চিরপ্রণয় চিরবিরহ || শেখ লুৎফর

চিরপ্রণয় চিরবিরহ || শেখ লুৎফর

[অকালপ্রয়াত বন্ধু হরিদাস সাহা স্মরণে]


ঢাকের শব্দ কানে লাগলেই বুকের অতলে চিনচিন ব্যথা হয়, মনে পড়ে প্রিয়তমা পুতুলের কথা। মনে পড়ে শৈশবের সখাসখি কালিদাস, ভবতোষ, বাচ্চু, মীরা, শিউলি ও আরো অনেকের মুখ। প্রিয় সেই মুখগুলো আমার হৃদয়ে অক্ষয় হয়ে থাকলেও পলল মাটির এই সোনার বাঙলায় আর কোনোদিন তাদেরকে আমি খুঁজে পাব না। খরায়-পুড়তে-থাকা দুনিয়ায় চাতক যেমন হাহাকার করে সারা আকাশ ঢুঁড়ে ফিরলেও একফোঁটা পানি পায় না, তেমনি সারা বঙ্গমাতার বুক তন্নতন্ন করে তালাশ করলেও জীবনে আর কোনোদিন তাদেরকে আমি দেখতে পাব না। কারণ তারা হিন্দু। তাই তারা সাধে-অসাধে বাংলা মায়ের শান্তির বুক ছেড়ে হিন্দুস্তানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। প্লিজ, বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছি এইকথা ভেবে কেউ যদি আমাকে একলা ফেলে চলে যান তাহলে আপনারাও আমাদের পিতৃপুরুষদের মতো বলে আমি ধরে নেব। যারা শুধুমাত্র সস্তায় হিন্দুদের জমি-বাড়ি কেনার লোভে পা দিয়ে কচলে-মচলে মেচাগার করে দিয়েছিল হাজার বছরের হিন্দু-মুসলসান ভাইভাই সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এক ঐতিহাসিক দলিল।

জবাদিদি ছিল আমাদের গ্রামের সবচে সুন্দরী আর ভালো মেয়ে। সেই শিশুবয়সেই আমরা ক-জন ধর্মনির্বিশেষে সিক্ত হতাম তার স্নেহ-মমতায়। সে-ও ধর্ষিত হয়েছিল পাশের গ্রামের কয়েকজন অসভ্য, নোংরা মুসলমান নামধারী পুরুষের দ্বারা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ডাকাতির নামে পরিবারের সবাইকে বেদম পেটালে আর জবাদিদিকে বলৎকার করলে ওরা পানির দামে জমি-বাড়ি বেচে দিয়ে ভারতে পালাবে। বাস্তবে ঘটেছিলও তাই। দুইমাসের মাথায় জবাদিদিরা ভারতে চলে গেল। বিশাল বাড়ি, বাগবাগিচা, মাঠের জমি সব, সব নামমাত্র মূল্যে কিনে নিয়েছিল সেই বর্বর মানুষগুলো। তারপর বাড়ির সব বড় বড় মহীরুহ বৃক্ষগুলো বেচে দিয়ে খরিদমূল্যটা রাতারাতি উসুল করে ফেলে! তখন জবাদিদির কথা মনে হলেই আমি আমাদের শিমুলতলার সবচে বড় গাছটার মগডালে বসে সারাদিন দূরের রেলসড়কটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এই লাইন দিয়েই ট্রেনে চড়ে দিদিরা ভারতে চলে গেছে।

প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে গল্পের চেও কঠিন কিছু সত্য লুকানো থাকে, মৃত্যুর মতো ভয়াবহ কিছু স্তব্ধ মুহূর্ত থাকে, যা শুধু সে-ই সারাজীবন দীর্ঘশ্বাসে দীর্ঘশ্বাসে বহন করে। লালন করে। এই শারদীয় উৎসবের ঢাকের শব্দে স্মৃতির সেই কষ্টভরা ছোট্ট, নীল তোরঙ্গটা আজ আমি একটু খুলব।

