শ্রীদর্শিনী

শ্রীদর্শিনী

স্বল্পভাষী শ্রীদেবী (Sridevi), সিনেমায় যেমন চঞ্চল একটা বাচিক অভিনয়ে দেখা যায় তারে, এক-ধরনের রাজকীয় মুখরতা তার প্রেজেন্সে খেলা করে, ইন রিয়্যাল লাইফ মোটেও ট্যকেটিভ নন তিনি। ইনফোটুকু অনলাইনের একটা সাক্ষাৎকারভূমিকা থেকে আমরা জানতে পারছি। শ্রী স্ক্রিনে এসে হোক বা বাস্তবের বান্ধবহুল্লোড়ে পার্টিভিড়বাট্টায় একটাও কথা না-বলে কেবল হেঁটে গেলেই হয়, শ্রীমুগ্ধ প্রশংসাবাতাসে স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে চারিপাশ।

অভিনয়শিল্পী হিশেবে ব্যক্তিত্ব আর শৈলীশোভায় এত মনোমুগ্ধকর বাতাবরণ তৈয়ার করিয়া রাখা এবং স্ক্রিনে এত দীর্ঘ অনুপস্থিতির পরেও তারে ঘিরিয়া তার গুণগ্রাহীর আগ্রহ অব্যাহত থাকা চাট্টেখানি কথা নয়। একটানা পনেরো বছর বলতে গেলে ইন্ডাস্ট্রির কাকপক্ষীটিরও অগোচরে ব্যক্তিগত সংসার সামলেছেন, দুই কন্যার স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করেছেন মনোরম মাতৃমূর্তির ভূমিকায় নিরভিনয় শ্রীদেবী, বলতে গেলে বলিউডি পার্টিলাইফগুলোতেও উপস্থিতি ছিল অঙ্গুলিমেয়।

পনেরো বছরের বিরতি শেষে ফিরেছেন ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ দিয়া, মাৎ করে দিয়েছেন প্রত্যাবর্তনমাত্র, অদর্শনের দীর্ঘদিবস-দীর্ঘরজনী বিরহে কাতর ভক্তরা ছাড়াও নয়া জামানার দর্শকরাও দেবীকীর্তনে মুক্তকণ্ঠ। পরে আবারও যতি। দীর্ঘ নয় আগের মতো, কমও নয় ইন্ডাস্ট্রির অম্নিপ্রেজেন্স বিবেচনায় নিলে, গোটা পাঁচটা বছর নিয়েছেন তিনি বিরতি এইবার। এ-যাত্রা আরও পরিপক্ব ম্যুভিচিত্র নিয়েছেন বেছে, এসেছেন ‘মম’ নিয়ে, এবং প্রশংসিত হয়েছেন ম্যুভিক্রিটিক থেকে শুরু করে সাধারণ ম্যুভিভোক্তাদের কাছেও। ধুমধাড়াক্কা নাচানাচির বাইরে এক অন্যতর শিল্পী শ্রীদেবীর হাজিরানা আমরা আপকামিং ম্যুভিগুলোতে দেখতে পাবো মনে হচ্ছিল।

মজা করে এই বিরতি নিয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “পয়লা পনেরো বছরের বিরতি, ঠিক আছে, কিন্তু পরেরবার মাত্র পাঁচ, নিশ্চয় গাণিতিক যুক্তিতে এইটা ক্রমোন্নতিরই ইঙ্গিত, তাই না?” মানে, নেক্সট ইয়ারগুলোতে বেশ অভিনয়কাজ নিয়মিত করে যাবেন মনে হচ্ছিল। হলো না।

মাত্র চুয়ান্নয় বিদায় নিলেন যখন, চব্বিশ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ভক্ত-অভক্ত নির্বিশেষে বেবাকেই বিমূঢ় হয়ে পড়েন সংবাদের আকস্মিকতায়। একদম উয়িদাউট অ্যানি প্রায়োর নোটিস্ বলতে যা বোঝায় তা-ই শ্রীমৃত্যু মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

নব্বইয়ের গোড়ায় মাধুরী যখন নাম্বার ওয়ানের মুকুট শিরোপরে নেন, অব্যবহিত ওই সময়ে সেইটা ছিল শ্রীদেবীরই শিরোস্থিত। ব্লকবাস্টার হিটের সংখ্যা বেশুমার। বলিউডের গ্র্যাফটাই শুধু নয়, দক্ষিণী সিনেমাতেও উনার কমার্শিয়্যাল সাক্সেস ধর্তব্য।

কত কত ম্যুভি শ্রীদেবীর চোখাভিনয়-মুখাভিনয়েই কিস্তিমাৎ করে দিয়েছে সেই হিসাব মনে হয় না দাখিল করা লাগবে। বেফায়দা কাহিনির চিত্রও লুফে নিয়েছে দর্শক শুধু শ্রীদেবীকীর্তিরই কারণে। ড্যান্স, অ্যাক্টিং ইত্যাদি সবকিছু মিলেজুলেই শ্রীদেবীসিনেমাগুলো অনবদ্য। পুঁজি উঠিয়ে এনে দেদার মুনাফা কামিয়েছেন পরিচালক-পরিবেশকেরাও শুধু শ্রীজিরই ম্যাজিক স্পেলে।

একদম পিচ্চি বয়স থেকেই অভিনয়ের শুরু। বছর চারেক ছিল বয়স অভিষেক ম্যুভিতে অভিনয়কালে। এরপর কৈশোরের ঝলমলা হাওয়ায় শিশুশিল্পী থেকে নায়িকাভূমিকায় উত্তরণ ও সাফল্য অর্জন। এইসব তথ্য বিস্তারিত জানতে পারা যায় যে-কোনো উইকিবিতরিত পত্রালিকায়। এই নিবন্ধে সেসব পুনরুচ্চার অদরকারি বিবেচিত হলো।

‘গুমরাহ্’, ‘লামহে’, ‘জুদাই’, ‘সাদমা’, ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ ইত্যাদি সিনেমায় অভিনয় বাংলার আশি এবং নব্বইয়ের দশকের আপামর হিন্দি সিনেমাদর্শকেরা ইয়াদ করে উঠতে পারবেন। ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ আর ‘মম’ তো উপভোগ করেছে এই প্রজন্মও।

চলে গেলেন রঙের পর্দা ছেড়ে অন্ধকারে, যে-অন্ধকার আলোরও অধিক হয়তো; অথবা, আলো-অন্ধকারের অতীত ও ঊর্ধ্ব কোনো অভিজ্ঞতায় এই যাত্রা। স্বামী বনি কপুর এবং দুই কন্যা জাহ্নবি ও খুশি। রিসেন্টলি জাহ্নবি সিনেমায় সাইন করেছে, এই খবর অলরেডি কানে এসেছে সকলেরই। রিলিজ পায় নাই শ্রীদেবীতনয়ার ম্যুভিটি, পাবে অচিরেই, শ্রী দেখে যেতে পারলেন না শুধু।

পর্দার সামনেকার মানুষগুলো যখন অন্তর্হিত হয়ে যায়, কেমন অনর্থ ও নশ্বর মনে হয় তাবৎকিছু দুনিয়ার, কেমন যেন সবকিছু ঢাকিয়া যায় শূন্য শামিয়ানায়। এই পর্দামানুষগুলোর সঙ্গে যেহেতু জড়ায়ে থাকে আমাদের বেড়ে-ওঠা কালের ক্যালেইডোস্কোপ, আমাদের কৈশোর, যৌবন আমাদের …

লেখা : বিদিতা গোমেজ

বিদিতা গোমেজ

COMMENTS

error: