টোকন ঠাকুর : ছদ্মনামে সুরাসুর || আহমদ মিনহাজ

টোকন ঠাকুর : ছদ্মনামে সুরাসুর || আহমদ মিনহাজ

তাঁর কাছে কবিতা হলো ‘ছদ্মনাম’-র স্মারক। সময়সারণিতে ভ্রমণের ক্ষণে ব্যক্তির সত্তাকে সে ইঙ্গিতবাহক পরাভাষায় বিমূর্ত করে তোলে :—

সব নাম ছদ্ম নাম। ছদ্মনামে থাকি।
এমনকি তোমাকেও ছদ্মনামে ডাকি।
শুধুমাত্র জল, তাকে নদী বলে জেনে
যারা নীল, তাদেরও তো লাল রঙে চেনে
আমাদের কালো কালো ভায়োলেট চোখ।
এরই ফলে ছদ্মময় ছড়ালো কুহক?
(সব নাম ছদ্মনাম)

‘ছদ্ম’ ব্যাপারখানা টোকন ঠাকুরের কবিতার গতিপথকে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করে যায়। প্রকৃত চেহারা আড়াল করে ইনকোগনিটো বা ছদ্মবেশ ধারণের খেলায় ছদ্মনাম, ছদ্মভাষা, ছদ্মইঙ্গিত, ছদ্ম-অনুভ‚তির শরণ মেগে কবি নিজেকে সময়প্রবাহে সক্রিয় রাখেন। মানবসভ্যতা ও সামাজিকতার ওপর বিতৃষ্ণা বা নৈতিক শুচিবাই বাঁচিয়ে রাখার উদ্বেগ তাঁকে ছদ্মবেশ ধারণে বাধ্য করছে এমন নয়। বিগত কালপর্বের অসংখ্য কবিতায় ঘটনাটি অবশ্য চোখে পড়ে! পূর্ববর্তী যুগে কবির ‘ব্যক্তি আমি’ ছদ্মবেশ ধারণের ছলে সময়-সমাজ-সভ্যতায় বিদ্যমান নৈতিক কৌলিন্যকে ব্যঙ্গবাণে জর্জরিত করেছে। টোকনের ছদ্মবেশ ধারণের কারণটি সেখানে ভিন্ন। সভ্যসত্তার আড়ালে রাক্ষসসত্তা বহনের উদ্বেগ তাঁকে জ্বালিয়ে মারে। সভ্য মানুষের বেশে সমাজে ঘোরাফেরা করলেও সত্তার গহিনে স্বয়ংক্রিয় রাক্ষসসত্তার নিকট ফেরত যাওয়ার বাসনা কেন যেন ফিরে-ফিরে কবির মগজে চাগার দিয়ে ওঠে। অবদমনের চাপ নিজেকে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ বলে ভাবতে তাঁকে প্ররোচনা দিয়ে যায় :—

মানুষের ছদ্মবেশে থাকি, আদতে রাক্ষস!…

রাক্ষসের ভয়ে মানবীরা চিরকাল ভীত বলে আমি নিঃসঙ্গ হয়ে যাই, যথাক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে উঠি। নিঃসঙ্গতা এমন একটি উদাহরণ, যে-কেউ গ্রহণে অনিচ্ছুক — হায় রে এমন নিঃসঙ্গ থাকি

সকাল থেকেই একটা শালিখ কার্নিশে ভিজছে স্থিরচিত্রে, নিঃসঙ্গের ছদ্মবেশে আমি এখন ওই ভেজা শালিখ পাখি

শালিকের ছদ্মবেশে কবিতা লিখি!
(নিঃসঙ্গের ছদ্মবেশে)

