‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এই বরষায়’ || সুমনকুমার দাশ

‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এই বরষায়’ || সুমনকুমার দাশ

জননন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ শাড়ির আঁচল দিয়ে বারবার চোখ মুছছেন। অশ্রু সংবরণ করতে পারছেন না। একটু পরপর তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে। চোখে চিকন সোনালি রঙের ফ্রেম। সেই ফ্রেমের নিচে বিন্দু বিন্দু পানি জমছে। চোখ টকটকে লাল। উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন মঞ্চের দিকে। মঞ্চে তাঁরই আরেক ছেলে মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ছেলেবউ ইয়াসমিন হক। তাঁরা যখন ‘হুমায়ূন আহমেদ’ শব্দটা উচ্চারণ করছেন, তখন নীরবে শুধু চোখের পানি ফেলছেন। তাঁর চোখে একরাশ শূন্যতা।

আয়েশা ফয়েজের ডানে-বামে বসা ছিলেন প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদের তিন বোন, সাবেক স্ত্রী গুলতেকিন খান এবং দুই মেয়ে শীলা আহমেদ ও বিপাশা আহমেদ। কারো মুখে শব্দ নেই। শুধু চোখ ছলছল। যেন নিঃশব্দে শ্রাবণ মেঘের দিনের বৃষ্টি চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরছে। বিরামহীন চোখের পানিতে বুক ভাসিয়েছেন মিলনায়তন ভর্তি হাজারো মানুষ। এ দৃশ্য ছিল ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ৬ আগস্ট সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে হুমায়ূন আহমেদ স্মরণসভায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আয়োজনে সকাল ১১টা থেকে দুপুর তিনটা পর্যন্ত টানা চার ঘণ্টা ধরে চলে স্মরণসভা।

সভায় হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের সদস্যরা স্মৃতিচারণ করেন। প্রয়াত লেখকের ভ্রাতৃবধূ ইয়াসমিন হক ‘ভাসুর’ হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের দিনগুলোকে ‘সুইট মেমোরি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “আমি আর জাফর ইকবাল আমেরিকায় একসঙ্গে পিএইডি পড়তাম। আমরা একে অপরকে পছন্দ করতাম। সেখানে বাঙালি শিক্ষার্থী বলতে আমরা দুজনেই মাত্র ছিলাম। আমাদের পড়াকালীন হুমায়ূন আহমেদ একবার আমেরিকা গিয়েছিলেন। তখনও তিনি বিখ্যাত হননি। সেটা সম্ভবত ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাস।”

ইয়াসমিন হক বলেই চলছেন, “জাফর বারবার আমাকে বলছিল, ‘দাদাভাই (হুমায়ূন আহমেদ) আসবেন, তুমি আর আমি দাদাভাইকে বিমানবন্দরে রিসিভ করব।’ জাফর আমার ভালো বন্ধু। তাই তার কথা অনুযায়ী দুজনে মিলে দাদাভাইকে বিমানবন্দরে রিসিভ করতে যাই। তখন তিনি আমার ভাসুর ছিলেন না। যেহেতু তিনি জাফরের দাদাভাই, তাই আমারও দাদাভাই। বিমানবন্দরে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। একের পর এক বিমানের যাত্রীরা নামছেন, কিন্তু দাদাভাইয়ের পাত্তা নেই। যেহেতু তখন মোবাইলফোনের কোনো সুযোগ ছিল না, তাই তাঁর কোনো খবরও নিতে পারিনি। আমরা মনখারাপ করে দুজন ফিরে এলাম।“”

এর পরের ঘটনা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ইয়াসমিন হক বলেন, “আমরা রুমে ঢোকার পরপরই বাসার ল্যান্ডফোনে দাদাভাইয়ের ফোন আসে। সংক্ষেপে দাদাভাই জাফরকে জানালেন, তিনি প্লেন মিস করে পরেরটিতে এসেছেন। এরপর নিজের অবস্থান জানিয়ে সেখানে যেতে বলেন। জাফর আর আমি ছুটে গেলাম। এই ছিল দাদাভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি। ঠিক এ মুহূর্তে দাদাভাইয়ের আমেরিকা থাকাকালীন দিনগুলোর কথা এক এক করে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। একবার একটি কক্ষে ঢোকার আগ-মুহূর্তে দাদাভাই দেখলেন দরজা আপনাআপনিই খুলে যাচ্ছে। আবার বের হওয়ার সময়ও একই অবস্থা। এটি দেখতে পেয়ে দাদাভাই দরজা দিয়ে একবার ঢোকেন আর একবার বের হন। এভাবে বেশ কয়েকবার ঢুকলেন-বেরোলেন। আর বললেন, কী আজব বিষয়!”

