সুবীর নন্দীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী গেল ৭ মে ২০২০। তার বর্ণময় জীবন নিয়ে এত সোনাঝরা লেখা পড়ছি ক-দিন ধরে, অহঙ্কার হয় এ-রকম একজন মানুষ আমাদের আছেন বলে।
সুবীর নন্দী, আমি যাকে ফুলদা বলে জানি, তার সংগীত কিংবা সাংস্কৃতিক জীবন সম্পর্কে কিছু বলব না। শুধু ফুলদাকে যতটুকু জেনেছি নিজে কিংবা মায়ের কাছ থেকে, সে-কথাই তুলে রাখছি এখানে।
শৈশব থেকেই মায়ের কাছে শুনেছি আমাকে ফুলদা (সুবীর নন্দী), মিষ্টিদা (সুবিনয় নন্দী) আর দাদা (অনিরুদ্ধ হোম রায়) — এদের মতো হতে হবে। ফুলদা আমার মায়ের বোনের ছেলে। মায়ের বড় আদরের। আমরা ছোটরা বেড়ে উঠেছি তাদের আদর্শ মেনে। দুঃখিত মা, সেই উচ্চতায় কখনোই পৌঁছানো হলো না আমার।
সুবীর নন্দীর ডাকনাম বাচ্চু। কিন্তু আমার মাকে কখনো বাচ্চু নামে ডাকতে শুনিনি। মা তাঁকে ডাকতেন বাবলী বলে। এই বাবলী ডাকের পেছনে ছোট্ট একটা গল্প আছে।

ছোটবেলায় ফুলদা তার বাবাকে বাবলী বলে ডাকত। পাশাপাশি ওর নিজেরও বাবা হবার সাধ জাগে। মেসো ডা. সুধাংশুশেখর নন্দী তেলিয়াপাড়া বাগানে চাকুরিতে থাকায় ফুলদার মা — আমাদের ধনমাসী — থাকতেন হবিগঞ্জে। পাশাপাশি থাকতেন মামা আর মাসী। ছোট্ট ফুলদা জানালার শিক ধরে মুখখানা বাড়িয়ে দিয়ে এক এক করে সবাইকে ডেকে ডেকে বলত, “আমি তোমার বাবলী”। তাঁকে ক্ষেপাবার জন্য সব মামা-মাসীরা বলতেন, না তো, তুই বাবলী না। রেগে গিয়ে ফুলদা বলত – মরার জাত, আমিই তোদের বাবলী।
মায়ের সাথে ভারি মজার সম্পর্ক ছিল তার। মায়ের বিয়ের পরদিনই নাকি ধুতি-পাঞ্জাবি পরে বাকি ভাইদের সাথে হাতজোড় করে আমার দাদুভাইকে বলে এসেছিলেন, আপনি আমাদের কন্যাদায় থেকে মুক্ত করলেন!
মা, কুট্টিমাসী বলে ডাকতেন যাকে, ছিল তার আশ্রয়ের জায়গা। কেউ শাসন করলে কেঁদেকেটে ছুটে আসত মায়ের কাছে। ধনমাসী বলতেন, ও তো লিপির (আমার মায়ের নাম) পোষ্য পুত্র। মায়ের সাথে তার এই পুত্রসম সম্পর্ক অটুট ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
ভয়ঙ্কর দুষ্ট ছিল। গাছে চড়া, দৌড়াদৌড়িতে ফুলদার জুড়ি মেলা ছিল ভার। আমার বড়মাসী অতিষ্ঠ হয়ে তাকে ডাকতেন ‘বাছা হনুমান’। হনুমান মানে কী বুঝতে পারত না। খুশি হয়ে সবাইকে বলত, বড়মাসিমা আমাকে বাছা হনুমান বলে ডাকে।
ফুলদা থাকতেন ঢাকায় আর আমি মৌলভীবাজার। মামাবাড়ির অনুষ্ঠানে বা ছুটিছাটায় দেখা হতো। ছোট ছিলাম তখন, একটু ভয় পেতাম বলে সহজভাবে মিশতে পারতাম না। বড় হবার পর ঢাকায় গিয়েছি যখন, ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। বাইরে আসার পর যতবার দেশে গেছি, তার সাথে দেখা না করে আসিনি। শেষবার দেখা হয়েছিল ২০১৮-তে। একটু অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু ভাবতেই পারিনি এই দেখাই শেষ দেখা হবে।
ফুলদা ছিলেন একজন সাধারণ কিন্তু অসাধারণ জীবনযাপনে বিশ্বাসী। ইংরেজিতে যাকে বলে প্লেইন লিভিং হাই থিঙ্কিং। খুবই সাধারণ পোশাক পরতেন। দেশ আর দেশের মানুষের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা। ২০১৮-র শেষে নিউইয়র্কে গিয়ে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ভাইদের বারবার অনুরোধের পরও দেশে আসা থেকে আটকে রাখা যায়নি তাকে।
সুবীর নন্দী ভাগ্যবান। বহু মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। সংগীতকেই জীবন মেনেছিলেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন, সেই জীবনই উদযাপন করে গেছেন।
আমি নিজেও কৃতজ্ঞ তার কাছে। কুট্টিমাসীর প্রতি যে প্রবল ভালোবাসা ও সম্মান তিনি ধারণ করতেন, তার কিছু অংশ স্নেহের ফল্গুধারা হয়ে বর্ষিত হয়েছে আমার ওপর। মায়ের আদেশ মেনে তার মতো হতে পারিনি। কিন্তু তার সাহচর্য পেয়েছি, এই গর্বটুকুও কম না।
তুমি এমনই জাল পেতেছো সংসারে
কার-বা এমন সাধ্য আছে
এই মায়াজাল ছিঁড়ে যেতে পারে —
… …
- In all departures there is an arrival & other poems || Roushan Hasan - September 11, 2026
- সাম্যের দিকে যেতে যেতে লেখাপত্র || রোদ্দুর রিফাত - September 10, 2026
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026

COMMENTS