মহাভারতের সভাপর্ব ও কোয়েলোতর্জমার তারিফি রিভিয়্যু

মহাভারতের সভাপর্ব ও কোয়েলোতর্জমার তারিফি রিভিয়্যু

জাতি অনুসারে কেউ শত্রু হয় না, বৃত্তি সমান হলেই শত্রুতা হয়।

না, বাক্যটা আমার ব্যাকপকেট বা বুকপকেট থেকে বেরোয় নাই। কিংবা বাক্যটা আদতে আমারই তো, ‘মহাভারত’ যদি ডিসঔন না করি। ‘ধৃতরাষ্ট্র-শকুনি-দুর্যোধন সংবাদ’ অংশে এইটা পাওয়া যায়, কাশীরাম দাশ বা রাজশেখর বসু দুনোজনেরই তর্জমায়, মহাভারতের সভাপর্বে এইটা অ্যাভেইলেবল। সংলাপটা বাপ-পুত মধ্যকার। যুধিষ্ঠিরের প্রতি যুদ্ধংদেহ দুর্যোধনকে হানাহানিহিংসা থেকে নিবৃত্ত করতে ধৃতরাষ্ট্র পুত্রধনটিরে পাখিপড়ানোর মতো বোঝাচ্ছিলেন, পুত আমার, যুধিষ্ঠিরের যেমন অর্থবল-মিত্রবল আছে তেমনি তোমারও সমান মাত্রায় জিনিশগুলা আছে, কেন হুদা ভাইয়ের বিরুদ্ধে এই বিদ্বেষ? যুধিষ্ঠির তো তোমার বিরুদ্ধে বিদ্বিষ্ট নয়! আদৌ যুধিষ্ঠির তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না। আর তাছাড়া লড়তেই যদি হয় তো ধর্ম মানিয়া নাঢ়াই চালাইতে বাধা কোথায়? কেন তুমি মিছামিছি বিগব্রোর সয়সম্পত্তি হাইজ্যাক করতে চাইছ? অধর্ম করতে যেও না আব্বু, শুধুশুধু ঢোঁশাঢুঁশি ইমিডিয়েইটলি বন্ধ করো! প্রত্যুত্তরে দুর্যোধন কহেন, ফায়শা আলাপ রাখেন তো আব্বাজান! অধর্মের কথা আজাইরা আনবেন না মুখে। এইখানে ধর্মাধর্ম বিচারিবার বেইল নাই। বৃত্তিবিচারে এইটাই ঠিক। আমরা ক্ষত্রিয়। জয়লাভই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম। হোক তা কাতারে কাতার লাশ ফালাইয়া বা বাংলার কবিদিগের ন্যায় চিমটি হিংসাধারায়। এইখানে অমোচনীয় কালিতে কেউ শত্রু কেউ মিত্র নয়। ভাই গুল্লি মারি, জিততে হবে য্যাম্নেই পারি। জাতি অনুসারে কেউ শত্রু হয় না, বৃত্তি সমান হলেই শত্রুতা হয়। কাজেই সমানবৃত্তির লোক আমরা, ভাইবিরাদরি প্রীতিম্যাচ খেলাইবার গ্রাউন্ড নহে এই কুরুক্ষেত্র।

ঘটনা খাল্লাস। অথবা বাকি ইতিহাস টু বি কন্টিন্যুড আন্টিল দ্য প্রেজেন্ট। কহতব্য শুধু এইটাই যে একটা বাংলাভাষান্তরের বই রিভিয়্যু করতে যেয়ে হেন মহাভারত  বর্ষানোর মাহাত্ম্য কোথায়। লিঙ্ক খানিকটা আছে বৈকি। ইন্ডিরেক্ট বা ডিস্ট্যান্টলি ডিরেক্ট একটা কানেকশন তো ঘটানোই যায় দি মাহাভারাতার বিবিধ ঘটনাবলির সনে বেবাক বত্তমান ভুবনের। সেইটা না-ঘটায়েও বইরিভিয়্যুকালে কেন মহাভারত  মনে এল, সংযোগ কোথায় এবং কতটুকু, বলছি, রোসো। প্রথমত, মহাভারতানুসারে লেখালেখিবৃত্তির লোকেরা ভাবাপন্ন শত্রুতায়, ঈর্ষান্বিত, ঈর্ষার সম্পর্কেই অন্বিত তারা। নাথিং এল্স্। অতএব কোনো বইয়ের, হোক তা ভাষান্তরিত বই কিংবা কাব্য-গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধাদির অরিজিন্যাল, রিভিয়্যু কি ঈর্ষাশূন্য সম্ভব? মহাভারতসূত্রানুসারে নেভার। কাজেই, বিয়িং অ্যা রেগ্যুলার রিডার এবং সম্ভাব্য বইক্রেতা আপনারা আলোচক/বইরিভিয়্যুয়ারের বিতং-করা বার্তাকথায় ইনফ্লুয়েন্সড হওয়াটা কাজের কথা না।

তা, ভাঙাগড়ার এই ঝকমারি দুনিয়ায় ঈর্ষা এক মানবিক গুণেরই নাম, যদি তারে কেটেছেঁটে কব্জায় রাখা যায়। একটাকিছু লিখে প্রকাশ করে সমানবৃত্তির সহজনের চক্ষে ঈর্ষাফুল্কি জাগানি — সৃজনশীল কাজে এরচেয়ে বড় পুরস্কার আর হতে পারে কিছু? অনুবাদকেরে দিলখোলা না-হলেও দিলচুপসা তারিফ করতেই হয়। পাওলো কোয়েলো অনুবাদের মূল সমস্যা, — আমরা আংরেজি অনুবাদ দেখে যেইটুকু কোয়েলো অন্তরের অধিগত করি, নিশ্চয় কোয়েলোর মাদার-টাং এখনও খুব-একটা জানি না আমরা বাংলাবাজারীরা, ব্রাজিলের এই লেখক ওইদিককার কোন্-একটা ভাষায় যেন লেখেন বলিয়া আখবারে পড়েছি মনে পড়ে এবং রচকের পেট থেকে এঁটেল-পলি-বেলে-দোআঁশমাটিতে পয়দা হওয়া মাত্র উনার রচনা প্রায় তিন-চারকুড়ি ভাষায় ট্র্যান্সল্যেটেড হয়ে যায়, আংরেজিমিডিয়া ধরেই মুখ্যত দুনিয়াবাণিজ্যে বেস্টসেলার এই রচয়িতা, বাংলাদেশেও উনি পঠিত অনেকটা, বাংলায় আছে তার ম্যাজর বইগুলা — ‘আলকেমিস্ট’, ‘জাহির’ ইত্যাদি বেশকিছু কোয়েলোবইয়ের একাধিক বঙ্গানুবাদ নজরে এসেছে এই ভোঁতামাথা আলোচকের, সেসব অনুবাদ ছাতাফাতা যা-ই হোক-না — বাংলার চেয়েও সহজিয়া আংরেজি সিন্ট্যাক্স, এত সহজ ও স্বচ্ছ ও ঝরঝরে যে কেবল আংরেজি ভোক্যাব্যুল্যারি নির্ভর করিয়া পাওলো কোয়েলো অনুবাদ না-মুমকিন। অবশ্য কোনো অনুবাদই শব্দভাণ্ডার/পরিভাষাভাণ্ডারনির্ভর হওয়া অনভিপ্রেত। যদিও হইতে দেখি প্রায়শ।

উনি — পাওলো কোয়েলো মশাই — ফিকশন্-ননফিকশনের রেখাজোখা প্রায়শই ডিফিউজ্ করে এমন একটা হাবভাবে আগাইয়া নিয়া যান উনার আখ্যানভাগ, তাকলাগানো বললেও কম বলা হয়, টাশ্কি খাওয়া যারে কয়। একবার ‘লাইক্ দ্য ফ্লোয়িং রিভার’ নামের একখানা পাওলোবই শির-কদম তর্জমার শখ হয়েছিল বিধায় হাড়েহাড্ডিতে জেনেছি যে সোজাসাপ্টা ভাষার ভাষান্তর কত কঠিন তথা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য। ফলে, একবারের ওই নাকানিচুবানি খাইবার বাদে, যেখানে যখনই কোয়েলোতর্জমা বাংলায় দেখিতে পাই কুড়াইয়া লহি তাই এবং দৃষ্টিযোগে পড়ি। ঢিসুমঢিসুম অ্যাকশনের এই বাঙ্গালা ফেবুসমাজের সাহিত্যকীর্তিক্ষেত্রে বেশকিছু কোয়েলোরচনা জাকির জাফরান অনুবাদ করে চলেছেন খণ্ডাকারে খেয়াল করছিলাম দুইয়েকটা বাংলা আন্তর্জালিক পত্রিকায় এবং সেগুলো সবিরত প্রকাশ হয়েছে একটা সময় পর্যন্ত। অত্র ভূখণ্ডের বইপড়া, ছাপাছাপি এবং বইয়ের মলাট দর্শনদারি ও টিভিবাইটের মহান ফেব্রুয়ারি মাসে ২০১৭ সনে এসে সেসব খণ্ড গোটা-আস্ত বইয়ের শরীর ধরে বেরোলো।

সুসংবাদই তো, সুসংবাদ না? আলবৎ! সুসমাচার প্রচার করি আরেকটু। প্রথমত, অনুবাদকাজটাতে সেই জিনিশটা আছে বলে মনে হলো, ওই জাদু বা ম্যাজিক বলি আমরা যারে বাংলায়, যা থাকলে টেক্সট হুদা কাঠখোট্টা না থাকিয়া প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এই লেখাটার যে-কয়টা পার্ট ছাপা হয়েছে একাধিক ওয়েবম্যাগে, সেই সব-কয়টাই পড়েছি বলিয়া দাবি করি। নিশ্চয় ইন্ ফিউচার গ্রন্থাকারেও পড়তে পারব তমন্না ছিল দিলের ভিতরে, এমন বই বুকে নিয়ে কোলে করে পড়ারই মতো, একাগ্র মনিটরস্ক্রিনে এর গতরের জেল্লা যতটা চোখে চটক লাগায় অন্তরের ঘুঘুকোমলতা ঠাহর হয় না আদৌ বইরূপা না হলে। অ্যাট লাস্ট বইটাও নয়নে এল।

গ্রন্থাকারে পড়ার সুযোগ সহসা করে উঠতে পারব বলে মনে হচ্ছিল না; অ্যাফোর্ড করার টানাপোড়েন তো রয়েছেই, জেবের ভিতর হ্রস্বকায় রেস্ত থাকায় কিতাবিস্তান/বইদোকান মাড়াই না তা-ও অসত্য নয় বটে, বিশেষত বইপড়ার ঝোঁক ব্যাকবেঞ্চার হিশেবে জিন্দেগি-বন্দেগি তামা করা আমার ন্যায় ব্যক্তিদের থাকে না বা নাই। কিন্তু, ভালো প্রশ্ন, গ্রন্থাকারে ‘ম্যানাস্ক্রিপ্ট ফাউন্ড ইন্ অ্যাক্র্যা’ না-হেরিয়া কি রিভিয়্যু করা যেত না? আরও ঘোড়দৌড়ে যেত বৈকি রিভিয়্যু করা না-পড়ে আদৌ বই। রিভিয়্যুকরণে পড়াপড়ি বরঞ্চ মুসিবতেই ফালাইয়া দ্যায় রিভিয়্যুয়ারেরে। কেমন করে? একটা আলগা পাণ্ডিত্যভরা আরিস্তোক্রাসি ফলানো যায় না, ভালো ক্রিটিকের বাজারমশহুর গেরামভারিক্কি গলা আনয়নে বেগ পোয়াতে হয়, তাছাড়া ভালোজাতের বই পড়ে ঈর্ষা বাড়ে এবং দরবেশপ্রশান্তির ব্যুকরিভিয়্যু পয়দাবার চান্স কমিয়া যায়। একটা লাগসই উপায় আছে অবশ্য বইরিভিয়্যুয়ের; উপায়টা বাংলাদেশের মৌলিক উদ্ভাবন এবং বিশ্বসাহিত্যে এক দিশারী সংযোজন, — বইয়ের ফ্রন্ট এবং ব্যাক মলাটের ভিতরগোঁজা পাঙ্গাশমাছের পেটির ন্যায় চিলতে ফ্ল্যাপে যেটুকু খবরান্তর পাওয়া তার ভিত্তিতে রেসকোর্স জয় করা যায়, রিভিয়্যু চোখ ধাঁধিয়ে দ্যায় খান্দানি রিডারের সামনে একটা গাম্ভীর্যভান ধরে রেখে গেলে আগাগোড়া; আপনি যদি বই পড়ে ফেলেন রিভিয়্যুয়ের আগে, তখন সেই বইজাগা নানা জিনিশ জেঁকে ধরে আপনেরে, জ্যান্ত হতে চায় রিভিয়্যু ক্ষণে ক্ষণে, এবং ঈর্ষার ন্যায় মানবিক ক্যারেক্টারিস্টিক্স লেপ্টে রয় সেই রিভিয়্যুলেখার পরতে পরতে। সেই রিভিয়্যু তখন চারশ শব্দ ছাড়ায়ে ফ্রাইডে-সাপ্লিমেন্টের প্লীহায় ত্রাস ধরায়ে দ্যায়। কিচ্ছুটি করার থাকে না। কার্যক্ষেত্রে রিভিয়্যুটা পাঠকের বা লেখকের বা বেনিয়া পাব্লিশার কোনো তরফেরই বিশেষ প্রোফিটে আসে না, কারণ বিজ্ঞাপন দরকার হয় বইয়ের, বাংলাদেশে বইপ্রোমোশন্যালের অভাবে এই রিভিয়্যু বইবিজ্ঞাপন হিশেবেই ক্রিয়া করে দেখতে পাই, রিভিয়্যুয়াররা এই গোমর জানেন বলেই বোধহয় রিভিয়্যু করতে যেয়ে অ্যাডভার্টই করেন। সন্দেহের অবকাশ নাই, বিজ্ঞাপনে বসতি লক্ষ্মী; কিন্তু বক্ষ্যমাণ রিভিয়্যু, বলার অপেক্ষা রাখে না, লক্ষ্মীছাড়া।

‘ম্যানাস্ক্রিপ্ট ফাউন্ড ইন অ্যাক্রা’ শীর্ষক ইংরেজি কিতাব থেকে ‘আকরায় পাওয়া পাণ্ডুলিপি’ বাংলায়। ই.এম. ফর্স্টারের অ্যাস্পেক্টস্ অফ দি নভেল  বা মিলান কুন্ডেরার দি আর্ট অফ দি নভেল  অনুসারে এইটা আদৌ উপন্যাস কি না, তা বটে এক দশাসই জিজ্ঞাসা। আপনি যদি নিয়মানুশাসিত গল্পোপন্যাসপাঠক না-হন তবে লেবেলনিরপেক্ষ পড়ে যেয়ে এই বইয়ের রসাস্বাদন করবেন নিশ্চয়। এই বই উপন্যাসোপম হলে বেহতর বলবেন আর প্রবন্ধোপম হলে বলবেন আজাইরা, তা তো সুসারের বিবেচনা না। তারপরও বলব, অনেকরকম কবিতার কথা দাশবাবু বলেছিলেন যে-কায়দায়, উপন্যাসে যে-জীবনজিজ্ঞাসা তালাশ করে বেড়ান আপনি এবং হামেশা পান না বা কালেভদ্রে একচিমটা পান, অনূদিত এইখানে যদি তা পেয়ে যান এবং পান প্রোফাউন্ডলি তবে কেন উপন্যাস বলবেন না তারে? এবং যদি নিবন্ধপ্রবন্ধবই হয় এইটা আর আপনি এখানে পেয়ে যান মহাজীবনের মধু, উপন্যাস দিয়া আমড়াপ্রিকল বানাইবেন তবে?

একটা সওয়াল পুঁছ করবার ইজাজত চাইব আপনাদেরে এবার। খানকোম্প্যানির মিয়াঁউ-মিয়াঁউ অ্যাকাডেমিঅ্যাওয়ার্ডেড গুচ্ছের লেখক বাংলায়, হালে এরা সবাই শিফট করেছে অবশ্য সিরাজী সিলসিলায়, তাদের হাজার-হাজার আরব্য রজনীর উপন্যাসগালগপ্পো, বণিক প্রকাশকঘরের রঙবাহারী বিস্তর কবিতাবই নিবন্ধবই প্রবন্ধবই গবেষণাবই, এইগুলা গা-মাথা গুলাইয়া তোলে না আপনার? আমার তো তোলে, মোস্টলি, বিলিভ মি! কিন্তু নোখগণ্য হলেও দুইয়েকটা পার্থক্যসূচনাকারী কিতাব বছরের এমাথা-ওমাথা বাইরায় নিশ্চয়, সেই খোঁজ আপনারা রাখবেন না? খালি ইয়ারবখশি নিয়া করিয়া যাবেন গোলার্ধগুলজার? “আমার বন্ধুর বইবেরোনো একুশে ফেব্রুয়ারি / আমি কি না-কিনে পারি?” নিশ্চয় কিনবেন; বন্ধু ছাড়া বাংলাদেশের বইবিপণীবিতানে লেখকগণ্য বড়সড় কেউ আছে নাকি? কিন্তু কোয়েলোর যে-কিতাবখানা জাকির জাফরান বাংলায় হাজির করেছেন, এই কিতাব ফেব্রুয়ারিতে খরিদ করে ফেব্রুয়ারিতেই ফিক্কা মারা চিরতরে বিস্মরণের অতল গহ্বরে — এমন মাল নয়। রেহেলে চাপায়ে নিত্য-আহ্নিকে তেলাওয়াতের জোখা বই, বোস্তনি পরায়ে তমিজের সাথে হেফাজতে রাখবার মতো বই, কিংবা প্রেমাস্পদের ঠোঁটে পেশ্তাবাদাম চুম্বনকালে তার শ্বাসঘ্রাণ গ্রহণের ন্যায় নিরুপম অনির্বচনীয় কতিপয় বই যে এই দুনিয়ায় বিরাজে — সেই লিস্টিতে ‘আকরায় পাওয়া পাণ্ডুলিপি’ রিসেন্ট সংযোজন ধরিয়া আপনি বইখানা কালেকশনের নিয়তে নেড়েচেড়ে দেখতে পারেন, ফল পাইবেন হাতেনাতে।

এরপরও উপন্যাসোন্মাদ যদি কেউ থাকেন তো গ্যুগল্ করে দেখতে পারেন অত্র বই বিষয়ে; দেখবেন যে এইটা ফ্যাক্ট নয়, ফিকশনই। বিসমিল্লার উইকিপৃষ্ঠাতেই বলবে দেখবেন যে এটি একটি নভেল, ভুবনজনপ্রিয় পাওলো কোয়েলো এর রচয়িতা, ২০১২ সনে এটি পর্তুগিজে ছেপে বেরোয় এবং যথাপূর্ব কোয়েলোনভেলগুলোর ন্যায় বেস্টসেলার হয়। যেন অনেকটাই জিব্র্যানের ‘দ্য প্রোফেট’-এর আদলে এর আঙ্গিক; বা, খালি জিব্র্যানের প্রোফেটের কথা বলি কেন, এই ধাঁচের আরও কিছু বই বাংলাভাষায় পাঠকাভিজ্ঞতায় এর আগে এসেছে; একসময়ের অবধুত বা যাযাবরের বই কিংবা রামায়ণ-মহাভারতের সারানুবাদ, বাইবেল অনুবাদ, ও অন্যান্য স্ক্রিপ্চারগুলোর সারাংশ অনুবাদ, ফ্রেইডরিখ নিৎশের ‘কহেন যেমন জরথুস্ত্রা’ ইত্যাদি অনুবাদে এহেন টোন্যাল এফেক্ট পাওয়া যায়; প্রেম, প্রতারণা, মানুষরত্ন, লড়াই, নিঃসঙ্গতা, আত্মা, সাফল্য ও নিষ্ফলতা, বাস্তু ও বস্তু, সৌহার্দ্য, যৌনতা, মরমিয়ানা প্রভৃতি বিষয়ক দুর্দান্ত অভিজ্ঞানপুঞ্জ এই বইয়ের উপজীব্য। অভিনব প্রকরণের এই স্নিগ্ধ পঠনোপকরণটি কবি জাকির জাফরান অনুবাদ করেছেন কবিতার-তুল্য-গতিশীলা বাংলায়। যেমনটা থাকে কোয়েলোনভেলগুলোতে, একেবারেই নিরাভরণ ভঙ্গিতে কথাবয়ন এবং নিরলঙ্কার বাকস্পন্দী মিস্টিক ইম্প্রেশন, বঙ্গানুবাদনে সেই টিউন বজায় থেকেছে আগাগোড়া। আখ্যানধর্মী নয় এ-বই, নিমআখ্যান বা ননফিকশন ধারায় এ এক উপভোগ্য গদ্যকাজ; বলা বাহুল্য, ভাষান্তরকালে টেক্সটের না-আখ্যানগুণ সুচারু ধরে রাখা হয়েছে গোটা কাজটাতে; অনুবাদপিপাসু বাংলা মুলুকের পাঠকেরা কাজটার বিলক্ষণ সমাদর করবেন।

ব্র্যাজিলিয়্যান লেখক কোয়েলোর এই বইটির ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয় একহাজার বছর আগে জেরুজালেমের অবরুদ্ধ কোনো নগরপ্রাচীর ঘেঁষে। জেরুজালেমের দেহাতি জনতা, নারী-পুরুষ-শিশু সবাই, নগরপ্রাচীরকোণে একজায়গায় হন্তদন্ত অসহায় ভিড় জমিয়েছে। সেই ভিড়ের মাঝখানে এক প্রাজ্ঞ বুজুর্গ, ‘কপ্ট’ সম্বোধনে যিনি সবার নিকট সম্মানীয়, অনর্গল লোকেদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে কথা বলে চলেছেন। এই প্রায় সার্মোনের ঢঙে কথাবলার মধ্য দিয়ে ন্যারেশন আগায়েছে গোটা বইয়ের। লোকেরা জানতে চাইছে ডেইলি লাইফের বিবিধ সঙ্কট-সুরাহা বিষয়ে এবং উত্তর দিয়া যাইছেন কপ্ট। লোকেদের জ্ঞাতব্য বিষয়ের তালিকায় রয়েছে ‘ভয়’, ‘শত্রু’, ‘পরাজয়’, ‘যুদ্ধজঙ্গ’, ‘রূপান্তর’-‘পরিবর্তন’, ‘বিশ্বস্ততা’ আর ‘নীরবতা’, ফাইন্যালি তারা জানতে চায় ‘সৌন্দর্য’, ‘সেক্স’, ‘কৌলীন্য’-‘আভিজাত্য’ প্রভৃতি বিষয়াদি নিয়া। কা’লিল্ জিব্র্যানের ‘দি প্রোফেট’-এ যেমন আলতামিরা গুহাসংলগ্ন বুজুর্গের কাছে লোকেরা নানা বিষয়ে জিগ্যেশ করে এবং জেনে একপ্রকার চরিতার্থবোধে ভরে ওঠে ভেতর থেকে, এখানেও তা-ই; বিবদমান ধর্মযোদ্ধাদের দখলদারিতার মাঝখানে দলিত জনসাধারণ বুজুর্গের কাছে ‘একমুহূর্তের ভিক্ষা মাগে’ যেন, তৎসঙ্গে এই কথাবাহনের পাঠকেরাও অলক্ষে-অজান্তে যেন ‘গলিত স্থবির ব্যাঙ’ দৈনন্দিনতার এই জিন্দেগিতে স্যালভ্যাশন চায়। পায় কি? পাওয়া যায় কি? বিফলে মূল্য ফেরৎ, বইটা হাতে নিয়া পাঁচ-সাতপাতা আগুয়ান হয়ে দেখুন, অন্তর তব বিকশিত হবে অন্তরতম কোনো উদ্ভাসনের দিদার লভিয়া। চান্স আছে বেদিশা এই জিন্দেগানির কয়েকটি দিশা পাইবেন এই বই পড়ে। এই বই পড়ে আপনি জানতে পারবেন … দাঁড়ান, ধীরে, বলছি।

কিন্তু কোনোই খামতি নাই এই অনুবাদে, তা তো হবার নয়। দেড়শতাধিক পৃষ্ঠার একটা আখ্যানভাগ অনুবাদে একেক পাঠকের বিবেচনায় একেকটা খামতি ডিটেক্টেড হবে, এইটা স্বাভাবিক। এর ফলে এই বইয়ের অনন্যসাধারণতা খারিজ হয়ে যায় না। আংরেজি অনুবাদে দেখা যায় পাওলো কোয়েলো বইয়ের বর্ণনাভাগ কবিতারাহসিক রাখবার খাতিরে (আন্দাজ করছি) সেন্টেন্স অপূর্ণ রাখছেন বা ভার্ব ইমপ্লায়েড রেখে যাচ্ছেন; প্রোফেটিক টোন আনয়নে সেন্টেন্সের ইম্পারেটিভ ম্যুড প্রচুরভাবে অ্যাপ্লাই করা, বা আংরেজির পদনির্দেশকগুলো প্রয়োগের স্বাভাবিক স্ফূর্ত ফর্ম্যাট — বাংলায় এইগুলো যথাযোগ্য অনুসরণ করতে যেয়ে কোথাও-কোথাও কখনোসখনো রিডিঙফ্লো তথা বাক্যিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে। এই জিনিশটার ইংরেজি-বাংলা পাশাপাশি রেখে এক্সাম্পল্ বর্তনে উঠাইতে পারলে একটু উপকার হয়তো হতো, সম্ভব হচ্ছে না আপাতত বৈঠকে। এছাড়া ভাষান্তর স্বতশ্চল, সুন্দর, স্বচ্ছ, অবলীল, অন্তরমুখর।

