বাইশে শ্রাবণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ দিবস। এমন মৃত্যুগন্ধি দিনকেও আমরা উৎসবের দিন বানিয়ে নিয়েছি। ঐ দিন আমরা রবীন্দ্রকর্মের সাথে একাত্মতা পোষণ করে নাচি, গাই, নাটক করি, ছবি দেখি। কিন্তু কবির মৃত্যুদিনের আড়ালে যে আরও মৃত্যু বা আরও বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো চাপা পড়ে যায় তার খোঁজ রাখি ক’জন? তেমন একটি সত্য গল্প বলেছেন চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন। তিনি বলেছেন—
গঙ্গার ধারে এই নিমতলা ঘাটটি ক’দিন ধরেই সরকারি নিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে যাতে কবির (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) দেহের সৎকার সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। পুলিশের কর্ডন গেটের সামনে। বাধ্য হয়েই দূরে দাঁড়ালাম। আমার মতো আরও অনেকে কোনও উপায়ান্তর না-দেখে দাঁড়িয়ে রইলো দূরে। একটু তফাতে। কিন্তু সেই পুলিশকর্ডনের ভেতর একটি লম্বা সুদর্শন যুবককে দেখে আমি একটু অবাকই হলাম। কতই বা বয়স হবে পঁচিশ-ছাব্বিশ। সাদা একটা ধুতি তাঁর পরনে আর গায়ে একটা কুর্তা। বিধ্বস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কর্ডনের ভেতরে। সেই যুবকের দু’টি হাতের ওপর সাদা কাপড়ে মোড়া একটি মৃত শিশু, যাকে শ্মশানে দাহ করতে নেমেছে ওই যুবকটি, নিশ্চয় সে-ই শিশুটির বাবা। কিন্তু এখানে এসে নিষ্ঠুর পারিপার্শ্বিক অবস্থায় সে-যুবকটি দ্বিধাগ্রস্ত। ও অন্য কোনও শ্মশানে গেল না কেন! ভাবলাম আমি। যুবকটি একাই এসেছে মনে হলো। হয়তো কোনও ব্যাপার আছে যে, এই নিমতলা ঘাটেই তার শিশুটিকে দাহ করতে হবে। হয়তো মনের ভেতর তেমন কোনও ইচ্ছে, যুবকটির কোনও বিশেষ অভিমান কাজ করছে। হঠাৎই ভিড়ের ঢেউ। সব দিক দিয়ে। কাতারে কাতারে মানুষ শ্মশানঘাট অতিক্রম করতে চলেছে। অসংখ্য মানুষ ছুটে আসছে শ্মশানের দিকে। পুলিশের সব রকম রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল জনতার মিছিলে। চারিদিকে বিশৃঙ্খলা। ভিড়ের চাপে মানুষের মৃত্যু! কোনও রকম বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে! কিন্তু ঐ মৃত শিশুটি! শিশুটি হারিয়ে গিয়েছে, ভিড়ের চাপে মৃত শিশুটি পদপিষ্ট হয়েছে! ওই যুবকটি কী একমাত্র সন্তানের পিতা! হয়তো ‘হ্যাঁ’ হয়তো বা ‘না’। (তৃতীয় ভুবন, মৃণাল সেন)
এই ঘটনা জানার পর, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিনে যারা নানা উৎসব করে তাদের সবাইকে আমার ঐ শিশুর খুনী মনে হয়। মনে হয় আমিও সেই খুনীদের একজন। আপনিও কি নন?
- চা-শ্রমিকের দেশে ফেরার বাকি কাহিনি || ইলিয়াস কমল - May 21, 2026
- একজন নির্মাতার প্রথম ছবির জার্নি || ইলিয়াস কমল - May 1, 2026
- কালচার কোন পথে || ইলিয়াস কমল - April 16, 2026

COMMENTS