আমারে লইয়া চলো নয়া আগামীর দিনে

আমারে লইয়া চলো নয়া আগামীর দিনে

এই নিবন্ধটা আলাপভিত্তিক একটি ইংরেজি নিবন্ধের কিয়দংশ ভর করে বাংলায় অ্যাডপ্টেড। জন ডেনভারের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যেয়ে একটা আস্ত সংকলন প্রযোজিত হয়েছিল ২০১৩ সনে, রেকর্ডেড গানের সংকলন, ডেনভারেরই এক-ডজনেরও অধিক গান নয়া অ্যারেঞ্জমেন্টে গেয়েছেন সেই সংকলনে নতুন সময়ের নবীন অথচ শ্রোতামান্য সংগীতশিল্পীরা, ডেইভ ম্যাথ্যুস্ (Dave Matthews) হচ্ছেন সেই মিউজিক সংকলনের একজন কণ্ঠশিল্পী ও রেকর্ডপ্রোডিউস্যর এবং এই নিবন্ধ ডেইভ ম্যাথ্যুসেরই কিছু কথা বাংলায় হাজির করতে চলেছে। এর আগে বলে নেয়া ভালো হয় যে ডেইভ ম্যাথ্যুস্ হচ্ছেন অ্যামেরিক্যান রকসিনে একজন নিয়মিত মঞ্চসফল মিউজিশিয়্যান এবং উনার নিজের নামেই রয়েছে ব্যান্ড, ‘ডেইভ ম্যাথ্যুস্ ব্যান্ড’ যা সংক্ষেপে ডিএমবি নামেই মশহুর। ডেনভারকে ট্রিবিউট জানায়ে যে-অ্যালবাম বেরিয়েছে একটু আগে বলা হচ্ছিল, ‘দি মিউজিক ইজ্ য়্যু : অ্যা ট্রিবিউট টু জন ডেনভার’ সেই অ্যালবামের নাম, ডেইভ ম্যাথ্যুস্ স্বকণ্ঠে গানগাওয়া ছাড়াও ওই অ্যালবামের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়কদের মধ্যে একজন তিনি। রিলিজের পরে অ্যালবামটায় গানগাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে এনপিআর ম্যাগাজিনে একটি ইন্টার্ভিয়্যু দিয়েছিলেন ডেইভ ম্যাথ্যুস্, সেই ইন্টার্ভিয়্যু নিয়েছিলেন এনপিআর অবদায়ক স্কট সাইমন, জন ডেনভারের স্যংরাইটিং থেকে ডেইভ কিছু জিনিশ শিখেছেন বলিয়া আলাপে স্বীকার করেন এবং সেই লার্নিং নিয়া আলাপ করেছেন।

প্রোক্ত সংকলনে ডেইভ গেয়েছেন ডেনভারের ‘টেইক মি টু টুমরো’ গানটা। গাইবার সময় কায়দাটা খানিক নিজের মতো করে নিয়েছেন ডেইভ, অনেকটাই ধীর লয়ের হয়েছে ডেইভ ভার্শন, স্লো-ডাউন করে নিয়ে ডেইভ ‘টেইক মি টু টুমরো’ গেয়েছেন অ্যালবামে। এমনিতে এই গানটা খুব ছোট নয় আবার বড়ও নয় এমন কলেবরের, মূলত তিনটা স্তবকে একুনে বারো/চোদ্দলাইনের গান বলতে গেলে, ব্যালাড নয়, এবং গানটা আদৌ লিরিকপ্রধানও নয়। এর বিশেষত্ব সংগীতে একটা আলাদা সাউন্ড ক্রিয়েট করার মধ্যেই নিহিত। মোদ্দা কথা, ডেনভারের গান ডেইভ যেভাবে ইন্টারপ্রেট করেছেন সেভাবেই গেয়েছেন এবং তা খারাপ হয় নাই। ইন্টার্ভিয়্যুটাতে ডেইভ কীভাবে ডেনভারের গান পার্সিভ করেন সেই সূত্র ধরে কথা বলেছেন মুখ্যত।

