নীল আকাশের নিচে প্লেব্যাকসিঙ্গার || আহসান রফিক

নীল আকাশের নিচে প্লেব্যাকসিঙ্গার || আহসান রফিক

সোনালি দিনের খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী খন্দকার ফারুক আহমদ (১৯৪০-২০০১)-এর কণ্ঠটি ছিল অসম্ভব রোম্যান্টিক, যদিও প্লেব্যাকে তাঁর শিল্পীজীবনের সূচনা হয়েছিল ম্যুভিডিরেক্টর মিতার ‘চাওয়া পাওয়া’ (১৯৬৭) ছায়াছবির অসাধারণ স্যাড টিউন ও কম্পোজিশনের “রিক্ত হাতে যারে ফিরায়ে দিলে ওগো বন্ধু” (কথা : ড. মো. মনিরুজ্জামান; সুর : সত্য সাহা) গানটি দিয়ে। গানের জগতে তাঁর পদার্পণ অবশ্য আরো আগে, রেডিয়োর মাধ্যমে, ১৯৬১ সালে। তাঁকে গানের জগতে নিয়ে এসেছিলেন সত্য সাহা, যার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি যে-১৩৩টি সিনেমায় গান গেয়েছেন তার মধ্যে ১২৮টি সিনেমার সংগীতপরিচালক ছিলেন সত্য সাহা।

ঊনসত্তরের উত্তাল সময়ে “কোথায় যেন দেখেছি” সিনেমায় তাঁর গাওয়া “রিকশাওয়ালা বলে কারে তুমি আজ ঘৃণা করো” গানটি শ্রমজীবী মানুষের মনে ঢেউ জাগিয়েছিল। গানটির জন্য মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানে লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে সোনার মেডেল পরিয়ে শিল্পীকে সম্মানিত করেছিলেন। ফোকসম্রাট আব্দুল আলীমের সাথে তাঁর ঘনিষ্ট সাহচর্য ছিল। এর সুবাদে ‘মালকা বানু’ চলচ্চিত্রে একটি ফোকটাইপ গান “কে তুমি গো পুকুরঘাটে সখি” বঙ্গবন্ধুর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। বঙ্গবন্ধু শিল্পীকে ডেকে এনে নিজ হাতে পুরস্কৃত করেছিলেন।

20045793_10211120001448500_243874302_n“নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তা চলেছি একা”, “আমি নিজের মনে নিজেই যেন গোপনে ধরা পড়েছি”, “আমার এ গান তুমি শুনবে জানি শুনবে”, “আর কত দূরে উড়ে যাবি ওরে”, “কোথায় তোমায় যেন দেখেছি”, “আমার বউ কেন কথা কয় না” সহ অনেক সিনেমার গান, “বাসন্তীরঙ শাড়ি পরে”, “সেদিন তুমি কি যেন কি ভাবছিলে”, “সোহাগী লো কি দেবো বলো”, “জীবনের বাতায়নে কতবার অকারণে আঁখি মেলে রেখেছি”, “তুমি যদি একটু থাকো আমার পাশে” প্রভৃতি রেডিওর বেসিক আধুনিক, সাবিনা ইয়াসমিনের সাথে চিরকালের রোম্যান্টিক “কাছে এসো যদি বলো তবে দূরে কেন থাকো”, “নীল নীল আহা কত নীল তোমার ও-দুটি চোখ”, “গান না যদি গল্প বলি”, “তোমার এ উপহার আমি চিরদিন রেখে দেবো”, শাহনাজ রহমতুল্লাহর সাথে “শুধু একবার বলে যাও আমি যে তোমার কত প্রিয়”, ফেরদৌসী রহমানের সাথে “আমি কার জন্য পথ চেয়ে রবো”, শাম্মী আখতারের সাথে “ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে” সহ বহু গান আরো বহুকাল খন্দকার ফারুক আহমদের কণ্ঠের মহিমা ঘোষণা করবে।

আমাদের জাতীয় সংগীতের প্রথম রেকর্ডে অজিত রায়, নীলুফার ইয়াসমিন, মাহমুদুন্নবী, আব্দুল জব্বার, শাহনাজ বেগম (রহমতুল্লাহ) ও সাবিনা ইয়াসমিনের সাথে তিনিও কণ্ঠ দিয়েছিলেন। এছাড়াও “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”, “জাগো অনশনবন্দি ওঠো রে যত”, “কারার ঐ লৌহকপাট” প্রভৃতি জাগরণমূলক গানের প্রাথমিক রেকর্ডে খন্দকার ফারুক আহমদের কণ্ঠের সরব উপস্থিতি ছিল।

১৯৭৪ সালে ‘আলোর মিছিল’ ছবিতে “দিনবদলের দিন এসেছে কান পেতে ঐ শোনো” গানটির জন্য তিনি প্রথম বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। পেয়েছেন শেরেবাংলা পদক, ভাসানী পদক, ঋষিজ পদক সহ অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার। ১৯৮০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই শিল্পীকে ‘হান্টিং সিঙ্গার’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

19988896_10211120003328547_185145903_n

খন্দকার ফারুক আহমদের সঙ্গে লেখক আহসান রফিক

বাংলা গানের ব্যাপ্ত ভুবনে এক উজ্জ্বলতর নক্ষত্রপ্রতিম এই গুণী শিল্পীর জন্ম ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জুলাই, জীবনাবসান ২০০১ খ্রিস্টাব্দের ১১ জুলাই। শিল্পীর পিতৃভিটা বাংলাদেশস্থ বগুড়ার খন্দকারপাড়ায়, ইশকুলজীবন কেটেছে পার্বত্য শহর রাঙামাটিতে। একটি পৃথক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কণ্ঠসম্পদের অধিকারী শিল্পী খন্দকার ফারুক আহমদের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী নীরবেই পার হয়ে গেল। স্মরণ করতে দেখা গেল না কোথাও মুখে-মুখে-ফেরা “ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে” কিংবা “নীল আকাশের নিচে আমি / রাস্তা চলেছি একা” পঙক্তিবিশিষ্ট উত্তুঙ্গ জনপ্রিয় গানগুলোর কণ্ঠশিল্পীটিকে। এই বিস্মরণপটু বদ্বীপের শিল্পসাহিত্যসাংস্কৃতিক মজমায় স্মৃতিনিষ্ঠ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকারী নিঃস্বার্থ সুরসমুজদারও তো ক্রমশ দুষ্প্রাপ্য।

বর্তমান রচনাটির মাধ্যমে এই নিরুপম কণ্ঠশিল্পীর প্রতি নিবেদন করছি হৃদয়ের সুরপুষ্পপল্লবিত শ্রদ্ধা।

… …

আহসান রফিক

COMMENTS

error: