রবিকবির পরব্রহ্ম ৬ || আহমদ মিনহাজ

রবিকবির পরব্রহ্ম ৬ || আহমদ মিনহাজ

ষষ্ঠ বাখান : ছবিয়াল রবি ও ন্যাংটা রাজা
অবনীন্দ্রনাথ আর গগনেন্দ্রনাথের পাল্লায় পড়ে ছবি আঁকার কসরতে রবি হাত পাকাইতে শুরু করল একদিন। তাঁর সে-ছবির ভাষা দেশি ভাইবেরাদরগো মাথার উপরে দিয়া যায় দেখে রবিকবি এইগুলা বাক্সপেটরায় ভরে পাড়ি দিলো আর্হেন্তিনা। মনে আশা, তাঁর এই প্রত্নতত্ত্ব যেইটা নন্দলাল, অবন বা গগেন যে-ছাঁদে আঁকে তার লগে মহব্বত সত্ত্বেও আলাদা একখান জিনিস, লোকে তা একদিন ঠিক বুঝব। কবিতা ও গানের খাতায় কাটাকুটি করনের দিন থিকা এর লগে তাঁর আশনাই চলছিল। অবদমনের বিস্ফার হয়তো বলা চলে, দেশ যারে ধরতে পারছে বলে একিন হয় না; এখন বৈদেশে ওরা যদি বোঝে! এই ছবির জগৎ রবির জীবনের দ্বিতীয় সত্তা, যার লগে তাঁর পরব্রহ্মর ধ্যানে চোবানো সত্তার সংযোগ ক্ষীণ। এই ছবিয়াল রবি পশ্চিমের অ্যালিয়েশনের দ্যোতক হওয়ার পরেও সেখান থেকে দূরে সরে কেমনে-জানি নিজভাষায় কথা কয়!

অধমের ক্ষুদ্র বিবেচনায় মনে হইছে ছবিয়াল রবির জগৎটা হইছে তাঁর দ্বিতীয় সত্তা; যে-সত্তা জীবনভোর বহির্মুখী বা Extrovert থাকার চাপ সামাল দিয়া বিজয়া অর্থাৎ ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর প্ররোচনায় নিজের দুঃস্বপ্নের খাতা খুলে বসছিল একদিন। মনের গহীনে যে-সাপ্রেশনগুলা তাঁরে বহুদিন থিকা পিটায়, ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’-র মতো যেসব অকথিত কামবাসনা, হৃদয়ের বিরোধ ও বিরহ, ভীতি ও বিকার এবং এইগুলার যোগফল অবদমনের নির্গলন, — রবির ছবি-আঁকার ক্যানভাসে সেইগুলার মোক্ষণ ঘটছিল বৈকি!

এই ছবিগুলা হয়তো তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম অনুভবের প্রকাশ। সমাজ উদ্ধারে নিজের ইচ্ছা ও অনিচ্ছায় ব্যতিব্যস্ত রবিকে যে-অনুভব স্ব-চেতনসত্তারে অতিক্রম করে গহন অবচেতনে ডুব দিয়া নিজের খবর নিতে বাধ্য করে। ছবিগুলা পশ্চিমের চোখ দিয়া দেখতে গেলে অবদমন বা সাপ্রেশনের বিস্ফার। প্রাচ্যধারায় হয়তো-বা সো-কলড রৈবিক মরমিবাদ ও আধ্যাত্মিকতার লগে রবির বিরোধাভাস। ছবির এই জগৎ তাঁর খোলস উৎপাটন করায় এবং রহসঘন মধুর ‘পরব্রহ্ম’ প্রীতিটারে অন্তত এখানে ‘ভালগার’ ভাবতে বাধ্য করে। ছবিগুলা সেই রবিকে চেনায় যার সঙ্গে নারীর জটিল ও অকথিত চোরাটানের ইশারা ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল ও বাইরে জীবনভোর জারি ছিল অগোচর চপল আনন্দের খেয়ালি তোড়ায়! এভাবে হয়তো-বা যার নারীত্বের দ্যুতি কিশোর রবিকে শেলি-র ‘পরম রমণী’-র আস্বাদ দিয়েছিল একদিন, সেই কাদম্বরী দেবীকে রবি বহুভাবে রিকল ও মেমোরাইজ করে ধূসর প্রহেলিকায়