গুলতেকিন খানের প্রতি হুমায়ূন আহমেদের প্রগাঢ় ভালোবাসার বিষয়টি উল্লেখ করে ইয়াসমিন বলেন, “আমেরিকা থাকাকালীন একবার দাদাভাইকে নিয়ে একটি দোকানে যাই। তখন দাদাভাই একটি সুন্দর লকেট দেখে বলেন, ‘জানো ইয়াসমিন, এই লকেটটির দাম ৪৯ ডলার। আমার হাতে ৫০ ডলার আছে। আমি এখন এই লকেটটি অনায়াসেই গুলতেকিনের জন্য কিনে ফেলতে পারি।’ আমি বললাম, এটি কিনলে আপনার হাতে তো একডলার ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তখন দাদাভাই বললেন, কিন্তু কিনে দেশে গুলতেকিনের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারলে তো সে একেবারে চমকে যাবে। … এই হলো দাদাভাই। এরপর তো আমার ভাসুর হওয়ার সুবাদে দাদাভাইকে আরও কাছে থেকে দেখার সুযোগ পাই।”

আমেরিকায় হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পরের মুহূর্তের কথা স্মৃতিচারণ করে ইয়াসমিন বলেন, “যখন দাদাভাই মারা যান, ওই রাতেই গুলতেকিনভাবি আমাকে ফোন দেন। তিনি তখন আমেরিকাতেই ছিলেন, কিন্তু অনেক দূরের একটি স্টেটে। ভাবি ফোনে বলেন, ইয়াসমিন আমি কি আসব? আমি তাঁকে বলি, আপনি আসতে আসতে জানাজা শেষ হয়ে যাবে এবং আমরা দেশের উদ্দেশে চলে যাব। তখন ভাবি বললেন, ইয়াসমিন, তুমি আমেরিকায় হুমায়ূনকে স্বাগত জানিয়েছিলে, আবার এই আমেরিকাতেই শেষ বিদায় জানালে।”

ইয়াসমিন হক কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন। মঞ্চের শ্রোতাদের সারিতে থাকা গুলতেকিন অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তাঁর পাশে বসা মেয়ে শীলা আহমেদ ও বিপাশা আহমেদ একজন আরেকজনের হাত ধরে দুঃখ ভাগাভাগির চেষ্টা করেন। তাঁদের গুমট কান্না ছড়িয়ে পড়তে মিলনায়তনের হাজারো শ্রোতাদের মধ্যে। পুরো মিলনায়তনে ঝিম-ধরা পরিবেশ। এরপর মঞ্চে উঠে প্রয়াতের ছোটভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেন। এর আগে শীলা আহমেদ বলেন বাবাকে নিয়ে তাঁর সুখস্মৃতিগুলো। আর শ্রোতাদের সারিতে বসে কাঁদলেন পরিবারের অপর সদস্যরা।

সেদিন হুমায়ূন আহমেদের মেয়ে শীলা আহমেদ তাঁর বাবা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “বাবার কথা কিছু বলতে গেলেই খারাপ লাগে। কান্না লাগে। এরপরও একটা স্মৃতিচারণ করছি। ছোটবেলায় আমি আর বিপাশা খুব দুষ্ট ছিলাম। আমরা খেলা পছন্দ করতাম। পড়াশোনা তেমন করতাম না। একবার এক পরীক্ষার প্রথম সাময়িক পর্বে সব সাবজেক্টে লাল কালি পেলাম। সে-ঘটনায় মা খুব রেগে গেলেন। বাবাকে বকা দিলেন। এরপর বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। ফিরে এসে আমার হাতে একটি কোয়ালিটি চকলেটের বক্স ও একটি চিঠি দিলেন।”

শীলা আহমেদ বলেই চলেছিলেন, “চকলেট পেয়ে আমি তো খুব খুশি। কারণ বড় কোনো উপলক্ষ ছাড়া আমার কোয়ালিটি চকলেটের বক্স আসত না। একটু পরে চিঠি খুললাম। খুলে দেখি এতে বাবা লিখেছেন, মা রে, পরীক্ষায় ভয়াবহ খারাপ ফল করেছ। এর জন্য তোমার মা আমাকে আচ্ছা বকাবকি করেছে। তোমাকে আমার পড়ানোর কথা থাকলেও তা সময়ের অভাবে পারিনি। কিছুদিনের মধ্যে পারব বলেও মনে হচ্ছে না। কারণ আমাকে একটি উপন্যাস লিখতে হবে। আর এ উপন্যাস জঙ্গলে না গিয়ে লেখা সম্ভব হবে না। তাই আমি জঙ্গলে চলে গেলাম। মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। সবসময় মনে রেখো, লেখকের সন্তান হওয়াটা খুব কষ্টের।”

এরপর শীলা বললেন, “বাবার শেষ কথাটা এতই নির্মম তা পরে বুঝতে পারি। লেখকের সন্তান হওয়াটা যে কত কষ্টের তা আমরা পুরোপুরি টের পেয়েছি। কত কষ্ট, কত অভিমান বুকে জমা হয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর সব আবেগ দুমড়ে-মুচড়ে সেই কষ্টটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। শহিদ মিনারে যখন বাবার কফিন নিয়ে আসা হলো, তখন আমরা সব ভাইবোনেরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন দেখলাম কত কত মানুষ বাবার প্রিয় কদমফুল সহ নানাকিছু নিয়ে বাবাকে শেষ দেখা দেখতে এসেছেন। তাঁদের সবাই বাবার কফিনে হাত ছুঁইছেন। হাজার-লক্ষ মানুষের নিখাদ ভালোবাসার এ দৃশ্য দেখে আমাদের বুক গর্বে ভরে ওঠে। সেদিন বুঝলাম লেখকের মেয়ে হওয়াটা অনেক সুখের ও গর্বের। কিন্তু আফসোস, আমাদের সেই অনুভূতিটুকু বাবা আর জেনে যেতে পারলেন না।”

সভায় হুমায়ূন আহমেদের মায়ের উদ্দেশে দেশের আরেক জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, “খালাম্মা, আপনি মোটেই মনখারাপ করবেন না। বাংলাদেশের কতজন মা রয়েছেন, যাঁর প্রত্যেকটি সন্তানই স্ব স্ব ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখেছেন? আপনি আমাদের বিরল মায়েদের একজন এবং আপনার ছেলে বিরল লেখকদের একজন। তিনি নিজেকে পুড়িয়ে গন্ধ বিলিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের জন্য স্বপ্ন রচনা করেছেন। লিখে লিখে আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। লেখনী দিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষকে হাসিয়েছেন-কাঁদিয়েছেন। তিনি এক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ।” কথা বলতে বলতে একসময় আনিসুল হকের গলাও ধরে আসে। চোখ ভিজে যায় উপস্থিত শ্রোতাদের সকলের।

একসময় স্মরণসভা শেষ হয়। মানুষজন ধীরে ধীরে গন্তব্যে রওয়ানা দেয়। স্মরণসভার ফাঁকে ফাঁকে হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় যে-গানগুলো গীত হয়েছিল, সেগুলোর রেশ টেনে শ্রোতারা গুনগুন করে হাঁটছেন। সভা শেষ হওয়ার আধাঘণ্টা পর শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। হুমায়ূনের প্রিয় ‘বৃষ্টির শহর’-এর অতিবিখ্যাত সেই বৃষ্টি। তখনও সভায় আগত বেশকিছু শিক্ষার্থী ও শ্রোতা মিলনায়তন থেকে বের হননি। বৃষ্টি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা মহাউৎসাহে হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে গন্তব্যে রওয়ানা দেন। কেউ-একজন উঁচু গলায় গেয়ে ওঠেন, ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এই বরষায় …’

… …

COMMENTS