রাক্ষস শব্দের প্রয়োগ টোকনের কবিতায় দ্বিরাভাসের জন্ম দিয়ে যায়। কবির এই রাক্ষসসত্তাকে স্কটিশ লেখক রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের কালজয়ী রহস্য-আখ্যান ‘ড. জ্যাকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড’-এ অঙ্কিত শুভ ও অশুভ শক্তির সরলাঙ্ক দিয়ে মাপার নয়। নিজের উদ্ভাবিত ঔষধের সাহায্যে দিনে সুস্থ-স্বাভাবিক ও নৈতিক গুণের অধিকারী ড. জ্যাকিল রাত ঘনালে অনৈতিক মি. হাইড রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। সত্তাগত রূপান্তরের খেলায় মিস্টার হাইড ক্রমশ স্বয়ংক্রিয় হয়ে ওঠার পরিণামে ড. জ্যাকিলের পক্ষে নিজের স্বরূপে ফেরত যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। হাইড তাকে জান্তব ও হিংস্র করে এবং খুন করতে বাধ্য করায়। অনুশোচনার টানাপোড়েন সইতে না পেরে অগত্যা ড. জ্যাকিল আত্মহত্যায় জীবনের ইতি টানেন। শুভ সত্তাকে ছাপিয়ে ছদ্মবেশী অশুভ সত্তার আধিপত্য বিস্তারের ছক টোকনের সভ্য ও রাক্ষসসত্তার মাঝে ব্যক্ত দ্বন্দ্বে মুখ্য হয়ে ওঠে না। তাঁর সভ্যসত্তা নৈতিক ও শালীন এমন নয়, আবার রাক্ষসসত্তাকে অনৈতিক বা অশালীন ভাবার যুক্তি থাকে না। এই রাক্ষস আদিপ্রাকৃত ও প্রাচীন ইতিহাস বেয়ে তাঁর রক্তে খেলা করে বেড়ায়। সভ্যতা যাকে অনার্য, অ-সভ্য ও অচ্ছুৎ নামে চিহ্নিত করতে চিরকাল তৎপর থেকেছে সেই মানবরূপী ‘অনার্য রাক্ষস’ কবিসত্তায় বিহার করে এবং আর্য সভ্যতার ঘেরটোপ ছিঁড়ে আদি স্বরূপে ফেরত যাওয়ার প্ররোচনা দিয়ে যায় :—

আয়নার মধ্যে তাকিয়ে নিজেকে রাক্ষস মনে হলো!

সঙ্গে সঙ্গে রাক্ষসের মানে, সংক্ষিপ্ত বাঙলা অভিধানে পাওয়া গেল — নরখাদক জাতি, নিশাচর, কর্বূর, প্রাচীন অনার্যজাতি ইত্যাদি…যদিও, রাক্ষসের একটা অপ্রত্যাশিত ভয়ঙ্কর মুখচ্ছবি আঁকা আছে মনুষ্যকুলের মনে। এটা জানি, কারণ এদ্দিন আমিও মানুষের রোল প্লে করে এসেছি। এদ্দিন আমিও মানুষ ছিলাম।…

…ডাইনিদের নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে অনেক তরুণ যোদ্ধা অকালেই মরে ভূত হয়ে যায়। যারা ভূতে বিশ্বাস করে না, আমার মতোন, একদিন আয়নার মধ্যে তাকিয়ে দ্যাখে — সে নরখাদক, সুযোগ পেয়ে নিজেকে খেয়েছে; সে নিশাচর, আঁখিতে আঁধি চারণ করেছে; সে প্রাচীন অনার্য, কারণ তার অনুচ্চবর্গের দেহ;

দেখি, আয়নার মধ্যে আনস্পেকটেড একটি অচেনা মুখ, রাক্ষসের…
(দেখি রাক্ষসের মুখ, পাই ডাইনির নিঃশ্বাস)

নব্বইয়ের কবিতাবিশ্বে সভ্য মানুষ অস্বস্তির শিরোনাম। একে প্রত্যাখ্যানের সাহস কবির নেই তবে এর থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া ও আদিপ্রাকৃত অনার্য জীবনে ঢুকে পড়ার মনোবাসনা তাঁকে উত্যক্ত করে। টোকনের কবিতাযাত্রা সে-কারণে পরাভাষার শরণ মেগে আরোগ্য লাভের উপায় খোঁজে। যে-ভাষাপৃথিবী পরিপার্শ্বের সঙ্গে তাঁকে জুড়ে রেখেছে তাকে ভিন্ন অর্থে পাঠ যাওয়ার বাসনা কবিকে ভাবায় :—

হাঁসগুলিকে সরাসরি হাঁস না-বলাই ভাল।
লিখিত ইঙ্গিত রেখে কবিতাও বলা যায়।
আরও বলা যায় — আমি ইঙ্গিতবাদী মানুষ,
চেষ্টা করছি ঘোড়াগুলোকেও বিশেষ কিছু ভাবার।

তাই, জলঢেউয়ের বেআব্রু বুক খুব ধরেছি
মনে পড়ছে অনেক কথা সব না বলাই শ্রেয়
যতই আমার দেহ বলি, দেহ কি আর দেহই?

আবার, কবিতাগুলো কি যথার্থ কবিতাই?
তাহলে কেন দিঘি দেখলেই লাফিয়ে পড়তে যায়?
ক’হাত দূরেই মধ্যরাতের সমুদ্র গর্জায়
ক্রোধের ফেনা তীরের বালি কী চায় সঠিক জানি?

ব্লাউজগুলিকে শুধুমাত্র ব্লাউজ বাদেও বলব :
সতর্কতার ফাঁকে হঠাৎ অসতর্কের আগুন!
কিন্তু সে ঠিক আগুনও নয়, বাঘের চোখে জাদু
মোহিনী সংকেত পেয়ে, তাকে মৃত্যুই বলি যদি —

ব্যথাকে বলব জল, সেই জলই প্রত্যেকের ব্যক্তিগত নদী…
(প্রত্যেকের ব্যক্তিগত নদী)

ভাষার প্রথাসিদ্ধ অভ্যাসে অর্থ বিপর্যয় ঘটাতে ইচ্ছুক টোকন ঠাকুরের কবিতা নব্বইয়ে সচল পরাভাষার সাহায্যে ছদ্মবেশ খুলে ফেলতে আকুলান হয়। তাঁর কবিতা প্রশ্ন ওঠায়, — শব্দকে কেন সমাজসিদ্ধ বোধগম্য অর্থে চিরকাল পাঠ যেতে হবে? শব্দে প্রতিষ্ঠিত অর্থকে ভিন্ন নামে সম্ভাষণের বাতিক তাঁকে ভোগায়। পরিচিতি শব্দ দিয়ে বোনা বস্তুপৃথিবীর জগতে যদি হঠাৎ রদবদল ঘটানো হয় তাহলে পরিণাম কী দাঁড়াতে পারে সে-বিবরণ সুইস লেখক পিটার বিকসেলের ‘টেবিল হচ্ছে টেবিল’ গল্পে স্মরণীয় ভাষায় মুদ্রিত হয়েছিল। শব্দে পুঞ্জীভূত অর্থ প্রতিটি বস্তুকে সুনির্দিষ্ট অর্থ, ছবি, অভ্যাস ও বাস্তবতা দান করে থাকে, এখন হঠাৎ রদবদলের ফলে বাস্তবতাটি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। টেবিলকে যদি ঘড়ি কিংবা ঘড়িকে টেবিল ভাবি তখন অর্থ ও চিত্র-সংযোগের প্রচলিত অভ্যাসে বিপর্যয় ঘনায় আর সেটি সামলানো বিরাট ঝকমারি!

কিন্তু এটি কোনো মজাদার গল্প নয়। গল্পের শুরু ও শেষ দুটোই দুঃখজনক ছিল। ধূসর কোট পরিহিত বুড়ো লোকটি অন্যরা কী বলছে সেটি আর ধরতে পারবে না, আর বিষয়টি মোটের ওপর মন্দ ছিল না।

এটা বরং অধিক বাজে ছিল, লোকজন আর কখনো তার কথাবার্তা বুঝতে পারবে না।

সুতরাং বাতচিত করা সে ছেড়ে দিয়েছিল।

লোকটি খামোশ হয়ে গিয়েছিল, কেবল নিজের সঙ্গে সে কথা বলত, আর এমনকি লোকজনের সঙ্গে কুশল বিনিময়ও করত না।
(টেবিল হলো টেবিল : পিটার বিকসেল; ভাষান্তর : লেখককৃত)

ভাষা ও বাস্তবতার আন্তঃসম্পর্ক ঘিরে বিরাজিত প্রপঞ্চকে পিটার বিকসেল তাঁর গল্পে স্মরণীয় চরিত্র দান করেছিলেন। টোকনের নাম ও ছদ্মনাম সমস্যায় জর্জরিত কবিতারা চকিত বিকসেলকে মনে করিয়ে যায়। চেনা শব্দে অর্থবিপর্যাস ঘটানো কবিতার প্রধানতম কাজ। হাজার বছরের ইতিহাসে ঘটনাটি ধারাবাহিক নিয়মে ঘটেছে, এখন ঘটছে এবং আগামীতে ঘটতেই থাকবে। পরিচিত অর্থবোধে বিপর্যয় ঘটানোর জন্য শব্দে নিহিত ইমেজকে অন্য শব্দে পোরা ইমেজ দিয়ে স্থানান্তরের পক্ষে কবি তাই নিঃসংকোচে ওকালতি করে যান। ইমেজের এই স্থানান্তর নতুন অর্থস্তর তৈরি করে, যেখানে পরিচিতি শব্দের আদলে বিশেষ বিপর্যয় না ঘটিয়ে শব্দটি পাঠকের কাছে নতুন অর্থে পঠিত হতে থাকে। যে-কারণে হয়তো হাঁসকে ‘কবিতা’, কবিতাকে ‘দিঘি’, ব্লাউজকে সতর্কতার ফাঁকে অসতর্ক আগুন ভাবার বিভ্রম কবিকে খাটিয়ে মারে। কবিতা হচ্ছে বিভ্রমকে সত্য ভাবতে বাধ্য করার আয়ুধ। চেনা বাস্তবতাকে ফিকশনে রূপান্তরিত করার জন্য কবি সেখানে খেটে মরেন। ভাষাকে ছদ্মবেশ থেকে মুক্ত করতে এছাড়া দ্বিতীয় কোনো শল্য চিকিৎসা তাঁর আয়ত্ত নেই :—

যদিও কোকিল ডাকছে, এতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হচ্ছে, স্বাভাবিকতার পতন ঘটছে। এ সময় কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে, এ সময় উত্তরের হাওয়া আসে গুপ্তচর হয়ে, দক্ষিণের বারান্দায় ওত পেতে বসে থাকে আততায়ী ঘ্রাণ, চন্দ্রমল্লিকার। মনে হয়, শিহরন শব্দের অর্থ বুঝতেই দিগ্বালিকা আজ আর স্কুলে যাবে না, কিন্তু স্কুলে যাবার নাম করে সে ঠিকই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়বে।

শিহরন, তোর কথা কীভাবে লিখব আমি?
(উত্তরের হাওয়া)

টোকনের কবিতায় শব্দের অর্থবিপর্যাস আড়ালবর্তী অনুভূতির সঙ্গে তাল দিয়ে ঘটে। ‘উত্তরের হওয়া’ কবিতায় যেমন ‘শিহরন’ শব্দের চেনা অর্থে পিটার বিকসেলের কায়দায় রূপান্তর বা বিপর্যয় ঘটানো কবির উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু ‘দিগ্বালিকা’-র স্কুলে যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে পড়ায় রোমাঞ্চঘন যেসব গোপনীয়তা কাহিনি হওয়ার সম্ভাবনায় অবারিত হতে থাকবে সেটি উক্ত শব্দের প্রচলিত ইমেজে নতুনত্ব বহায়। সুইট সিক্সটিনের আবেশলগ্ন এই ‘শিহরন’-কে অবশ্য ভাষায় অনুবাদ করা কঠিন! একমাত্র অনুভূতির তারে এর রোমন্থন হয়তো সম্ভব। ‘ভূগোল মাস্টার’ কবিতাও তথৈবচ :— ‘এই আকাশ আমার পিতা / মাটি আমার মা / আমি তাদের সন্তান, ঐ দিগন্ত / কিন্তু ভূগোল মাস্টার বলছেন— / দিগন্ত একটি ধারণামাত্র’ (দ্রষ্টব্য : ভূগোল মাস্টার, বুদবুদ পর্যায়ের কবিতা)

টোকন ঠাকুরের মনোবিশ্বে জায়মান অনুভব তাঁর কবিতায় যেসব ইঙ্গিত রেখে যায় তারা সকলসময় সুগম এমন নয়। ‘দিগন্ত’-কে ভাষা দিয়ে বিরচিত ‘ধারণা’ টের পাওয়ার পর নিজ অর্থবোধের বিপর্যাসে উদ্বিগ্ন কবির ইঙ্গিতবাহক ভাষা পাঠকের কাছে অস্পষ্ট বা ক্ষেত্রবিশেষে দুর্বোধ্য মনে হওয়া বিচিত্র নয়। তিনি পাঠসুখকর তবে ‘ইঙ্গিতবাহক’ এই কবি সেইসব পাঠকের জন্য খোরাকি যারা শব্দের প্রচলিত অর্থে বহাল থাকার পরেও কবিতার ইমেজারি অর্থস্তরে যেসব অঘটন ঘটায় তাকে পাঠ করতে ভালোবাসেন।


নব্বইয়ের কবি, নব্বইয়ের কবিতা
আহমদ মিনহাজ রচনারাশি

গানপার

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you