আলো-ছায়ার অবিরাম খেলায় ঘেরা মানুষের জীবন কেবলই কুহেলিকা। আপাতদৃষ্টিতে শান্ত দিঘির মতো অচঞ্চল জীবনের অতল গভীরে তীব্র জলোচ্ছ্বাস বয়ে চলার ধারণাকেই কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটছে। এই রূপান্তর মানুষকে প্রথাগত সাফল্যের মোহ থেকে পরম আত্মিক উপলব্ধির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এ-কথা ধ্রুব সত্য যে কেউই নিখুঁত নয়। আমরা ভুলে যাই, প্রতিটি মানুষের প্রতিদিন একাকী রণক্ষেত্রে লড়াই করার ইতিহাস রয়েছে। সেই লড়াই অধিকাংশ সময় কৃত্রিম হাসির আবরণে ঢাকা পড়ে যায়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মনস্তত্ত্ববিদরা প্রথম Aesthetic Empathy বা নান্দনিক সহানুভূতির ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁদের মতে, মানুষ অন্য মানুষের প্রতিই নয়, প্রকৃতির চলন এবং শিল্পের গভীরতার সাথেও নিজের দুঃখকে মিলিয়ে নিতে পারে। এই মেলবন্ধনই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখছে। বর্তমান যুগের চরম আত্মকেন্দ্রিক সামাজিক ব্যবস্থার বিপরীতে সহমর্মিতা বা কাইন্ডনেস মানব প্রজাতির সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। মানুষ দিন দিন সমাজবিচ্ছিন্ন ও একাকী হয়ে পড়ায় মানসিক ও সামাজিক স্তরে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে পারস্পরিক সহমর্মিতা মানুষের মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায় এবং সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। ডারউইনের বিবর্তনবাদের আধুনিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, টিকে থাকার লড়াইয়ে সেই প্রজাতিই সবচেয়ে বেশি সফল, যারা নিজেদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল এবং সহমর্মী।
স্নায়ুবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী, একজন মানুষ অন্য মানুষের প্রতি নিঃশর্তভাবে সদয় হলে বা গোপন কষ্টের বোঝা ভাগ করে নিলে মস্তিষ্কে এক অলৌকিক রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। একে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘হেল্পার্স হাই’/(Helper’s High)। এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের মেসোলিম্বিক রিওয়ার্ড পাথওয়ে সক্রিয় হয়, যার ফলে ডোপামিন এবং এন্ডোরফিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ ঘটে যা মানুষের মনে স্বর্গীয় বা ইউফোরিক আনন্দের অনুভূতি দেয়। শুধু তা-ই নয়, হার্ভার্ড মেডিসিন ম্যাগাজিনের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে আরেক বিস্ময়কর তথ্য। যখন আমরা কারও প্রতি সহানুভূতিশীল হই, তখন আমাদের শরীরে ‘অক্সিটোসিন’ নামক হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। এই অক্সিটোসিন মনের ভয় বা দুশ্চিন্তা দূর করার পাশাপাশি আমাদের হৃদযন্ত্রের রক্তনালীগুলোকে প্রসারিত করে রক্তচাপ কমায় এবং ধমনীর প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন দূর করতেও সাহায্য করে। অর্থাৎ, অন্যকে ভালো রাখার যে মানসিকতা, তা পরোক্ষভাবে আমাদের কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকে সুস্থ করে তুলে। মানুষের শরীরে প্রকৃতি যেন এক পরম সত্য লিখে রেখেছে—অন্যের প্রতি ভালোবাসাই নিজের অস্তিত্ব সুরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়। কঠিন পৃথিবীতে কোমল হৃদয়ের অধিকারী হওয়া প্রকৃতির সবচেয়ে বড় জৈবিক উপহার।
মানসিক ক্ষত এবং নিরন্তর লড়াইয়ের পটভূমিতেই পৃথিবীর মহান মানুষেরা তাঁদের শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলো সম্পন্ন করে গেছেন। আব্রাহাম লিঙ্কনের কথাই ধরা যাক, যিনি আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম সফল এবং সহানুভূতিশীল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিত। লিংকন তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় তীব্র বিষাদ বা মেলানকোলিয়ার সাথে লড়াই করেছেন, যাকে আধুনিক পরিভাষায় আমরা ডিপ্রেশনের সমতুল্য বলতে পারি। তাঁর অন্তহীন অভ্যন্তরীণ অন্ধকারই তাঁকে অন্য মানুষের, বিশেষ করে ক্রীতদাসদের কষ্টের প্রতি সহানুভূতির চোখ দিয়েছিল। তিনি নিজের ক্ষত দিয়ে অন্যের ক্ষতকে চিনতে পেরেছিলেন। তদ্রুপভাবে, আধুনিক বিজ্ঞানের জনক স্যার আইজ্যাক নিউটন কিংবা কালজয়ী বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলার জীবন ছিল অন্তহীন একাকীত্ব এবং মানসিক টানাপোড়েনে ভরা। টেসলা তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে সমাজ থেকে দূরে গিয়ে পাখিদের মাঝে, বিশেষ করে পায়রাদের সেবায় পরম শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। মানুষের সমাজ থেকে পাওয়া আঘাতকে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসায় রূপান্তর করার এই মানসিক ক্ষমতাকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলা হয় ‘কোপিং মেকানিজম’, যা মানুষকে চরম মানসিক বিপর্যয়ের মুখেও সান্ত্বনা দেয়। জীবন এবং জগতের অপূর্ণতা ও অমসৃণতার বোধ মানুষের মনস্তত্ত্বে ধৈর্য এবং জীবনকে মেনে নেওয়ার অলৌকিক ক্ষমতা জাগ্রত করে।
জীবনের অপূর্ণতাই আসলে শিল্পের সবচেয়ে বড় উপাদান। জীবন যদি নিখুঁত হতো, তবে হয়তো পৃথিবীতে কোনও কবিতা লেখা এবং কালজয়ী সুর সৃষ্টি হতো না। রুশ কথাসাহিত্যিক লিও টলস্টয় জীবনের শেষভাগে এসে সমস্ত ধন-সম্পদ ও সামাজিক প্রতিপত্তি ত্যাগ করে সাধারণ কৃষকের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, মানুষের ছদ্মবেশী অহংকার এবং বাহ্যিক আড়ম্বর আসলে অন্তরের শূন্যতা আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। কারও বাহ্যিক সাফল্য দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়া মানে তাঁর জীবনের একটি পৃষ্ঠা মাত্র দেখা। মানুষের বন্ধ খাতার অশ্রু ও কান্নার ইতিহাস কল্পনাতীত। আপাতদৃষ্টিতে যাকে সুখী মনে হয়, নিভৃতে সেও হয়তো গভীর মানসিক যন্ত্রণার সাথে লড়াই করছে। তাই অন্যকে বিচার করার চেয়ে তার লড়াইয়ের প্রতি সহমর্মী হওয়া প্রয়োজন। আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কৃত্রিম যুগে মানুষ দিন দিন আরও একা হচ্ছে। পর্দায় ভেসে ওঠা নিখুঁত জীবনের ছবি দেখে তরুণ প্রজন্ম অবাস্তব প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে “সো বি কাইন্ড টুডে” বা “আজ সদয় হোন” বাক্য প্রয়োগ অত্যন্ত বৈপ্লবিক সামাজিক বার্তা।
মনোবিজ্ঞানী বারবারা ফ্রেডরিকসন এবং বেথনি কোকের এক যুগান্তকারী গবেষণা মতে, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতা এবং সামাজিক সংযোগের (Social Connectedness) সাথে হৃদযন্ত্রের ভেগাস নার্ভের (Vagus Nerve) কার্যকারিতা বা ‘ভেগাল টোন’ (Vagal Tone) সরাসরি যুক্ত। তাঁদের গবেষণার মূল বিষয় ছিল ‘লাভিং-কাইন্ডনেস মেডিটেশন’ (Loving-Kindness Meditation) বা মৈত্রী ধ্যান। গবেষণায় উঠে আসে, যারা নিয়মিত ইতিবাচক অনুভূতির চর্চা এবং সামাজিক সংযোগ বৃদ্ধি করেন, তাঁদের ভেগাল টোন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। উন্নত ভেগাল টোন মানুষের প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে শরীরকে শান্ত রাখে, মানসিক চাপ কমায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। কারও গোপন কষ্টের কথা না জেনেই মৃদু হাসিমুখে তাকানো বা ভুলের প্রতি সহনশীল হওয়া আসলে অজান্তেই একটি ভেঙে যাওয়া মনকে জোড়া লাগানোর প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া। মানুষের মনের এই ক্ষমতাকে বলা হয় ‘রেজিলিয়েন্স’ (Resilience) বা মানসিক স্থিতিস্থাপকতা। চারপাশের ভালোবাসা এবং সহানুভূতির সংস্পর্শেই রেজিলিয়েন্স বা মানসিক স্থিতিস্থাপকতা সচল হয়।
জীবনকে কফির কাপ এবং জানালার পাশে রাখা ফুলদানির সবুজ পাতার মতো সহজ-সরল দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখাই হলো প্রকৃত প্রজ্ঞা। জীবনের জটিল সমীকরণ সমাধান করতে গিয়ে আমরা ভুলেই যাই, দিনশেষে আমরা সবাই একটুখানি শান্তি ও যত্নের প্রত্যাশী মাত্র। কোনও মানুষের কর্কশ আচরণের পেছনে থাকতে পারে তার রাতের পর রাত না ঘুমানোর ক্লান্তি এবং নীরবতায় থাকতে পারে প্রিয়জন হারানোর তীব্র শোক। বিচারক হওয়ার চেয়ে সহযাত্রী হওয়া অনেক বেশি আনন্দের। আমরা যদি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মহাবিশ্বের প্রতিপালকের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি যে আমরা আরও একটি দিন বেঁচে আছি এবং এই কঠিন পৃথিবীতে হৃদয়ের কোমলতাকে হারিয়ে যেতে না দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করতে পারি তবেই আমাদের জীবনের সার্থকতা। জীবন নিখুঁত না হলেও জীবনের অপূর্ণতাই একে পরম সুন্দর এবং অর্থবহ করে তুলেছে। আসুন, আমরা একে অপরের বোঝার ভার কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করি, কারণ দিনশেষে এই পৃথিবীতে সহমর্মিতাই মানুষের একমাত্র চিরন্তন পরিচয়।
- অপূর্ণ জীবনের নান্দনিক সহমর্মিতা || আয়াজ আহমদ বাঙালি - August 30, 2026
- মন হইলো…মানুষ মূলত… || রোদ্দুর রিফাত - August 30, 2026
- ‘মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান’ প্রসঙ্গে || বদরুল হায়দার - August 20, 2026

COMMENTS