বানপ্রস্থ থেকে ফিরে || কল্লোল তালুকদার

বানপ্রস্থ থেকে ফিরে || কল্লোল তালুকদার

প্রায় এক যুগ পর নেত্রকোনা এলাম। শহরের রাস্তাঘাটের বেহাল দশা দেখে খুব হতাশ হই। গতবারের চেয়ে এবারের অবস্থা যেন আরও শোচনীয়, করুণ। রাস্তায় বড় বড় গর্ত। বৃষ্টিতে কাদা-জলে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। চলাফেরার অযোগ্য। কোথায় যাই, কী যে করি!

হঠাৎ মনে পড়ল নেত্রকোনায় দর্শনীয় তেমন কিছু না থাকলেও দেখার মতো একটি জায়গা আছে। ‘বানপ্রস্থ’। জ্ঞানব্রতী যতীন সরকারের বাসভবন।

গতকাল সন্ধ্যায় আমার তাউই মশায় (মেজদার শ্বশুর) পরিমল রায়ের সঙ্গে যতীনস্যারের বাসায় যাই। যতীনস্যার শুয়ে ছিলেন। আমাদেরকে দেখে উঠে বসলেন।

— কেমন আছেন, স্যার?
— আমি তো ভালোই আছি, কিন্তু শরীরটা ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। কোনো কাজ করতে দিচ্ছে না।

শুরু হলো স্যারের স্বভাবসুলভ প্রাণোচ্ছল কথাবার্তা। আর আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে কেবল শুনি, বসেই থাকি। কখন যে তিন-তিনটে ঘণ্টা কেটে গেল টেরই পেলাম না।

বিচিত্র বিষয়ে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। কিন্তু তাঁর যাপিত জীবন কী নিরাভরণ, কী সহজ-সরল! বিস্ময় জাগে। কখনও শিশুর মতো প্রাণ খুলে হেসে ওঠেন, কখনও-বা বই বের করে পড়ে শোনান। এখনও তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি। এক-পর্যায়ে দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলতেই স্যার বললেন,

— শোনো, আমার ‘পাকিস্তানের জন্ম মৃত্যু দর্শন’ বইটি তো পড়েছ? আমি তো সব সময়ই বলি, জিন্নাহ আমাদের উপকার করেছেন। আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ, তিনি যদি ১৯৪৮ সালে না বলতেন, “Urdo and only Urdo shall be the state language of Pakistan”, তাহলে তো আমাদের ভাষা-আন্দোলনই হতো না। তারা যদি বাংলাভাষা, বাংলা বর্ণমালা বদলাতে না চাইত তবে হয়তো এইভাবে আমাদের স্বাধীনতাই আসত না। সত্যি কথা বলতে কী, আমরা তো একসময় রবীন্দ্রসংগীত শুনতাম না। শুনতেন কিছু বিশিষ্টজন। আমাদের কাছে মনে হতো রবীন্দ্রসংগীত হলো প্যানপ্যানানি গান। কিন্তু পাকিস্তানিরা যখন ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করল, তখনই তো আমরা তার দিকে ঝুঁকলাম। শুনতে শুনতে আমাদের কান অভ্যস্ত হলো। তারা যদি এই-সমস্ত ঘটনা না ঘটাত, তবে হয়তো রবীন্দ্রসংগীত আমাদের জাতীয় সংগীত হতো না। তারা যতই এই-সমস্ত কাজ করেছে, আমরা ততই সচেতন হয়েছি, হয়েছি ঐক্যবদ্ধ। কাজেই এই-সমস্ত জঙ্গিবাদের ঘটনাও যে হচ্ছে, তাতে আমি খুশি খুশি খুশি। ৭১-এ তিরিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। এই-সমস্ত সন্ত্রাসী জঙ্গিবাদের ঘটনায় তোমার-আমার জীবনও যেতে পারে, তাতে কী হয়েছে? যায় যাক। পৃথিবী তো এভাবেই এগিয়ে যায়। পৃথিবী সবসময় সামনের দিকে অগ্রসর হয়, কোনো সময় পিছনের দিকে যায় না। কিন্তু সোজাসুজি যায় না। ঘুরিয়েপ্যাঁচিয়ে যায়। কিন্তু প্যাঁচটা যখন দেয় তখন হা-হুতাশ করলে চলবে না। আমি নেত্রকোনার একটি দৃষ্টান্ত দেই। এই যে মগরা নদী নেত্রকোনা শহরের মধ্য দিয়ে গেছে, মাত্র ৬-৭ মাইল জায়গার মধ্যে এটি তিনটি বড় বড় বাঁক নিয়েছে। এইসব বাঁক দেখে মনে হয় নদী বুঝি আবার তার উৎসমুখে ফিরে যাবে। কিন্তু তা কী গেছে? নদী শেষ পর্যন্ত ঘুরে ঠিকই সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়েছে। কাজেই এই সময়ের বাঁকে যারা হতাশ হয় আমি তাদের ঘৃণা করি। সোজা কথা। আর যারা বলে — এই তো সময় পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, সাহসের সঙ্গে সংকট মোকাবিলা করার, — আমি তাদের পক্ষে।

— স্যার কী লেখালেখি হাতেই করেন, নাকি কম্পিউটার ব্যবহার করেন?
— দেখ, আমি একজন যন্ত্রমূর্খ। নূতন প্রজন্ম অনেক বিষয়েই আমার চেয়ে অনেক বেশি জানে। আমি খুব ভালো করেই জানি — আমি কী জানি না। তাই নিজেকে বলি যন্ত্রমূর্খ। এইসব যন্ত্রটন্ত্র ব্যবহার এ-জীবনে আর হবে না। তাই যা-কিছু লিখি তা হাতেই লিখি।

— স্যার, নিজেকে কী একজন লেখক হিসেবেই ভাবতে ভালোবাসেন?
— না, আমার ধারণা আমি একজন ভালো শিক্ষক। শুধু তা-ই নয়, আমি গর্ব করে বলি, — I am one of the best teachers in the world.

রাত গভীর হয়ে আসে। আমাদেরকে একসময় উঠতেই হয়। নেত্রকোনাবাসীর প্রতি ভীষণ ঈর্ষা হলো। তারা এমন একজন জ্ঞানতাপস পেয়েছেন। আহা! এ-রকম একটি বাতিঘর যদি আমাদের শহরে থাকত! প্রতিটি জনপদে থাকত! সমাজে এই-রকম বাতিঘরের বড়ই প্রয়োজন।

জুলাই ২০১৬


কল্লোল তালুকদার রচনারাশি

কল্লোল তালুকদার

COMMENTS

error: