শ্রীদেবীর পুরা নামটা জানা আছে এমন মানুষ গত একদশকে বেড়ে-ওঠা জেনারেশনের মধ্যে একজনও পাওয়া যাবে না। ব্র্যান্ডনেমেই চিনেজানে সবাই তারে। এছাড়া আরেকটা ব্যাপারও হচ্ছে কি যে, দেড়-দশকেরও অধিক শ্রীদেবী (Sridevi) ছিলেন না সার্কিটে। অ্যাট-লিস্ট বলিউডে দেবী ছিলেন গরহাজির লম্বা কাল ধরে। এই সময়টায় শ্রী নিজের সংসার বানিয়েছেন, সাজিয়েছেন, আগায়ে নিয়ে গেছেন। দুই কন্যা আস্তেধীরে বেড়ে উঠেছে, একজন সিনেমাতেও সাইন করে ফেলেছে এরই ভিতর, এবং সবদিক গুছিয়ে দেবী ফিরেছিলেন পর্দায় ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ দিয়ে একটানা চোদ্দবছরের বিরতির পরে ২০১২ সনের দিকে। এসেই কিস্তি নিজের কোর্টে।
অ্যানিওয়ে। দেবীর নাম লইয়া আরম্ভ করেছিলাম। বলছিলাম যে দেবীজির পুরা নামটা আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানে না। নাইন্টিসের মধ্যভাগ পর্যন্তও পত্রিকায় দেবী নিয়া নানা কাহিনিকিসসা বাইর হতো হররোজ। তখন বাংলাদেশের চিত্রালী-তারকালোক ইত্যাদি ম্যাগপড়ুয়া বেবাকেই জানত দেবীজীবনের ভ্যেরি ভ্যেরি ইম্পোর্ট্যান্ট কোয়েশ্চনগুলোর উত্তর ছাড়াও অতল-গহিনের বহু গলিঘুঁজি। শ্রীদেবীজির পুরা নাম শ্রী অম্মা আয়াঙ্গার। বলিউডে এসে এই শ্রীদেবী নামের চলন-পত্তনি হয়, এর আগে দেবীর স্ক্রিনপ্রেজেন্স হয়ে গেছিল অম্মা নামেই। মাত্র চার বছর বয়সে একটা তামিল চলচ্চিত্র ‘কন্দন করুনাই’ শ্রীকে প্রেজেন্ট করে এক অবতারের শিশুকালের চরিত্রে। এরপরে নাইন্টিন সেভেন্টিতে তেলুগু ম্যুভিতে দেবীজির ডেব্যু হয় শ্রী অম্মা আয়াঙ্গার নামেই। সিনেমার নাম ‘মা নন্না নির্দোষী’। শ্রী করেছিলেন ছোট্ট একটা রোল। শুরুটা এইভাবে। দেবীর বলি-অভিষেক হয় ‘সোলোয়া সাওন’ দিয়ে সেভেন্টিনাইনে, দেবী ইন রিয়্যাল তখন ষোড়শীই ছিলেন বটে! বা, তারও আগে একবার ‘জুলি’ দিয়ে, ১৯৭৫-এ, সেইটা নায়িকা না সাপোর্টিং রোলে।

তেষট্টিতে জন্ম। উনিশশ তেষট্টি। জিলা তামিলনাড়ু। দক্ষিণ প্রান্তের একটা নিরিবিলি লোকালয়ে দেবী ভূমিষ্ঠ হন। দেবীমাতা রাজেশ্বরী আয়াঙ্গার এবং দেবীপিতা আয়াপ্পান। বাবা নামজাদা আইনজীবী, গৃহবধূ মা। দেবীর এক বোন এবং একজোড়া স্টেপব্রাদার। বোনের সঙ্গে ভালোই মিলমজলিশ ছিল, সতেলা ভাইদের লগে কেন জানি তিক্ত হয়ে যায় রিলেশনটা। মাকে দেবী ভীষণ ভালোবাসতেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মায়ের অভাব বোধ করেছেন দেবী।
শ্রী অম্মা থেকে দেবী কীভাবে শ্রীদেবী হয়ে উঠলেন, সংক্ষেপে সেইটা জানাই। সাপোর্টরোলে ডেব্যু হয়েছিল ‘জুলি’ দিয়ে দেবীর, বলিউডডেব্যু, তখনও অম্মা নামেই ছিলেন পর্দায়। কিন্তু অম্মা নামটা ঠিক যাচ্ছিল না হিন্দির সঙ্গে। এই-রকম ইতস্তত চলছিল, তখনই ‘সোলোয়া সাওন’ করার অফার এবং প্রধান নায়িকা হিশেবে! এই সিনেমাতেই শ্রীদেবী স্ক্রিনে লেটারিং হিশেবে এভার ফার্স্ট দেখা যায়। এরপরের দেবীযাত্রা আর তার একের পরে এক জয়রথ তো দুনিয়া দেখেছে।
দেবীজীবনী লিখতে গেলে একাধিক মুশকিলের সঙ্গে যুঝতে হবে সেই জীবনীকারকে। একটা মুশকিল তো সকলেই জানেন যে, দেবীদের একজীবনে এক-দুই-তিন-চার-পাঁচটি জীবন যাপন করার হুকুম থাকে। সেই প্রিভিলেজ ও সামর্থ্য দুনোটাই ছিল অম্মা আয়াঙ্গার ওর্ফে দেবীজির। শ্রীদেবীর তামিলজীবন, তেলুগুজীবন, মলয়ালমজীবন, কন্নড়জীবন এবং হিন্দিজীবন তথা বলিউডে দেবীর অধিষ্ঠান ও মাধুরীজিকে এন্টার করতে দেখার আগ পর্যন্ত বলিউডে দেবীযুগ। গোটা চুয়ান্ন বছরের জিন্দেগিতে দেবী তিনশতাধিক ম্যুভিচিত্রে কাজ করেছেন। দেবীর ক্যারিয়্যারগ্রাফ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। দেবীফিল্মোগ্র্যাফি তো গ্যুগল করলেই মিলবে। এইখানে কেবল বলি যে এই তিনশতাধিক ম্যুভির মধ্যে দেবী-অভিনীত ৭২টা তামিল, ৮১টা তেলুগু, ২৩টা মলয়ালম, ৬টা কন্নড় এবং ৭২টা হিন্দি সিনেমা রয়েছে।
ব্যক্তিজীবনে দেবী ছিলেন স্বল্পভাষী। সিনেমায় ভীষণ মুখরা মনে হলেও আদতে এর ঠিক বিপরীতই ছিলেন দেবীজি। সিনেমালাইফে পেয়ার-আপ করেছেন নিজের দ্বিগুণ বয়সীদের সঙ্গে যেমন, তেমনি হাঁটুনিম্ন বয়সীদের সঙ্গেও। অমল পালেকর থেকে শুরু করে কমল হাসান, রজনীকান্ত, শত্রুঘ্ন সিনহা, নাগার্জুন, জিতেন্দ্র, অমিতাভ, মিঠুন প্রমুখ শ্রীদেবীর সিনেমানায়কদের কয়েকজন। নায়কের মিছিল আরও লম্বা, আরও শানদার, আরও দীর্ঘ। নব্বইয়ের মাঝামাঝি শ্রীর সঙ্গে বেঙ্গলি নায়ক মিঠুন চক্রবর্তীর বিবাহসংক্রান্ত খবর কাগজে বেরিয়েছিল। বাঙালিবাবুটি বিট্রে করেন বলিয়া জানা যায়। শ্রী ছিলেন কুমারী, বাবুটি বিবাহিত। পরে মিঠুনের পয়লা তরফ যোগিতা বালি আত্মহন্তা হবার হুমকি দিতেই মিঠুনের বিগ্রহ-সাক্ষী-রাখিয়া-করা সেকন্ড ম্যারেজটি উবিয়া যায়। শ্রী ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন এই মিঠুনপ্রতারণায়।
নাইন্টিসিক্সে দেবী বিয়াশাদি করে থিতু হবার মানসে ফের আরেক দোজবরে বনি কপুরের সঙ্গে গেরো বান্ধেন। ইন্ডাস্ট্রি বিদায় দিয়ে স্বামী-সংসার-সন্তান স্বাগত জানান। দেবী নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একপাড়াও সরিয়া আসেন নাই আত্মজাদ্বয় একটা লেভেলে আরোহণের আগ পর্যন্ত। ছোট মেয়ে খুশি, বড় জাহ্নবী, হিন্দি সিনেমায় জানভি উচ্চারণেই নিশ্চয় দেবীতনয়াকে দেখব আমরা অচিরে। দেবী দীর্ঘ অদর্শন শেষে ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ দিয়ে ফেরেন, আরও ছয় বছর অন্তরালে থেকে ফের দরিশন দেন ‘ম্যম’ ম্যুভিতে। এন্তার নাচানাচি শেষে এইবার দেবী কিছু মনের মতো অভিনয়কলা দেখাইতে মওকা পাচ্ছিলেন, এমন সময় বিচ্ছেদ। ফেব্রুয়ারি ২০১৮। ইন্দ্রপতন। দেবীবিদায়।
… …
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026
- অপূর্ণ জীবনের নান্দনিক সহমর্মিতা || আয়াজ আহমদ বাঙালি - August 30, 2026
- মন হইলো…মানুষ মূলত… || রোদ্দুর রিফাত - August 30, 2026

COMMENTS