চৌথা বাখান : চেতনসত্তা ও স্ব-চেতনসত্তা : রবিগানের লগে বাউলের আচার-বিচার ও দেহসাধন
‘পরব্রহ্ম’ নিয়া রবিভাবনার সাকিন তালাশ করনের ক্ষেত্রে বাংলার বাউল ও ভারতীয় লোকায়ত জীবনধারায় তাঁর সম্পৃক্তি গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক বিবেচিত হওনের কারণে চৌথা বাখানে এই প্রসঙ্গ নিয়া আগাইতে চাই। রবির জীবনে বাউল ঘটনার রকমফেরে বারবার আসে এবং গান ও গীতিনাট্যের প্রতি অঙ্গে সে অকাতরে এর প্রয়োগ ঘটায়। এইটা অবশ্য মনে রাখা দরকারি গানের সুর বা গীতিনাট্যের অঙ্গে বাউলরস গ্রহণের মধ্য দিয়া রবির সত্তা নিজে কিন্তু বাউল হয় না কিংবা বাউলের সাধনরীতি ও আচার-উপাসনারে কবুলও করে না। বৈদিক ‘পরব্রহ্ম’-র লগে বাংলার আমজনতার আলাপ বোঝার উপায় হয়ে বাউলের মেটাফর তাঁর চৈতন্যে অনুপ্রবেশ করে আর নিজের সৃষ্টিজগতে সেই রূপকল্পগুলার প্রয়োগ ও রূপান্তর ঘটায় সে।
খিয়াল করা প্রয়োজন, বাউলের গুণগান করা নিয়া তাঁর বিশেষ মাথাব্যথা নাই। কন্টেন্টের বিচারে আমজনতার হৃদয়-তরঙ্গিত বাউলের মন্ময়ভাব ও সুরধারা বৈদিক ‘পরব্রহ্ম’-র ভাবজগৎ কতখানি ধারণ করে, ভারতের আনাচ-কানাচে বিরাজিত ভাবসাধনার ভূগোল ও জলবায়ু কতটা কী আত্মস্থ করে সে, এবং আত্মস্থকরণের কোয়ালিটি রবির নিজ ভাষাছকে নতুন সম্ভাবনায় উদ্ভাসিত হওনের শক্তি রাখে কি না এই বিষয়গুলা সেখানে প্রধান হইয়া ওঠে। ‘রিলিজিয়ন অফ ম্যান’ সহ অন্যান্য লেখাপত্তরে রবি আসলে প্রশংসা করে বাউলের সেই কোয়ালিটির যা স্বতন্ত্র এক ভাষাজগৎ জন্ম দিতে পারছিল, যেইটা বৈদিক জ্ঞানের রস জনসাধারণের নিকট অন্তত পৌঁছানোর চেষ্টা করছে এবং সে-চেষ্টা বিফলে যায় নাই; কারণ রবির চেয়ে অনেক ভালোভাবে তারা আমজনতার হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিতে সক্ষম হইছিল।
এইটা সত্য, জাতীয় চেতনার নতুন রূপকার হিসেবে শিক্ষিতজনতার হৃদয়ে অমরতা লাভ করলেও ব্যাপক অনক্ষর এবং সেইসঙ্গে গ্রামীণ প্রান্তিকজনের সংসারে রবির স্থান এখনও পাকাপোক্ত হয় নাই; সেখানে বাউল ও লোকায়তের রাজ আজও সমানে বহমান। কারণটা এই হইতে পারে, রবি কিংবা সামগ্রিকভাবে শিক্ষিতজনের সাহিত্য যেসব প্রক্রিয়া ও ভাষা-উপকরণের আশ্রয়ে প্রকাশিত হইতে থাকে তার সঙ্গে শহুরে ও গ্রামীণ প্রান্তিকজনের বিভেদ-বিচ্ছেদের ইতিহাস বহু পুরাতন; রাষ্ট্র ও সমাজকাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটাইতে পারে এরকম উপপ্লব ছাড়া এই বিচ্ছিন্নতা নিরাকরণ হওনের জিনিস না। তো সেই বাস্তবতা মাথায় নিয়া বাউল ও লোকায়ত সংস্কৃতির সঙ্গে রবিকবির সংযুক্তি ও দূরত্বের সমস্যাটা পাঠ করা পাঠকের উচিত মনে করি।
তো এই প্রসঙ্গে বলি, রবির লগে বাউলগো আশনাই নিয়া বিস্তর কথাবার্তা হইছে; সে-তুলনায় তাদের সঙ্গে রবিকবির দূরত্ব ও মানসিক বিরোধ নিয়া আলাপ অধমের বিশেষ চোখে পড়ে নাই। এইটা একদিক থিকা রবীন্দ্রনাথ নিয়া বাঙালিগো বহুমাত্রিক ভাবনার সীমাবদ্ধতা নজর করায়। এই প্রসঙ্গে জাহেদ আহমদের ‘রবি রিগিং’ নামক লেখাটি উল্লেখ করা যাইতে পারে। উইটি ক্যামোফ্লেজে রবিচর্চার হালত ও খাসলত সম্পর্কে লেখক যেসব ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন সেইটা অন্যভাবে আমাদের রবিচর্চার নানামাত্রিক সীমাবদ্ধতার দিকে আঙুল উঠায়। লেখক সবিস্তারে যেসব প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ লেখায় টানছেন সেখানে কিছু ব্যাপারে দ্বিমত বা আপত্তির উদ্রেক হইলেও (*পাঠক সে-আপত্তির খানিক আভাস ‘দুসরা বাখান’-এ ‘সঞ্চয়িতা’র সম্পাদনা সূত্রে ব্যক্ত কথাগুলার মধ্যে পাইবেন; যা জাহেদ আহমদের মূল টেক্সটের এনকাউন্টার নহে, বরং তাঁর টেক্সটের ইনসার্শন কওয়া যাইতে পারে।) সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে রবিচর্চার হাল-হকিকত বুঝতে কামে দেয়। আগ্রহী পাঠক ‘গানপার’ হইতে লেখাখান একবার নজর করতে পারেন।
এর বাইরে রবি সম্পর্কে ব্যতিক্রম ও ভিন্নমাত্রিক কথাবার্তা টুকটাক যা হইছে তার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়া রবির বিরোধিতা সম্পর্কিত বানোয়াট তর্ক-বিতর্ক আর ‘রক্তের দাগ’ মুছন কিংবা সলিমুদ্দি টাইপের জিনিসগুলাই বাংলাদেশে বেশি চোখে পড়ে, তো ওইগুলার মধ্যে বিশেষ সারবত্তা না থাকায় ইগনোর করা উত্তম মনে করি। রবি সম্পর্কে সলিমুদ্দি মার্কা কমেন্ট যা আজকাল ফ্যাশন হইয়া উঠছে বলে প্রত্যয় জাগে সেইটা বিবেচনা করতে অসুবিধা নাই যদি কমেন্টের পেছনে ক্রুড লজিক ও রেফারেন্স থাকে; অথবা যিনি কমেন্ট করছেন সেইটা তাঁর গভীর অনুধ্যান হইতে আসে; সেরকম কিছু অধমের চোখে না পড়ায় অগত্যা রবিকেন্দ্রিক এইসব আপতিক জ্ঞানগম্যিগুলারে বিবেচনা হইতে বাদ দিয়া অগ্রসর হওয়া যুক্তিযুক্ত মনে হয়। পাঠকের যদি মনে হয় অধম ভুল করছে তবে অনুরোধ থাকল ভুলটা ধরাইয়া দিয়েন, এবং সেক্ষেত্রে ফিরা ভাবতে বা নিজেকে শুধরে নিতে লেখকের আপত্তির কোনও কারণ থাকবে না।
এইবার মূল প্রসঙ্গে ফেরত যাই। বাউলের সঙ্গে রবির দূরত্বের গণ্য কারণ সম্ভবত এইটা ধরা যায়, — বাউলাঙ্গের আধ্যাত্মিক সাধনা হইতে যে-মন্ময়ভাব ঠিকরায় রবির কাছে সেইটা নতুন মনে হয় নাই। ইতিহাসে লেখে বয়স যত বাড়ছে সেখান থিকা সে এক্সিট করছে। যদিও বাউলধারা যেভাবে টেক্সট তৈরি করে বা করায় এবং আমজনতার হৃদয়ের খাদ্য হয় তার সেই টেক্সচ্যুয়াল কোয়ালিটি (Textual Quality) রবি স্বয়ং নিজের লেখায় জীবনভোর কামে লাগাইতে দ্বিধা বা কৃপণতা করে নাই। রবির গানে বাউলাঙ্গের সুর ফুটে দেইখা যেসব রবিভক্তরা আচানক বোধ করেন তাদের বোধহয় এই ঘটনায় অত গদগদ হওয়ার কিছু নাই। রবিগানের সুরকাঠামোয় বাউল-ওস্তাদি হইতে বৈদেশি অপেরাগানের কোরাসধর্মী ঐকতান কিংবা ভিনদেশের লোকজ সুরের অনুপ্রবেশ সহজ ছন্দে ঘটে গানে সুর জোড়নের রবিকৃত পন্থা ও বি-নির্মাণের ধারায়। এই ঘটনা মনে হয় নজরুল আরও ব্যাপকভাবে ঘটায় নিজের গানে। এমনকি হালের কবীর সুমনের গানেও সেইটা নানাভাবে ধরা পড়ে।
গানের কথায় ভাবিকমর্ম ফোটানোর খেলায় রবি যদি ওস্তাদ হইয়া থাকেন তবে শব্দের বৈচিত্র্য এবং সুর ও রাগরাগিণীর বাহারে নজরুলকে ওস্তাদগো ওস্তাদ মানতে হয়। অবশ্য শুদ্ধ রাগরাগিণীর জগতে নিত্যবিহারী ধূর্জটিপ্রসাদ নজরুলের এইসব সুর লাগানোর পন্থায় অধিক প্রীত বোধ করতে পারেন নাই। তাঁর মনে হইছে গানের কথার অঙ্গে রাগরাগিণীর ভাবিকমর্ম ও তান-কর্তব ইত্যাদি জুড়নের সময় নজরুলের গানের ধারা কেমন জানি বেসামাল হইয়া পড়ে এবং গভীরে যাওয়ার আগে মামলা তামাদি কইরা বসে।
বাংলা গানের দেহে ওস্তাদি কালোয়াতি অর্থাৎ উত্তর ভারত ও কর্নাটকি ঘরানার রাগরাগিণীর ব্যবহার নিয়া ধূর্জটিপ্রসাদের লগে রবিকবির দ্বিমতমুখর পত্রালাপ এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়, যেহেতু দ্বিমত পোষণের বাহানায় দুজনের মধ্যে যে-ডায়ালগ হইতে থাকে সেই তুল্য কোনওকিছু আজকাল আর চোখেই পড়ে না! সুতরাং ধূর্জটিপ্রসাদ যখন নজরুল নিয়া মন্তব্য করেন তখন নজরুলভক্তরা যেন আবার ভেবে না বসেন ‘এইটা আবার কে রে!’ বিনয়বচেন কই ধূর্জটির বক্তব্য উড়াইয়া দেওনের আগে তাঁর সিভিখান যেন তাঁরা একবার নজর করেন। আশা করি সকল ভ্রমের অপনোদন এতেই ঘটিবে।
রবি ও নজরুল তাঁদের গানরচনার পদ্ধতিতে স্বকীয়তা তৈরির খাতিরে ভারতীয় ধ্রুপদি সংগীতের অতিকায় জগতের কোন বিন্দু হইতে নিজেকে এক্সিট করান এবং ধূর্জটি কেনই-বা সেইটা নিয়া দ্বিমত জুড়েন সে-প্রসঙ্গ বাংলা গানের কথায় বিচ্ছুরিত ভাবিকমর্মের সঙ্গে ওস্তাদি গানের ধারায় সুর জুড়ন নিয়া রবির অস্বস্তি ও আপত্তির জায়গাটা চিনতে ব্যাপক কামে লাগে। দুজনের পত্রালাপ এইটা ক্রম-প্রকাশ্য করে বাংলা গানের কথায় ওস্তাদের কালোয়াতি অর্থাৎ ভারতীয় রাগরাগিণীর প্রয়োগের প্রশ্নে ধূর্জটি হইছেন পিওরিস্ট (Purist) বা শুদ্ধতাবাদী এবং রবি সেখানে রিফরমিস্ট (Reformist) বা সংস্কারপন্থী। রবির কাছে ‘গীতবিতান’-এ সংকলিত গানগুলা মিউজিক স্কেল ও নোটেশনের মধ্য দিয়া সুরজাল তৈরির আধার মাত্র নহে; ধূর্জটির লগে আলাপ জুড়তে গিয়া দেহে সুরের শিহরণ জাগানোর রোমাঞ্চ সৃষ্টির খাতিরে রাগরাগিণীর ব্যবহারে নিজের আপত্তি সে তাই গোপন করতে পারে না। সুরের ফান্দায় পড়ে গানের ভাবরস যদি কোনওভাবে ক্ষুণ্ন হয় রবিকবির বিবেচনায় সেইটা বাংলা গানের চিরায়ত ধারার লগে বিচ্ছেদের শামিল। বাংলা গানে রাগের ব্যবহার বা সুরের ধারা চর্যাপদের যুগ হইতে গানের কথায় ব্যক্ত ভাবের লগে তাল রেখে আগায় যেহেতু, ভারতবর্ষের ওস্তাদি গানের সুরপ্রধান প্রবাহ সে-গানে যুক্ত করার ক্ষণে খিয়াল রাখা প্রয়োজন সুর যেন কথার মর্মকে লঘু না করে।
এ-কথা সত্য, রবিগানের বাক্যবন্ধগুলা ‘পরব্রহ্ম’ নিয়া তাঁর জীবনব্যাপী কসরতের অংশও বটে। ‘আয়ে না বালাম’ বা ‘সজনা না যাইও পরদেশ’ এরকম দু-চার কলির ব্যবহারে আলাপ হইতে বিস্তারে যাওয়ার মধ্য দিয়া ভারতীয় রাগসংগীত শ্রোতার হৃদয়ে রাগ-আশ্রিত সুরের যে-অপূর্বতা বহায় এবং এইভাবে সুরকে অমোঘভাবে টেক্সটে কনভার্ট করে, যেখানে সুরই শ্রোতার মনে ভাবের আবেশ জাগায়, যে-কথাগুলা ধূর্জটি রবিকে নানাকথার ছলে ধরাইয়া দিতে চায় এবং রবি সেখানে সপাটে ধূর্জটিরে ত্যাজ্য বা Disown করে। সে ডিজওউন করে যেহেতু জীবনের আটপৌরে যত অনুভূতির সঙ্গে তাঁর সংযোগ এবং সেই অনুভূতির সাপেক্ষে ‘পরব্রহ্ম’ নিয়া দোটানা ও সমর্পণে বিদীর্ণ হওয়ার উপযোগ, উভয়কে একতারে বেঁধে গানে মূর্ত করতে গেলে সেই গান তাঁর দরকার যেখানে সুরের লগে কথা জোরকদমে ছুটতে পারে, যেন শ্রবণের সময় শ্রোতারা শুধু সুরটা নয় বরং রবিকবির ভাবুকতার চড়াই-উৎরাই দেখতে পায়। রবিগানে কীর্তনাঙ্গের সুরের ব্যবহার এই কারণে হয়তো বিশেষ গুরুত্ব পায়। কীর্তন হইছে সেই জিনিস যা শ্রোতার চিত্তে সুরের আবেশ তৈয়ার করলেও ভাবের রস সেখানে অটুটই থাকে।
সুরের তুঙ্গ প্রবাহ কিংবা ওস্তাদি রাগরাগিণীর কসরত যোজনের ফলস্বরূপ কোনও কারণে সেই ভাবখানা যদি ব্যাহত হয় রবির কাছে সেইটা পণ্ডশ্রম ও বিপর্যয়ের নামান্তর গণ্য হইতে থাকে। যে-কারণে ধরণী থিকা বিদায় নেওনের আগে ‘গীতবিতান’-এর সমুদয় গানের স্বরলিপি প্রস্তুত করার জন্য সে উতলা হইছিল। মনে ভয় ছিল বঙ্গপুঙ্গবরা হয়তো সময়ের সঙ্গে তাঁর গানের ভাবিকমর্ম অবহেলা করবেন এবং বিনোদিত হইবার জন্য ইচ্ছামতো সুরতাল জুড়ে অচিরে সে-মর্মের সমাধি রচিবেন! দ্রষ্টব্য যে, ঘটনাখান এখন বাউল ও লোকায়ত সুরের গান পরিবেশনের ক্ষেত্রে একপ্রকার রেওয়াজ হইয়া উঠছে এবং নজরুলের গানও এই অত্যাচার থিকা নিজেকে রক্ষা করতে অক্ষম মনে হইতেছে।
ধূর্জটির লগে রবির দ্বন্দ্ব এই জায়গা থিকা গতিশীল হওনের ফলে দুজনের মতবিরোধ শেষ হইতে চায় না। ধ্রুপদি সংগীতে অতুল অভিজ্ঞ হইলেও এখন মনে হয় রবিকে যে-জিনিস সেই সময় ভুগাইছিল অর্থাৎ বাংলা গানে কালোয়াতি সুর জুড়নের প্রবণতা, ধূর্জটি সেই বিষয়টা সম্যক ধরতে পারেন নাই। রবির অটলতা অন্যভাবে বড়ে গোলাম আলী খান সাহেবের প্রবাদপ্রতিম উক্তিকে নজর করায়। স্মৃতি প্রতারণা না করলে উক্তিটি খান সাহেব জনৈক সাক্ষাৎকারগ্রহিতার লগে আলাপের সময় মুখ দিয়া বাহির করেন :— ‘বৈদেশের রাগ-রাগিণীর ন্যায় ভারতীয় রাগিণীর সুনির্দিষ্ট কাঠামো বা স্কেলিং নাই। এইটা মুহূর্তিক। ঈশ্বর নিয়া মানুষের মধ্যে যেমন বিচিত্র ভাব ও অনুভূতি থাকে, ভারতীয় রাগও তেমনি বিচিত্র ও তাৎক্ষণিক। যে এই রাগ চর্চা করে তার মনের ভাবের উপরে গলা বা যন্ত্রে সে কোন রাগ কেমনে জুড়বে সেইটা নির্ভর করে। মনের অনুভব ও সংবেদন সেখানে সুরের মধ্য দিয়া শ্রোতার হৃদয়ে ভাবাবেশ তৈরির শেষ কথা।’
বড়ে খান সাহেব যে-কথাগুলা মুখ দিয়া সেদিন বাহির করছিলেন তার মধ্যে ওস্তাদি গানের আদিচরিত্র ও চিরসত্য প্রকাশ পাইছিল। বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে ভারতীয় ধ্রুপদি সংগীতের ঠাঠ, রাগরাগিণীর ভাব ও পরিবেশনরীতির শ্রেণিকরণের মাধ্যমে যে-সংহত চরিত্র দান করছেন তার উপযোগিতা নিয়া প্রশ্নের অবকাশ নাই। সময়প্রবাহে কামটা জরুরি ছিল এবং ভাতখন্ডে সেই কাম করায় ভারতীয় ধ্রুপদি সংগীত একখান কাঠামোবাদি চেহারা পাইছে, যার মধ্যে বইয়া এর লগে আলাপ জুড়ন গায়ক-বাদকগো কাছে এখন অনেক সহজ মনে হয়। তথাপি বড়ে গোলাম আলীর বক্তব্যই এই সংগীতের খাঁটি অপূর্বতার শেষ কথা গণ্য হওয়া উচিত। রাগের স্কেল, আলাপ ও বিস্তারের ধরন ইত্যাদি অতিক্রম করে গায়ক বা বাদকের মনে ভাবের ছবি যদি উদয় না হয় এবং সেইটার সাপেক্ষে রাগের তানফান্দা জুড়তে তারে অধীর না করে তবে রাগরাগিণী কেন মানবমনের অনুভূতির ধারক-বাহক ও বহিঃপ্রকাশ সেই প্রশ্নের সঠিক জবাব মিলে না।
রবিকবি সেই জায়গা থিকা ওস্তাদি গানের সুরধারায় নিজেকে সম্পৃক্ত করার পক্ষে অটল থাকার কারণে কলকাতার ওস্তাদি গানের মজলিশে যে-দেখনদারি কালোয়াতি সেই সময় চালু ছিল সেইটার উপরে তাঁর গোসসার অন্ত ছিল না। সকলেই তো আর ওস্তাদ আব্দুল করিম খান, বড়ে গোলাম আলী খান, ফৈয়াজ খান বা আমির খান হইতে পারেন না। কালোয়াতরা বড় ওস্তাদ হইতে পারেন কিন্তু তাঁদের পক্ষে তানসেন হওয়া কঠিন। মনের ভাবের লগে রাগের ভাব ও তার লগে গলার ভাব মিলে যে-অপূর্বতা জন্ম নিয়া থাকে সেখানে একটা ‘মেঘমল্লার’ যদি পরিবেশন করতেই হয় তবে মেঘ সেই মুহূর্তে গায়ক বা বাদকের ভিতরে বিরাজিত ও সঞ্চরণরত হইছে কি না সেইটা শ্রোতারও টের পাওন চাই। ওস্তাদি গান পরিবেশনায় এই জিনিসের ঘাটতি রবির কাছে পীড়াদায়ক ছিল।
ঊনবিংশ শেষ দিক থিকা বিংশ শতকের প্রথম তিন-চার দশকে যদিও অতুল সব ওস্তাদরা ভারতবর্ষে দেখা দিছিলেন এবং রবিকে তাঁদের লগে সংযুক্তকরণে ধূর্জটির আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও বিচিত্র কারণে সেইসব অতুলনীয় গায়কদের সঙ্গে তাঁর দূরত্বটা ঘোচানো যায়নি। এটা একদিক থিকা রবির সীমাবদ্ধতাও বটে, যে-কারণে নিজের গানে প্রয়াজনীয় রাগরাগিণী ব্যবহার করলেও রবিগানে সুরের ধারা কেমন যেন একঘেয়ে লয়তালে শ্রোতাকে ক্লান্ত করে। অবশ্য রবির তাতে যায় আসে না, কারণ তাঁর লক্ষ্য গানের মধ্য দিয়া ভাবের নতুন সড়কে গমন এবং সুর বা যন্ত্রানুষঙ্গ সেখানে নিছক উপকরণ মাত্র। যে-কারণে রবিকে আমরা কীর্তন-বাউল ও লোকায়ত সুরে যতটা স্বচ্ছন্দ হইতে দেখি উত্তর ভারতীয় ঘরানায় গানের কথায় ওস্তাদি তান জুড়নে ততটাই বিমুখ ও দূরে অপসৃত এক বিন্দু মনে হয় তাঁরে।
ভাবিক মর্ম ক্ষুণ্ন না করেও রবির গানকে ওস্তাদি ধাঁচে পরিবেশন সম্ভব সেইটা কপিরাইট উঠনের পর ওস্তাদ রশিদ খান বা পণ্ডিত অজয় রায়ের কন্যা কৌশিকী দেশিকানের মতো গায়কদের গান শুনলে খানিক টের পাওন যায়। কৌশিকী ও শ্রাবণী সেনের যৌথ-সঙ্গতে রবির গানগুলা মূল সুরধারাকে ব্যাহত না করেও শ্রোতার মনে সুরের অপূর্বতা ও ভাবের আবেশ জাগাইতে সক্ষম হইছিল। কিংবা সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠের লগে ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের বাদন শ্রবণের সময় রবিগানের ভাবকে ক্ষুণ্ন করছে বইলা কখনও মনে হয় নাই। আসল কথা হইছে গানের ভাবের লগে গায়কের একাত্মতা যদি একবার তৈরি হইতে পারে তখন সুরের বাড়াবাড়িও ভাবের আবেশটাকে আটকায়া রাখতে পারে না। রবিকে এই যুক্তিটা ধূর্জটি সে-সময় যে-কোনও কারণে হোক বুঝাইতে পারেননি।
গান্ধিজির প্রাত্যহিক ভজন ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ কতজন কতভাবে গায়! গায়কি-সুর-পরিবেশন এমনকি ফিউশনের বিচারের কোনওটাই খারাপ এমন নহে, কিন্তু বিষ্ণুদিগম্বর পলুস্কর যবে সেই ভজনে তান জুড়েন তখন বাকিসব গৌণ ও অপ্রধান এবং স্মৃতি হইতে মুইছা যাওয়ার উপক্রম করে। কারণটা কিন্তু পলুস্করের কণ্ঠস্বর বা সুর যোজনার মধ্যে নহে; কারণটা ভজনের ভাবের লগে তাঁর নাড়ির যোগ যা তাঁর দেহকে সেই মুহূর্তে পরব্রহ্মসম অনুভূতির মধ্যে নিয়া যায় এবং ফলস্বরূপ শ্রোতার মনেও রঘুপতির ছবিখান স্মৃতিচিহ্ন হইয়া ওঠে। পলুস্করের বাইরে যত অসংখ্যজন অসংখ্যবার গানটা গাইছেন তাদের মধ্যে বরং বৈদেশি পিট সিগার-কে আপন লাগে কানে, এবং সেইটা এ-কারণে যে তিনি বৈদেশি হইলেও গানের ভাবিকমর্মটার লগে মনের যোগ ঘটাইতে তাঁর অসুবিধা হয় নাই।
এইসব ভাবনার ফেরে ধূর্জটির সঙ্গে বাতচিতের ক্ষণে রবিকে যদিও রিফরমিস্ট মনে হইতে থাকে অন্যদিকে সেই রিফরমিস্ট মনোভাব তাঁকে গোঁয়ার বইলাও প্রতিপন্ন করায়। ধূর্জটিরে সে কিন্তু সিগন্যালটা দিয়া দেয়, — শ্রোতা যখন তাঁর গানে কান পাতবে তখন বাদ্যানুষঙ্গের সুরজালে বিভোর হওনের মুহূর্তে সে যেন ভাবে কী-হেন কারণে এই লোকটা নিজের জীবনকে ফুলের উপমায় সাজায়; সেই ফুল, যে একদিন তার অঢেল পাপড়ি থিকা দু-একটা অন্যকে দান করছিল; তারপর ফুলটা পরিপক্ক ফল হওনের দোষে অধিক দানের সুযোগ তার থাকে না, অগত্যা হেমন্তের অপেক্ষা করে ফল হইতে পুনরায় পাপড়িমেলা ফুলে ফেরত যাওনের জন্য! যদিও ফেরত যাওয়াটা সম্ভব হইয়া ওঠে না, যেহেতু সময়ের তির ইচ্ছা করলেও পেছনে ঘুরান যায় না। সময় কী নিবে আর কোনটা ফেরত দিবে সেইটা কারও হাতে নাই :— ‘Time the destroyer is time the preserver.’
ঠেকায় পড়ে সুরের ছন্দে গান বাঁধে রবি, এবং সেইটা এ-কারণে :— লোকে তাঁর গান গুনগুন করে গাওয়ার সময় যেন চকিতে ভাবে এই লোক কেন ‘তালা’ না ভেঙে ‘চাবি’ ভাঙার কথা কয় গানে! ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে…’! ‘তালা’ শব্দটা সুরের স্কেলিঙে কানে বেখাপ্পা লাগে দেখে কি সে ‘চাবি’ ভাঙতে কয়? নাকি অন্য কারণ আছে সেখানে! লোকটারে কেউ কি ‘চাবি’ দিয়া ঘরে আটকাইছে? নাকি সে নিজেরে ‘চাবি’ দিয়া নিজেই ঘরে বন্দি করছে? বাউলাঙ্গের সুরে মর্মবিধুর সে-গানে নিজের ছ’ফিট দেহখাঁচাটারে কি চাবির রূপকে দেখে সে? লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’–র লগে কোনও সাদৃশ্য কি রাইখা যায় রবির এই গান? অথবা ‘চাবি’ হয়তো সেই জিনিস এখানে যা প্রকারান্তরে তালার প্রয়োজন অমোঘ রাখে? অগত্যা ‘চাবি’ দেওয়ার খেলাটা যদি চিরতরে ধ্বংস করা যায় তাইলে হয়তো জগতে আর কাউরে ‘তালা’ দিয়া রাখতে হয় না!
ঘটনা যেমন হোক ‘চাবি ও তালা’–র এই দ্বিরুক্তি আস্ত ‘গীতবিতান’ কিংবা রবিগানেরও ‘চাবি’, যার মধ্য দিয়া রবিকবি নিজের দিনযাপনের খতিয়ানে যা কিছু তাঁরে বাঁধে কিংবা ছাড়ে, সংসারে শামিল করায় ও সেখান থিকা আড়াল নিতে কয়, ভান-ভণিতায় সে ঘুরঘুর করে ঘোরে এবং পরক্ষণে সেখান থিকা এক্সিট নিতে মরিয়া হয়…, এবং দেশ হইতে বিদেশে সমুদয় দ্বিরুক্তির জগতে পাক খাওনের ঘোরে জীবনটা মাঝেমধ্যে দুঃসহ প্রেত মনে হইতে থাকে, এই সকল বন্ধন ছিন্ন করার আবেশ হইতে সে গান বাঁধে। তো এই বিবেচনাখান মাথায় রাখনের পর কথাটা বোধহয় কওন যায় :—
পাঠ ও শ্রবণ-গভীরতা হইতে প্রাপ্ত রুচিবোধের জায়গা থিকা ধূর্জটি অতুল এলিট হইতে পারেন কিন্তু বাংলা গানের স্রোতে রবি যেখান থিকা নিমাই সন্ন্যাসীর কীর্তনের সঙ্গে আলাপ করে, বাউলের একতারার লগে নিজের মিলন ও বিচ্ছেদের কাম সারে, এই ব্যাপারগুলা লখনউ শহরের গলিগুঁজি হইতে স্রোতের মতো উছলে–ওঠা বিরিয়ানির সুঘ্রাণ ও ভুলভুলাইয়ার মধ্যে পাক খাইতে খাইতে বাহির হয়ে আসা সুরজালে বন্দি ধূর্জটি বুঝতে পারা দূরে থাক, ধরতেও পারেন নাই।
সে যাই হোক, ধূর্জটিরে নমস্কার দিয়ে বাউলে ফেরত যাইতে চাই। কথা হইল, রবির গানে বাউলাঙ্গের প্রয়োগ ঘটলেও মনে রাখা জরুরি, বাউলের সুরজাল তৈরির ধরন ও ভাবিকমর্ম ডেলিভারি দেওয়ার স্টাইল সে ফলো করছে ঠিকই কিন্তু সেই সুরজালের নেপথ্যে প্রবাহিত জীবনদর্শন, সাধনরীতি, উপাসনা ইত্যাদি নিয়া সমাজের লগে বাউলের বিবাদ বা বোঝাপড়ায় শরিক হওনের ঠেকা বোধ করে নাই; এবং তা দুটি কারণে :
প্রথম কারণ জীবনদর্শনের দিক থিকা বাউলগানের বক্তব্য কোনওভাবেই বৈদিক ‘পরব্রহ্ম’-র মূল বাণীটারে এনকাউন্টার করে না, বরং হাজার পথ ঘুরান শেষে সেখানেই বিরাম নিতে চায়; সুতরাং এই ভাবদর্শন বুঝনের পিছে আর না খাটলেও চলে। দ্বিতীয় কারণ পরম নিরাকারের জগতে বিরাম খুঁজতে গিয়া বাউল যেসব আচার ও উপাসনারীতি সঙ্গী করে আগায় সেইটা তারে প্রতিমা-উপাসনায় সংযুক্ত করে বা এভাবে সে পৌত্তলিকতা নিজের অবচেতনে ধারণ করতে থাকে; পিতৃসূত্রে ব্রাহ্মভাবে মাথা মুড়ানো রবির ব্রহ্মজ্ঞান এই জিনিসটা এলাউ করতে পারে নাই; তাঁর হয়তো মনে হইছিল ‘পরব্রহ্ম’-র সাধনা যেহেতু মনের লগে মনের সাধনা সেখানে দেহসাধনার নামে এইসব আচার-উপাসনা অনাচার মাত্র। কাজেই সে এর থিকা নিজেকে দূরেই রাখে।
সুধীর চক্রবর্তী বাউল-ফকিরি সাধনরীতির তরিকা নিয়া হাটেমাঠেঘাটে তালাশ করতে গিয়া এইটা লক্ষ করছিলেন, বয়স যত বাড়ছে বাউলধারা নিয়া রবির আগ্রহ নীরবতায় গুম হইছিল। শান্তিনিকেতনে পৌষ মেলা সহ লোকায়ত সকল ব্যাপারস্যাপার যথারীতি চলছে ঠিকই কিন্তু বীরভূমের বাউলগো দেহসাধনার আশ্রয়ে যে-উপাসনারীতি চলে রবি সেখানে নিজেকে সক্রিয় করে নাই। পাঠকরা সুধীরের ‘বাউল ফকির কথা’ বহিখানায় ইচ্ছা করলে বিষয়টি নজর করতে পারেন।
ঐতিহাসিক ও শ্রেণিক পটভূমি কেন বাউলকে একতারা হাতে প্রান্তিক ও নির্জন হইতে বাধ্য করে, সমাজের মধ্যে আরেকখান সমাজ রচনা করতে সে কী কারণে বাধ্য হয় ইত্যাদি রবিকে উতলা করে নাই অথবা তিনি সেইটা উপেক্ষা করেন দেখে সুধীর চক্রবর্তী কবির দিকে অনুযোগের তির ছুঁড়ছিলেন। তাঁর মতে বাউলের দেহসাধনা ও উপাসনারীতি রবিকবি খাটো করে দেখছেন এবং অনেকসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্যও করছেন বইলা প্রত্যয় হয়। যা প্রকারান্তরে বাউলধারার ভাববস্তুর সঙ্গে লগ্ন হওয়া সত্ত্বেও সেখান থিকা কবিকে বিলগ্ন বা বিচ্ছিন্ন রাখে বইলা সুধীর তাঁর বইয়ে আভাস দিতে চাইছেন। সেইসঙ্গে সুধীরের এই কথাটা মনে জাগছে :— বাউলের দেহসাধনা, গুরুভজনা ও সাধিকা নিয়া কাজকারবারের মধ্যে যেসব মর্ম ফোটে নিজের গীতিনাট্যে রবি এর ব্যাপক অঙ্গবিচ্ছেদ ঘটানোয় বাউলরসের সঙ্গে সেইটা স্ববিরোধ তৈরি করে এবং যারা রবিসূত্রে বাউলকে পাঠ করেন তারা একটা ভুল কনটেক্সটে বাউলের সঙ্গে মামলা রফা করেন।
সত্য বটে, রবির নাটকে বাউলিনি একলা নারী হয়ে মঞ্চে একতারায় সুর তোলে এবং বাউলও তথৈবচ! একলা পুরুষ রূপে যাত্রাপালার বিবেকের ন্যায় একতারা হাতে সে টুনটুন করে নাচে ও মঞ্চে ঘুইরা বেড়ায়। সুধীরের তাই হয়তো মনে হইছে বাউল সম্প্রদায় ও তাদের গান রবিকবি পেট্রোনাইজ করছেন তাতে সন্দেহ নাই কিন্তু বাউল হওয়ার পেছনে যেসব সমাজিক কারণ ও অন্তরজ্বালার চক্করে ভদ্রলোকেগো ব্রহ্ম-উপাসনার জগতে বাউলের স্থান হয় না বা সেখান থিকা নিজের নিষ্ক্রমণ ঘটাইতে সে বাধ্য হয় সেই কারণগুলা রবি হেলা করছেন।
রবির দিকে অনুযোগের ছলে সুধীর যে-কথাগুলা বলার চেষ্টা করছেন সেইটা মিছা না। কিন্তু বহিতে উদ্ধৃতি জুড়নের পরেও সুধীর স্বয়ং যে-জিনিস মিসরিড করেন সেইটা হইল রবি যেখান থিকা ‘পরব্রহ্ম’-র লগে বোঝাপড়া করে তাঁর সেই জীবনদর্শনের জায়গা হইতে বাউলগো ইগনোর করতে সে বাধ্য। রবিকবি যে-পন্থায় আধ্যাত্মিক ও মরমি হওয়ার মামলা তামাদি করে সেখানে আচার-ভজন আশ্রিত দেহসাধনা ক্রমশ গৌণ হয় এবং মানসিক-অবধান তথা অনুধ্যান বা মেডিটেশন প্রধান হইয়া ওঠে। মানসিক-অবধানের সাহায্যে ‘পরব্রহ্ম’-র লগে মামলা তামাদি করার কামটা একলা সারাই প্রয়োজন। দেহ সেখানে নিজেরে জিগায় তার ভিতর-বাহিরে যত কল্লোল যত দ্বৈতঝড় বহে তারা সব নীরব হওনের পর অদ্বৈত কোনও অনুভব সে টের পায় কি না?
দেহের মধ্যে সে-অনুভব যখন জাগে তখন স্ব-চেতনসত্তার আবশ্যকতা ফুরায় এবং চেতনসত্তা শান্ত স্রোতের মতো জগৎসংসারে নিজেকে প্রবাহিত ও কর্মে লিপ্ত হইতে দেখে। এই চেতনসত্তা জীবনের উদ্দেশ্য নিয়া প্রশ্ন করে না। তার কোনও আশা-হতাশা নাই; সুখ-দুঃখ নাই; পছন্দ-অপছন্দ-গ্রহণ-বর্জনের বালাই নাই। সে হইছে নদীর স্রোতে ভাসা কাষ্ঠখণ্ড। স্রোত তারে যেদিকে টানে সেদিকপানে ধায়। চেতনসত্তা তাই মল ও মণিকাঞ্চনে প্রভেদ করে না। স্ব-চেতন বা কনশাস কোনও দেহধারী জীবের পক্ষে বোধের এই স্তরে পৌঁছান সম্ভব না। তার স্ব-চেতনসত্তা তারে মলের সঙ্গে মণিকাঞ্চনের প্রভেদ করতে কয়। মলের মধ্যে সে অর্থ আরোপ করায়। মণিকাঞ্চনের মাঝে নবনিত্য অর্থের (অথবা অনর্থের) যোজনা করে। এইটা তাই অর্থবিজ্ঞান। ভেদ বা দ্বৈত হওনের বিজ্ঞান। ভালো-মন্দ ও সৎ-অসৎ রপ্ত করার বিজ্ঞান। নিজেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মরত সত্তা ভাবা এবং অদ্বৈত সে-অভিজ্ঞতা যাপনের পক্ষে দ্বৈততা তাই বাধার কারণ হইয়া ওঠে শেষতক। রবি হয়তো সে-কারণেই গায় :— ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না? / কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না?’