স্কটের সঙ্গে আলাপকালে ডেইভ বলছেন, “এই গানটায় ডেনভার একটা ডিফ্রেন্ট সাউন্ড ক্রিয়েট করার দিকেই মনোযোগী ছিলেন মনে হয়। লিরিকে সেভাবে এম্ফ্যাসিস্ দিতে যান নাই, দিতে যাবার দরকারও হয় নাই। কিন্তু জন ডেনভার স্বভাবত যেমন লিরিক লেখেন, ‘টেইক মি টু টুমরো’ সেসব থেকে ভিন্ন। অথচ চাইলেই তিনি এইটাও উনার ধারার লিরিকেই লিখে ফেলতে পারতেন। জনি তা করেন নাই, কারণ পৃথক একটা সাউন্ড ক্যাপ্চার করার দিকেই তিনি ছিলেন মরিয়া। আর শেষমেশ তিনি তাতে সফলও হয়েছেন বলেই আমার ধারণা।” কাজেই, নিজে যখন গাইতে গেছেন এই গানটা, ম্যাথ্যুস্ বলছেন, ভিন্ন ধাঁচের এই গানটা সামলানো অনেকটা চ্যালেঞ্জ হিশেবেই নিয়েছেন। “তো, আমি চেষ্টা করেছি ভিন্ন একটা অ্যাঙ্গেল থেকে এইটা সামলাতে। এখন, আমি বলতে পারব না অ্যালবামে যেভাবে গেয়েছি সে-ভাবের চেয়ে অন্য কোনো ভাবে এরচেয়ে ভালোভাবে আমি গাইতে পারতাম কি না। তবে এইটা আমি বলতেই পারি যে ডেনভার যেভাবে গেয়েছেন গানটা, আমি সেই রাস্তায় যাইনি, আমি ভিন্ন পথে হেঁটেছি গানটা গাইবার সময়।”

এই ইন্টার্ভিয়্যুকালে ডেইভ কথা বলেন ডেনভারের সমসাময়িক কিছু কালচারাল ট্রেন্ড এবং টেন্ডেন্সি নিয়ে। যেমন, ডেনভারের মিউজিক নিয়ে, স্টেজপ্রেজেন্স নিয়ে, ডেনভারের ফিজিক্যাল অ্যাপিয়্যারেন্স ইত্যাদি নিয়ে সেই-সময় এমন কতিপয় ব্যাপার গণমাধ্যমে হামেশা আসত যা ন্যাক্কারজনকভাবে ব্যক্তিকে হেয় করার বদ-অভিপ্রায় থেকে করা হয়েছে। ডেইভের কথাবার্তায় এইসব ব্যাপারে বেশকিছু অন্তর্দৃষ্টি মিলবে। ডেইভ বলছেন, “প্রচুর গান শুনে বেড়ে উঠেছি আমি। বিস্তর গানে ডেনভারের ছায়া আমি নিশ্চিতভাবে সে-সময় পেয়ে যেতাম। বলার তো অপেক্ষা রাখে না যে ডেনভার সেই সময়টায় নিজের অজান্তেই তার চারপাশের মানুষগুলোকে রোজ সুরে বেঁধে রেখে চলেছিলেন।” কথা বলছিলেন ডেইভ ম্যাথ্যুস্, এনপিআর ম্যাগের কন্ট্রিবিউটর জার্নালিস্টের সঙ্গে, এক-পর্যায়ে যেয়ে বলেন, “অবাক হতে হয় এখন আজকে এই কথাটা ভাবলে যে ডেনভার তার সময়ে এতটা হাসিঠাট্টার বিদ্রুপের আর ফাইজলামির শিকার হয়েছেন মিউজিক-ইন্ডাস্ট্রির লোকদের মাধ্যমে। Dave Matthewsএবং এই বিদ্রুপবাণগুলো অকথ্য অসহ পাশবিকতায় সেই ইন্ডাস্ট্রি থেকেই আসছিল, যে-ইন্ডাস্ট্রির চূড়ায় ডেনভার তখন অধিষ্ঠিত। অবাক লাগে যে ডেনভারের যা-কিছু চমৎকার বৈশিষ্ট্য, তার মিউজিকের তার মুখাবয়বের তার আচরণের তার স্বভাবের, বেছে বেছে সেই জিনিশগুলা নিয়াই রিডিকিউল করা হচ্ছিল তাকে একাধারে বছরের পর বছর! ওই সময়টায় আমি ছোট ছিলাম, বয়স ছিল অল্প নেহায়েত, তবু জনিকে ভালো লাগত এবং জনির গানবাজনা ভালোবাসতাম। মনে পড়ে, ডেনভার ভালোবাসতাম বলে সেই-সময় বন্ধুদের কাছ থেকে মশকরা সইতে হয়েছে ব্যাপক এবং আমি ভীষণ বিব্রত হতাম তখন। আমি বিব্রত রইতাম সবসময় ডেনভার ভালোবাসি বলে। কিন্তু বয়সও অল্প তখন, কতটুকুই-বা বুঝতাম, মনেপ্রাণে চাইছিলাম সবার কাছে নিজেরে স্মার্ট হিশেবে হাজির রাখতে। ডেনভারকে সবাই ক্ষ্যাত বলত। কাজেই আমার হলো মহাবিপদ। ডেনভারের মিউজিক ভালোবাসার অপরাধে ক্ষ্যাত বদনাম নিয়া আমারেও ভুগতে হয়েছে। অথচ জন ডেনভারের মতো দৃঢ় চরিত্রের মানুষ, লব্ধপ্রতিষ্ঠ মানুষ, সম্পন্ন ও সম্পূর্ণ ব্যক্তিমানুষ কমই দেখা যায় সচরাচর। একদমই সিনিক্যাল নয় এমন মানুষ সংসারে বিরল। জন ডেনভার সেই বিরলদের একজন।”

