কেন আমাদের দিয়া মার্ক্সবাদ হইল না || সুমন রহমান

কেন আমাদের দিয়া মার্ক্সবাদ হইল না || সুমন রহমান

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই মার্ক্সবাদ অধ্যয়নচক্রের কথা মনে পড়ে।

আমাদের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন ইহার উদ্যোক্তা। তুখোড় মার্ক্সীয় জ্ঞান নিয়া ঘুরাঘুরি করেন তিনি। তার ভয়ে আমরা তটস্থ। মার্ক্সবাদ না জানার লজ্জায় জড়োসড়ো।

একদিন তিনি প্রস্তাব করলেন : স্টাডি সার্কল হোক। সবাই মার্ক্সবাদ পড়ি। সকলেই একবাক্যে রাজি।

সংগঠন তৈরি হলো। গঠনতন্ত্র হলো। সেখানে তিনি জুড়ে দিলেন, মার্ক্সবাদ অধ্যয়ন শেষে আমরা বিদ্যমান মার্ক্সবাদী পার্টিগুলোর গঠনতন্ত্র ও রাজনীতিপ্রক্রিয়া বিচার করে দেখব। এর মধ্যে যেটিকে আমাদের পাঠের বিচারে অথেন্টিক মনে হবে, সেটায় যোগদান করতে হবে।

আমরা মিনমিন করে এই ক্লজটা বাদ দিতে বললাম। কিন্তু তিনি অনড়। সেটা যে বাদ দেয়া যাবে না, বা বাদ দিলে নেহাত পাতিবুর্জোয়া ব্যাপার হবে, সেটিও গোটা-তিনেক কোটেশন ঝেড়ে বুঝিয়ে দিলেন।

সেই বন্ধুটি কমিউনিস্ট কর্মীসংঘ নামে একটি দল করতেন। ফলে, আমরা প্রথম থেকেই সন্দেহের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম।

আদ্যিকালে সব পথ নাকি রোমে গিয়ে শেষ হতো। এই পাঠচক্রের পথ শেষমেষ কমিউনিস্ট কর্মীসংঘেই গিয়ে শেষ হবে না তো!

ফলে মার্ক্স পড়বার আগেই প্রাণভয়ে মার্ক্সের ক্রিটিক করা ধরলাম। উদ্দেশ্য, পাঠচক্রের পশ্চাতে কোনো চক্রান্ত থাকলে তাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা। আমাদের সাথে অধুনা বিখ্যাত এক নৃবিজ্ঞানী ছিলেন। তখন তিনি ছাত্র। নৃবিজ্ঞান থেকে মার্ক্সিস্ট প্রত্যক্ষবাদকে চ্যালেঞ্জ করতে আরম্ভ করলেন। ছিলেন আরো একজন প্রথিতযশা নৃবিজ্ঞানী ও ফোকলোরিস্ট, তিনি খালি নিও-মার্ক্সিস্টদের কথা জিগান। এতে আমাদের মার্ক্সবাদী বন্ধু সঙ্গত কারণেই যথেষ্ট গোস্বা হতে শুরু করেন। যেহেতু তার নৃতত্ত্ব আর নিওমার্ক্সিজম নিয়া পড়া তেমন নাই।

প্রচুর বাকবিতণ্ডা হতে লাগল। তার কথা, আগে মার্ক্স পড়ো। পরে অন্য কিছু হবে। আর আমাদের কথা, সব একসাথেই পড়ি। নাকি? আমাদের মনে তো ভয়! মার্ক্স পড়লে যদি মার্ক্সের ফাঁদে পইড়া কমিউনিস্ট কর্মীসংঘে জয়েন করা লাগে!

ফলে আমরা নৃতত্ত্ব আর নিওমার্ক্সিজম দিয়া অথেন্টিক মার্ক্সিজমের সাথে লড়াই চালাতে লাগলাম।

তাও বন্ধুটি হতোদ্যম হন নাই। কিন্তু ‘অ্যান্টি ডুরিং’ পাঠশেষের টানটান আলোচনায় আমাদেরই আরেক দার্শনিক বন্ধু যেদিন পুরোপুরি ঘুমায়ে গেলেন, সেদিন তিনি ক্ষ্যান্ত দিলেন। বুঝলেন, আর যা-ই হোক এসব সুবিধাবাদী মুঝিকদের দিয়ে ‘মার্ক্সবাদ’ হবে না! 🙂 😀

[বাই দ্য ওয়ে, স্টাডি সার্কল শেষ হয়া গেলেও আমাদের সার্কল ভাঙে নাই। এরপর আমরা মার্ক্সবাদ বাদ দিয়া সুবিনয় রায়, দেবব্রত আর পঙ্কজ মল্লিকের রবীন্দ্রসংগীতে মনোনিবেশ করেছিলাম]

… …

COMMENTS