দ্বৈতভাব সৃষ্টি করে যে-বিজ্ঞান সেখানে জগৎসংসারের উদ্দেশ্য নিয়া বিবাদ চলে নিত্য। এইটা জাঁ বদ্রিলারের অর্থ বা মিনিঙের দ্যোতক, যেখানে বাস্তবে বিদ্যমান সংসারের হালচাল নিয়া নতুন অর্থ বা মিনিঙের আরেকখানা জগৎ তৈয়ার হয় এবং বাস্তবের জগৎকে মিনিঙের সেই জগৎ অবিরাম নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করতেই থাকে। মিনিঙের জগৎখান বাস্তবের নকলি (Simulation) হইলেও দেহধারী ব্যক্তির মন তারে পৃথক বইলা ভাবে এবং সেখানে যাপন শুরু করে। মিনিঙের সে-বিশ্বে নিজেকে যাপন করতে গিয়া দেহধারী ব্যক্তির সত্তা ক্রমশ নকলিরে আসল ও অর্থপূর্ণ বইলা গ্রহণ করে এবং সেইটারে গ্রহণ করা ছাড়া উপায় চোখে দেখে না। এই যেমন Surplus Value বা উদ্বৃত্ত মূল্য, Globality বা বিশ্বায়ন, Corporate বা বহুজাতিক … এই অভিধারা কী বস্তু সেইটা সম্যক ঠাহর হয় না কিন্তু বিশ্বে তামাম মানব-সম্প্রদায় সে-মিনিংগুলার মধ্যে বিচরণ করে এবং তারে বাস্তবতা বইলা স্বীকার যায়। এই বাস্তবতার মধ্যে যে-লোক চলেফিরেখায়দায় তারে তখন নিজের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় মিনিঙের দ্বারা অবিরত নির্ধারিত হইতে হয়।
মিনিঙের এই বিশ্ব মানুষকে আদিম ও সভ্য বইলা ভাগ করে; প্রাগৈতিহাসিক ও ঐতিহাসিক বইলা দাগায়; প্রাচীন ও আধুনিক সভ্যতার মধ্যে পার্থক্য করায়; এবং এখন একুশ শতকে পা রাখনের পর সেই মিনিং মানুষকে হিউম্যান ও ট্রান্সহিউম্যান-এ তার নিজেকে ভাগ হইতে কয়। দেহধারী সে-মানুষ মৃত্যুবরণের কারণে মিনিঙের জগৎ থিকা মিসিং হইলেও মিনিং তার হইয়া সেখানে তখনও জীবিত থাকে। তারা সেই চিহ্নে পরিণত হয় যেইটার সাহায্যে মৃত মানুষটার লগে জীবিতরা নিজেকে সংযুক্ত করে। মৃত মানুষটি হইছে ‘মরহুম’; কাগজে কোনও-একদিন সে হয়তো মুদ্রিত হইছিল; ক্যানভাসে কেউ তার ছবি আঁকছিল অথবা ক্যামেরার ক্লিকে ধারণ করছিল এবং সে ওই লেখা ও ছবি রূপে সেখানে সক্রিয় থাকে। দুঃখজনক হইলেও সত্য বায়বীয় এই চিহ্নগুলা ছাড়া তার কাছে এখন আর যাওনের উপায় থাকে না! মৃত ব্যক্তিটির কাছে যাওয়ার উপায় হয়তো হাতঘড়ি বা মোবাইল যেইটা সে ব্যবহার করছিল। তারে অনুভব করার উপায় হয়ত পোশাক, ডায়েরি কিংবা সমাধিফলক ইত্যাদি। সময়ের সঙ্গে এই চিহ্নগুলাও ক্ষয় হইতে শুরু করে এবং সেই ব্যক্তিকে ঘিরে তৈরি মিনিঙের জগৎ তখন নিঃস্বতায় মহাকালে হারায়। এইভাবে মিনিং জিনিসটা বাস্তবে বিরাজিত জগৎসংসারের ন্যায় নিজেও একদিন প্রত্নতাত্ত্বিক হইয়া ওঠে। স্ব-চেতনসত্তা দিয়া তৈরি মিনিঙের বিপদ কইলে এখানে :— এর মধ্য দিয়া গমনরত লোক কদাপি সেই জগতে ফেরত যাইতে পারে না যেখানে একদিন তার জন্ম হইছিল!
হইতে পারে সে-লোক জন্ম নিয়াছিল বনে এবং সেখানে একটা গাছের জীবন ছিল তার! সেই গাছ যার কোনও অর্থ তৈরির ফুরসত নাই; নিজেরে জিগানের দরকার নাই সে কে বা কী কারণে বনে বিরাজিত? কোনও মিনিং ছাড়া মিনিংফুল একটা জীবন কাটায় সে; গায়েগতরে বাড়ে ও সময় হইলে মাটিতে ঘুমায়। সমস্যা হইল মানুষ এখন আর সেই জগৎটারে বিলং করে না! ফলত মিনিঙের যে-জগতে তার বিচরণ ও বসবাস সেইটা বিলুপ্ত বা কোনও কারণে সমুদয় উৎস মুছে গেলে তার জীবন ধু ধু মরু। সে এমনকি দেহ নিয়া জীবিত ও সচল থাকলেও ত্রিশ লাখ বছর আগে ইথিওপিয়ার মরুজংলায় কন্দমূল ও পিঁপড়ার ডিমের তালাশে হয়রান লুসি-র লগে তার কোনও তফাৎ নাই। লুসি-র কঙ্কাল জীবাশ্মে পরিণত হওয়ার কারণে প্রত্নতত্ত্ব হইতে পারছে এবং ত্রিশ লাখ বছর পরে হইলেও প্রাগৈতিহাসিক আদিমানব রূপে মিনিঙের জগতে তার স্থান নতুন করে নির্ধারিত হইছে। ত্রিশ লাখ বছর আগে সে সত্যি কেমন ছিল সেটা এখন আর জানার উপায় নাই। প্রত্নতত্ত্ব এখন তারে যেভাবে লুসি নামে কল্পনা ও ব্যাখ্যা করে তার কাছে যাওনের সেইটা একমাত্র উপায়। যদিও প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালে মৃত মাত্রই জীবাশ্মে পরিণত হয় না, যে-কারণে তারা চিরতরে মহাকালের ঠিকানায় হারায়া যায়।
মানুষ তাই স্তানিস্লেভ লেম-র ‘One Human Minute’ অর্থাৎ অনুপল-মানবের সমতুল কোনও কিছু। ওয়ান ফাইন মর্নিঙে সেই মানুষ ঘুম থিকা জাগার পর দুষ্প্রাপ্য বইয়ে ঠাসা লাইব্রেরিতে ঢোকে এবং দেখে ‘১’ নামে গাণিতিক সংখ্যাটি ছাড়া বইগুলার বেবাক অক্ষর চিরতরে মুছে গেছে! বইগুলার মধ্যে বিগত কালের সমাজ-সভ্যতার যত চিন্ ছিল এই সবকিছু বিলুপ্ত হওয়ার কারণে সেখানে আর ফেরত যাওন সম্ভব না। বিগত বইলা যদি কিছু থাকেও চিন্ মুছে যাওয়ার ফলে অর্থেরও চিরতরে মৃত্যু ঘটে এবং সে-বিগত তখন প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞান হওয়ার সম্ভাবনা হারায়া ফেলে। এই অবস্থায় চিহ্নহীন ঘটনার জগৎ শুধু নিজের নিয়মে সক্রিয় ও জারি থাকে কিন্তু স্ব-চেতনাসত্তা হইতে নির্মিত কোনও মিনিঙের জগৎ আর সেখানে বিদ্যমান থাকে না। নাস্তিবাদ এই জগৎকে ‘শূন্য’ বা Nothingness-এর উপমায় রিড করে, পক্ষান্তরে আস্তিবাদ এরে অভেদ বা অদ্বৈত কইয়া বোঝে ও সেখানে নিজের সমাধি দেখতে পায়। সোজাকথা এইটা হইছে সেই সিঙ্গুলারিটি যার পরে আর কিছু নাই এবং থাকার সুযোগও নাই।
ব্যক্তির চেতনসত্তাও সিঙ্গুলারিটির দ্যোতক; সুতরাং যে-লোক সেখানে অটল থাকতে চায় এবং পাখির মতো দানা খুঁটে বাঁচতে চায় তার পক্ষে মিনিঙের কারণে সৃষ্ট ভেদাভেদের জগৎ অর্থাৎ স্ব-চেতনায় জারি থাকনের অভ্যাস প্রত্যাহার করা ছাড়া উপায় নাই। এই প্রত্যাহারের মধ্য দিয়া সে প্রকৃতির সঙ্গে অভিন্ন হইয়া ওঠে। গৌতম বুদ্ধ যেমন একসময় অভিন্ন হইছিল এবং বাকিজীবন যত কামকাজ করছে সেখানে বৃক্ষস্বভাব ছাড়া দ্বিতীয় কিছু তাঁর মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। এই স্বভাব যে রপ্ত করতে পারে একটা গাছের সঙ্গে সে-ব্যক্তির কোনও ফারাক নাই। মাটি ও আলোবাতাস হইতে রস শোষণ করে সে বাড়তে থাকে, একসময় ফুলে-ফলে ভরে ওঠে, এবং দেহকোষ যখন আর পরিপুষ্ট হইতে পারে না তখন নির্বাণ নিয়া নেয়; অর্থাৎ সহজাত চেতনসত্তায় কাটানো জীবনকে টা টা দিয়া নিরন্তর বহমান সেই সিঙ্গুলারিটির মধ্যে তার প্রবেশ ঘটে। বেদের ভাষায় ‘পরব্রহ্ম’-র মধ্যে তার বিলয় ঘটে। কোরান কয় আল্লা নামের একত্ব-র দিকে সে উত্থিত হইতে থাকে। বিজ্ঞান মুচকি হেসে জানায় সে অদ্য মহাকাশে শক্তিস্রোতের ভূতুড়ে যে-তরঙ্গ বহে সেখানে গিয়া মিশে এবং হয়তো জায়মান কোনও নক্ষত্র গঠনের কামে শরিক হয় অথবা গ্যাসের ঘূর্ণিতে পাক খাইতে থাকে। নিরাকার এই সিঙ্গুলারিটি হইছে চেতনসত্তার সেই অভেদ অদ্বৈত রূপ যেখানে কায়াহীন অস্তিত্ব জান্তব স্রোতের মতো নিখিল নাস্তিসম এক জগতে প্রবাহিত থাকে।
সত্তুরের দশকে মুম্বাই শহরে নিজগৃহের অপরিসর কক্ষে বসে দেশি-বিদেশি কতিপয় ভক্তের সঙ্গে অদ্বৈতরসের আলাপ জুড়নের সময় বিড়ি ফুঁকতে-ফুঁকতে প্রচারবিমুখ একরোখা ব্রহ্ম-সাধক নিসর্গ দত্ত মহারাজ এই কথার প্রতিধ্বনি করছিলেন। চেতনসত্তা ও স্ব-চেতনসত্তার লগে দেহ কী করে আলাপ শেষে পুকুরে ফোটা পদ্মের আকার নেয় সেই ব্যাখ্যা দিতে গিয়া তিনি যেসব কথা কইছিলেন এর সারার্থ এইবেলা স্মরণ করি :
আমার এই সত্তা আদিঅন্তহীন। এর শুরু ও শেষ নাই। স্ব-চেতন হওনের ক্ষণে সত্তায় ‘আমি’ জাগ্রত হয় এবং পৃথিবী ও সংসারের মধ্যে নিজেকে বিচরণ করতে দেখে। স্ব-চেতনসত্তার কারণে ‘আমি’–র মধ্যে ‘আমিত্ব’ ভাবের উদয় ঘটে বইলা সেইটা তারে দ্বৈত করে। স্ব-চেতনসত্তা বিলুপ্ত কিংবা কোনও কারণে অনুপস্থিত হলে সত্তায় কোনও বিকার ঘটে না। আদিঅন্তহীন স্রোতের মতো সে খালি বইতে থাকে; নিদ্রার মধ্যে দেহ যেমন প্রাণ ধরে রাখে, সত্তাও সেভাবে জাগ্রত থাকে সেখানে। এই সত্তা হইছে চেতনা বা চেতনসত্তা। স্ব-চেতনসত্তার বিলোপে ‘আমি ও আমিত্ব’ ভাব লুপ্ত হয়; আমার এই সত্তা তখন চেতনের প্রতিফলন মাত্র এবং সে-কারণে নিজেই ‘পরব্রহ্ম’ বা I am That.
চেতনসত্তা শান্তস্রোতে পরিণত হইলে কী ঘটে সে-আভাস চাইনিজ মার্শাল আর্ট অর্থাৎ কুংফু-র অন্যতম মহান শিল্পী ব্রুস লি তাঁর তাওবাদসিক্ত বচনেও রাইখা যায়। কুংফু অর্থাৎ জিত-কুনে-দো তো আত্মরক্ষার একখান কৌশল মাত্র না, এর মধ্যে তাওবাদের মূলসত্য চোরাস্রোতের ন্যায় বহমান। ব্রুস লি তাঁর ‘জিত-কুনে-দোর তাওবাদ’ বহিতে মহান এই শিল্পকলার কলাকৌশল নিয়া বাতচিত করলেও সেই কথাটি যুত করে বলতে পারে নাই যে-কথা টিভিঅনুষ্ঠানে মার্কিনি এক সাহেবের লগে বাতচিতের ক্ষণে অনায়াসে বইলা উঠতে পারছিল। কুংফুমাস্টার হিসেবে তাঁর ক্ষিপ্র গতি ও অতুল ম্যুভমেন্টের রহস্য কি জানতে চাইলে ব্রুস লি মৃদু হেসে ‘এন্টার দ্যা ড্রাগন’-এর সংলাপ স্মরণ করছিল সেদিন :
Empty your mind, be formless, shapeless — like water. Now you put water in a cup, it becomes the cup; You put water into a bottle it becomes the bottle; You put it in a teapot it becomes the teapot. Now water can flow or it can crash. Be water, my friend.
নিজের কথার মধ্যে লি তাওবাদের ইঙ্গিত বহন করে নীরবে :— একজন কুংফুমাস্টার তাও-র ভিতর দিয়া প্রবাহিত হওয়ার মাধ্যমে সাচ্চা হইয়া ওঠে। কুংফু-র মুহূর্তে দেহে যে-তরঙ্গ বহে সেইটা স্ব-চেতনসত্তার বিক্ষেপ নয়, এইটারে বরং জলের অনুরূপ চেতনসত্তা বইলা ভাবা যাইতে পারে। কুংফু-র সাহায্যে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার সময় ব্রুস লি-র দেহ জলের আকার ধারণ করে, সুতরাং তারে এখন যে-পাত্রে রাখা হবে সে হয় ওই পাত্র জুড়ে অবস্থান করবে অথবা পাত্রটা চুরমার করে বাহির হইতেও পারে। কুংফু-র ফিলোসফিটা এখানে :— দেহকে জলের মতো ভাবতে না পারলে জিত-কুনে-দোর টেকনিক কামে দিব না। ওইটা কুংফু রপ্ত করার সময় সচেতনভাবে লোকে শিখে কিন্তু আসল খেলা হইছে নিজের দেহকে সহজাত নমনীয়তার মধ্যে নিয়া যাওয়া, যেন সে জল, স্রোতে–ভাসা কাঠের টুকরা, চকিতে শরীরে বিষ ঢুকাইতে পারে এমন কোনও পতঙ্গ বা সরীসৃপ। মোদ্দা কথা যে-দেহ কুংফু-র খেল দিয়া শত্রুকে নিকাশ করে সে-দেহটারে পরিস্থিতির মধ্যে সেটেল করা। এই কামটা যে করতে পারে তার দেহ তখন ‘শূন্য’ মন নিয়া জলের মতো সহজ ছন্দে পরিস্থিতির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে বা কুংফু-র মোক্ষম আঘাতে শত্রুকে চুরমার করে।
চেতনসত্তা হইছে সেই জল যে কিনা সহজ এবং জগতে সহজাতভাবে সক্রিয় থাকায় ‘পরব্রহ্ম’। বাউলরা যখন ‘সহজ মানুষ’ এই মেটাফর গানে ব্যবহার করে তখন সেই মেটাফরের আড়ালে ব্রুস লি–র ‘Be like water’ অর্থাৎ জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে জলের মতো বিরাজিত থাকার সত্য সেখানে মূর্তিমান হইয়া ওঠে। এই জল হইছে সহজিয়া এবং সহজিয়া হওয়ার কারণে সে ‘পরব্রহ্ম’। সহজ সে-অনুভবে পৌঁছানোর জন্য ব্রুস লি কুংফু-র ভাও রপ্ত করে; বাউল একতারা হাতে পথেঘাটে ঘোরে; আর রবিকবি ‘প্রেম’ নামের ব্যাপারখানাকে টটোলজি বা দ্বিরুক্তির ছলে প্রয়োগ ঘটানোর মাধ্যমে ‘পরব্রহ্ম’-র লগে নিজের কারবার সারে। দৈহিক বাসনার জায়গা থিকা বিচার করলে রবিকবির দ্বিরুক্তি মানুষের লগে প্রেমের আভাস জাগায় কিন্তু মনোদৈহিক জায়গা থিকা দেখলে ব্রহ্ম বা ঈশ্বরকে সে বিবাহ করতে চায় বইলা প্রত্যয় জাগে। রুমি যেমন শামস তিব্রিজকে বিবাহের জন্য ব্যাকুল হইছিল। নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার প্রেমবিভোর আমির খসরু সে-বিবাহের ফেরে নিজেকে মদহুঁশ ও নাঙ্গা দেখতে পাইছিল একদিন :— ‘ছাপ তিলক সব ছিনি রে মুসে নয়না মিলায়-কে / প্রেম ভাটিকা মদওয়া পিলায়-কে / মাতওয়ালি কর লেনি রে মুসে নয়না মিলায়-কে’।
খসরুর মতো রবিও মদহুঁশ! রমণীকে সে Love করে কিন্তু নিজের Marriage বা বিবাহ ঘটায় God-এর লগে। একখান তফাৎ অবশ্য আছে সেখানে :— রুমি-খসরু ও বাউল যেমন গুরু-মুর্শিদ-পির এবং নবি-অবতারগো ঘটকালির মধ্যে দিয়া গমনের পর God-এর সঙ্গে বিবাহের কাম সারে, ওদিকে রবিকবি সেই কাম বা আকামটা করে তাঁর নিজের লগে। ‘পরব্রহ্ম’-র লগে অদ্বৈত হওয়ার রাস্তায় সে তাঁর নিজেকেই বিবাহ করে। এই রবি হাসন রাজার অভিন্ন সহচর। হাসন রাজাও বজরায় সুরমা গাঙে বহুত ঘুরনফিরন, কোড়া পাখি শিকার আর পিয়ারির লগে রঙ্গিলা পিরিতি শেষে আচানক নিজের মধ্যে সেই সুরমা গাঙ, পিয়ারি, কোড়া পাখি হইতে বেবাক জগৎ লীলা করে দেখে চমকায়, আর চমকিত হরষে মুখ দিয়া আওয়াজ ছোঁড়ে :—
বিচার করি চাইয়া দেখি সকলেই আমি / সোনামামি সোনামামি গো / আমারে করিলা রে বদনামি। / আমি হইতে আল্লা রসুল আমি হইতে কুল / পাগল হাসন রাজা বলে তাতে নাই ভুল।। / আমা হইতে আসমান জমিন, আমি হইতেই সব / আমি হইতে ত্রিজগৎ আমি হইতে রব।।… / আপন চিনিলে দেখ, খোদা চিনা যায় / হাসন রাজায় আপন চিনিয়ে, এই গান গায়।
অনুধ্যানের ক্ষণে রবিও নিজের দেহে চিরকালের সে-‘আমি’ চমকায় দেখে শিহরিত হয় এবং বিবাহের কাম সারতে অক্লেশে নিজেকে শুনিয়ে ‘পরব্রহ্ম’-র বাখান গায় :
কোথায় ফিরিস পরম শেষের অন্বেষণে। / অশেষ হয়ে সেই তো আছে এই ভুবনে॥ / বাণী দু-হাত বাড়ায় শিশুর বেশে, / আধো ভাষায় ডাকে তোমার বুকে এসে, / তারি ছোঁওয়া লেগেছে ওই কুসুমবনে॥ / কোথায় ফিরিস ঘরের লোকের অন্বেষণে — / পর হয়ে সে দেয় যে দেখা ক্ষণে ক্ষণে। / তার বাসা-যে সকল ঘরের বাহির-দ্বারে, / তার আলো যে সকল পথের ধারে ধারে, / তাহারি রূপ গোপন রূপে জনে জনে॥ [গীতবিতান : ১০৫]
এই বাখানের মধ্য দিয়া রবি বা হাসনের দেহখান আর দেহ থাকে না, ওইটা মিথোলজির স্মারক করে নিজেদের; তাঁদের দেহে সৃষ্টির পুরুষ ও নারী সত্তা দুটাই একলগে তখন চমকায়। সুফিভাবে এরকম একখান কথা চালু আছে, আল্লার নিরাকার সত্তা যখন সৃষ্টিতে সাকার হইতে চায় তখন পুরুষ রূপের সঙ্গে নারী রূপেও সে সাকার হয় এবং সেই নারীর নাম হইছে ‘সাকিনা’। হাসন পুরুষ রূপের লগে সাকিনারেও দেখে বইলা নিজেরে বিবাহে তাঁর আর কোনও বাধা থাকে না। রবিও নিজের দেহে নিরাকার নির্গুণ ‘পরব্রহ্ম’-র সগুণাত্মক রূপ শিব ও পার্বতীকে অর্ধনারীশ্বর হয়ে বিরাজিত দেখে এবং নিজের সঙ্গে বিবাহ সারতে কালক্ষেপ করে না। বৈদিক বিশুদ্ধ অনুধ্যান হইতে উদ্ভুত ‘পরব্রহ্ম’-র যে-মিথোলজি পুরাণের মধ্য দিয়া সৃজিত হইতে থাকে এবং রবি ও বাউলকে সমভাবে সে-জগতে টানে সেখানে শিব-পাবর্তী পুরুষ-প্রকৃতি রূপে পরস্পরের মধ্যে যুগলবন্দি বা অদ্বৈত হইয়া ওঠে। সৃষ্টির প্রয়োজন দেখা দিলে তার যদিও সাকার রূপ ধারণের মাধ্যমে আবার দ্বৈতও হয়। এইটা হইছে আদি ও একমাত্র, এছাড়া ব্রহ্ম কী করে মানুষে অংশকলায় অর্থাৎ লালনকথিত সেই ইশারাটা ঠিকঠাক ধরন যায় না। রবিও সেখানে ব্যতিক্রম না। নিজের ছয় ফিট দেহখান সে ‘পরব্রহ্ম’-র জন্য সাজায় ও সেইটা তারে নিবেদন করে :— ‘আমার এই দেহখানি তুলে ধরো, / তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো—’।
এহেন প্রেমের জগতে অনুধ্যান বা মেডিটেশন সবকিছু ছাপাইয়া প্রধান হয়। প্রেমের এই রীতিতে উপকরণ হয়তো লাগে তবে আচার-উপাসনা গৌণ হইতে বাধ্য সেখানে। ব্রুস লি-র জন্য উপকরণটা ছিল কুংফু; রুমির জন্য শামস তিব্রিজ আর দফের তালে ঘূর্ণিনাচ; খসরুর জন্য নিজামুদ্দিন আউলিয়া ও কাওয়াল; খাজা মইনুদ্দিন চিশতির জন্য দফ নিয়া জিকির বা সামা; লাল শাহবাজ কালান্দারের জন্য দমে দমে আলী নাম জিকির; লালনের জন্য এইটা একতারা; আর রবিকবির জন্য খাতা-কলম। কাগজের অক্ষরে স্ব-চেতনসত্তার অনর্গল উন্মোচনের মধ্য দিয়া নিজের দেহকে সে খালি বা রিক্ত করতে থাকে। দেহসাধনায় চারিচন্দ্র বা ইত্যকায় বিষয়গুলা রবি কেন এলাউ করে না সেইটা বোঝার জন্য সুধীর এই জায়গাটা বিবেচনায় নিলেও পারতেন।
রবি তাঁর সারাজীবন নারীপুরুষ নির্বেশেষ মানুষের লগে প্রেম করার ছলে নিজের সঙ্গে প্রেম করছে। যদিও তাঁর এই প্রেম নার্সিসাস নয়, যেইটা পশ্চিমে খুব চলে এবং মানুষকে নিয়া উদ্বেগ-বিরক্তি-হতাশা ও শেষতক অনুভূতিহীনতা বোধ করানোর মধ্য দিয়া মানসিক অবসাদ, বমনপিপাসা ও আত্মপ্রেমে নিঃস্ব হয়। তবে নার্সিসাস না হইলেও রবির গানে-কবিতায় নিজের দেহখান রূপক হয়ে স্রোতের মতো উছলে পড়ে। তাঁর দেহ ফসলের খেত, সোনালি ধানে ভরপুর। ‘রাশি-রাশি ভারা-ভারা ধান’ দিয়া সে তারে সাজাইছে এবং সময় হইছে দেখে ধান কেটে নৌকায় তুলে দিছে। নৌকা বড় নিঠুর। রবিকে একলা রেখে ‘ভারা ভারা’ শস্যে বোঝাই সে-তরী হারায় নিরুদ্দেশ :— ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই — ছোটো সে তরী / আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি। / শ্রাবণগগন ঘিরে / ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে, / শূন্য নদীর তীরে / রহিনু পড়ি— / যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।’
নিরুদ্দেশে যে-হারায় সে আর কেউ না, রবির স্ব-চেতনসত্তা। এই সত্তা তাঁরে দিয়া লেখায়; গান বাঁধতে বাধ্য করে; নটে বানিয়ে মঞ্চে উঠায় অথবা বক্তিমা ঝাড়তে বলে; সেই সত্তা তাঁরে দেশ-বিদেশ ঘোরায় আর দেশজাতি নিয়া গুরুতর কথা ফাঁদার জন্য খালি খোঁচায় আর খোঁচায়! আবার এইসব যখন অসহ্য বোঝা বইলা মনে হয় তখন চতুর স্ব-চেতনসত্তা তাঁরে কুয়ার ধারে নিমগাছের তলে বসাইয়া রাখে। উদ্দেশ্য? — রবিকবি যেন এই ফাঁকে নিজেকে নয়নভরে দেখবার পারে!
রবি দেখে নিমগাছের তলে গ্রাম্যবালিকা হয়ে সে বসে আছে। ছাতিফাটা তেষ্টায় কাতর পথিক বালিকার কাছে একদিন জল চেয়েছিল আর বালিকা কলস হইতে পথিকের করপুটে জল ঢেলে দিয়েছিল সেদিন। পথিক এখন নাই। বালিকার হৃদয়ে টোকা দেওয়ার পর থিকা তার আর দেখা নাই। কোথায় কোন চুলায় গেছে কে জানে! তবে যাওয়ার ক্ষণে বালিকার সর্বনাশ করে গেছে। হৃদকমলে বালিকা এখন শুধু পথিকের মুখখান ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পায় না। মনের আয়নায় পথিক খালি আসে আর যায়! মনে পড়ে, সেদিন তার নাম জানতে চেয়েছিল সে আর শরমে নিজের নামখান বালিকা তখন কইতে পারে নাই। আজ এতদিন বাদে বোধ জাগছে, নিঠুর পথিক তার মনে অরূপ তৃষ্ণা জাগ্রত করে চিরজনমের জন্য পালাইছে। একলা ও রিক্ত মনে নিমগাছের তলে বসে থাকা ছাড়া বালিকার এখন কি করার আছে :—
যখন তুমি শুধালে নাম / পেলেম বড়ো লাজ, / তোমার মনে থাকার মতো / করেছি কোন্ কাজ। / তোমায় দিতে পেরেছিলেম / একটু তৃষার জল, / এই কথাটি আমার মনে / রহিল সম্বল। / কুয়ার ধারে দুপুরবেলা / তেমনি ডাকে পাখি, / তেমনি কাঁপে নিমের পাতা— / আমি বসেই থাকি।’ [কুয়ার ধারে, খেয়া]
রবি জনমভর এক ‘বসে থাকা’ পাবলিক! হাজারবিজার মানুষের লগে রাইতদিন উঠবসের পর টের পায় তারা আসলে তাঁর সাইড দিয়া বাহির হইয়া যাইতেছে! বিরাট সংসারযজ্ঞে তাঁকে একলা রেখে সকলে যে-যার পথ ধরে আর যাওয়ার আগে তাঁর জন্য রাইখা যায় রিক্ত ধানখেত। এই উপায় নাই যে তাদের সে জিজ্ঞেস করবে কেন তারা গোছা-গোছা বইপত্তর নিয়া তাঁর কাছে আসে দু-কলম লিখে দেওনের জন্য? কেন এই লোকগুলান তাঁর কাছেই খালি দেশজাতির ভবিষ্যৎ জানতে চায়? কী সে-কারণে সকলে মিলা তাঁরে গুরুদেব কইয়া নমো-নমো করে আর সে বাধ্য হয় গুরুর ভূমিকা পালনে? তাদের কিছু বলতে না পারার দুখে হয়তো রবি নিজের স্ব-চেতনসত্তার কাছে নালিশ করে :— ‘আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে / হে সুন্দরী? / বলো কোন্ পার ভিড়িবে তোমার / সোনার তরী।’ [নিরুদ্দেশ যাত্রা, সোনার তরী]
‘সোনার তরী’ হয়তো ক্লিয়ার করে, অরূপ এই রূপের জগৎ হইছে মায়া এবং সেইটা নিরুদ্দেশ হওয়ার পর রিক্ত ধানখেত এই দেহ ছাড়া কিছু পড়ে থাকে না, যে-দেহের ঠিকানা রূপরসহীন নিরাকারের অন্ধস্রোতে প্রবাহিত নির্বিকার চেতনসত্তার জগতে। কে কার সঙ্গী সেখানে? কেউ নাই একমাত্র নিজে ছাড়া। অদ্বৈত সে-নিরাকার হইছে রবিকবির সেই জগৎ যেখানে পৌঁছানোর জন্য অনুধ্যানকে একমাত্র মাধ্যম বইলা সে স্বীকার যায় এবং সাধনসঙ্গিনী লগে নিয়া কামবাই দমন ইত্যাদি এক্সপেরিমেন্টে সায় দিতে আপত্তি ঠুইকা বসে। রবির জীবনজার্নির মধ্যে ‘কামবাই’ ব্যাপক আকারে থাকলেও সেইটা তাঁর জীবনভাবনার দোষে শেষতক রক্তমাংসহীন কায়ার অনুভূতি জাগায় মনে। এটা সেই ‘কামবাই’ নয় যে-‘কামবাই’ মানিক কিংবা জগদীশ গুপ্ত পাঠে অহরহ জাগে। এমনকি বাউলের ‘কামবাই’ নয়, যে-বাই দমনের জন্য বাউল বীর্যসাধনায় আকুলিত হয়। সে সাধনসঙ্গিনী নিয়া ঘোরে এবং দেহতত্ত্বের গানের মধ্য দিয়া নিজের সাধনারে ‘পরব্রহ্ম’-র লগে জুড়ে।
যে-কামবাই বাউলকে শূক্রপাত করতে বাধ্য করায় সেই শূক্রপাতের কারণ রূপে উদিত হরমোনের নিঃসরণ ঠেকানোর জন্য মগজের নিউরণকণাগুলা সে অবিরত খাটানোর চেষ্টা করে এবং এই রিফ্লেক্সটা হইছে বীর্যসাধনার মূলকথা। ঘটনা যদি তাই হয় তাইলে অনুধ্যান সেখানে যথেষ্ট হওনের কথা, সঙ্গিনী নিয়া ঘুরনে কি কাম! চারিচন্দ্র সাধনা ইত্যাদির নামে বীর্য পান, যোনিরসের ব্যবহার, মলমূত্রের এস্তেমাল এবং সঙ্গিনী নিয়া এইটা পরীক্ষা করা যে ‘না আমি নিজের শূক্রপাতের বেগ দমন করতে পারছি’… রবির মনে এইসব নিয়া খটকা জাগে বইলা হয়তো সে প্রশ্ন তোলে :— ‘বুঝাইয়া কও দেখি, এইগুলার কাম কি মনু?’ এই আচাররীতিকে সে তাই তাচ্ছিল্য করে এবং লালন, গগন হরকরা ও হাসন রাজাকে সোদর বইলা বুকে টানে। যদিও লালনে সাধনসঙ্গিনী অপরিহার্য অনুষঙ্গ কিন্তু তাঁর টেক্সটের গভীরতা বিবেচনায় সাধনসঙ্গিনীর ঘটনা রবি সেখানে ইগনোর যায়। ‘মানুষ’ ভজনের উছিলায় নবি-কানাই-শ্রীচৈতন্য বা নিমাই সন্ন্যাসীকে মুর্শিদ অর্থাৎ গাইড মান্যকারী লালন অনন্য সেই সিঙ্গুলারিটির মধ্যে নিজেকে একীভূত করতে পারছিল বইলা রবির কাছে সে দামি হইয়া ওঠে।
‘পরব্রহ্ম’ মানুষেই বিরাজিত, বিষয়টি উপলব্ধি করনের জন্য সেরেব্রাল কর্টেক্স বা মগজের সেই মহাসড়কে নিজেকে উঠানো দরকার যেখানে দেখা-স্পর্শ-অনুভব হইতে প্রাপ্ত নিউরণকণা লজিক সেন্টারস বা যুক্তিবোধ গঠনকারী কেন্দ্রগুলায় একীভূত ও সংহত হইতে থাকে এবং স্থায়ী স্মৃতি হইয়া ওঠে। মস্তিষ্কবিজ্ঞান অনেকদিন ধরে স্মৃতি সংরক্ষণের পদ্ধতিটারে দুই ভাবে দেখে। এর একটা হইছে ক্ষণস্থায়ী (Short Term Memory) এবং অন্যটা স্থায়ী (Permanent Memory)। ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিগুলা ক্রমাগত অভ্যাস ও অনুশীলনের মধ্য দিয়া মগজে স্থায়ী বা পার্মানেন্ট হয়, অর্থাৎ যেসব বস্তু-চিন্-ঘটনার সংযোগে যাওনের ফলে স্মৃতি স্থায়ী সংকেতে পরিণত হয় সেগুলার স্পর্শে আসা মাত্র মস্তিষ্কের গলিরাস্তার বাল্বগুলা জাইগা ওঠে এবং ব্যক্তির আচরণে সেই স্মৃতির প্রকাশ ঘটে।
আমাগো আহার-বিহার-ভজন-শয়ন-রমণ ও নিদ্রার মতো নিত্য অভ্যাসের অনেকগুলা যদিও জিনকোষের গঠনে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ হওয়ার কারণে মস্তিষ্কে আপনা থিকা খেলে, কিন্তু ব্রহ্ম-অনুভব বা এরকম কোনও ঘটনায় যে-লোক নিজেকে বিজড়িত করতে চায় অনুশীলনের মধ্য দিয়া তারে সেইটা রপ্ত করনের বাও শিখতে হয়, যেন মস্তিষ্কে অভিজ্ঞতাটা স্থায়ী হয় ও সময়মতো রেস্টোর করন যায়। এইটা হইছে মেডিটেশেনের সারকথা। মস্তিষ্কবিজ্ঞানী এরিক ক্যান্ডেল তাঁর অতি উপাদেয় ‘স্মৃতির তালাশ’ (In Search of Memory) বহিতে এই ঘটনাখান ‘অনুশীলন মানুষকে দক্ষ ও নিখুঁত করে এবং অনুশীলন ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিকে স্থায়ী স্মৃতি হইতে সাহায্য করে’ বইলা দাগাইছেন।
রবি এই মস্তিষ্কবিজ্ঞানে দড় ছিল বা এইটা নিয়া ভাবছিল এমন প্রমাণ অবশ্য ইতিহাসে লেখে না, কিন্তু তাঁর সহজ অনুভব শঙ্কারাচার্য হইতে শ্রী চৈতন্য এঁনারা কোন পথে ‘পরব্রহ্ম’-র সুলুক করছেন সেইটা ধরতে পারছিল বইলা দেহসাধনার আচার-বিচারে তাঁর মতি ছিল না। শঙ্কারাচার্যের মস্তিষ্কের নিউরণকণা অ্যানালিটিক্যাল বা বিচারপদ্ধতি অনুশীলনের সড়কে গমনাগমনের মাধ্যমে ব্রহ্মস্মৃতি অধিগত করছিল। শ্রী চৈতন্য বামুনগো টুলে এই পদ্ধতি রপ্ত করলেও বিকল্প পথ ধরে ব্রহ্মর সুলুক করছে। নিমাই সেই পথ ধরছে যেখানে গমনের পর মস্তিষ্কের বামদিকের মহাসড়কে বিদ্যমান বিচারপদ্ধতির স্মৃতি-সংকেত ডানদিকের মহাসড়কে সক্রিয় ইমোশন সেন্টারস বা আবেগকেন্দ্রগুলার লগে কমিউনিকেট সারতে বাধ্য হয়। এই ইমোশন বিচারভাব হইতে নিজেকে প্রত্যাহার কইরা নিতে এবং রাধাভাবে কৃষ্ণরূপী ‘পরব্রহ্ম’-র প্রেমে মাতোয়ারা হইতে নিমাইকে সাহায্য করে। রবির লগে বাউলের মিলন ও বিরোধের জায়গাটা ক্লিয়ার করতে পঞ্চম বাখানে নদের নিমাই সূত্রে অগত্যা সেইদিকে যাইতে চাই।
… …
- হাসিনাপতন : প্রতিক্রিয়া পাঠোত্তর সংযোজনী বিবরণ || আহমদ মিনহাজ - September 4, 2024
- তাণ্ডব ও বিপ্লব || আহমদ মিনহাজ - August 10, 2024
- তাৎক্ষণিকা : ১৮ জুলাই ২০২৪ - August 8, 2024
COMMENTS