রবির দ্বিতীয় সত্তার এই জাগরণগাথায় রমণীরা রবির ভিতরের অবচেতনসত্তা হইতে যেন আসে এবং বিপর্যয় ঘাটায়। তাদের লম্বাটে মুখের ডৌল, মৌন অথচ নির্বাক নির্বিকার চোখের তারা, অধরে লটকে-থাকা টেরচা হাসির ছটা, কেউটে সাপের দেহছন্দে পিঠ ছাপানো খোলা চুলের প্রবাহ ও নিম্নগামিতা, এবং ক্যানভাসের মসীলিপ্ত পটভূমির মধ্যে তাদের অবস্থান মনে আরাম ও প্রশান্তি বহানোর পরিবর্তে অশান্ত ঝড়ের আভাস আনে। সে-ঝড়ের অতলে অনুযোগভরা ভালোবাসার মধুর কলহ ও বিরহ নেই, হাহাকার নেই, কোনও ক্রন্দন নেই, শুধু নির্বিকার অশনির সংকেতখানা অমোচনীয় হয়ে মনকে শিহরিত করায়। এই অনুভূতিটা অযুত অস্তিত্বের জন্ম দিবে বলে মাটির গভীরে ঘুমন্ত লক্ষ বীজের আকাশে উড্ডীন বলাকা হওয়ার দুরন্ত কোনও পিপাসা নয়। রবি এইখানে নয় সে-‘বলাকা’, ঝিলমের স্রোতে অভিন্ন দেওদারতরুর সারি দেখে যে একদিন বল্গাহারা আবেশে নিজেকে মুখর হইতে দেখছিল :— ‘শুনিতেছি আমি এই নিঃশব্দের তলে / শূন্যে জলে স্থলে / অমনি পাখার শব্দ উদ্দাম চঞ্চল। / তৃণদল / মাটির আকাশ’পরে ঝাপটিছে ডানা, / মাটির আঁধার-নীচে কে জানে ঠিকানা / মেলিতেছে অঙ্কুরের পাখা / লক্ষ লক্ষ বীজের বলাকা।’

ঝিলম নদীর স্রোতের তরঙ্গে বিলীন রবিকবি অস্তিত্বের যে অগাধ উন্মোচনের অভিজ্ঞতায় শিহরিত বোধ করেছিল সেইটা হয়তো তার প্রথম ও আদি সত্তা, যদিও বহুভাবে বোলপুরে পিতার সঙ্গে আকাশের তারা চেনার মধ্য দিয়া তাঁর স্ব-চেতনসত্তায় এর জাগরণ ঘটেছিল। বিশ্ব এখন এই সত্তাকে রবি কইয়া বোঝে এবং সেইটা মিথ্যা না। কিন্তুক রবির দ্বিতীয় সত্তায় অজস্র বলাকার মতো যেসব রমণী পাখা ঝাপটায় তারা প্রথম সত্তার মতো বহুগামী না হইলেও অতল রহসভরা উদ্বেগের স্মারক হইয়া সেখানে বিরাজ করে। এইটা অধমের অনুমান হইলেও সম্ভব মনে হয় :— গগনেন্দ্রনাথের রমণীকুল আাঁকার ধরন রবিকে প্রভাবিত করছিল ব্যাপক

গগনের Meeting at the staircase ভারতীয় ছবি আাঁকার জগতে তাঁর Signature Painting গণ্য হওয়া উচিত এবং হয়তো গণ্য হইছেও। সে যা-ই হোক, আঁকার ধরনে গগনেন্দ্রনাথের পরোক্ষ কোনও ইশারা যদি থাকেও রবি এই রমণীদের পাঠ করে নিজসত্তার অনুপম দ্বৈততায়। সেই দ্বৈততায় মৃত কাদম্বরী দেহ ধারণ করে ঠাকুরবাড়ির খোলা ছাদ হইতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামেন! রবি হয়তো নিজের মধ্যে কাদম্বরীকে হঠাৎ নজর করে এবং কাদম্বরীর মধ্যে অন্য রমণীরা আসে-যায় দেখে বিমোহিত হইতে থাকে! রবিকবির ছবির জগতে অবস্থিত রমণীরা শান্তির পরিবর্তে ঐকতানমুখর ঝড়ের আভাস নিয়া আসে; যে-ঝড় অস্তিত্বের অন্ধকার পাতাল হইতে উঠে আসে ও রবির মনের উপরে তরঙ্গ বহায়। অশনিসদৃশ রমণীগো তুলির পোঁচে ক্যানভাসে আঁকনের সময় রবি হয়তো কাদম্বরীর উদ্দেশে বিড়বিড় করে :— She has to be born to destroy the essence of love. The absolute woman but not for love, she is born to regain to inhale the man who lost his woman forever in the forlorn nightmare.

যা-ই হোক, মূল কথায় ফিরি। রবির আঁকিবুকি যে-রমণীরেই নজর করাক, কিংবা সেখানে পশ্চিমের চোরা অবদান যদি থাকেও, তাঁর এই দ্বিতীয় সত্তা ভারতীয় কনটেক্সটে শেষতক গৌণ হইয়া ওঠে; এবং সেইটা এ-জন্য :— রবি নিজের এই দ্বিতীয় সত্তাটারে জীবনের শেষ দম অবধি মাথাচাড়া দিয়া উঠতে দেয় নাই। তার মনে এই ভয় হয়তো ছিল, অবদমিত যে-সত্তার জাগরণ কেবল তার নিজের মধ্যে ঘটে সেই সত্তাটারে দেশ-সমাজ ইত্যাদির লগে জুড়নের মাঝে বিশেষ সার্থকতা নাই। সে এমন এক ভূখণ্ডে বিচরণ করে যেখানে লোকের ঘরে আলো জ্বালানোর ঠেকা হইতে তাঁর মুক্তি নাই; যেখানে এই কোটি কোটি জনতা মহাভারতের ব্রাহ্মণের উপমা বৈ অন্য কিছু নহে। ঘন অরণ্যে পথ চলার সময় গর্তে পা হড়কে পপাত ধরণীতল সেই বামুনের পায়ের নিচে সাপ ফণা তুলছে আর মাথার উপরে মৌমাছির অব্যাহত গুঞ্জনের মধ্যে চাক থিকা মধু চুঁইয়ে পড়তেছে তার অধরে! আলগা লতা ধরে ঝুলন্ত বামুন সেই মধু পান করতে বাধ্য এখন। মৃত্যুর নরকসম বিভীষিকার জগতে বসে মধুপানের নামান্তর হইছে সংসার এবং রবিকবি সেইটা যাপনে বাধ্য

বিষের ভাণ্ড চারধার থিকা উপচাইয়া উঠছে তবু সে-বিষভাণ্ডের মধ্যে যাপনের হ্যাডম যে-রাখে সে হইল চিরপুরাতন ভারতীয় এবং প্রাচ্যে তার অধিবাস। রবিদেহের প্রতি মর্মে এই ব্রাহ্মণ বংশগতির সহজ নিয়মে বিচরণ করায় বিলেতফিলেত ঘুরে নিজের সেই একবগগা তালে সে ফেরত যায় পূর্ববঙ্গে অথবা আদিবিস্তৃত এই কুরুক্ষেত্র কর্মের চাকায় ঘুরতে তাঁরে বাধ্য করায়। ভারতবর্ষে ফেরত যাওনের পথে নিজের সান্নিধ্য সে খুঁজে পায় জাপান, পারস্য কিংবা বালি দ্বীপে বহমান হিন্দু সভ্যতার স্মারকচিহ্নগুলায়। এই সত্তা হইছে রবির পিতামহ ও পিতৃসূত্রে পাওয়া সেই উত্তরাধিকার যে একইসঙ্গে কর্মী ও সন্ন্যাসী

রবির এই সত্তা তো খালি গানবাজনায় নিঃস্ব হয় নাই। তাঁর স্ব-চেতনসত্তায় এক কর্মী রবি জন্ম নিয়েছিল পারিবারিক আবহের দোষে। সেই রবি এলিট এবং সে এইটা ভাবছে :— প্রাচ্যের জীবনধারায় যেসব মরাগাঙ আজও বহে এবং সমাজের ক্ষতির কারণ হয়, সেসব মরাগাঙে জোয়ার আনার জন্য প্রতীচ্যে বিকীর্ণ আলোর কিছু অংশ কাজে লাগানো যায়। ‘তাসের দেশ’-এ ‘শুকনো গাঙে আসুক / জীবনের বন্যার উদ্দাম কৌতুক;’-এর কোরাসছন্দি সুরটা বিলক্ষণ তাঁরে নিয়ন্ত্রণ করে সেই সময়। সেই হৃদয় ও মন নিয়া রবি পশ্চিমা সভ্যতার সাধারণ ও গুণীজনের জগতে ঘুরছে আগন্তকের মতো। পশ্চিমে সে পঠিত হইছে মিস্টিক সেইন্ট-এর তকমায় আর সে নিজে পশ্চিমকে রিড করছে সভ্যতার অশ্বমেধ যজ্ঞে সওয়ার এক রাজা রূপে; এই রাজারে নয়নভরে দেখতে মন চায় এবং নয়ন তারে দেখতে থাকে দেখতেই থাকে…তারপর আচমকা ঘোরে চটক লাগে…যখন নয়ন দেখে রাজা আসলে ন্যাংটা!

রবি দেখে রাজার চোখের কোণে কালি জমছে। তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়া সাদা কষ বাহির হইতেছে। রাজা দিগ্বিজয় করে ঘরে ফিরছে। অশ্বমেধ যজ্ঞে বসছে আবার দিগ্বিজয়ে বাহির হবে বলে। তার অধরে হাসির আভা কিন্তু চোখের কোণ দিয়া গড়ানো অশ্রু প্রতিহত করনের খ্যামতা সে রাখে না। রাজার কপালে রাজতিলক। মুকুট থিকা সভ্যতার দ্যুতি চমকায় :— জ্ঞানের দ্যুতি, বিজ্ঞানের দ্যুতি; সে-রাজা য্যান পাথরে খোদাই মনোরম মূর্তি একখান! তার হাতের পাঞ্জায় বিদ্রোহ, বিপ্লব, মারি, প্লাবন…যা-কিছু সভ্যতারে ভাঙেগড়ে তারা সূর্যের আলোয় ঠিকরায় চারদিকে! সেই রাজারে দেখতে দেখতে সম্বিতহারা রবিকবি হঠাৎ টের পায়, রাজা তো আসলে রাজা না, সে হইছে কুঠুরিবন্দি প্রেত। তার হাতে ফুল, বুকে নিজেকে কারাগারে বন্দি হইতে দেখনের বিষাদ। সে আসলে ভাগা দিতে চায় এইসব থিকা কিন্তু নাচার নিজ কর্মদোষে!

এই রাজা রবিকবির ‘রাজা’ ও ‘রক্তকরবী’ নাটকে আসে কি না জানি না, তবে এইটা ঠাহর হয়, রবি এই রাজাকে কভু নিজদেশে দেখতে চায় না বলে ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে…’ ইত্যাদি বাখান গাইবার পর সান্ধায় নিজ আশ্রমে। সেই মাটির কুটিরে কিংবা বজরায় যেখান থিকা লন্ডনে বসে দাগানো কার্ল মার্কসের ‘উদ্ভিদসুলভ’ জীবনের ছায়ায় বাড়তেথাকা মধুপায়ী বামুনগুলারে অনায়াসে নজর করা যায়! ভারতবর্ষের এই সভ্যতা অবসন্নতার প্রহর শুরু হওনের দিন থেকে জীবনের নতুন রসে আর বাড়তে পারে নাই তো কি হইছে, বিরাট এই ভূবর্ষ এখনও সচল তার নিজ নিয়মছকে গড়া অভিজ্ঞানের মধ্যে, — যেখানে দারিদ্র্য অসীম, যেখানে নতুন জ্ঞান প্রবেশের পথ পায় না, যেখানে কলহ-বিবাদ আর চাবুকের ঝনাৎকার সদা চলে, যেখানে রণচণ্ডি আবেগ সব চুরমার করতে ছোটে এবং পরক্ষণে মোক্ষম মারের চোটে ন্যাতায় ধুলায়; যেখানে লোকে বয়স ফুরানোর আগে গঙ্গা ও কবরযাত্রায় জীবনের শেষ দেইখা ফেলে এবং সন্ন্যাস আর দরবেশের শরণ মাগে নিত্য; যেখানে মানুষগুলো বহুভাবে মার খেয়েও কী করে জানি উৎসবে জীবিত ও সচল থাকে আজীবন!

সেই জটিল ও বহুবর্ণিল জীবনস্রোতের তরঙ্গে ভেসে রবি নিজের কিনারা খোঁজে মানবতার স্রোতে, যে-স্রোত পশ্চিম মহাসাগরের রাজা-প্রজারা এখন আর নিরাময় বইলা একিন যায় না। রবি ধায় ভারতীর্থের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ মহাসাগরে। এই সাগর তাঁর কাছে এখনও চিরজীবিত ও সচল এক নাঙ্গা কালী! রবি জানে ভারত হইছে মহাকালী; যে-কালী প্রতিপলে জন্ম দেয় ও সংহার করে ধরণী! এই রবির সঙ্গে পশ্চিমের সাহেবমেম কিংবা কামু-কাফকা-পেসোয়ার এখানে তফাত। আত্ম-অস্তিত্বের ফেরে যে-মানুষ জগৎকে প্রত্যাখ্যান করে সে তখন নিজেকেই হাস্যকর প্রমাণে মরিয়া হয়! ফার্নান্দো পেসোয়া এই কাণ্ড ঘটায় নিজ জবানে। তাঁরে লিখতে হইছিল :—

The entire day, in all the desolation of its scattered and dull clouds, was filled with the news of revolution. Such reports, true or false, always fill me with a peculiar discomfort, a mixture of disdain and physical nausea. It galls my intelligence when someone imagines that things will change by shaking them up. Violence of whatever sort has always been, for me, a fragrant form of human stupidity. All revolutionaries, for that matter, are stupid, as are all reformers to a lesser extent – lesser because they’re less troublesome. [The Book of Disquiet : Fernando Pessoa]

পেসোয়াসূত্রে রবিকবি কেন মনে উদয় হইছিল সেইটা আমার নিজের কাছে এখনতক দুর্বোধ্য। হইতে পারে বহুভাবে সম্মোহক ও জাদুবিবশ হওয়ার পরেও পশ্চিম মহাসাগর তীরে দলে-দলে স্রোতের মতো গুচ্ছ-গুচ্ছ এইসব সামুদ্রিক শৈবাল লোকে যাগো পেসোয়া-কামু-কাফকা ইত্যাদি নামে চিনে, তাঁরা সকলে শেষতক ঠিক সেই জিনিস নয় যা হাতে পেলে ভারতসাগর কিংবা বঙ্গোপসাগরের বেলাভূমে বসে থাকা কোনও রবি কিংবা তার মতো অন্য কোনও রবি বিহ্বল আবেশে অক্লেশে বইলা উঠতে পারে : ন্যাংটা কোনও রাজা না! আল্লার কিরা, আমি ‘মানুষ’ দেখতে পাইছি!

আপনাকে ই-মেইল দাগানোর কারণটা হয়তো এখানেই (বি.দ্র. যে এই দীর্ঘ রচনাটা গানপারে-পূর্বপ্রকাশিত অন্য একটা রচনার পাঠাভিঘাতে লেখকের সঙ্গে গানপারসঞ্চালকের ইমেইলালাপের একফোকরে তৈরি হয়। — গানপার) :— সিংহভাগ জায়গায় অভিন্ন সহমত আর কতিপয় এমন স্থান যা সেই সিহংভাগকে নির্ধারণ করে তার লগে দ্বিমত ও প্রত্যাখ্যানের মন নিয়া পেসোয়া আমি শেষতক পড়ব তাতে সন্দেহ নাই, তবে এইটা মাথায় রাইখা :— আমি সেই দেশ বা ভুবনের মানুষ যেখানে অতুল ঐশ্বর্যে চমকদার এই সভ্যতা এখনও ঠিকঠাক পৌঁছাইতে পারে নাই, এবং সেই ভুবনের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে পেসোয়া এবং তিনারা বহুগম্য জটিলতার চক্করে শেষতক আমার পৃথিবী থিকা দূরেই বসত করেন! তাগো সুর আমি হয়তো নিতে পারি কিন্তু সেই সুর আমারে দখলে নিতে পারে না

আমি সেই পৃথিবীর আদম যে আমারে শেখায় :— নিজেকে প্রত্যাখ্যান অথবা স্বার্থপরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কইরা তোলায় মুক্তি নাই। কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয় দেইখা ব্যক্তির নিজেকে গুরুত্বহীন ভাবন এবং গুরুত্বহীন বোধ করনের পর নিজের কাছে সে কেন গুরুত্বপূর্ণ ইত্যাদি হেঁয়ালির মধ্যে মুক্তি নাই রে পাগলা! পাকের মধ্যে পাকাল মাছের মতন মানুষকে বাঁচতে হবে জীবনভোর। সেই মাছ কাদার মধ্যেই থাকে কিন্তু কাদা তার গায়ের চামড়ায় ঢুকতে পারে না, বরং পিছল খাইয়া কাদায় পইড়া থাকে। মানবসমাজ হইছে স্ব-নিয়ন্ত্রিত ধরণীর অংশ আর দিনশেষে সেখানে তলায়। সুতরাং সহজছন্দে এইটা বরং ভাবা যাইতে পারে :— ঘটনার একঘেয়ে পুনরাবৃত্তির কারণে প্রত্যাখ্যান অনিবার্য হইলেও নির্বিকার মন নিয়া শেষ দম অবধি পাথর উপরে ঠেইলা তুলনের আকাম হইতে মানবের মুক্তি নাই। যেহেতু, বেঁচে থাকা বা সিসিফাসের ন্যায় অস্তিত্বের বোঝা টাননের ঘটনা শেষমেশ দেহের প্ররোচনা আর অণু-পরমাণুর খেল ছাড়া দ্বিতীয় কিছু নয়। এই অনুভবের জায়গা থিকা রবিকবির প্রচণ্ড একাকিত্বের মধ্যেও সকলের লগে থাকার অজেয় এই পরব্রহ্মসুলভ দমটারে আমি চিরচুম্বন করি


শেষ।
মোট ছয়টি অধ্যায়ে বিন্যাস্ত  রবিকবির পরব্রহ্ম এইখানে শেষ হলো।
পূর্ববর্তী কিস্তিগুলোর লিঙ্কমালা অ্যাটাচড রইল।
—গানপার


… …

COMMENTS