এই মাটিতে হিন্দু-মুসলমান ভাইভাই প্রায় হাজার বছর। তাই নানান দিক থেকে তারা বাঁধা ছিল আষ্টেপৃষ্ঠে। তার মধ্যে ভাব-বিশ্বাস, ভালোবাসার বাঁধনটা ছিল সবচে মজবুত। সেই বাঁধনেই আমার শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের দিনগুলো এই মাটিতে বাঁধা পড়েছিল। একদম বুঝ হওয়ার পর দেখেছি গ্রামটাতে হিন্দু-মুসলমান সমানে সমান। হিন্দুরা দক্ষিণে, মুসলমানরা উত্তরে। গ্রামটার পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে কালের একমাত্র নীরব সাক্ষী ছোট নদী সুতিয়া।

গ্রামের একমাত্র আখড়াটা মাঝখানে। তার একদিকে হিন্দু, অন্যদিকে মুসলমান। আখড়ার উত্তরে তিন-চারটা ক্ষেত পেরোলেই আমাদের বাড়ি। গ্রামের মসজিদটাও আমাদের বাড়িতে এবং মসজিদের সামনে চার-পাঁচটা পাড়ার একমাত্র টিউবওয়েলটাও। সেই ভোর থেকেই হিন্দুরা মাটির কলস নিয়ে খাওয়ার পানি নিতে আসত। আমাদের বয়েসীরাও কেউ কেউ আসত ছোট হাঁড়ি কাঁখে কিংবা ঘাড়ে ফেলে। তাই ন্যাংটা বয়স থেকেই তাদের অনেকের সাথে আমাদের চিনপরিচয়, আলাপসালাপ। ওরা পানি নিতে আসলেই আমরা টিউবওয়েলের একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকি। তারা কল টিপে টিপে ছোট কলসিতে পানি ভরে। ভরা শেষ হলে আমার তাদের হাঁড়ি ছুঁয়ে দেই। মুসলমানরা ছুঁয়ে দিলে ওদের সবকিছু নাকি ছুঁচি (অপবিত্র) হয়ে যায়। তাই তারা রাগ করে। কেউ কেউ গালি দিয়ে হাঁড়ি ফেলে কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়। আমরা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাসি-হাসি মুখে পাল্টা গালি দেই। এইভাবে রাগারাগি, গালাগালিতে আমাদের কচি মনের নরম মাটিতে ভাবের অঙ্কুর শুরু হয়। তারপর ইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর যখন দেখি হিন্দুপাড়ার রেখা আছে, কানন আছে, সুবল আছে তখন গলায় গলায় ভাব হতে আর কয়দিন লাগে?

হিন্দু বন্ধুদের কাছ থেকেই দুর্গাপূজার মূর্তি বানানোর খবর পেতাম। খবর পেতাম চক্ষুদান অনুষ্ঠানের। সেইদিন থেকে খাওয়ার সময়টুকু বাদ দিয়ে সারাদিন আখড়াতেই কাটত। মন্দিরের সামনের বিরাট চত্বরটা তখন আমাদের খেলার মাঠ। কে হিন্দু, কে মুসলমান এই প্রশ্ন আমাদের কারো মনেই আসত না। খেলায় বাটপারি করে একে অন্যকে ঠকানোর জন্য আমরা কিরা কাটতাম, ‘বিদ্যা! মা-কালি!’ — তারাও আমাদের এই শপথকে বিশ্বাস করত।

সত্তর থেকে আশি। এই দশ বছরে আমার বালকজীবন থেকে চিরদিনের মতো ইন্ডিয়া নামক একটা অতলগহ্বরে হারিয়ে গেল অন্তত কুড়িজন বন্ধু। কালিদাস নামে আমাদের দুইজন বন্ধু ছিল। তাই আমরা একজনকে ডাকতাম বাবা কালি। বাবা কালি কথা শুরু করার আগে বা…বা করে কয়বার তোতলাত। প্রাণোচ্ছ্বল এই ছেলেটার সাথে আমার ছিল হৃদয়ে হৃদয়ে ভাব। কালিদাস, দিলীপ, ভবতোষ, বাচ্চু, মীরা, শিউলি একেকটা নাম এখন আমার কাছে একেকটা দীর্ঘশ্বাস। গভীর রাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয় কষ্টজর্জর, ক্লান্ত পৃথিবী যেন নিঃস্বের দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে। মনে পড়ে দেশত্যাগী আমার প্রিয় বন্ধুদের কথা। বাইরে টুপটাপ করে ঝরে-পড়া শিশির কিংবা বৃষ্টির ফোঁটাকে মনে হয় এই মাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া আমার বন্ধুদের চোখের পানি। জানি না আমার প্রিয় মুখগুলো আজ বেঁচে থাকার জন্য কোথায়, কোন জনপদে ঘামে ফেনা ফেনা হয়ে ছুটছে। কারণ বলতে গেলে তারা এক-রকম নিঃস্ব হয়ে এখান থেকে বেরিয়ে গেছে। তাই দুর্গাপূজার ঢাকের শব্দ কানে লাগলে আমার বুকটা হাহাকার করে ওঠে।

বুক কেঁপে উঠার আরেকটা কারণ হলো পুতুল। বিএসসিতে আমরা ক্লাসমিট ছিলাম। দুই-আড়াইশ ছেলেমেয়ের মধ্যে আমরা বিশ-পঁচিশজন সামনের দিকে বসার জন্য রীতিমতো লড়াই করতাম। সামনে বসার সরাসরি ফজিলত দুইটা :

১. বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে বোঝা যায়।
২. মেয়েদেরকে খুব কাছ থেকে মন ভরে দেখা যায়।

ওদের উড়নার একটু নড়াচাড়া, শরীরের একটু মিষ্টি ঘ্রাণ পাওয়ার জন্য আমার ক্লাসমিটদের কেউ কেউ জানবাজি রাখতে রাজি ছিল।

প্রাইমারি থেকেই বিজ্ঞান আমার প্রিয় বিষয়। তাই আমার মন থাকত স্যার আর বোর্ডের দিকে। আমি, মানিক আর স্বপন — আমরা তিন বন্ধু বসতাম একবেঞ্চে। আমি স্যারের পুরো লেকচারটা মন দিয়ে নোট করতাম। তিন-চার মাস পর স্বপন একদিন বলল, — এই লুৎফর, তুই কিছু বুঝতারছত?
— কি?
— সত্যি কিছু দেখছত না?
— না।
— সামনের ঘন্টায় পুতুলের দিকে একটু খেয়াল রাখিছ।

ঘণ্টা পড়তেই আমরা দোতলার একশ তিন নাম্বার রুমের দিকে ছুটতে থাকি। একপাশে মেয়েরাও। জাপানি পুতুলের মতো ঝলমলে হলুদ লিকলিকে পুতুল সবার আগে। মেয়েদের সারির প্রথম বেঞ্চের ডানদিকের প্রথম সিটটা তার সিলমারা। আমরা সবাই জানতাম পুতুল এই শহরের নামকরা এক সোনা-ব্যবসায়ীর মেয়ে। গুণবাচক এই শব্দগুটার জন্য ক্লাসের ছেলেমেয়ে সবাই তাকে একটু ছাড় দিত। মোস্তাফিজ স্যারের ক্লাস। (আমরা পাস করে চলে আসার দুই বছর পর তিনি কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে গিয়ে সেখানেই শিক্ষক হিসাবে থেকে যান।) ছেলেদের সারির সামনের বেঞ্চের মাঝের সিটে আমি। আমার একপাশে মানিক অন্যপাশে স্বপন। পশ্চিমের সারিতে মেয়েরা। ক্লাস শুরু হতেই স্বপন আমাকে চিমটি কাটতে শুরু করে। ওর দিকে তাকাতেই সে পুতুলের দিকে তাকাবার জন্য আমাকে ইশারা করে। আমি চেয়ে দেখি পুতুল আমার দিকে বড় বড় উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছে। প্রথম ভাবলাম ভুল। আবার তাকাতেই আমাদের চোখাচোখি হলো। পুতুলের ফর্সা মুখটা মুহূর্তে লাল হয়ে ওঠে। আমিও লজ্জা পাই। তারপর আরো কয়বার চোখ তুলতেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেছে দেখে আমি আর তাকাই না।

