গুরু, হুজুর-রুমাল ও ১টি অটোগ্রাফ || সজীব তানভীর

গুরু, হুজুর-রুমাল ও ১টি অটোগ্রাফ || সজীব তানভীর

দুই দশকের সাথে আরও তিন-চার বছর আগের সময়, অঞ্জন যখন বলেছেন মাথার ভিতর এলভিস প্রিসলির কথা তখন এদেশের তরুণ-যুবা-কিশোরদের মাথার ভেতর একটাই নাম, ‘গুরু’। এমনকি তার পরিবারপ্রদত্ত ডাকনামটার থেকেও বেশি বোধহয় উচ্চারিত হতো এই ‘গুরু’। গুরু জেমস্ তখন প্রতিটা তরুণ হৃদয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাস করেন।

তার আগে, সেই পরিবর্তনের কালে (স্যাটালাইটক্যাবলের আগ্রাসন অলরেডি শুরু ততদিনে) আমাদের এই বাংলার কোনো ফ্যাশন-আইকন ছিল কি না মনে পড়ে না। গুরু জেমস্-ই একটা প্রজন্মকে জিন্স প্যান্টের উপরে পাঞ্জাবি পরতে শিখিয়েছিলেন সেই কালে, ডেনিমের সাথে সাদা পাঞ্জাবি আর কাঁধে লাল গামছা অথবা আমরা যেটাকে তখন বলতাম হুজুর-রুমাল, পায়ে জুতা। সে এক অস্থির উম্মাদনার কাল! ব্যান্ডসংগীত পথভ্রষ্ট তরুণদের আড্ডা, হেনতেন বহু কথা প্রচলিত তখন বুড়োদের মনে। আমরা কী আর থোড়াই কেয়ার করি এসব রদ্দি চিন্তায়!

এমনই সময়ে গুরু জেমস্ আসলেন তার ছোটবেলার শহরে, আমার শহরে, আমাদের শহরে। জেলা স্টেডিয়ামের মাঠ জুড়ে হবে ওপেন এয়ার কনসার্ট, শুধু একা ‘ফিলিংস’ গাইবে (তখনও সেটা ‘ফিলিংস’ ব্যান্ড, ‘নগরবাউল’ না)। গুরু এত কাছে আর তার সাথে দেখা করব না, তা কী হয়! খোঁজ পেলাম গুরু কোন হোটেলে উঠেছেন, আমাকে ঠেকায় কে!

হোটেল মুক্তা তখন নতুন হয়েছে মাত্র, দোতলায় রিসিপশন। আমি গুরুর কপি হয়ে জিন্সের সাথে সাদা পাঞ্জাবি আর গলায় সাদা হুজুর-রুমাল নিয়ে হাজির, চুলটাই তখন বড় করতে পারিনি। রিসিপশনে ম্যানেজার বলল অপেক্ষা করতে, চারতলার একটা কক্ষে গুরু আছেন, তার ছোটভাই এসেছে তার সাথে দেখা করতে, সে গেলে আমি চেষ্টা করতে পারি দেখা করার, যদি গুরুর অনুমতি মেলে।

মিনিটখানেকও হয়নি, আমি তখন রিসিপশনের সামনে অস্থির পায়চারি করছি, হঠাৎ গুরুর দরাজ গলায় চিৎকারের আওয়াজ। গুরু তার ভাইকে চিৎকার করে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলছেন। মুহূর্তের মধ্যেই সিঁড়ি দিয়ে গুরুর ভাই নেমে এসে হোটেলের বাইরে চলে গেল। ঠিক তখনই গিটারে ঝঙ্কারের সাথে গুরু গাইতে শুরু করলেন, ‘দূঃখিনী দূঃখ করো না…’। পুরো হোটেল তখন গুরুর গান আর গিটারের শব্দে গমগম করছে, যেন এক ঐশ্বরিক ব্যাপার।

গুরু গান থামালেন, ভয়ে ভয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলাম তার ঘরের দরজায়। দরজা টোকা দিয়ে বললাম, ‘গুরু আসব?’ উত্তর আসলো, ‘কে? আয় ভেতরে আয়’। দুরুদুরু বুকে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম চুপচাপ। গুরু প্রথম কথা বললেন, ‘কি রে কি বলবি?’

এর মাঝে পাশের রুম (যেখানে ফান্টিভাই ছিলেন) থেকে আমাদের নেওয়াজভাই গুরুর রুমে আসলেন, আমি বাকরুদ্ধ অবস্থা থেকে কথা বলার কিছুটা শক্তি পেলাম উনাকে দেখে, বললাম, ‘গুরু অটোগ্রাফ’। নোটবুক আর কলম এগিয়ে দিলাম, গুরু বললেন, ‘দে তাড়াতাড়ি’। গুরু অটোগ্রাফ দিলেন। আমি এবার কাঁধ থেকে সাদা হুজুর-রুমাল খুলে গুরুর সামনে ধরলাম, সেটাতেও গুরুর অটোগ্রাফ চাই আমার। গুরু সেটা নিলেন, বললেন, ‘কি করেছিস রে পাগলা, এই কলমে এখানে কীভাবে অটোগ্রাফ দিবো?’ জানালাম, মার্কার পেনও সাথে আছে। গুরু বললেন, ‘এত নার্ভাস কেন, দে তাহলে মার্কার!’ সাদা জমিনে লাল মার্কার দিয়ে গুরু অটোগ্রাফ দিলেন, আমার কাঁধে রুমালটা ঝুলিয়ে দিলেন। বললেন, ‘মাঠে আয়, গান হবে, কথা হবে সেখানেই। এখন নেওয়াজের সাথে একটু কথা বলি’। আমি গুরুর দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকতে থাকতে বেরিয়ে আসলাম ঘর থেকে অদ্ভুত এক ভালোলাগা নিয়েই।

এর পরে অনেকবার গুরুর সাথে দেখা হয়েছে। কখনোই সেই প্রথম দেখার মুগ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। সেই মুগ্ধতা কাটবার নয় বোধহয় কখনোই।

এত বছর যত্নে রেখেছি সেই রুমাল, মাঝেমাঝেই এটা দেখে সেই দিনে ফিরে যাই আমি …

আহা কী দারুণ সময়গুলি!


জেমসের অটোগ্রাফ সম্বলিত স্কার্ফের ছবি লেখকের সৌজন্যে পাওয়া। — গানপার

… …

COMMENTS

error: