিভ।

jim morrison

তাই, জাহেদ ভাইদের জেমস (পড়ুন এখানে) আমাদের জেমস হয়ে উঠতে সময় লেগেছে। আমার আগেও মরিসন স্করসেজির ছিল, কিংবা — চপিনের নকটার্নে আমার আগেও খোয়াবে ডুবেছে সহস্র পরান, র‍্যাবোর সাথে কাফেতে বসে আমার কখনো আড্ডা দেওয়া হয়নি, শক্তি কিংবা আবুল হাসান আপন হাসিতে কখনো আমার করতল ছুঁয়ে দেয়নি। অথচ এই কন্টেম্পোরারি হিরোহীনতার আক্ষেপে মাখা স্পেস-টাইম কন্টিনিয়্যুয়ামের পার্পিচুয়াল সমুদ্রে অন্তহীন অতলস্পর্শী শেকড়সন্ধানী সাঁতারই আমার যাপনকে অস্তিত্ববহ ও অর্থবহ করে রেখেছে। এই টেক্নিকালার খোয়াবই মৃত্যুমুখর আমাকে জানিয়ে দিচ্ছে প্রতিমুহূর্তে —

সোহান, তুমি বেঁচে আছো। বেঁচে আছো। বেঁ চে আ ছো …

(চলবে)

COMMENTS