একটা ভালো গান বাঁধতে গেলে কি কি লাগে? একটা ভালো গানে কি কি ইনগ্রেডিয়েন্টস্ থাকা চাই? কি কি থাকলে পরে একটা গান ভালো হয়ে ওঠে? এবং সেইসব জরুরি ইনগ্রেডিয়েন্টস্ জন ডেনভারের গানে আদৌ ছিল কি? থাকলে, ছিল তা কেমন মাত্রায়? ডেইভ বলছেন, “একটা গানে যদি এমনকিছু উপাদান থাকে যা চারপাশের সবকিছু একত্রে বেঁধে রাখে, একত্রে একতোড়ায় এঁটে ওঠায় বেবাককিছু, অথবা গান যদি পারে ব্যাপ্ত ভুবনের নিরর্থকতায় একটা আবছা অর্থের বোধ জাগায়ে তুলতে, এমন গানই বিবেচিত হতে পারে ভালো গান বলে। এই-রকম গানের উদাহরণ দিতে যেয়ে আমি হামেশা কমন কিছু গানের উদাহরণই দিয়া থাকি। নিশ্চয় সেক্ষেত্রে প্রায়শ বব ডিলানের উদাহরণ সবচেয়ে বেশিই দিয়া থাকি। … তা আপনি যেভাবেই বলুন যা-ই করুন, ধরুন আপনি একটা গাছ-বাওয়ার সময় গান গাইছেন বা ঠাণ্ডায় জমে যেয়ে কনকনে শীতের হিমে বা পেটব্যথায় ভুগে একটা গান হয়তো তুলেছেন মুখে, এবং সেই গানটা যদি হয় ‘শেল্টার ফ্রম দ্য স্টর্ম’-এর মতো গান যা বব ডিলানের আশ্চর্য সৃষ্টি, যেখানে আছে “Come in, she said / I’ll give ya shelter from the storm”-এর মতো পঙক্তিমালা, তাহলেই বুঝবেন ভালো গানের মর্ম। সবকিছুই নিমেষে একত্র করে ফেলে, এ এমন গান। এবং এইখানেই মনে হয় যে ডেনভার এই কাজটা তার কায়দায় আরও চমৎকারভাবে করে যেতে পেরেছেন, করে গেছেন অদ্ভুত সুন্দর ও স্মরণীয় সমস্ত পঙক্তি সৃজনের মধ্য দিয়ে একটানা আজীবন। ‘টেইক মি হোম, কান্ট্রিরোডস্’ গানটার কথাই ধরা যাক, এই গানটা রেকর্ডপ্লেয়ারে শোনার সময় আমার বাবা হামেশা কাঁদতেন তার জীবনের শেষদিনগুলোতে। এই কান্না আদৌ অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ, এ এমনই গান যে এখানকার কথাগুলো শ্রোতা তার নিজের কথা মনে করেই শোনে। এই গান আপনি যখনই শুনবেন, মনে হবে যেন কথাগুলো একান্ত আপনারই কথা।”

কান্ট্রিমিউজিকের অ্যারেনায় কেবল নয়, ডেনভারের গান ও সামগ্রিক সংগীতসৃজন সীমানা ছাড়িয়ে ব্যাপ্ত পরিসর নিয়েছে সবসময়। একটা ভালো গান, ভালো সংগীতচর্যা, তা-ই করে থাকে। একটা-কোনো কূপে যেমন আটকে থাকে না পানি, আল্টিমেইটলি নদী-সমুদ্রবাহিত হয়ে মিলায় অনন্তে, মিউজিকের ব্যাপারেও কথা সেইটাই। মিউজিক বহতা পানিধারার মতো, আলোবাতাসের মতো, স্বতশ্চল।

প্রতিবেদক : বিদিতা গোমেজ

… …

Ξ গানপারে ডেনভার Ξ

————————————————————–

অ্যানির গান ও অন্যান্য :: জন্ ডেনভার

ক্রিসম্যাস ট্যুগেদার :: জন ডেনভার 

জন ডেনভার : তবুও শুনাইয়া যাব ফিইরা আসার গান || হাসান শাহরিয়ার

কান্ট্রিরোডস্ পঞ্চাশস্পর্শ

অঞ্জলি লহ মোর সংগীতে : ডেনভার ট্রিবিউট অ্যালবাম

বিদিতা গোমেজ

COMMENTS

error: