পৃথিবীর প্রথম সেই জ্যোৎস্নাক্রান্তি যারা দেখেছিল,
তোমার হাতেই আমি স্বপ্নপোড়া তাদের করোটি
তুলে দেবো, তুমি আজ গোত্রপ্রধান তাদের। বলো,
কে ছিল প্রথম নারী খোঁপায় যে গুঁজেছিল ফুল!
এই অমৃতময় পঙক্তি চারটি জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের প্রথম কবিতার অংশ। ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’, অগ্রজ কবি জাকির জাফরানের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ হওয়ার আগেই বইটির কিছু কবিতা বিভিন্ন মাধ্যমে পড়বার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। আমি তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, আমরা একটা অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ পেতে চলেছি।
জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের কবিতা সম্পর্কে বলার আগে আমি একটি কথা বলে নিতে চাই। যখনই কবিতাগুলো পড়ছিলাম, আমার এমন মনে হচ্ছিল যেন আমি নিজেই এই কাব্যের কোনো চরিত্র। আবার আমিই তার তৃষ্ণার্ত এক পাঠক। তাই তো মন বারবার গেয়ে ওঠে —
জল খাবো, ওগো তুমি ঠোঁটে করে নিয়ে আসো জল।
বেহুলার বুক থেকে, সাবিত্রীর শিলা-ব্রত থেকে…
একজন দীক্ষিত পাঠক জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের যত গভীরে যাবে, তার নিজেকে মনে হবে জলমহালের চাঁদ। সে তো শুনবেই তাঁতপল্লির কলরোল! সে প্রতিটি চুমুতে খুঁজবে হাওরের ঘ্রাণ। হেমন্তের কোনো-এক দুপুরে ‘নিথুয়া সংকেতে’ সে তো ডাকবেই, সে তো লিখবেই ‘বারুইয়ের ভাষা’। আবার কখনো কখনো দূরের পথে হাঁটতে হাঁটতে সে বলে উঠবে —
পতিত জমির স্তনে করো আজ শস্যের আবাদ,
দিগন্ত-হালটে জাগো ধিকিধিকি ধানগাছতলে।
জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় কোনো সাধারণ কবিতার বই নয়, এটি নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী কাব্যগ্রন্থ। কবি জাকির জাফরানের পারদর্শিতা সম্পর্কে বলতে গেলে একটা কথাই যথেষ্ট। তিনি জ্যোৎস্নাকে একটি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। আমরা কবি নির্মলেন্দু গুণের কিছু কথা পড়লেই বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারব। তিনি বলেছেন —
জ্যোৎস্নাকে বাংলা কবিতায় বহুবার বহুভাবে ব্যবহৃত হতে আমরা দেখেছি — কিন্তু জ্যোৎস্নাকে সপ্রাণ-সম্প্রদায় হিসেবে, তাঁর আগে কোনো কবিকে ভাবতে দেখেছি, এমনটি মনে পড়ছে না।
কবি নির্মলেন্দু গুণের এমন বক্তব্যের পরে আর কোনো সন্দেহই থাকে না যে, কবি জাকির জাফরান তার পারদর্শিতার প্রমাণ রাখতে সফল হয়েছেন।
‘আমরা জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের লোক’, বইটি পড়ার পর থেকে আমি এই কথাটি সবচেয়ে বেশি বলেছি। নিজেকে বারবার মনে হয়েছে জৈন্তিয়া পাহাড়ের একজন আদিবাসী। আমি এই জনপদে এসেছি জ্যোৎস্নার গন্ধ নিতে।
ফুল আর খিলি হাতে বসে আছি, অভিষেক দাও।
শখের হাঁড়িতে রাখা বড়ি, সবুজ রুমাল আর
আলপনা আঁকা জলচৌকি, শীতলপাটিতে রাখা
লাজুক কস্তুরী কিছু — তুমি শুধু অভিষেক দাও।
এমন সব পঙক্তি দিয়ে এই কাব্য সাজানো হয়েছে, যা থেকে নির্দ্বিধায় বলা যায় বাঙলা ও বাঙালির যে পরিচয়, জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের মাধ্যমে কবি তা নতুনভাবে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ, ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’ বাঙলা ও বাঙালির প্রেমের আখ্যান।
…
কবি মাসুদ খানের কবিতাবিষয়ক একটি আলোচনার কিছু অংশ তুলে ধরছি —
কবিতা নানা ধরনের। কোনো কোনো কবিতা পাঠককে এক স্নিগ্ধ নতিধীর গতিতে চালিয়ে নিয়ে পৌঁছিয়ে দেয় গন্তব্যে- খুবই সাধারণ এক স্টেশন থেকে উঠিয়ে নিয়ে নানারূপ দৃশ্য ও হাওয়াপ্রবাহের ভেতর দিয়ে নিয়ে গিয়ে পৌঁছিয়ে দেয় এক নতুন অভাবিতপূর্ব স্টেশনে। অভাবিত, তবে সুনিশ্চিত সেই স্টেশন। সেসব কবিতা দেয় গন্তব্যের নিশ্চয়তা, নির্ভরতা। পাঠশেষে পাঠকের ভেতরে জাগে এক ধরনের বিস্ময়জনিত মুগ্ধতা, সেইসঙ্গে সে পায় অভিযানের সম্পূর্ণতা।
আবার কোনো কবিতা আছে যে কবিতা নিয়ে যায় না কোনো গন্তব্যে, পাঠককে নানারূপ বাঁকাগতি দেখিয়ে, চোরাপথ ঘুরিয়ে, নানারকম ইন্দ্রিয়হর্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে হঠাৎ ছেড়ে দেয় এক অচেনা অনিশ্চিত প্রান্তরে। এই যে ইন্দ্রিয়হর্ষ অভিজ্ঞতা আর অভিযানের এই যে অসম্পূর্ণতা এতেও মুগ্ধ হয় অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পাঠক।
আমরা কবি মাসুদ খানের বক্তব্যের সাথে গেলে, জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ে এই দুই ধরনের কবিতার সাথে পরিচিত হতে পারব।
আগেই বলেছি, ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’ বাঙলা ও বাঙালির মাঝে যে আত্মিক সম্পর্ক সেটি নতুনভাবে আমাদের সামনে তুলে এনেছে। বাঙলার সঙ্গে বাঙালির প্রেমের যে মিথ, এই বইটি না পড়লে বোঝা যাবে না। নারী চরিত্রকে কেন্দ্রে রেখে আউল-বাউলের কথা, বাঙলার লোকজ ইতিহাস, ধর্ম, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের বীরগাথা … এমন আরও গুরুত্বপূর্ণ সকল বিষয়কে মুগ্ধ পঙক্তির মাধ্যমে এক-মলাটে বেঁধেছেন কবি জাকির জাফরান।
কবি জাকির জাফরান ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। কিন্তু বাংলা কবিতার সাথে তাঁর দীর্ঘ যাপন। তাঁর জন্ম সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কুচাই গ্রামে। আমরা জানি, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল আউল-বাউল ও সুফিবাদের জন্য প্রসিদ্ধ। আর সেই গন্ধ আমরা কবির আগের গ্রন্থগুলোতেই পেয়েছি। কবি জাকির জাফরানের প্রথম কবিতার বই ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’, ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়। তারপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়না’ (২০১৪), ‘অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলি’ (২০১৫), দীর্ঘ বিরতির পর ২০২০-এ প্রকাশিত হয় চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধেরা জানালা’। আর ২০২১ বইমেলাকে সামনে রেখে প্রকাশিত হলো ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’। কবি জাকির জাফরানের কবিতা বিবর্তনের পথে হেঁটেছে। প্রতিটি নতুন বই প্রকাশ হওয়ার পর, পাঠককে তিনি ভিন্ন কাব্যস্বাদ দিতে সক্ষম হয়েছেন। পাঠক পরিচিত হয়েছেন নতুন এক কাব্যভাষার সাথে, নতুন একজন জাকির জাফরানের সাথে। সেইদিক থেকে জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ও একটি সফল কাব্যগ্রন্থ। একটা সহজ-সরল ভাষার মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় আঞ্চলিক শব্দগুলোকে তিনি তাঁর কবিতায় তুলে এনেছেন। আমার এমন মনে হয়, তিনি যেন এই ভাষাটাকে যুগ যুগ ধরে খুঁজেছেন। একটা মাটির ভাষা, পাখির গানের ভাষা, হাওরে ঝরে-পড়া জ্যোৎস্নার গন্ধের ভাষা, যে-ভাষা আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য, যে-ভাষার মাঝেই লুকিয়ে আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস, আর তারই সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’।
মূল কথা হলো, কোনো আলোচনাই একটি বই সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা দিতে পারে না। একটি বই সম্পর্কে বুঝতে ও জানতে হলে পাঠককে অবশ্যই সেই বইটি পড়তে হবে। ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’, কবি জাকির জাফরানের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। বইটি প্রকাশ করেছে ‘জলধি’। প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী রাজীব দত্ত। প্রতি পৃষ্ঠায় শৈল্পিক অলঙ্করণ করেছেন সত্যজিৎ রাজন। বইটির ভূমিকা লিখেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। আমি আবারও নির্দ্বিধায় বলব, বইটি পড়লে আপনি ঠকবেন না। বইটি ঢাকার কবিতা ক্যাফে ছাড়াও বাতিঘরে পাওয়া যাচ্ছে। সবশেষে জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের জন্য কবি জাকির জাফরানকে অভিনন্দন। তাঁর বইটি পাঠকপ্রিয় হোক, এই শুভকামনা। কবির শুভ হোক, জয় হোক।
পূর্বপ্রকাশিত জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় রিভিয়্যু
জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় পাণ্ডুলিপির তারিফ
… …
- In all departures there is an arrival & other poems || Roushan Hasan - September 11, 2026
- সাম্যের দিকে যেতে যেতে লেখাপত্র || রোদ্দুর রিফাত - September 10, 2026
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026

COMMENTS