বাঁশিছিদ্রে বেদনাবাতাস ও বারী সিদ্দিকীর বিদায়সানাই

বাঁশিছিদ্রে বেদনাবাতাস ও বারী সিদ্দিকীর বিদায়সানাই

দৃশ্যের অভিঘাতে নাকি শব্দের, তা আজ আর স্পষ্ট গলায় বলতে পারব না। মাখামাখি হয়ে গেছে সেই দৃশ্য ও শব্দপুঞ্জ। অবশ্য বরাবরই তা-ই, দৃশ্য ও শব্দ যদি ঠিকঠাক কিমিয়াটা পায় তাইলে একদম ‘জনমভরা মাখামাখি’ বিরাজিতে থাকে স্মৃতিতে আমাদের। শব্দের গতি সেকেন্ডে কত, অথবা আলোর গতি, স্পষ্ট গলায় বিজ্ঞান এই হিসাবটা আমাদেরে দ্যায়। কিন্তু সংগীতে, সাহিত্যে, শিল্পে এই জিনিশটা মাখামাখি চিরকাল। শব্দ ও আলো/দৃশ্য জুধা করা যায় না একটা-কোনো সুসংবদ্ধ সংগীত অথবা সাহিত্য থেকে। এবং বিশেষভাবেই মিউজিক শেষমেশ ম্যাজিক, সেল্ফ-এক্সপ্ল্যানেটোরি কিংবা ব্যাখ্যাতীত। সংগীতে বিশেষত শব্দ-অশব্দ দৃশ্য-অদৃশ্য সমস্তকিছু মিলেমিশে যে-জিনিশটা আদল পায় তা বাক্যখর্চায় নয় বরঞ্চ উপলব্ধি-অনুভবসাপেক্ষ।

বলছিলাম, বারী সিদ্দিকীর (Bari Siddiqui) সঙ্গে আমাদের ইন্ট্রোটা ‘শ্রাবণমেঘের দিন’ ছায়াছবির মাধ্যমেই হয়েছিল। সন্দেহ নাই, আমার মতো গড়-রুচির চেয়েও নিচু দরোজার সংগীতদর্শকশ্রোতার সঙ্গে বারী সিদ্দিকীর পয়লা সাক্ষাৎ হয়েছিল ওই সিনেমায় তার প্লেব্যাকের সুবাদে। সেই সিনেমাটা বানিয়েছিলেন সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদ। গল্পঘটনার ঐক্য ছাড়াও সংগীতের সুসামঞ্জস্য ম্যুভিটাকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছিল। লোকে প্রেক্ষাগৃহে গেছিল দলে দলে, ব্যাপক নিয়েছিল এর গানগুলো গলায় তুলে বাংলার ভিলেজের এবং শহরের অধিবাসীরা প্রায় একসঙ্গে, এবং আদ্বিজচণ্ডাল বাংলা হাতে পেয়েছিল বারী সিদ্দিকী শীর্ষক এক অনন্য ঘটনা।

‘শ্রাবণমেঘের দিন’ সিনেমায় শেষদিককার দৃশ্য। প্রণয়পীড়িত নায়িকা বিষপান করার অব্যবহিত পরে নৌকাযোগে নায়ক দূরবর্তী গঞ্জে নিয়া যাচ্ছে বেহুলা বাঁচাইবার আশা বুকে লয়ে। ব্যাকগ্রাউন্ডে টেনশনের তীব্রনিনাদী সাউন্ড। মাঝনদীতে যেয়ে আচমকা পুরো পর্দা জুড়ে নৈশব্দ্য। সুনসান স্তব্ধ নৌকো ও নদীর দুনিয়া। হালছাড়া মাঝির হাত থেকে বৈঠা পানিতে পড়ে যায় ঝপাৎ শব্দে। এবং তখনই, ঠিক তখনই, পাকদণ্ডীর ন্যায় আত্মা প্যাঁচিয়ে বের হয়ে আসে একটা আওয়াজ — ভবনদী-উতরোল অসহায় হাহাকারের প্রলম্বিত সুরেলা কান্নার আওয়াজ — “সোয়াচান পাখি / আমি ডাকিতাসি / তুমি ঘুমাইসো নাকি?” নিথর দুনিয়ার নদীনিসর্গে, সেল্যুলয়েডে স্ক্রিনে, এই এক হাহাকারাকীর্ণ প্রণয়ার্তির সুর ছাড়া নাই কিছু আর। ম্যুভির দৃশ্যের সঙ্গে একাঙ্গ সংগীত। বৈতালিক মুখড়া ছাড়িয়ে একসময় গানটা তালে পড়ে, বেজে ওঠে বাদ্য, কেবল সবকিছু ছাপিয়ে একটা আদিগন্ত ক্রন্দন প্রবাহিত হতে থাকে আমাদের অভিজ্ঞতায়। “তুমি-আমি জনমভরা / ছিলাম মাখামাখি / আজি কেন হলে নীরব / বুঝলাম না চালাকি / পাখি … ” ইত্যাদি বিহ্বল ক্রন্দনের দমকে বিদীর্ণ চরাচর।

সচকিত হয়ে প্রেক্ষাগৃহের ভিতরেই নিবন্ধকার আর তার রঙিনদিনের বন্ধুদের মধ্যে বচসা বাঁধে কে এই শিল্পী, কি তার নামপরিচয়, নিবাস কোথায় তার … ইত্যাদি নিঃসংগীত তথ্যাদি নিয়া। প্রায় শেষের অংশে ম্যুভি, অচিরেই টাইটেলকার্ডে দেখে ফেলা যায় কে গেয়েছেন কে গীতিকার কে সুরকার ইত্যাদি তথ্যনিচয়। এই তীব্র ক্রন্দনগহীন ঘনবনাচ্ছন্ন গলার শিল্পীটা বারী সিদ্দিকী নামে সেদিন পরিচিত হয়ে উঠলেন আমাদের কাছে। একই সিনেমায় এই বর্ণিত দৃশ্যের আগেও একই গলায় একাধিক শুনে এসেছি খেয়াল হয়। একটা হচ্ছে “পূবালি বাতাসে / বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি / আমার নি কেউ আসে” … এবং “ওগো ভাবীজান / নাওবাওয়া মর্দলোকের কাম” ইত্যাদি। শেষোক্ত গানটায় বারীর গলার খেলোয়াড়ি মিষ্টি বদমাইশি এত খোলতাই হয়েছিল যে এ-ধারার মৌজের গানে উনার গলা আর কখনো ব্যবহৃত হতে দেখি নাই। একটুর জন্যে, নেহায়েত বারীর জন্যেই বাঁচোয়া, এই গানটার রসভঙ্গ ঘটত। অন্য কেউ হলে এইটারে একটা আইটেমস্যঙের ন্যাকামো বানায়ে ফেলত। বারী করেছেন মৌজের গ্রামবাংলার হেরিটেজ্  মনে রেখে। এরপরে, এই সিনেমার পরে একই ডিরেক্টরের অন্য সিনেমায়, এই শিল্পীর আরও পরিচয় আরও সংগীত আরও গান আমরা পেয়েছি।

Bari Siddiqui 2

কিন্তু খুব বেশি নয়। সংখ্যায় বেশি গেয়েছেন বলা যাবে না। গানবাজনায় এই সংখ্যাপ্রাধান্যের দিনে বারী সিদ্দিকী গেয়েছেন অল্প। স্টুডিয়োরেকর্ডের কথা বলছি। সিদ্দিকী তার শ্রোতাকে সংখ্যায় নয়, চাকচিক্যের আধিক্যে নয়, গাইবার মায়ায় বেঁধেছেন। মরমিয়া বাঁধন। গলার মর্দানা গানে কেমন করে সামলাতে হয়, কতটা নোয়াতে হয় আর কতটা উঁচাতে, এই তালিমটা বারী সিদ্দিকীর ন্যায় শিল্পীদের কাছ থেকে পেয়ে যাব আমরা বাংলার আগত-অনাগত বহুকাল ধরে। যেমন পাই সুবীর নন্দীর ন্যায় শিল্পীদের কাছ থেকে এইধারা তালিম।

যদিও বারী সিদ্দিকীর শ্রোতারা তার বাঁশির জন্য নাকি তাঁর গলার গায়কীর জন্য তারে পছন্দ করে, কোনটার পাল্লা ভারী দেশদুনিয়াজোড়া তার জনপ্রিয়তার পেছনে, এইটা আজ আর সনাক্ত করা শক্ত। তবে বাঁশুরিয়া বারী সিদ্দিকীর রূপমুগ্ধ শ্রোতা তারাই যারা তারে স্টেজে দেখেছেন সশরীর। কিংবা লাইভের পর্দায়। প্লেব্যাকে বারীর বাঁশিও শোনা যায় নাই তা নয়; প্লেব্যাকে বারী সিদ্দিকী নিজের ভুবনকাঁদানো গলা দিয়ে মরণশীল জীবনমুখর মরমিয়া মানুষগুলোর মন জয় করেছেন সেই শ্রাবণমেঘের দিন থেকেই। অঝোরে এই গলা আমাদেরে ঝরিয়েছে, আজও ঝরায়, যাবে আরও বহুকাল ঝরিয়ে।

বেশকিছু সংগীত নিজে রচনা করেছেন, রচেছেন বেশকিছু গানও, তবে যে-বারীর সঙ্গে এই নিবন্ধকারের পরিচয় হয়েছে এ-পর্যন্ত তিনি মুখ্যত উকিল মুন্সীর গান অভাবিত উদার-দরাজ কায়দায় আমাদের কানে পশিয়েছেন। উড়িয়ে এনেছেন আকাশে-অ্যাটল্যান্টিকে সেই সুরকার্পেটে চড়িয়ে। স্রেফ গলায় এহেন উড়াল, এই ফ্লাইট, অনবদ্য! শুধু গলা আর অননুকরণীয় গায়কী দিয়ে বারী সেই গানগুলো শ্রোতাসাধারণ আমাদের মর্মে বেঁধিয়েছেন বললেও কম বলা হয়। কেবল উকিল মুন্সীই গেয়েছেন তা-ও নয়, আরও কতিপয় পদকর্তার অসামান্য গোটাকতেক গান সিদ্দিকীর গলাবাহিত হয়ে আমাদের অভিজ্ঞতায় এসেছে স্মর্তব্য। কখনো খতিয়ান-জাব্দাখাতা নিয়া বারী সিদ্দিকীর সাংগীতিক তুল্যমূল্য অঙ্কিতে গেলে সেসব কথা পাড়া যাবে পরে।

এই জীবনের ভোরবেলায়, ইশকুলকালে আমাদের, আম্মা-কাকিমারা বাঁশি বাজাইতে নিষেধ করতেন আমাদিগেরে থোঁতামুখ ধরে। বলতেন, বাঁশি যে বাজায় তার দুইজীবনেও দুঃখ যায় না। বলতেন, বাঁশির ছেঁদা দিয়া রক্ত বাইরায়। বলতেন, বাঁশি শুনে কেউ হুহুক্রন্দনে ভেসে গেলে সেই কান্নাকারীর অভিশাপে যে-বাজায় তার ক্ষতি হয়। আমাদের আম্মা-চাচিমাদের সন্তানবাৎসল্য হয়তো পরিমাণে একটু বেশিই ছিল, তবে নিষেধাজ্ঞার নেপথ্য যুক্তিগুলো যখন দেখি দুনিয়ার বাঁশুরিয়াদের সবার ক্ষেত্রে সমান প্রযোজ্য না-হলেও কারো কারো ক্ষেত্রে ফলিয়া যায়, আম্মাদের সেই মমতার আশঙ্কামাখা বারণবাক্যগুলো মনে পড়ে। বেহিসাবি জীবনের যাতনা বারী সিদ্দিকীরও ললাটে সেঁটে ছিল গোড়া থেকে। ক্যারিয়ারে একদম মন না দেয়া, পানাসক্তির আতিরেক্য, বারীকে ভুগিয়েছে। মেজাজি ছিলেন বেজায়, প্রায়-কাপালিক চোখজোড়ার দিকে তাকাইলেই সেইটা বোঝা যায়। ব্যাপার না; বাঁশিওয়ালাকে এমন একটু ভুগতে হয়, রেশটুকু রয়ে যায় তার বাঁশির সুরের, বেঁচে-থাকা বাতাসের বহমানতায়।

অ্যানিওয়ে। একটা অ্যালবামভরা গান শুনেছিলাম বারীর, সিডিযুগে, বহুকাল আগে। এছাড়া তার গান শোনা হয়ে যেত এফএমে, সেল্যুনে, আপিশের এজিএমে ইয়াং কোনো কলিগের কাভার ভার্শনে। এখন তো চৌদিকে চৌপর আওয়াজের ঘর্ঘর। গানশোনাশুনি ইস্তফা দিয়াছি বিস্তর আগে। এরপরও কালেভদ্রে ইউটিউব ইত্যাদি ক্লিকিয়ে এক-দুইটা গান শোনা যে একেবারে হয় না তা নয়। হয়। একদম ক্বচিৎ কদাচিৎ। মাঝেমধ্যে। যেমন বারী সিদ্দিকীর গান সর্বশেষ কবে শুনেছি, ভাবতে যেয়ে ইয়াদ হলো, খুব বেশি পিছনে নয়, এই বছরেই স্টার্টের দিকে। এবং কোথায়? আবার কোথায়! গানবাংলায়! চেইঞ্জ অফ উইন্ডস্! তাপসনিঃশ্বাসবায়ে, তাপসের মায়েস্ত্রোগিরির তুজুর্বায়, চ্যানেলটা গানের ভালো একটা প্ল্যাটফর্ম হওয়ার সমস্ত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও হয়ে উঠছে না। তারপরও কয়েকজনের গান না-শুনলেই নয়, তাপসযন্ত্রণা দাঁতকিড়িমিড়ি সহ্য করে এইভাবে জেমস্-বাচ্চু-বারী-সুবীর প্রমুখ কয়েকজনের গান শুনতে হয়েছে। অ্যানিওয়ে। এই প্রোগ্র্যামেই সিদ্দিকীর জীবনের লাস্ট পার্ফোর্ম্যান্স কি না, কে জানে। ম্যে বি, হতে পারে।

এসেছিলেন নভেম্বরে, গেলেনও নভেম্বরেই। সিক্সটি ক্রস করেছিলেন সবে, তেষট্টিতে গেলেন। এত অল্প! অথচ কত সুরবিস্তারী! নির্বিঘ্ন হোক, শুভ হোক, বারী সিদ্দিকীর যাত্রাপথ ও অনন্তকালিক গন্তব্য।

শ্রদ্ধালেখ্যপ্রণেতা : বিদিতা গোমেজ

… … 

বিদিতা গোমেজ

COMMENTS

error: