১
নারী-পুরুষের যে মিলন হয়, জুবেদ শেখ তার ছোটবেলায় বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে টুকটাক চটি বই পড়তে যেয়ে জেনেছে, এইটার সুন্দর নাম হল রতিমিলন, কিন্তু বড় হতে হতে এই ছাব্বিশ বছরে এসে পড়বার পর তাবৎ বাংলা সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতায় এই কয়েক মিনিট আগে পর্যন্ত তার মনে হইতেছে — রিয়াজের সাথে দীর্ঘদিন দেখা করতে না পেরে দুর্ধর্ষ পিতা আহমদ শরিফের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কলেজের পিছনবারান্দা দিয়ে বুকের উড়না ফেলে দিয়ে ডবকা দুধগুলি নাচাতে নাচাতে পূর্ণিমা যেভাবে ছুটে এসে রিয়াজের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেইটার নামও নাকি মিলন! যেভাবে পাবলিক বলে আর কি! আলিঙ্গন মিলন হয় কি করে — এইটা তার মাথায় আসে না। দুটো জিনিস কী এক!
গ্রামের ভাষায় রতিমিলনকে বলে চুদাচুদি। কিন্তু জুবেদ শেখের মনে হয়, চুদাচুদি শব্দটা দিয়ে পারস্পরিক দুইটা শরিলের আনন্দ ভাগাভাগিটা একেবারেই ফুটে ওঠে না। এই শব্দটা এক ধরনের গালি বলে মনে হয় তার কাছে। যেমন কেউ যখন বলে, তোর মারে চুদছি, এই কথার মানে হলো — ঐ লোকটাকে চূড়ান্তভাবে অপমান করা। এর চাইতে জঘন্য গালি বাংলা ভাষায় সম্ভবত আর নাই। আবার কেউ যখন বলে, তোরে চুদার টাইম নাই — এরও মানে আগেরটার প্রায় কাছাকাছি। হতে পারে সেইটা, তোরে আমি নর্দমার পানিতে কিলবিল করা সাদা কৃমির মতন দেখি। এ-রকম আর কি। তাইলে এই ‘চুদাচুদি’ শব্দটা ‘রতিমিলন’ শব্দের সমগোত্রীয় কী করে হয়!
ভাদো মাসের ঝলমল করা চন্নি রাইত, লিচুগাছের ঘন ছায়ার নিচে, ইন্দারার হিম হিম ঠান্ডা জলে চ্যাপচ্যাপা গরম, ঘাম আর লবণের ভারী ক্লান্তি তাড়াতে তাড়াতে, নতুন প্যাকেটখোলা কেয়া সাবানের ভুরভুরা খুশবাই রাতের বাতাসে ছড়িয়ে, অত্যন্ত চমৎকার একটা সঙ্গম পর্ব কাটানোর পর জুবেদ শেখের এইসব দু-চারটা শব্দ নিয়ে ঘোর ঘোর ভাবনার মধ্যে প্রায় হঠাৎ করে, এই এক্ষুণি হঠাৎ করে মনে হয় — ‘রতিমিলন’ শব্দটাও যেন পর্যাপ্ত নয়।
আজকে শুরুটা হয়েছিল, সংগমের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে। শুরুর দিকে কয়েক ধাপ পেরোনোর পর মনটাকে একটু যদি এদিক সেদিক না সরানো যায়, যদি ধনুকের বাঁক থেকে সূচালো তির তীব্র গতিবেগে বেরিয়ে পড়ে যদি বাতাসের আইনকানুন না মেনে সা সা করে পাখির মাথা লক্ষ্য করে ছুটতে থাকে, তবে নিশ্চিত থাকো সেই তির পাখি অবধি যাওয়ার আগেই গুত্তা খেয়ে মাথা ঘুরে মাটির দিকে ধরাশায়ী হবে। তিরমারা জানতে হয়। মাঝপথে এসে তিরের ফলাকে হাওয়ার মধ্যে শূন্যে কিছুক্ষণ ভাসিয়ে ভুলিয়ে রাখতে হয়। সঙ্গমের সময় দক্ষ পুরুষেরা টেকনিক খাটায়। জুবেদ শেখ নিজেকে এখনো অতটা দক্ষ মনে করে না। বয়স সবে ছাব্বিশ। খেলতে খেলতে খেলোয়াড় — তাই না! গোটা জীবন এখনো পড়ে আছে।
সঙ্গমের সময় কেবল জোশ লাগতে শুরু করেছে, এই সময় ঘোড়ার লাগাম খুব সাবধানে রাখতে হয়, আচমকা দৌড় লাগালে শেষ অবধি যেতে পারবে না ঘোড়া, এই সময় হলো সুখি রাজকুমারের মতন ঘাড় ঘুরে ঘুরে নদীর তীর, শস্যক্ষেত, গ্রামের ঘরবাড়ি দেখবার। জুবেদ শেখ ঘরের বর্গা, মাটির দেয়ালের উপর সারি সারি চলা কালো পিঁপড়ার সারি — এইসব দেখে, দেখতে দেখতে ‘রতিমিলন’ শব্দটাকে মাথার ভিতরে ঢুকিয়ে ফেলে। বলতে হয়, সে ইচ্ছা করেই এই কাজটা করে। ঘোড়ায় সওয়ারিকে শুধু গন্তব্য নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে চলে না। এই সময় নানান বিক্ষিপ্ত ভাবনায় মনটাকে সদাব্যস্ত রাখতে হয়।
২
সিতারা বানু সেই ধরনের নারী যে কিনা শুধু ভালোবাসা চায়। শুধু ভালোবাসা, আর কিছু না। এমন অনেক দিন গেছে জুবেদ শেখ নিজের কারবার, পুলিশি মামলা, নিজের বাচ্চাকাচ্চা, সংসারের খরচাপাতি — এইসব নিয়ে এট্টু আনমনা হওয়া মাত্রই চলন্ত ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়েছে। সিতারা বানুর জায়গায় অন্য নারী হলে এবং সে নারী যদি সিতারার মতন অতীব সুন্দরী ও মেদচর্বি ছাড়া প্রফুল্ল যৌবনা কার্তিক মাসের মধ্যাহ্ন-পরবর্তী টানটান রৌদ্র অথবা রৌদ্রের মতন হয় এমনকি তার অর্ধেকেরও কম থাকে, জুবেদ শেখ মনে করে সে নিশ্চিত তখন সে নারীর লাত খেতো, চোইত মাসের মরা উরির ঝাড়ের রূপ নেয়া তার বউ হাসনা পর্যন্ত এমন অবস্থায় তাকে অনেকদিন কুদাকুদি করেছে। হাসনারও এমন হঠাৎ করে নায়িকা পূর্ণিমার মতন নাক সিঁটকানো ভাব দেখে জুবেদ শেখের মাঝেমধ্যে একা একা অট্টহাসি দিতে ইচ্ছা করত। কথায় আছে না — ঘোড়া গাতায় পড়লে ব্যাঙেও লাত মারে! হা হা হা!
কিন্তু ব্যতিক্রম সিতারা বানু। জুবেদ শেখ সম্পর্কে তার দুঃসম্পর্কের ভাগিনা হয়। মানে সম্পর্ক চালিয়ে যেতে হলে একটা-না-একটা লতাপাতার লেজের অবশিষ্টাংশ যেহেতু তৈয়ার করে রাখতে হয় সেই অর্থে ভাগিনা আর কি! মৈ এমন একটা ডাক, যার সাথে দূরে বলে কিছু নাই। মায়ের পরেই মৈয়ের জায়গা। সুতরাং এখানে অবিশ্বাসের প্রসঙ্গ আসলে তা অনেকদূর গড়িয়ে যাবার পর লোকে জট খুলতে বসে।
তার ভিতরের খবর কেমন করে যে সে জানে! যেদিন জুবেদ শেখের ভালোবাসতে আদর করতে মন বসে না, সেদিন সে জুবেদ শেখের সামান্য সময়ের চোখের দৃষ্টি দেখেই তাকে পড়ে ফেলতে পারে। অথচ তাদের দু-জনের সম্পর্ক মাত্র এই ক-দিনের। হাসনার সাথে তার বিয়ের প্রায় বারো বছর চলে। প্রথম প্রথম হাসনাও তার এই মনের ভিতরের ভালো-মন্দ বুঝতে পারত। কিন্তু একসাথে থাকতে থাকতে কাঁচির দুই বাহুতেও মরিচা পড়ে। অনেকদিন ব্যবহারের পর দেখা যায়, চাবি দিয়ে তালা খোলা যাচ্ছে না, অনেক কসরত করে খুলতে হয়। দুনিয়ার নিয়মই হয়তো এই। রোগে-অসুখে সারাবছর ভোগা হাসনার জন্য তার মায়া হয়। শরিল ভালো থাকলে মনটাও ভালো থাকে। হাসনা যে সময়-অসময়ে ছাঁৎ করে লাফ-দেয়া শিখার মতো জ্বলে ওঠে, যৌবন-হারানো নদী আর যৌবন-হারানো নারীর সাথে তার তুলনা দেয়া যায়। যে-নদী তীব্র বারিষার দিনেও হাঁটুর উপরে উঠতে পারে না, আচমকা এক শীতের বৃষ্টিতে তার পাড়ভাঙা স্রোত আলু-টমাটোর ক্ষেত ভাসিয়ে দিলে গিরস্তও তখন বিদ্রুপের হাসি হাসতে চায় নদীর দিকে চাইতে চাইতে।
তবে সিতারা বানু যেহেতু শুধু ভালোবাসা চায়, শরিলের সুখ সবদিন না-পেলেও তার দিন চলে যাবে, হয়তো তার মনটাকে সে এইভাবে তৈরি করে রেখেছে, হয়তো এ-রকম না-ও হতে পারে — মানুষের মন বোঝা কী সহজে যায়! কিন্তু আগে যতবার জুবেদ শেখ মাঝপথে ছিটকে পড়েছে, অন্য নারী হলে নিশ্চিত তাকে গালাগালি করতো, নিজের বউ যেখানে তাকে এক ইঞ্চি ছাড় দেয় না সেখানে সিতারা বানু তাকে বুকে তুলে নিয়েছে। মুমূর্ষু বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দোল খাওয়ানোর মতন “আমি নু তর মা ব্যাটা! আমি নু তর মা!”, যতবার সিতারা তাকে মায়ের রূপ ধরে পুত বলে ডেকেছে ততবারই সে কেঁপে কেঁপে উঠেছে। “আম্মা আম্মা” বলে গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে কিছুক্ষণ। যেন পুরো পৃথিবী গোটা একটা পর্বতের নিচে চাপা পড়ে সহস্র বছরের জন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কোনো-এক অপরাহ্নে তখন ঝাপসা চোখে দেখা যাবে সাগরের তীর ধরে ধরে একটা ল্যাংটা বালক হাতে একটা পিতলের ঘটি নিয়ে গ্রামের পথে আসতেছে। ঠিক যেভাবে মায়ের গর্ভ থেকে মানবসন্তান ধীর ক্লান্ত পায়ে পৃথিবীর পথে আসতে থাকে। এইসব দৃশ্য তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কতক্ষণ এইভাবে বিভ্রমে কেটে যায় কে জানে!
তারপর জুবেদ শেখ যথারীতি সিতারাকে আদর করতে গেছে। আচমকা মুখ থুবড়ে পড়া ঘোড়াটা ঈশান কোণে কেমন করে রক্তিম সিঁদুর দেখে কে জানে! এর পরের দৃশ্যে দেখা যাবে, তীব্র সুখে একে অপরে আঁকড়ে ধরে দুইটা আদিম জন্তু শীৎকার করতে করতে মরে যাওয়ার মতন ডুবে গেছে স্রোতহীন কোনো জংলি নদীর অতল জলে। সেই সুখের কোনো তুলনা কারো সাথে দিতে চায় না জুবেদ শেখ।
মিষ্টির দোকানে বোলভরা শিরায় চিনিখেকো পিঁপড়ার ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়া দেখেছে কেউ! জুবেদ শেখ দেখেনি। তবে কল্পনা করলে পিঁপড়ার অনুভূতিটা সে বুঝতে পারে। তীব্র সুখে হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার করতে করতে মরণের পথে গমন। নারী-পুরুষের দুই নগ্ন শরিলের পরস্পর একসাথে ডুবে যাওয়াটাও এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত সহমরণ, যে-মরণে নারী-পুরুষ সবাই ঝাঁপ দিতে চায় — সে-রকম আর কি! সিজনের পয়লা বৃষ্টিতে রসকষ-নিঃস্ব-হয়ে-যাওয়া কামিনীগাছটা হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ি করে যেভাবে নাচতে নাচতে আকাশের অসীম পথে মিলিয়ে যাওয়ার জন্য তোড়ফোড় আয়োজন করে — ঠিক সে-রকম মরণের আনন্দের সাথে সঙ্গমের তুলনা দিতে চায় জুবেদ শেখ। রতিমিলন শব্দটা কোনোভাবেই সঙ্গমের আনন্দের প্রতিশব্দ হতে পারে না। অন্য বিকল্প কি শব্দ হতে পারে — জুবেদ শেখ তা জানে না। কিন্তু এইটা সে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারে — রতিমিলন শব্দটা খুবই নিরীহ মনে হয় সঙ্গমের মতন তীব্র এবং আনন্দকাতর শব্দের কাছে।

৩
সিতারা বানুর মতন একটা টাইট মালকে দিনের পর দিন মাসের পর মাস একা পাহাড়ের টিল্লায় অবহেলায় ফেলে রাখে যে ব্যাটামানুষ, তার পৌরুষ নিয়ে সন্দেহ এক-সময় ছিল জুবেদ শেখের। হতে পারে সে-লোকটা চার বাচ্চার বাপ। কিন্তু বাপ বনে গেলেই যে মর্দা পুরুষ হয়ে গেল — বিষয়টা কী তাই! কিন্তু পরে সে বুঝতে পারে লোকটাও সিতারার মতন ভালোবাসার কাঙাল। সিতারা তাকে একদমই সহ্য করতে পারে না অথচ সিতারার জন্য সে পাগল! নায়ক বাপ্পারাজের প্রেমিকা ভালো না বাসলেও সারাজীবন সে ভালোবেসে যাবে — সেইরকম আর কি! কিন্তু জুবেদ শেখের কথা হলো, ভালোবাসলে দূরে থাকা কেন! লোকটাকে সে হয়তো ইচ্ছা করলে বলতে পারত মহান কবি শেক্সপিয়ারের অমর সেই লাইন, “আউট অফ সাইট আউট অফ মাইন্ড“। কাছ থেকে দূরে সরে গেলে মনটাও দূরে দূরে সরে যায়। কিন্তু আরও একটু গূঢ় চিন্তা করে দেখল, সে কেন বলতে যাবে! কারো সংসারের ভাঙাগড়ার দায়িত্ব কি কেউ তাকে সঁপে দিয়েছে! আর আরেকটা কারণ কি সেইটা, যে তাদের দু-জনের মধ্যে মিল না থাকলে জুবেদ শেখেরই লাভ! সিতারা তার স্বামীর ভালোবাসা পেলে কি জুবেদ শেখকে আর কেন জিগাতে যাবে, বগল কামিয়ে দিতে!
রুটিরুজির জন্য সংসারে হাজারো কাজ আছে। হ্যাঁ, তুমি সংসারে একটাই কাজ জানো, সেইটা হাতির দাইদারি, এই তো! কিন্তু যে দাইদারের ঘরে অপূর্ব সুন্দরী বউ থাকে, তার কি উচিত হয় ঘরবাড়ি ফেলে গহিন পাহাড়ে যেয়ে হাতির ল্যাদার ঝাঁঝালো গন্ধের নিচে থেকে মুখ হা করে রাতযাপন করা! জুবেদ শেখ কোনোভাবেই হিসাব মিলাতে পারে না। সিতারার স্বামী দেখতে যতই বেখাটা, গরু দিরগা দেয়ার মুগুরের মতন হোক — স্বভাবে লোকটার ঘাউড়ামি একটা আছে। সংসারের হিসাব বড় জটিল। প্রেম-ভালোবাসার জন্য হলো একটা দেয়াল আর বিপরীতে যে দেয়াল আছে, সেখানে প্রেম-ভালোবাসার বিন্দুমাত্র জায়গা নাই। আছে ঘৃণা হিংসা রক্তপাত, নিষ্ঠুরতা এইসব। জুবেদ শেখ যেভাবে শুধুমাত্র কামনার জ্বালা মিটানোর জন্য সিতারার কাছে আসে, সেইরকম সিতারার প্রতি একপ্রকারের তীব্র ঘৃণা সে লোকটার চোখেমুখে দেখতে পেয়েছে। ভালোবাসার আরেক নাম তো ঘৃণা — তাই না! সামান্য একটা দাইদার হয়ে এত রূপসী এক নারী তার জীবনে আসবে আর প্রকৃতি তাকে বিনয় দেখিয়ে ছেড়ে দেবে এতটা ঔদার্য বোধহয় প্রকৃতি কোনোকালেই করেনি, জুবেদ শেখের স্বল্পজ্ঞানে যেটুকু জানে আর কি!
৪
জুবেদ শেখ যখন সিতারার জীবনে ঢেউয়ের তরঙ্গ লাগার মতন তীরের কাছাকাছি এসে কেবল আসা-যাওয়া শুরু করেছে, তখনি সে বুঝতে পারে, সিতারা বানু সুখী নয়। এত রূপ থাকার পরও মানুষ যদি অসুখী হয়, তাইলে রূপসৌন্দর্য নাই এমন লক্ষ হাজার কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা বেদনা আর বিচ্ছেদ দিয়ে এত হাহাকার করা কেন ভাই! তাইলে কি এটাই ঠিক — সুন্দরী মাত্রই অসুখী আর অসুন্দররাই সুখী!
কিন্তু জুবেদ শেখের এইসব দার্শনিক বিলাপ তো ভ্রম মাত্র, তাই না! সে সামান্য গরুর দালাল। লেখাপড়া করেছিল কলেজ অবধি, পরে আর হয়ে ওঠেনি। অবসর পেলে এইসব সুখ-অসুখ নিয়ে নানান ভাবনা ভাবতে পারে, বলা যায় এইসবে তাকে ঘিরে ফেলে। সামান্য লেখাপড়া করার এই হলো আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ — আল্লাই জানেন ভালো। তবে সিতারার ব্যাপারে তার বেদনা কিংবা তার মনের দুর্বলতা এইসব বোধহয় খাটে না। দিনের পর দিন আসা-যাওয়া করতে করতে একটু দুর্বলতা তৈরি হতে পারতো, যেইটা খুবই স্বাভাবিক। শুধু কী শরিলের যাবতীয় জ্বালাযন্ত্রণা ধুয়ে ফেলার জন্য সিতারার কাছে সে আসে! যেভাবে পুরুষমানুষ বেশ্যালয়ে যায়! সিতারা কী তার কাছে কেবলই একটা বেশ্যার মতন নারী! যে-পরিমাণ প্রেম-ভালোবাসা আদরযত্ন তার জন্য সিতারা উজাড় করে দিচ্ছে — এইসবের কী কোনো মূল্য নাই! বেশ্যাকেও তো শেষ পর্যন্ত জমিদারপুত্র স্বীকার করে নেয়। তীব্র ভালোবাসার কাছে হার মানে। এইরকম গল্পকাহিনি তো জুবেদ শেখের নিশ্চয় অজানা নয়।
কিন্তু অতদূর সে ভাবতে চায় না। আজ যদি সিতারার সাথে তার সম্পর্ক এই মুহূর্ত থেকে বন্ধ হয়ে যায়, সে মনে করে তার খুব-একটা মনখারাপ হবে না। গল্প-উপন্যাস একজীবনে প্রচুর পড়ার এই হলো আশীর্বাদ। সংসারে এইসব প্রেম-ভালোবাসা তো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা — তাই না! কেউ কারো জন্য আটকায় না। বই পড়তে পড়তে জীবন সম্পর্কে সে যা জানে, জুবেদ শেখ মনে করে অতটুকুই চলার জন্য যথেষ্ট। হয়তো তার এই নির্মোহ স্বভাবের জন্যই হাসনা তাকে আজো পাগলের মতো ভালোবাসে। হয়তো সিতারাও এ-রকম।
সিতারা বানুকে যেদিন সে প্রথম দেখে, সারা শরীরজুড়ে যেন বিদ্যুৎগতিতে ঘুমন্ত সরীসৃপ দংশন করতে তেড়ে আসছে,— এমনটা মনে হয়েছিল তার। এমন নারীকে যদি বিছনায় নিয়ে না যাওয়া যায়, তাইলে কিসের জীবন! ঘরে বসে বসে বাল ছিঁড়ার জন্য!
এক ভয়ঙ্কর তুফানের রাইতে গোটা এলাকা যখন তছনছ হয়ে গেছে, বাজ পড়ছে একেকটা — যেন কলিজা জ্বালিয়ে টাটকা ছাই না হওয়া পর্যন্ত রেহাই দেবে না কাউকে। এমন দিনে, ঘোর ঘুটঘুটা মধ্যরাইতে ঘর থেকে কারা বেরোয়? হাসনা কিছু বুঝে উঠবার আগেই জুবেদ শেখ উত্তেজনায় লাইট পর্যন্ত নিতে ভুলে গেছে। তার মাথায় শুধু ঐ একটাই চিন্তা, আজ এক্ষুনি যদি ঝড়তুফান পরোয়া না করে নির্জন টিল্লার মধ্যে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে একা থাকা সিতারার কাছে যায়, নির্ঘাৎ সিতারা প্রচন্ড খুশিতে আজই তাকে উজাড় করে সব দিয়ে দিতে পারে। মেয়েরা এইসব বিষয় নিয়া খুব সিরিয়াস থাকে। চরম বিপদের দিন সে যাকে কাছে পায়, তার প্রতি বিশ্বস্বতা রাখা ঐদিন থেকেই শুরু করে দেয়। সুযোগ তো তোমার মুখের সামনে আল্লাহ তুলে দেবেন না। ঐ এক চ্যুতি চান্স যারা কাজে লাগায়, তারাই দুনিয়াদারি ভোগ করে।
গিয়ে দেখে, সিতারার অবস্থা সে যেমনটা কল্পনা করেছিল, ঠিক সে-রকম। টিনের চাল সব-কটা উড়ে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে বৃষ্টি পড়তেছে ঝমঝমিয়ে। তিনকিলো পথ — এই বৃষ্টির মধ্যে, ছাতা নাই লাইট নাই! কেমন ঘোরগ্রস্ত প্রেমিক, নিজেকে একটিবার চিন্তা করে দেখুক জুবেদ শেখ! যদি সে টর্চলাইট আনতো, আলো ঘুরালেই দেখতে পেত সিতারার ধবধবে সাদা মাংসল একটা পা হাঁটুর নিচ থেকে অনাবৃত হয়ে দরজার চৌকাঠের বাইরে, কেবলি পাখানি দেখা যাইতেছে আর বাকি শরিল ঘরের ভিতরে। অন্ধকারে ঘোর বৃষ্টির মধ্যে এই দৃশ্যটা কল্পনা করে জুবেদ শেখ কী কামাতুর হতে শুরু করবে! বাইরে ঘোর বৃষ্টি, ঠান্ডা ভেজা বাতাসে শরিলে তীব্র কাঁপুনি ধরবার মতো অবস্থা হওয়ার কথা। কিন্তু তার শরিলের ভিতর শূন্য নেড়াক্ষেতে আগুন জ্বলবার পর, বাতাসের ঝাপটায় আগুনের শিখা লাফ দিয়ে দিয়ে জঙ্গলের দিকে ধাওয়া করবার মতন দাবানল জ্বলতেছে কেন! কামের আগুন কী এতটাই শক্তিশালী যে ঝড়তুফানে সর্বস্বান্ত হওয়া একটা নারীর অসহায়ত্বকে পর্যন্ত নিস্তার দেবে না!
সিতারাকে তার বাচ্চাসমেত তার রান্ধাঘরের লাকড়ি রাখার মেচাঙের নিচে ভিজা জবুথুবু অবস্থায় আবিষ্কার করার আগে আগে জুবেদ শেখ অন্য একটা পরিস্থিতির মুখামুখি হয়। এই-যে গহিন অন্ধকারের রাইতে ঘোর বৃষ্টির মধ্যে, ঠাটা পড়ে নগদ কাঁচা টাটকা মৃত্যুও হয়ে যেতে পারে যে-কোনো মুহূর্তে, গোটা একটা জনমানবহীন এলাকায় সে যে একা আসলো, হাতে তা-ও কিনা একটা টর্চ পর্যন্ত নাই — এখন যদি সিতারার ঘর থেকে সিতারাকে তার বাচ্চা সহ কাঁচা খেয়ে ফেলার পর সিতারার রূপ ধরে এই এলাকার ভয়াবহ ডাইনটা বেরিয়ে আসে! অসম্ভব বলে তো কিছু নাই! কিয়ারি বলো আর ডাইন বলো — এদের শত শত নিষ্ঠুরতার কাহিনি কে না জানে! তার পাশের বাড়ির চাচা মন্তাজ মিয়া এই তো গত বছর শীতের এক সন্ধ্যায় পাহাড় থেকে আসার পথে রাস্তার পাশে পড়ে তার লাশ আবিষ্কার করেছিল গ্রামের মানুষ। হার্টঅ্যাটাক, ব্রেনস্ট্রোক, সাপের কামড় — এইসব কিচ্ছু না। লাশকে গোসল করানোর সময় দেখা গেল, মন্তাজ মিয়ার পিঠে টাটকা পাঁচ আঙুলের দাগ! এই দাগ যে মানুষের না সেইটা একটা দুধের বাচ্চাও বলে দিতে পারবে। হাতের থাবার মধ্যে যেন গনগনে গরম লোহার টুকরা ফিটিং করা। পাঁচটা আঙুল এমন গভীর হয়ে বসেছে, কাছে গেলে সেই ক্ষতের ভিতরটা পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা গেল। লাল লাল মাংসের চাকা পিঠের ভিতরে বুদবুদের মতন ভাসতেছে। এইসব দেখবার পর মানুষের হুঁশ কী আর জায়গায় থাকে! জুবেদ শেখ মুহূর্তের মধ্যে তাকে আটকে ফেলা ভয় কাটানোর জন্য চিৎকার করে সিতারার নাম ধরে ডাকতে পারে, তার বাচ্চাদের নাম ধরে ডাকতে পারে! জানে সিতারার দাইদার স্বামী বাড়িতে নাই, হোক তার বয়সে অনেক বড় — তবু চিক্কার করে হুসমতের বাইচ্চা, দাইদার কুত্তার বাইচ্চা বলে ডাকতে পারে! কিন্তু সে এইসব কিচ্ছু না করে কেবল মুচকি একটা হাসি দিয়ে কেন বলতেছে, “আমি কিতা রহস্যোপন্যাস লিখতে বইলামনি, ল্যাওড়া!”
৫
সে জানে যে, ঝড়তুফানে গুর্দা ফেটে যাওয়ার মতন প্রচণ্ড ঠাটা পড়ার রাইতে সে কেন, তার মৃত বাপ-চাচারা যদি জিন্দা ফিরে তাকে লাঠি-তরোয়াল সহ ঘের দিয়ে সিতারার বাড়ির উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়, তবু সে যাবে না। যে-মানুষ হাল্কা ঠাটা পড়লেই ঘরের ভিতর তাড়া-খাওয়া মুরগির মতন পড়িমরি করে ঢোকে — সে কিনা মাঝরাইতে ঘুটঘুটা অন্ধকার পাড়ি দিয়ে তিনকিলো পথ কোনোরকম লাইটটাইট না নিয়ে দৌড়তে শুরু করবে! আর তার বউ হাসনা অন্ধকারে-হারিয়ে-যাওয়া তার স্বামীর গন্তব্যের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখবে!
প্রায় প্রতিবারই কাহিনিটা এই ঝড়তুফানের রাইতে এসে আটকে যায়। সিতারার ঘরে তো চোইতমাসি দুপুরবেলাও যাওয়া যায়। টাটকা খিরা পিসপিস সাথে নুন-মরিচমাখা। মাটির ঘরের খোলা জানলা দিয়ে হু হু বাতাস এসে ঢুকতেছে, বাইরে রইদের মাতম। বিছনায় পাশাপাশি বসে তারা খিরা খেতে খেতে একে অপরে প্রচণ্ড তৃষ্ণা নিয়ে চাওয়াচাওয়ি করতেছে। এই দৃশ্য কী বেমানান কিছু! অথবা হাওনমাসি ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ব পড়ব ভাব, এর আগে চানাডাইল আর আটা নিয়ে সিতারার ঘরে যেয়ে হাজির হওয়া যায় — ঝুমঝুম বৃষ্টির দিন গরম পরোটা আর চানাডাইল খেতে খেতে সিতারার রান্ধাঘরে বসে তার ব্লাউজ উপচেপড়া স্তন দেখবার দৃশ্যও তো কল্পনা করা যায় — যায় না! কিন্তু মাথায় এসে কবে যে এই বৃষ্টি, তা-ও মধ্যরাইতের ঘুটঘুটা অন্ধকারের মধ্যে, এইসবের সাথে তার সবচাইতে আতঙ্ক যে জিনিসটায় সেই ঠাটা পড়াটাও মিলে গেল — এখন কোনোভাবেই সে এই দৃশ্যটাকে অতিক্রম করে যেতে পারছে না। বড় লেখক হলে নিশ্চয়ই পারত। কিন্তু সে তো সামান্য গরুর দালাল। তার মাথায় আর কতটুকুই-বা লোড নিতে পারে! ঝাড়তেও পারতেছে না। একটা দৃশ্যকে সেন্সর করার জন্য সে তুতবাড়িবাজারের পুবপার্শ্বে নির্জন টিলাগুলোতে কয়েকদিন পর্যন্ত গেছে, যেখানে রয়েছে সিতারার একলা বাড়ি। এত নির্জনে কেউ থাকতে পারে না, থাকবার কথাও নয় — এইসব কঠোর কথা বলে সিতারার বাড়িকে কাছাকাছি বসতির ধারেকাছে কোথাও আনতে চেয়েছে। কিন্তু সেইটা আনতে গিয়ে দেখেছে, ঝামেলা কমার তো প্রশ্ন নাই বরং বাড়বার সম্ভাবনাই বেশি। তখন করতে হবে কি — হুসমত দাইদারের চরিত্রটাও পালটে দিতে হবে। নির্জনতার মধ্যে সিতারার নিসঙ্গতার বেদনা গভীরভাবে অনুভব করা যায়। বসতিতে নিয়ে গেলে সিতারা আর সিতারা থাকবে না। পুরা কাহিনিটাই তখন মাঠে মারা যাবে। তার চাইতে যতটুকু সে এগিয়ে নিতে পেরেছে ততটুকুই থাকুক। মনকে সান্ত্বনা দেয়া ছাড়া তার হাতে আর কিছুই করার নেই। আছে কি?

৬
হাসনা এইসব মরে গেলেও বিশ্বাস করবে না। একটা মানুষ যে দুই-দুইটা জীবন যাপন করতেছে, এইটা তার জ্ঞানে ধরবে না। আবার বিপরীতে যদি চিন্তা করা যায়, এই যেমন জুবেদ শেখ যদি মনে করে, হাসনার ভিতরেও যদি তার মতো আরেকটা জীবন বসবাস করতে থাকে! জুবেদ শেখের থাকলে হাসনার থাকতে অসুবিধা কোথায়! থাকতে পারে না! হয়তো এইভাবে পৃথিবীর অগুন্তি মানুষ একসাথে দুইটা জীবন চালিয়ে নিতেছে। কে জানে?
একেকদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সে এতক্ষণ যাকে খোয়াবে দেখেছিল, সেই লিচুগাছের ছায়াপড়া উঠান, ঝিরঝির মোলেম বাতাস, শীতল ছায়াপড়া ইন্দারার পাড়ে গোসলরত তাকে ডাক দিয়ে যাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে ডিম দিয়ে লাউয়ের ঝোল নিয়ে বসা ম্যাক্সিপরা সিতারা — মনে হয় সিতারা অনেক দূর থেকে তাকে ডাক দিতেছে, এত কাছে থেকেও অনেক দূরে শোনার কারণ সে ততক্ষণে ঢুকে গেছে আরেক ধান্দায়, গরুর তিনটা চালান একটু পরে মুগরিব বাদ এসে ঢুকতেছে দশটেকি লাইন দিয়ে, তারা তিনজন পাইকারের সর্বমোট বিশটা মাল, তার একার সাতটা, ওপার থেকে ইমো ভিডিওকলে গরুগুলির সাইজ দেখে সে ভীষণ খুশি, এইবার ভালো একটা দান মারা যাবে, এইবার আর মিস করবে না, হুন্ডা কিনেই ছাড়বে, নতুন হুন্ডা নিয়ে তাতানো রইদের নিচে দুইপাশে সারি সারি শাল গজার বনাক — এইসব অতিক্রম করে শূন্যে চিলের ডিগবাজি খাওয়ার মতন ভো চু ত ভো চু ত … যাহ চ্ছালা! এই জুবেদ শেখ তখন কাউকে কেয়ার করে নাকি! হুন্ডা একটা লগে থাকলে তুমি এই যুগের রাজা! আজকাল ফইন্নির বাচ্চারাও হুন্ডা দৌড়ায়! সব্জিওয়ালা, মাছের মাইমল, রাজমিস্তরির যোগালি, বুঙ্গা কারবারি, হোটেলের মেসিয়ার, বিদেশ থেকে ক্যানসেলড দুম্বার রাখাল — কে চালায় না হুন্ডা! বিছড়াইতে যেয়ে দেখা যাবে, একা এক ভোদাই মার্কা জুবেদ শেখই অবশিষ্ট রয়ে গেছে! অথচ যে কিনা লাখ লাখ টাকার কারবার করে! তার উড়ন্ত গতির পিছন থেকে সিতারা যে তাকে ডিম দিয়ে লাউ তরকারি গরমাগরম খেতে ডাকছে, মনে হইতেছে অনেক দূর থেকে তাকে ডাকতেছে, সে পষ্ট শুনতেছে আবার শুনতেছে না — এই বেটিমানুষের আবার বড় দোষের একটা হলো, একবার ডাকলে তার কাছে যাওয়া ছাড়া রেহাই দেবে না, অথচ হুন্ডার গতি এখন ফ্যুল গিয়ারে, এখন কেবল বাতাসে শিস দিলে ‘টুনির মা’ গানটা শোনা যাবে, — ও টুনির মা / তোমার টুনি কথা শোনে না / যার তার লগে / ডেটিং মারে / আমায় চিনে না … উ … এই সময় এই উরাধুরা সুখের সময় কেউ এসে ডাকাডাকি করলে মেজাজের কী আর গতি ঠিক থাকে! সে তখন “এই বেটি চুপ থাক” বলে চড়া গলায় ধমক দিতে যাবে, আর এইটা করতে যেয়ে সে তখন নিজেকে আবিষ্কার করবে — নিজের বাড়ির বিছনায় শূন্যে হাত পা ছুঁড়ে সে প্রায় আধো অন্ধকারে দুইটা জীবনের মাঝখানে এট্টু সময়ের জন্য হাসফাস করতেছে, বাচ্চার ঝাঁঝালো মুতের গন্ধ ততক্ষণে তাকে আসল জীবনে ফিরিয়ে আনলে সে দীর্ঘশ্বাস লম্বা করে ফেলে আধো অন্ধকারে দেয়ালের কাছে খাড়া-করে-রাখা আলমারির উপর পড়ে থাকা হাসনার বিয়ের লাল ময়লা সুটকেসটাকে পাশ ফিরতে ফিরতে দেখবে, প্রায় অস্ফুট স্বরে সে তখন বলবে, “হালার জীবন! পুঞ্জির সামান্য ছফা কামলা মস্ত বড় গরুর দলাল অইতো চায়!“ — বিড়বিড় করে না বললেও চলতো, ততক্ষণে হাসনা ভইষের মতন ঘুমে কাদা, ভুস ভুস করে শ্বাস ফেলতেছে, শুনে ফেলার কোনো ডর নাই কিন্তু সে বিড়বিড় করবে, হাসনার শোনা না-শোনা, সেইটা বিষয় না, সে বড়বিড় করবে এইজন্য যে আল্লাহ যাতে শুনতে পান, তার ধারণা আল্লাহ একদিন তার স্বপ্ন পূরণ করে দেবেন।
৭
ঘুম ভাঙার পর সে শিথানের কাছে রাখা ডার্বি সিগ্রেটের প্যাকেটে পড়ে থাকা সর্বশেষ সিগ্রেটটা হাতড়ে হাতড়ে বের করবে, কাছাকাছি লাইটারটাও যাবে পেয়ে — এইসব নিয়ে আলগোছে বিছনা থেকে উঠে সে, যেহেতু আধো অন্ধকারে প্রায় সবকিছুই দেখতে পাচ্ছে, যেহেতু সে মাত্র ছাব্বিশ বছরের টনকা যুবক, ছাপ্পান্ন বছরের বুড়া নয়, প্রায় নিঃশব্দে, দেয়ালটেয়াল ধরবার কোনো প্রয়োজন আছে কী! দরজার ছিটকারিটাও তার হাতের পরশ জানে, টিকটিকির লেজের বাড়িমারার মতন ‘চটাস’ করে মৃদুমন্থর একটা শব্দ তুলে সে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যাবে, এই মধ্যরাতে। মাথার উপর বরাবরের মতন ঝলমলে চন্নি, কোনোদিন চন্নির তেজ থাকে প্রায় নিভু নিভু, ঝাপসা, আলো ক্রমশ ফুরিয়ে যাবার মতন। হেঁটে হেঁটে সে তার বাড়ির পুকুরপাড় পর্যন্ত যাবে, ঐটুকুই সীমানা। বরইগাছের ছায়ার নিচে। কোদাল দিয়ে দুইদিন পরপর চেঁছে দেয়া একটুকরো জায়গা, যেখানে সে প্রতি রাতে এসে বসে থাকে। এখানে সে ততক্ষণই বসবে যতক্ষণ-না তার শরিলের জ্বালাযন্ত্রণা, মনের যাবতীয় দুঃখবেদনা — এইসবের উপশম হবে।
সিতারার সাথে তার সম্পর্কটাই-বা কেমন! মুখে সে বলতেছে, তার অত দায় নাই। ভালোবেসে যদি সিতারা শোকে দুখে আকুল হয়, সেইটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু এমন কোনো দিন এমনকি আছে এমন কোনো মুহূর্ত — যেখানে সিতারা ছাড়া অন্যকিছু কল্পনা করতে পারে! এই-যে মাঝরাইতে বিছনায় বউবাচ্চা ফেলে এই নিস্তব্ধ রাত্রির নিচে এসে প্রায় প্রতিদিনই পৃথিবীর সমস্ত মনুষ্যপ্রজাতি যখন গভীর নিদ্রায় অতল সাগরের তলদেশে ডুবে গেছে, সে কেন একা একা, পুকুরপাড়ে, বরইগাছের ছায়ায়, নিঃসঙ্গ চন্নির নিচে!
সিতারার মনের হদিস তার দরকার নাই কোনো, তার দরকার টসটসে কাঁঠালের কোয়ার মতন পেলব শরিলটা — এই কথা মুখে যতই বলুক, এই যদি হয় — তাইলে ভাই কেন গোটা দিনজুড়ে কেবল বেদনার ক্ষীরে ডুবে যাওয়া!
সে যে সিতারাকে পালকা মা বানিয়ে চটি বইয়ের অজাচারি কাহিনির মতন প্রতিটি মুহূর্ত তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে, সারাদিনের ক্লান্তির ভারটাকে লাঘব করার জন্য এই-যে একটু পরে বরইগাছের নিচে বসে বসে নিঃসঙ্গ খোলা চন্নি আর নিঃসঙ্গ সে নিজে, রিপুর তাড়নায় ধীরে ধীরে নিজেকে শিথিল করে দেবে — এইসব নাহয় ঠিক আছে — কিন্তু এইসবের বাইরেও সিতারা কেবল একটা নারী হয়ে কী তাকে ইদানীং অনেকটা জায়গা জুড়ে বসতেছে না! আজকাল প্রায়ই একটা দৃশ্য দেখে সে, সিতারা আর সে লোকাল ট্রেনে চড়ে দূরে যাইতেছে কোথাও। একসময় দেখা গেল, সিতারার বাদাম খাওয়ার ইচ্ছা হলে জুবেদ শেখ তাকে বাদাম কিনে দিতেছে, সেই বাদাম ভেঙে ভেঙে সিতারা খাওয়ায়ে দিতেছে জুবেদ শেখকে। জানলার বাইরে থেকে দমকা হাওয়া এসে সিতারার আচমকা খোপা ভেঙে চুলের বাঁধ খুলে দিলে জুবেদ শেখের চোখেমুখে রেশমি চুলের এমন মোলেম পরশ লাগতেছে! তার মনে হইতেছে, পৃথিবীর সৌন্দর্য বড় ক্ষণস্থায়ী! আহা, বড় ক্ষণস্থায়ী!
ইদানীং বরইগাছের নিচে এই মধ্যরাইতে এসে সে বসতেছে ঠিকই, কিন্তু এমনও দিন আছে যে, যে-কাজের জন্য সে পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছে, দেখা যাইতেছে কোনো কোনোদিন সে শরিল শিথিল করার কথা বেমালুম ভুলে বসেছে। যে-ঘোরের মধ্যে সে থাকে, দেখা যেত, প্রায়ই সে ঝুপ করে গা ডুবিয়ে ঘরে ফিরে, মাঝেমধ্যে তার বউ হাসনা তাকে ভিজা অবস্থায় দেখে বিরক্ত হয়ে যায়, ঘুরেফিরে ঐ কিছু কথাই বলে, “বউ তো ডেইট ওভার অই গেছে! পুরান জুতা আর পিন্দা যায়নি!” অথবা, “সংসারও বাসি অই গেলে আর দাম থাকে না”! শেষের বাক্যটা কেবল একটাই থাকে, “স্বপ্নদোষে সুখ নেও মিয়া!”
- জাকির জাফরান, বাংলা কবিতার তিন দশকের তবিলদার - August 6, 2026
- শোনো পুঁইপাতা, জাকির জাফরান ও এক গার্ডেনারের গান - August 4, 2026
- শোনো পুঁইপাতা || জাকির জাফরান - August 4, 2026

COMMENTS