প্রেম-পিরিতির এইসব চোখটিপাটিপিতে আমার মন ছিল না। আমি তখন দুইহাতে আধুনিক বাংলা গান লিখছি। গান লিখতে বসলেই আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ বেতারের গীতিকার আব্দুল হাই আল হাদী সাহেব। তিনি আমাদের পাশের গ্রামের মানুষ। তো আমার গানের সংখ্যা তখন তিনহাজার ছাড়িয়ে গেছে। কবিতার পাণ্ডুলিপিও বেশ কয়টা। ইতিমধ্যেই ঢাকা বেতারের নিয়মিত গীতিকার হওয়ার পরীক্ষায় আমি দুই-দুইবার ফেল করেছি। বুকে ব্যার্থতার আগুন। আবার বিএসসিতে সেরা ফল পাওয়ার স্বপ্নে চোখদুইটা সবসময় চকচক করে। তাই মেসের সবার পরে ঘুমাতে যাই। উঠি সবার আগে। অন্ধকার থাকতেই ট্র্র্যাকস্যুট আর ক্যাডস পরে তিনমাইল দৌড়ে এসে ব্যায়াম করি। তারপর গোসল সেরে একমুঠ ভেজা ছোলা আর একদলা গুড় খাই। খেতে খেতেই পড়া শুরু করি। সকাল আটটায় প্রাণিবিজ্ঞানের স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে যাই। দশটায় কলেজের ক্লাস। বিকালে উদ্ভিদবিজ্ঞানের স্যারের কাছে প্রাইভেট। সন্ধ্যায় ছাত্র ইউনিয়নের অফিসে রাজনীতির আড্ডা। মনের মতো গান লিখতে পারছি না এই দুঃখে মাঝেমাঝে ব্রহ্মপুত্র নদীর চরে গিয়ে একা একা বসে থাকি। আর কী পুতুলের কথা মনে থাকে?

অক্টোবরের বারো তারিখ দ্বিতীয় ঘণ্টায় দুর্গাপূজার ছুটির নোটিশ হয়ে গেলো। তৃতীয় ঘণ্টায় গ্যাপ। আমি, স্বপন, মানিক পুকুরপারের মেহগনিতলায় আড্ডা দিচ্ছি। তো পুতুল মেয়েদের কমনরুম থেকে ধীরে ধীরে আমাদের কাছে এসে দাঁড়ায়। রাজকন্যার উড়নার গন্ধ পেয়েই আমরা তিনজন উঠে দাঁড়াই। স্বপন আর মানিক পুতুলের আজন্ম বন্ধু। তারা যেমন পুতুলের নিকট-প্রতিবেশী তেমনি প্রাইমারি, হাইস্কুল একসাথে পড়ে এই কলেজ থেকে ইন্টার করে এখন বিএসসিতে। আমি এই কলেজে বিএসসি পড়তে এসেছি অন্য একটা কলেজ থেকে। পুতুল আমাদের সামনে এসে ডান হাতের হলুদ আর চিকন আঙুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে সোজা হুকুমের সুরে বললে, — এই, তোমাদের তিনজনের পূজার নিমন্ত্রণ … আগামীকাল সন্ধ্যায় আমি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করব।

ফিরে যাবার আগে আমার চোখে চোখ রেখে আস্তে করে বলল, — এই তোমার কিন্তু মিস করা চলবে না।

 পরেরদিন সন্ধ্যায় আমরা তিনজন গুটিগুটি পায়ে শহরের সেই আলো-ঝলমলে বিশাল বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। সম্ভবত সে অপেক্ষায় ছিল। তাই মুহূর্তে দেবী এসে আমাদের সামনে দাঁড়ায়। আজ সে আকাশী রঙের একটা শাড়ি পরেছে, স্বর্ণাভ ঘাড়ে আলতোভাবে ঝুলছে মস্ত একটা খোঁপা, কপালে লাল টিপ, টানা টানা কাজল চোখদুইটা আবেগে কাঁপছে। বাড়ির ভেতরে পূজামণ্ডপ, মানুষের ভিড়। প্রাচীনকালের বিশাল বাড়িটার উত্তর কোনার দিকে একটা মস্ত বাগানের সামনে আমরা। তিনদিকেই এ্যরিকাপামের ঝোপ আর দেবদারু গাছ। তার নির্জন-কালচে ছায়ায় আমরা চারজন মুখোমুখি। মানিক সিগারেট ধরাবার উছিলা করে সরে গেল। স্বপন বলল, — এই তরা কথা বল আমি একমিনিটের মধ্যে আসছি।

কিছু বুঝে উঠার আগেই পুতুল আমার দুইহাত আঁকড়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেলে, — তুমি যে কী অন্ধ! কী আজব! আজ কতটা মাস ধরে আমি মরমে মরছি। এখন আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে … হায়!

পুতুল ফ্যাৎ ফ্যাৎ করে কাঁদতেই থাকে। আমাকে পরশু স্বপন বলেছে, — পুতুলের বর ইন্ডিয়ার শিলিগুড়িতে থাকে। ওরা এই দেশেরই মানুষ ছিল। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় এই দেশও যখন অস্থির হয়ে ওঠে তখন ওরা ভারতে চলে গেছিল। শিলিগুড়ি শহরে ওদের সোনার ব্যবসা আছে। সেখানে পুতুলের এক জ্যাঠামশায়ও বাড়ি কিনে বসত করছেন অনেক বছর আগে থেকেই। তিনিই এই বিয়ের ঘটকালিতে জড়িত। নেত্রকোনা শহরের পুরনো বাড়িতে ছেলের বৃদ্ধ পিতামাতা এখনো বাস করে। আপাতত পুতুল সেখানেই থাকবে।

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে পুতুল আমার গলা জড়িয়ে ধরে। তারপর বুকে মাথা ঘষতে ঘষতে বললে, — তোমাকে তো আমি সারাজীবনের জন্য হারালাম। হায় ভগমান! আমি-যে কী নিয়ে বাঁচব!

বলতে বলতে অবুঝ, অজ্ঞানের মতো পুতুল আমার পায়ের কাছে বসে পড়ে। ভয়ে আমার শরীর কাঠ! তবু তাকে জোর করে টেনে উঠাই। তালু-জিব শুকিয়ে মরুভূমি! তাই আমার গলা দিয়ে কথা আসছে না। হায় খোদা! এ কেমন বিপদ! আমি তো তাকে একটুও ভালোবাসি না। এইভাবে দুইদিনের আলাপে যে ভালোবাসা পাওয়া যায় তাকে আমি ভালোবাসা বলতে পারি না। ভালোবাসা যে কী আর এর ভয়াবহতা কত সুদূরপ্রসারী সেই সবক নেওয়া ছিল বলেই আমি পুতুলের কাছ থেকে পালাতে চাইছিলাম।

শরতের মেঘের মতো নরম আর হালকা পুতুল তখনো আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে ঝুলছিল। তার দেহের ভার, চুলের মিষ্টি গন্ধ, নিশ্বাসের গরম, চোখের পানির ভেজা স্যাঁতসেঁতে অনুভূতির কোনো মানেই ছিল না আমার কাছে। এত আতঙ্কের মাঝেও আমার ভয়তটস্থ শরীরে বারবার শুধু একটা বিজাতীয় শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল। ইচ্ছা করছিল ওকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসাহীন, কামান্ধ কয়টা চুমু খাই। প্রেম তো আর গাছের ফল না যে একটু নাড়া দিলেই টপ্পৎ করে আঁচলে পড়ে যাবে?

স্বপনের ফিরে আসার শব্দে পুতুল নিজেকে সামলে নেয়। মানিকও ফিরে আসে। আমরা এখন চারজন পাশাপাশি, ঘেঁষাঘেঁষি, সামনাসামনি। পুতুল সবার অলক্ষে পায়ের জুতা খুলে পালকের মতো মসৃণ আর তুলতুলে একটা পা আমার পায়ের উপর চেপে রাখে, — একটু ট্যাকনিক্যাল অসুবিধার জন্য তোমাকে আপ্যায়ন করাতে পারলাম না লুৎফর। পূজার পর থেকে আমি আর কলেজে যাব না। কিছু বলার থাকলে স্বপন কিংবা মানিকের কাছে … হুড়মুড় কান্নার চাপে পুতুলের কথা থেমে যায়।

মানিক আর স্বপন আমাকে একলা ফেলে হাঁটতে থাকে। পুতুল চট করে আমার কাছে এসে গাল পেতে দাঁড়ায়, — প্লিজ, একটা চুমু খাও। অন্তত বুকে একটা স্মৃতি থাকুক।

আমি নিরাবেগ গলায় তাকে পস্ট করে জানিয়ে দেই, — জোড়হাতে মিনতি করছি, নিষ্প্রেম হৃদয়ে চুমা খাওয়া আমার কাছে পাপের শামিল। আজ তাই তোমার কপালে চুমু খাব। আর যদি ভবিষ্যতে তোমার প্রেম আমার নির্ঘুম রাতের সঙ্গী হয়ে ওঠে তাহলে গাল পেতে দিয়ো, নিজেকে নিঃশেষে দেবো।

আমার কথা শেষ হতেই পুতুল ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে, — কবিতা হচ্ছে?
এই বলে পুতুল আমাকে জাপটে ধরে নিজেই একটা চুমু খেয়ে বাড়ির দিকে দৌড়ে পালায়।

পুতুল চলে যেতেই আমার বুকটা ধড়াস করে কেঁপে ওঠে। কেমন জানি খালি-খালি হয়ে যায়। আমি ঘোরগ্রস্তের মতো ধীরে ধীরে মেসে ফিরে আসি। কিন্তু সেই আমি আর আসি না; মুখে হাসি নাই, গলায় গান নাই, বুকের ভিতরে কেমন কাঁটাকাঁটা ভাব।

দিনে দিনে আমার গানের নদীটা শুকিয়ে মরল। কবিতাও পালিয়েছে। ভোরের ব্যায়ামটাও ছেড়ে দিলাম। খাবার সময় গরুর শুকনা খড় চিবানোর মতো স্বাদহীন ভাত চিবাই। আর পড়ি। শৈশব থেকেই শত দুঃখেও আমি পড়তে পারি। তাই লেখাপড়া বেড়ে গেল। বাড়ল সিগারেটও। মাঝেমাঝে মরা ব্রহ্মপুত্রের চরে গিয়ে একলা একলা হাঁটি। মটরক্ষেত, খেসারি কলাইয়ের ক্ষেত, চিনাবাদামের ক্ষেত দেখতে দেখতে নির্জন চরে মাইলের পর মাইল হাঁটি। একদিন দেখি ছোট্ট একটা জলার কিনারে দুইটা গুইসাপ পরস্পরকে আট হাত-পায়ে জড়িয়ে ধরে পানির মধ্যে গড়াগড়ি খাচ্ছে আর পরস্পরকে আদর করছে। অর্থাৎ তারা সং করছে! আমার হৃদপিণ্ডটা লাফিয়ে গলার গাছে চলে আসে। নাকে পাই পুতুলের শরীরের সুগন্ধ, বুকে পাই তার ছোট ছোট, শক্ত ও পেলব বুকদুইটার ওম-ওম পরশ। হায় আমার আল্লা! আমি সেই নির্জন, খাঁ খাঁ বালুচরে একলা একলাই হাউমাউ করে কেঁদে উঠি। মাথার মাঝে ঝিলিক দিয়ে উঠে কবিতার লাইন :

কৈ গ্যালো পান, পানি, পরান তামাক
তালুডা যে পদ্মার চর!
ক্যাডা যে কৈছিন এইরহম কালা পানির দ্যাশে আইতাম?

রাতে আর একলাইনও পড়তে পারলাম না। বাকি কবিতার একটা শব্দও নেমে এল না। ঘুমও আসছে না। মাথার যন্ত্রণায় রাত বারোটার দিকে রুমে তালা দিয়ে পাগলের মতো বেরিয়ে পড়ি। বাইরে বসন্তের একটু একটু শীত। যে-খেতাটা গায়ে জড়িয়ে বিছানায় মরার মতো পড়ে ছিলাম সেইটা দিয়েই শরীর-মাথা ঢেকে নিই। ঠোঁটের সিগারেট কখন-যে খেতায় পড়েছে খেয়াল ছিল না। বড় রাস্তায় উঠতেই খেতায় দপ করে আগুন ধরে যায়। আমি ভড়কে গিয়ে খেতাটা গা থেকে খুলে পাশের ড্রেনে ফেলে হাঁটতে থাকি। শনি যেভাবে মানুষ নামের শিকারকে টেনে টেনে চরম সর্বনাশের দিকে নিয়ে যায় আমিও সেইভাবে হাঁটতে হাঁটতে মাছবাজারে মদ-গাঁজার দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। ভেতরে গ্লাসের শব্দ, বোতল থেকে তরল ঢালার ওপ…ওপ…শব্দ। বাংলা মদের দুর্গন্ধে আমার আঁত-নাড়ি উল্টে আসছে! জীবনে এইসব চোখেও দেখিনি। তবু মরিয়া হয়ে কাউন্টারের ছোট্ট গর্তে মুখ রেখে বাইরে থেকে বলি, — দুই টাকার একপোটলা গাঞ্জা দেন।