‘ম্যানাস্ক্রিপ্ট ফাউন্ড ইন্ অ্যাক্রা’ — পাওলো কোয়েলো প্রণীত অনবদ্য গদ্যকাজের আরেকটি নিদর্শন — বাংলায় একই শীর্ষনামেরে ‘আকরায় পাওয়া পাণ্ডুলিপি’ হিশেবে এই গোটা বইটারই স্বচ্ছতোয়া ভাষাবুনুনি দিয়েছেন কবি জাকির জাফরান; — সেই বইয়েরই কিয়দংশ আঁজলায় তুলে তুলে এনে একচ্যাপ্টারে এইখানে দেখানো যাক বইয়ের অন্তর্গত নমুনাঝলক। অনুরূপে এই বইয়ের ভিতরে একের-পর-এক প্রসঙ্গ ধরে — প্রেম বিষয়ে, একাকিতা বিষয়ে, বন্ধুতা বিষয়ে, বিয়াশাদি বিষয়ে, সন্তানসন্ততি বিষয়ে, পরিবার ও স্বজন-দুর্জন বিষয়ে, যুদ্ধ ও যন্ত্রণা বিষয়ে, লড়াই ও পলায়ন বিষয়ে, নিঃসঙ্গতা বিষয়ে, যৌনতা ও জৈবনিকতা বিষয়ে — একেকটা দার্শনিক ধ্যানসৌন্দর্য উপহার দেয়া হয়েছে টেক্সটগুচ্ছ জুড়ে; এর বাংলা অনুবাদের টেক্সটগুচ্ছ কোয়েলোপ্রোজস্থ সৌন্দর্যের সেই বিস্ময় ঠিকঠাক পাঠকবোধে সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছে কি না তা বাংলায় এর খানিকটা হাতে নিয়া অনুধাবন করা যাবে হয়তো। ‘চৈতন্য প্রকাশনী’ থেকে ২০১৭ বইমেলায় এই ফিকশন্যাল্ ননফিকশন্ অথবা, ভাইস্ ভ্যার্সা, ননফিকশনধর্মী ফিকশনের ম্যাজিকপালকগুলো ছড়িয়েছে পাঠকের পরিব্যপ্ত চরাচরে।

‘ম্যানাস্ক্রিপ্ট ফাউন্ড ইন্ অ্যাক্রা’, জাকির জাফরান অনূদিত কোয়েলোম্যাজিক, বাংলাদেশে একুশে বইমেলায় ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়েছে, এই তথ্য অলরেডি বিজ্ঞাপিত। চলুন দেখা যাক, নিম্নস্থ অনুচ্ছেদগোছায়, জাফরানকৃত কোয়েলোতর্জমার চুম্বকাংশ :

দুটি দেহ যদি কেবলই মিলিত হয়, এটা যৌনতা নয়। এটা শুধুই আমোদ। যৌনতা ভোগসুখের অতীত।যৌনতায় প্রশান্তি দুশ্চিন্তা হাত ধরাধরি করে চলে, যেমন ব্যথা আনন্দ এবং লজ্জা সাহস একজন মানুষের শেষ সীমা পর্যন্ত পাশাপাশি থাকে।ধরনের পরষ্পরবিরোধী অবস্থা কীভাবে একত্রে মিলেমিশে থাকে? একটিমাত্র উপায়ে : নিজেকে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।যদি একজন প্রেমিক সম্পূর্ণরূপে নিজেকে নিবেদন করে, তখন অন্যজনও ঠিক একই কাজই করবে, কারণ অস্বস্তি ঔৎসুক্যে পরিণত হবে, এবং কৌতূহল আমাদেরকে সেসমস্ত জিনিশ আবিষ্কারের দিকে নিয়ে যায় যেগুলো আমরা আমাদের সম্পর্কে জানতাম না।

#
নিঃসঙ্গতা মানে প্রেমের অনুপস্থিতি নয়, বরং এর পরিপূরক।নিঃসঙ্গতা মানে সঙ্গের অনুপস্থিতি নয়, বরং এমন মুহূর্ত যখন আমাদের আত্মা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে জীবনের করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।সুতরাং আশীর্বাদপুষ্ট তারাই যারা একাকিত্বকে ভয় পায় না, যারা আপন সঙ্গী নিয়ে ভীত নয়, যারা সর্বদা কিছুএকটা করার জন্য মুখিয়ে থাকে না, এমনকি কোনও বিনোদন বা কিছু মুল্যায়ন করার জন্যও নয়।তুমি যদি কখনও একা নাহও, নিজেকে জানতে পারবে না।আর নিজেকে যদি জানতে নাপারো, তুমি শূন্যতাকে ভয় পেতে শুরু করবে।

#
একরূপতায় সৌন্দর্য থাকে না, থাকে ভিন্নতায়। লম্বা গ্রীবা ছাড়া কে একটি জিরাফকে কল্পনা করতে পারে, কিংবা মেরুদণ্ড ছাড়া একটি ক্যাকটাস? পর্বতচূড়ার অসমতাই একে চিত্তাকর্ষক করে তোলে। আমরা যদি এগুলোকে একই রকম করতে চেষ্টা করি, তাহলে এগুলো আর আমাদের মন কাড়বে না।অপূর্ণ জিনিসই আমাদেরকে অবাক আকর্ষণ করে।

#
আমরা এটা ভাবতে অভ্যস্ত যে আমরা যা দিই প্রতিদানে সেরকম কিছুই গ্রহণ করি। কিন্তু যেসব মানুষ ভালোবাসা পাওয়ার আশায় ভালোবাসে, তারা তাদের সময়ের অপচয় করছে।প্রেম বিশ্বাসের বিষয়, বিনিময়ের নয়।মতানৈক্য প্রেমকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। দ্বন্দ্ব হলো সেই শক্তি যা প্রেমকে আমাদের পাশে রাখে।প্রেম হলো একটি শব্দ মাত্র, যতক্ষণ না আমরা এটাকে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাদেরকে অধিকার করে নিতে দেই।প্রেম কেবলি একটি শব্দ, যতক্ষণ না কেউ এসে একে অর্থবহ করে তোলে।হাল ছেড়ে দিও না। মনে রেখো, চাবির ঝুটার সর্বশেষ চাবিটাই সবসময় দরোজা খোলে।

এক কথক ছাড়া আর-যারা আছেন, কোনোপ্রকার চরিত্রচিত্রণ ব্যতিরেকে ক্যারেক্টারগুলো মূর্ত দুই-তিনশব্দে, সবার চেহারা একটানে এইখানেই দেখানো সম্ভব। কয়েকজনের মধ্যে যেমন কথকের প্রতিবেশী ইয়াকুব আছেন, যিনি ‘পরাজয়’ সম্পর্কে কপ্টকে কিছু বলতে অনুরোধ করেন। মজার ব্যাপার হলো, ইয়াকুবের পরিচয় হিশেবে কথক ওইটুকু ‘আমার প্রতিবেশী ইয়াকুব’ বলেই চিনিয়ে দেন আমাদেরে এবং ইয়াকুবের চেহারা-বয়স-অবস্থান আমরা যার-যার মতো কল্পনা করে নিতে পারি। ঠিক একইভাবে আছে ‘একজন বণিক’, যে ‘একজন পরাজিতের বর্ণনা’ দিতে অনুরোধ জানায়। আছে ‘এক তরুণী’ নিঃসঙ্গতা সম্পর্কিত প্রশ্ন নিয়ে, ‘এক বালক’ আছে যে ‘অপদার্থ’ অপবাদ বিষয়ে জিগায়, আছে ‘আলমিরা নামক এক মহিলা’ যার জিজ্ঞাসা ক্রুসেডার এবং পরিবর্তন নিয়ে, এমনিভাবে আছে ‘কেউ-একজন’ তার ‘সৌন্দর্য’ সম্পর্কে একটু শোনার অভিপ্রায় নিয়ে, ‘এক তরুণ’ আছে তার দিকশূন্য পরিস্থিতিতে দিশা জানবার আগ্রহ নিয়ে, এমন অনেক তরুণ-যুবা-নারী-বৃদ্ধ-প্রৌঢ়-প্রাজ্ঞ-বুদ্ধিবিভ্রান্ত চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে একজন কথক ঘিরে। এইটুকু সংক্ষেপে বইয়ের ভিতরকার খোঁজখবর।

গুটায়ে ফেলা যাক ক্রমশ কথাজাল। গোটা বইয়ের ভিতর সবচেয়ে পীড়াদায়ক ব্যাপার কোনটা? বানানগত ভ্রান্তি কিংবা প্যারাগ্র্যাফিঙের অপরিচ্ছন্নতা এইসব অনুক্ত থাক; কেননা, বানানচারুতা বা পাতাবিন্যাস এইগুলোর অনবধানতা আজকাল ধর্তব্য নয় শুনতে পাই লেখকমহলে। এদেশের প্রকাশকদের কাছে এইসব ব্যাপারে সেন্স আশা করা পাঁচশ বছর পরে হয়তো যাবে। এরপরও আমি নিঃসন্দিগ্ধ নই। কিন্তু অত্র বইটা বলা যায় মোটামুটি যত্নছাপানো। তবু পীড়াদায়ক অনেক ব্যাপার সূক্ষ্মদেহে বিরাজিছে, এবং স্থূলদেহে অ্যাট-লিস্ট একটা পীড়ার উল্লেখ করতে হবে। সেইটা আমন্ত্রিত ভূমিকাকারের আশ্চর্য কারবার। কেমন ব্যাপারটা? প্রথমত, ভূমিকাটার লেখক কি অনুবাদক নিজেই? পদবী বাদে দুইজনেরেই সমনামী দেখা যাচ্ছে। একজনের টাইটেল জাফরান, আরেকজন আছেন ভূমিকায় তালুকদার টাইটেলে। লেখক যদি হন অনুবাদক স্বয়ং, তাইলে ঠিক আছে। এমনিতে একটা বইয়ের প্রবেশপথে তোরণ হিশেবে কাজ করে একটি প্রিফেস বা ভূমিকা, তবে সেই হোস্ট অবশ্যই হবেন লেখক স্বয়ং। অবশ্যই আমন্ত্রিত ভূমিকালেখকের শরণাপন্ন হবেন লেখক, হতে পারেন, প্রয়োজনে। এবং জনপরিমণ্ডলে সেই ভূমিকাপ্রণেতা পরিচিত হোন বা অপরিচিত, কিছু যায়-আসে না, হতে হবে থিম্যাটিক কন্সার্নড এবং রেস্পোন্সিবল অবশ্যই। ঠিক এইখানেই অত্র বইয়ের (আন্দাজ করছি আমন্ত্রিত) ভূমিকাটি বিরক্তিকর। অনুবাদকের কি কনফিডেন্সজনিত ঘাটতি ছিল যে এহেন ভূমিকার নামে একটা আখাম্বা সার্টিফিকেট গলায় ঝুলাইলেন? অনুবাদকের ‘পক্ষ থেকে’ আমাদেরে ‘এই গ্রন্থে অবগাহনের আনন্দযজ্ঞে’ ‘আমন্ত্রণ’ জানাতে এমন লোকনিয়োগের দরকার ছিল কি? ইনভিটেশন জানালে লেখক-অনুবাদক নিজেই জানাবেন। হয়ে গেছে এইটা আননেসেসারি সনদ অ্যাবাউট দি অনুবাদক। হতে পারত ‘মুখবন্ধ ও সম্ভাষণ’ অংশে কোয়েলো যেভাবে ম্যানাস্ক্রিপ্ট হস্তগত হওয়ার ঐতিহাসিকতা জানিয়েছেন, সেইটা ফিকশন-ননফিকশনের আলোআঁধারি ঘিরে যে-এক কুহক তৈয়ার করেছে সেই ল্যুপ-হোল্ নিয়া আলাপ হতে পারত বইটার জন্য এবং পাঠকের জন্য সম্পূরক। হয় নাই। হয়েছে রেটোরিকের নায়্যিভ প্রকাশ। হয়েছে “অনুবাদ তো মৌলিক সৃষ্টি নয়। কিন্তু জাকির জাফরানের এই গ্রন্থটিতে আমি মৌলিকত্বের সন্ধান পাই। তিনি অনুবাদের জন্য যে বইটি বেছে নিয়েছেন, এই বেছে নেওয়াটি মৌলিক।” হতভম্বচিহ্নটি নিজ দায়িত্বে বসায়ে নেব আমরা। আরও আছে। এই “পৃথিবীতে পাওলো কোয়েলহোই” নাকি “একমাত্র লেখক” যিনি “নেতি থেকে ইতি-তে পৌঁছানোকেই সাহিত্যের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছেন।” অবাক হবেন না, কারণ ধরণী বিপুলা হলেও অত বিপুলা নয় যে একজন ভূমিকালিখিয়ে এমন দুইচাইরপাত্তি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। আকুল না-হয়েও ভদ্রস্থ আবেদন একটা রাখতেই পারি আমরা অনুবাদকের দরবারে যে নেক্সট এডিশনে এইধারা হাবাগোবা ব্যাপার ছেঁটে ঝেঁটিয়ে বইটাকে আরও সুগ্রাহ্য করবার প্রয়াস নেবেন।

বইয়ের অনুবাদ কোন বা কার ইংরেজি ভার্শন অবলম্বনে করা হয়েছে, এই তথ্যটুকু অনুবাদকের জবানে বা প্রিন্টার্সলাইনে জ্ঞাপন জরুরি ছিল। অনুবাদের স্বত্ব বঙ্গানুবাদক সংরক্ষণ করেছেন দেখা যাচ্ছে প্রিন্টার্সলাইনে, কেবল মূলবাদক তথা পাওলো কোয়েলোর কাছ থেকে বা আংরেজি অনুবাদবই যেইটা বাংলাকালে অনুসৃত হয়েছে সেইটার পাব্লিশার বা ট্র্যান্সল্যাটর কোনো পক্ষের কাছ থেকে বাংলায় বাণিজ্যিক প্রকাশের অনুমতি গৃহীত হয়েছে কি না তা জানা যাচ্ছে না। মামলামোকদ্দমা হলে পরে কেম্নে কি করতে হয় তা নিশ্চয় পাব্লিশার সামলাবেন। হোকগে যা হয়।

এইবার কাভারের ব্যাপারটা আলাপে তুলি। ইংরেজি অনুবাদে মার্গারিট জুল কস্টার একই বই একই প্রচ্ছদে মার্কেটে আছে, ফার্স্ট অ্যামেরিক্যান এডিশন ইন ২০১৩, যেইটার জ্যাকেট ডিজাইন বাই লিন্ডা হুয়াং। এইখানে বাংলায় একই কাভারের শিল্পীর নাম দেখা যাচ্ছে ভিন্ন। অবিকল প্রোক্ত ইংরেজি এডিশনের প্রচ্ছদ শুধু বাংলায় লেটারিং ব্যবহার করে শিরোনাম সেঁটে অবলীলায় ক্লেইম করা হচ্ছে এর শিল্পী শিবু কুমার শীল! অনুবাদ হলো কি শিল্পীনামটাও? সমবেত অট্টহাস্য। সম্প্রতি স্মাগল্ড শব্দটা আমরা আর উচ্চারণ করি না, আমরা এখন গ্যুগল্ড শিল্পসাহিত্য করি। ইদানীং বাংলা পাব্লিশিং অ্যারেনায় কাতারে কাতার বেশুমার বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পে এই কাণ্ড ঘটতে দেখা যায়।

এই বইয়ের শুরুতে কথকের মুখে একটা বাক্য আমাদেরে সেই মহাভারতেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়; কথক বলছেন, “এখন আমি যেহেতু জীবনের শেষ প্রান্তে, পৃথিবীর বুকে চলতে গিয়ে আমি যা-কিছু শিখেছি আমি তাদের জন্য সেসব রেখে যাচ্ছি যারা আমার পরে আসবে। তারা যেন তার সদ্ব্যবহার করে।” মহাভারতে আছে, “কয়েকজন কবি এই ইতিহাস পূর্বে বলে গেছেন, এখন অপর কবিরা বলছেন, আবার ভবিষ্যতে অন্য কবিরাও বলবেন।” অদ্ভুত যোগাযোগ না? এই যোগাযোগগুলো, অন্তর্গত এই সংযোগগুলোই, জীবনের প্রবহমানতা প্রকাশ করে।

লেখা : জাহেদ আহমদ

… …

গানপার
আগের পোষ্ট

COMMENTS

error: