বাসমতি চালে ভেজা শাদা হাতখান রাখো বুকে হে কিশোরী

বাসমতি চালে ভেজা শাদা হাতখান রাখো বুকে হে কিশোরী

জীবনানন্দের কবিতালাইনটা মাথায় নিশ্চয় ছিল, তবে এইটাই একমাত্র কারণ নয় সিনেমাটা দেখার আগ্রহ তৈয়ারের পিছনে। এমনিতে বাসমতি শব্দটা কানে এলে একটা সুবাস নাকে এসে ঠেলা মারে এবং চোখেও তন্বী চিকন লম্বা চালের ছবিটা ঝাপ্টা লাগায়। এই সিনেমার নামটা ‘বাসমতি ব্লুজ’ হবার কারণে যেমনই সিনেমাসুরত হোক না কেন শুরু থেকেই ডিটার্মাইন্ড ছিলাম যে এইটা আমি যেমনে-পারি-তেমনে দেখব। খবর জানাজানি হয়ে যায় এখন সিনেমা আগমনের অনেক আগেই, টিজার-ট্রেইলার ইত্যাদি বাইরায়, ইউটিউবে বেজায় ধামাকা হয় এবং দৈনিকী নিউজের কাগজে নানান কাটপেইস্ট গালগপ্পোও পড়া হয়। এই সিনেমায় ব্রি লার্সন অভিনয় করছেন খবরটা আখবারে পড়েছিলাম। মোটামুটি দিনই গুনছিলাম বলব, কবে এইটা বাজারমন্দিরে এসে আবির্ভূত হয়। এইখানে গোপন থাকুক যে এই হিরোয়িনের প্রতি, ব্রি লার্সন নাম যার, বর্তমান নিবন্ধকারের একটা আশনাই আছে। ব্যাপারটা ক্রাশ বলে বোধহয় হালের ইংরেজিমিশা বাংলায়। বেশি সিনেমায় অ্যাক্টিঙে দেখা না-গেলেও ব্রি ভীষণ স্বপ্নপ্রাকৃতিক প্রেজেন্স নিয়া হাজির হন পর্দায়। আর বয়সও পড়ে আছে এখনও, ভবিষ্যতে ব্রি তার হাতের তাসগুলো ক্রমে টেবিলে ছড়াবেন নিশ্চয়। এই সিনেমায় ব্রিকে দেখে তেমনি হৃদি-ভেসে-যাওয়া আনন্দস্পন্দন হয়েছে, যেমন হয় সবসময়, এবং সিনেমাও গল্পে-নির্মাণকলায় হেলা করবার নয়।

এক ইয়াং অ্যামেরিকান সায়েন্টিস্ট ইন্ডিয়ায় আসে এবং তারই আগমনী দিয়া স্টার্ট নেয় সিনেমা। ধানবিজ্ঞানী সেই তরুণীর দিলের ভিতর ভারতীয় চাষাভূষাদের জন্যে বেজায় মায়া। আগমনের হেতুও ওই কৃষকদেরে হেল্প করার উন্নতবৈশ্বিক ভূমিকা। ধানবীজের একটি বিশেষ জাত সে আবিষ্কার করেছে যেইটার ফলন অনেক হাই এবং এই বীজ দিয়া আবাদ শুরু করলে ক্ষেতি কৃষকদের লাভও হবে যারপরনাই। জিএম খাদ্যশস্য নিয়া আমাদের এই ‘তৃতীয়’ দুনিয়ায় ক্ষীণ হলেও প্রতিরোধের একটা ধারা আছে, এই জিনিশ সিনেমায় কেমন করে মুকাবিলা করা হবে দেখার জন্যে একটু নড়েচড়ে বসতে হয় এইবার। জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড শস্যবীজের প্রোমোট করতে এসে অ্যামেরিকান তরুণী বিজ্ঞানীটি ফিল্ডের কালচারের সঙ্গে একটুখানি ডিপরুটেড হতে চেষ্টা করবে, এইটা আগে থেকেই ভেবে নেয়া যাচ্ছিল। তবে যেহেতু কমেডি কিসিমের সিনেমা, হার্ডকোর কোনো কথাবার্তায় না-যেয়ে যেন কমিক ধাঁচায় এগিয়েছে ন্যারেটিভটা। তারপরও যথেষ্ট সম্ভ্রমের সঙ্গে ব্যাপারটা সামলানো হয়েছে। মেয়েটা ফাইন্ডিঙস্ গড় করে একদম গোড়াতেই রিয়্যালাইজ্ করে, যে-ফার্মারদেরে হেল্প করতে সে এই বীজ বয়ে এনেছে সুদূর উন্নত যুক্তরাষ্ট্র হইতে, এই বীজই কৃষকদের মারণবীজ। সিনেমা তারপর গানবাজনা-কালচার ইত্যাদি চিনতে চিনতে এবং চেনাতে চেনাতে আগায়। দেখতে সুখ লাগে। বেশ ভাবায়ও। ব্রি তো যথাপূর্ব বর্তমান নিবন্ধকারের নিকট সমাদৃত, উপরন্তু শাড়ি পরে বেজায় সিডাক্টিভ।

যখন ‘বাসমতি ব্লুজ’-এর ট্রেইলার রিলিজ হয়েছিল, তখনই জিনিশটা মাথায় কিক্ দিয়েছিল যে দেখি কীভাবে এই সিনেমায় ত্রাতা অ্যামেরিকার চেহারাটা হাজির করা হয়। আরও মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম যে দেখব গ্রহীতা ভারতীয় গরিব জনতা শাদা হাতের প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্কটাকে এস্ট্যাব্লিশ করতে কোঅপারেইট করে নাকি নিকুচি করে। সেই দিন তো আজ আর নাই যে শাদা দেখলেই হৃদয়ের কাছা খুলে দেবে। ব্যাপারগুলো মোটামুটি ভালোই ডিল্ করা হয়েছে। অ্যামেরিকা বা বড়-অর্থে পশ্চিমের পরিত্রাতা সাইনবোর্ডটাকে বেশ দলাইমলাই ধোলাই দিয়া আগায়েছে সিনেমা। খানিকটা জাতীয়তাবাদের জজবায় নিপতিত হয়ে বেশ কতিপয় জায়গায় বর্ণদ্বেষদুষ্ট হয়ে গেছে বলতে হবে, রেসিয়্যালি ইনসেন্সিটিভ হয়ে গেছে বেশকিছু পয়েন্টে, এইসব থোড়াসা খামতি নিশ্চয় দৃষ্টি কোঁচকালেও মন অপরিচ্ছন্ন করবে না।

বেবাক প্রশ্নের অ্যান্সার মিলিয়ে দেয়া হয়েছে, এমন নয়; এমন তো হতেই পারে না। তারচে বরং অনেক জায়গায় প্রশ্নাতুর করেছে, এইটাই সিনেমার ব্রিলিয়্যান্স। মূল কন্সেপ্টের জায়গায় সিনেমার গল্প কিন্তু মোটেও কাল্পনিক কিছু নয়। নির্জলা নিরেট বাস্তব নিয়া আখ্যান গড়ে তোলা হয়েছে। অ্যামেরিকান সিড কোম্প্যানিগুলো এই অঞ্চলে, যেমন ভারতে তেমনি শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশ সহ সবখানে, পেল্লায় ক্যাপিট্যালের প্রচারণা চালাচ্ছে এনজিও দিয়া ব্যাপক বেচাবিকির প্রোজেক্টও চালাচ্ছে তাদের ল্যাবে বানানো জিএমও শস্যবীজ ধনধান্যের এই জনপদগুলোর ভোলাভালা চাষি-গিরস্তের হাতে গছানোর। গোটা ব্যাপারটাই নিসর্গবৈরী, মানবধ্বংসী, বিপর্যয়কর। ফিল্মমেইকার এই দিবালোকের সত্যটাকে এন্টার্টেইনমেন্টের মিঠাই-মশলা দিয়া পাশ কাটাইবার চেষ্টাও করেন নাই। জিনিশটা সাধু হয়েছে তাই, বিশ্বস্তও হয়েছে।