আমার গলার শব্দে কী ছিল জানি না। ভেতর থেকে সাথেসাথে একজন বেরিয়ে আসে। আধো অন্ধকারে তাকে দেখে আমি চমকে উঠি। কালো চিতার মতো চমৎকার গড়নগাড়নের দীর্ঘদেহী সুপুরুষ সে। তাকে কোনোদিন শহরের রাস্তায় হাঁটতে দেখিনি। সবসময় ক্লিনশেভড। সবসময় ফিটফাট। দিল্লির বাদশাদের মতো হেলান দিয়ে রিকশায় বসে থাকে, রিকশা ধীর গতিতে চলছে। মালে টাল হয়ে গেছে বলে মাথাটা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। সে এই শহরের শ্রেষ্ঠ মাতাল, শ্রেষ্ঠ বিলাসী পুরুষ এবং সম্ভবত কিছুটা ধনবানও। টলতে টলতে লোকটা আমার সামনে এসে ঝুঁকে, আমার মুখের কাছে মুখ এনে এক-নজর দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, — হায় বাপ! তুমি এই মুখ, এই সুন্দর গোঁফ লইয়া দুইটাকার গাঞ্জা কিনতে আইছ? হায় বাপ! এই লও জুতা, আমার নসিবে মারো, কেন আমি মদ খাই?

মাতাল লোকটা তার পায়ের জুতা খুলে আমার হাতে জোর করে ধরিয়ে দিতে চাইছে আর কাঁদছেই, — হায় বাপ! যৌবনের দুঃখ বেশিদিন থাকে না। ঘোর কেটে গেলে শুধু পস্তাবা। যাও, যাও বাপ, এই নরক থেকে পালায়া যাও।

সাথেরজনেরা এসে ধরাধরি করে লোকটাকে নিয়ে গেল। আমি গাঞ্জাটাঞ্জা ছাড়াই ঠ্যাংভাঙা, কানকাটা চোরের মতো কোনোরকম রুমে ফিরে আসি।

আবার শরৎ এসেছে। ব্রহ্মপুত্র নদীর চরে চরে সাদা ফুলের বাহার। আকাশের অনেক উঁচুতে কিছু কিছু সাদা মেঘ খুশিতে ঘুরাফিরা করে। কিন্তু বৃষ্টি হয় না। আমার বুকের ভিতরে কী যে নড়াচড়া করে, কী যে অপেক্ষা করে! একদিন ক্লাস শেষে স্বপন আমার কানে কানে বললে, — নেত্রকোণা থেকে পুতুল আজ আসবে।

কেউ আমাকে না বললেও আমি জানতাম। শহরের সাহাবাড়ির ঢাকের শব্দ শুনতেই আমার হৃদয় বলছিল সে আসবে।

আমি হু-হা করি না। গত একবছরের মাঝে আমি একবারও স্বপন কিংবা মানিকের কাছে পুতুল বিষয়ে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করিনি। মাঝেমাঝে ওরা পুতুলের শ্বশুরবাড়ির খবর কিংবা তার শিলিগুড়িতে চলে যাওয়ার প্রস্তুতির কথা বলত। তো আমার কোনো সাড়া-শব্দ নাই দেখে স্বপনও আর কথা বাড়ায় না।

গান-কবিতা বিদায় নিলেও খরখরা বুকে তখন কথাসাহিত্যের বাতাসে উপন্যাস নামক বৃক্ষের পাতা মর্মর ধ্বনি তুলছে। কারণ আমি তখন ‘রোদন উপাখ্যান’ নামে একটা উপন্যাস লিখছি। ভয়াবহ প্রেমের উপন্যাস। পরীক্ষার পড়া শেষ করে গভীর রাতে লিখতে বসে যতটা না উপন্যাস লিখি, নায়কের কষ্টে তারচে বেশি কাঁদি। কারণ উপন্যাসের পরিকল্পনামতো শেষমেশ নায়ক ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করে প্রেমের জ্বালা জুড়াবে।

পুতুল বাড়িতে এসেই স্বপনের মারফত এইবারও পূজার দাওয়াত দিলো। আমিও মনে মনে অপেক্ষায় ছিলাম। সেই সন্ধ্যা। সেই এ্যরিকাপামের ঝোঁপ। আমি কিছুই জানতাম না। স্বপন উত্তরের কোনায় আর মানিক দক্ষিণের ছোট পথটার পাশে। এইদিকে কারো আসার সম্ভাবনা নাই। তবু তারা পাহারায় দাঁড়িয়ে গেছে! বুঝলাম দেবী চৌধুরাণীর নির্দেশে আজ তার বাল্যবন্ধুরা বুক দিয়ে তার নিকুঞ্জবিলাসে নিরাপত্তা দিবে। স্বপন না হউক মানিকের অন্তত তা-ই করা উচিত। কারণ আমি গত দেড়বছর ধরে রাত একটার পর মানিকের পিরিতিকালীন নিরাপত্তার জন্য রড হাতে একটা কাঁঠালগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতেছি। তো একদিন রাতে মানিকরা দুইজনই মেয়ের মায়ের হাতে ধরা পড়ে আর মেয়ের বাপ এই মোটা বাঁশ দিয়ে আমার পিঠে মারে এক লাঠি। আমি দিশাবিশা না পেয়ে পিঠ বাঁচাবার জন্য পাশের কাঁচা ড্রেনেই লাফিয়ে পড়ে কোনোমতে রক্ষা পাই।

সেই একই ভঙ্গি, দেবী দেবী একই ভাব নিয়ে পুতুল আসে। এসেই আমার গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে, — লুৎফর, আমি সুখী হইনি। ও একটা মাতাল, লম্পট!

গত একবছরে পুতুলের প্রতি আমার প্রেম একটু একটু করে বনস্পতির মতো অনেক উঁচুতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। তাই আমিও সেই গুইসাপটার মতো পতুলকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার দুইচোখ দিয়ে ঝরঝর করে ঝরছে পুতুলের প্রেম।

অনেকক্ষণ পর পুতুল বললে, — আজ বাবা ব্যাংক থেকে পাঁচলাখ টাকা তুলে এনে ঘরে রেখেছে। আমরা আগামী পরশু ভারতে চলে যাব। একবার মনে হলো এই টাকা নিয়ে তোমার সাথে পালিয়ে যাই। অনেক ভেবে দেখলাম এই করে শুধু আমরা আমাদের প্রেমকেই গলাটিপে হত্যা করব … বলতে বলতে পুতুল জ্ঞান হারিয়ে আমার বুকের মাঝে ঢলে পড়ে।

অবশ, অনুভবশূন্য মগজে অনেক রাতে রুমে ফিরে আসি। বুকের মাঝে জহরের জ্বালা, কষ্টের চিনচিনানি। কী একটা যেন বেরিয়ে আসার জন্য ভেতরে উথালপাথাল করছে। আমি দ্রুতহাতে কলম নিয়ে কবিতার খাতা খুলে বসি :

যেদিকে চোখ যায় মসজিদের মিনারের মতন
আমার প্রেম, লাখে লাখে পুতুলের মুখ
বাসনার কবরে আজ শুধু কথা কয় পুষ্পের আগুন
নরকে আমি নিঃসঙ্গ গুনাগার!
কৈ গ্যালো পিতৃসম বৈরাম খাঁ
কোথায় মিলায়া গ্যাছে আমার নবরত্ন,
জেনানা মহল?
কৈ গ্যালো পান, পানি, পরান তামাক
তালুডা যে পদ্মার চর,
ক্যাডা যে কৈছিন এইরহম কালা পানির দ্যাশে আইতাম?

একই লেখকের অন্য রচনা / আমার দেখা শারদীয় উৎসব
শেখ লুৎফর রচনারাশি

COMMENTS