চেষ্টা সাধু, সহৃদয় ফিল্মমেইকারের সমস্ত উদযোগ, তবে এই ইন্ডিয়াল্যান্ডের ব্যাপারে মেইকারের নোলেজে একটু কমতি থাকায় লেজেগোবরে ব্যাপারটা নানাস্থানে উঁকি দিয়া যায়। বিশেষভাবে যে-ফিল্টার দিয়া প্রাচ্যকে দেখে পশ্চিম, অভ্যস্ত যেভাবে দেখে, অগোচর নয় তিতপুরান সেই ফিল্টার এইখানেও। ম্যুভিতে ব্যবহৃত মিউজিক মজার, বিনোদনসুখকর, তবে যেভাবে এর গানগুলো পিকচারাইজ্ করা হয়েছে সেইটা বলব উদ্ভট অনেক জায়গায়।

বিস্তর কৌতুকদৃশ্য রয়েছে এই সিনেমায়। সিরিজ্ অফ ফানি মোমেন্টস্ ছড়ানো ম্যুভিজুড়ে। যেমন রজিত এবং লিন্ডার মধ্যকার সম্পর্কমুহূর্তগুলোর কথা বলা যায়। দানব বীজবেচুয়া কর্পোরেট কোম্প্যানির সিইও চরিত্রে ডোন্যাল্ড সাদার্ল্যান্ড অভিনয় করেছেন কমিক দৈত্যের একটা টাচে। এইটা দারুণ হয়েছে। অ্যানিওয়ে। এই সিনেমা আখেরে একটা রাজনৈতিক কমেডির উদাহরণ হিশেবে মনে থাকবে, এর মধ্যে মিউজিক্যাল এলিমেন্টস্ এবং অ্যাটমোস্ফিয়ারের আধিক্য সত্ত্বেও। বাসমতির সুবাস দিয়া স্পাইসি ডিশের মাধ্যমে এই ফিল্মমেইকার আপনাকে একটা রাজনৈতিক চৈতন্যেরই কিসসা বলে গেছেন।

ও হ্যাঁ, জীবনানন্দের সঙ্গে এই সিনেমার কাহিনিগত অথবা কাব্যিক কোনো সংশ্রব নাই। শিরোনামে যে-লাইনটা টাঙানো হয়েছে এই রিভিয়্যুটিতে, এইটা আলবৎ জীবনেরই। গিমিক দিয়া খানিক চেষ্টা চালানো হলো ম্যুভিরিভিয়্যুটার পাঠকক্লিক বাড়াইবার। “বাসমতি চালে ভেজা শাদা হাতখান / রাখো বুকে হে কিশোরী; গোরোচনা রূপে আমি করিব যে স্নান” … ব্রি ইন্ডিয়্যান সেটিঙসে বেশ করেছেন অভিনয়। বাকিটা আপনার ইচ্ছা, দেখবেন কি দেখবেন না, ট্রাই করতে পারেন আপকামিং উইকেন্ডে।

Movie Title: Basmati Blues ।। Genre: romantic comedy musical ।। Director: Danny Baron ।। Starring: Brie Larson, Scott Bakula, Donald Sutherland, Tyne Daly, Utkarsh Ambudkar, Lakshmi Manchu ।। Cinematography: Himman Dhamija ।। Music by Steven Argila ।। Language: English, Hindi ।। Runtime: 105 minutes ।। Released in October 2017

রিভিয়্যুকারী : মিল্টন মৃধা

… …

মিল্টন মৃধা
Latest posts by মিল্টন মৃধা (see all)

COMMENTS

error: